![]() |
| আড্ডা হবে খুব জমাটি : পিনাকী চৌধুরী |
আড্ডা হল বাঙালির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক । বস্তুতঃ আড্ডা ছাড়া বাঙালির অস্তিত্ব কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব ! তা সে রকের আড্ডাই হোক , কিম্বা কফি হাউজের সেই বিখ্যাত আড্ডা । বাঙালির স্মৃতিতে আজও অমলিন সেই আড্ডা ! হ্যাঁ, মনের প্রসারতা ঘটে এইসব আড্ডায় । আর তারসাথে চলে পরচর্চা পরনিন্দা ! আর এই পরচর্চা পরনিন্দা করলে আমাদের মস্তিষ্কে ওপিয়েটার ক্ষরণ হয় , যাকিনা আমাদের মনকে উজ্জীবিত করে মনকে ভাল রাখে ! চায়ের দোকান যেন মধ্যবিত্তের বিশ্ববিদ্যালয় ! এখানে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যেন তর্ক চরমে ওঠে । কি নেই সেই চায়ের দোকানের আড্ডায় ?
রাজনীতির চাপান উতোর থেকে শুরু করে সৌরভ গাঙ্গুলির ' বাপি বাড়ি যা' কিম্বা পাড়ার সেই মেয়েটির গল্প -এসবই এখানকার আড্ডার বিষয়বস্তু ! আর রকের আড্ডার কথা বলতে গেলেই যেন অবধারিত ভাবে এসে যায় উত্তর কলকাতার সেইসব ট্র্যাডিশনাল রকের আড্ডার কথা , যেখানে একদম টিপিক্যাল মধ্যবিত্তরা অতি সাধারণ পোশাক , এমনকি লুঙ্গি পরে আড্ডায় মেতে উঠতেন অতীতের একসময় ! সে তুলনায় দক্ষিণ কলকাতার আড্ডাটা আবার কিছুটা আলাদা, পার্টি কালচারই যেখানে শেষ কথা ! বেশ একটা আভিজাত্য বজায় থাকে সেই আড্ডায় ! আর কলকাতার ম্যাডাক্স স্কোয়ারের সেই চিরাচরিত পুজোর আড্ডাতো একটি ঐতিহ্য ! এছাড়াও ছাত্রাবস্থায় ক্লাস বাঙ্ক করে কলেজ ক্যান্টিনের আড্ডা যেন বাঙালির এক নস্টালজিয়া! তবে মানুষ সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই বোধহয় আড্ডায় মেতেছেন ।
প্রাচীন গ্রীসের মহান দার্শনিক সক্রেটিস কিন্তু আদ্যন্ত বিচক্ষণ এবং অবশ্যই জ্ঞানী মানুষ ছিলেন । তিনি জানতেন কিভাবে আপামর শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো প্রবেশ করানো সম্ভব । তাই সক্রেটিস তাঁর শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ভাবে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা প্রদান করতেন না । তিনি পথে প্রান্তরে, সাবেকি হাটে নিতান্তই আড্ডার ছলে শিক্ষা ও উপদেশ দিতেন । প্রথমেই তিনি তাঁর অনুগামীদের কিছু দার্শনিক প্রশ্ন করতেন , তারপর তাদের উত্তর মন দিয়ে শুনতেন এবং সবশেষে যুক্তির মাধ্যমে তাদের মতকে খন্ডন করতেন ! সত্যিই যেন সক্রেটিস অভিনব এই উপায়ে এবং অবশ্যই আড্ডার আড়ালে নিরন্তর শিক্ষা প্রদান করতেন ! তবে এখানে উল্লেখ্য যে, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল আজও সর্বজনবিদিত ।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, এই রোটারি ক্লাবের জন্মই হয়েছিল আড্ডা থেকে ! কিন্তু কি সেই কাহিনি ? ১৯০৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের মার্কিন অ্যাটর্নি পল পি হ্যারিস এই রোটারি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন । ভিন্ন পেশায় নিযুক্ত তিন জন বন্ধুর সঙ্গে সপ্তাহান্তে আড্ডা দিতে দিতে সম্পূর্ণ সেবার উদ্দেশ্য এবং বন্ধুত্ব সৃষ্টির শপথ নিয়ে তিনি এই সংগঠন তৈরি করেন , যাকিনা পরবর্তী সময়ে ডালপালা বিস্তার করে মহীরুহ হয়ে যায় ! বর্তমানে সারা বিশ্বের কমবেশি ২০০ টি দেশে প্রায় ১২০০০ রোটারি ক্লাব নিরন্তর সমাজসেবা মূলক কাজে ব্রতী ! প্রায় প্রতিটি সপ্তাহের সাপ্তাহিক সভায় রোটারি ক্লাবের সদস্যরা আড্ডায় মেতে ওঠেন এবং অবশ্যই নিজেদের কর্মসূচি নির্ণয় করেন । হ্যাঁ, আমাদের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে আজও আলোড়ন তোলে ঐতিহ্যবাহী আড্ডা !

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন