অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল
অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

পর্বঃ-২

     বাড়ীতে এসে নিরুপমা,পিতা- শুভময় গাঙ্গুলী ও মাতা-আশাপুর্ণা দেবীকে বললেন।
---বাবা!তোমাদের কাছে আজ একটা চরম সত্য জানতে চাইবো?
---যদি না কষ্ট পাও।দুঃখ পাও।তাহলে আমি অভয় পেলে একটা কথা জিজ্ঞসা করবো।
---প্রত্যুত্তরে বাবা-মা বললেন হ্যাঁ।তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো।বাস্তবটা তোমার জানবার প্রয়োজন আছে বৈকি।
---তখনই নিরুপমা জিজ্ঞাসা করলেন,আমার জন্মদ্ধাত্রী পিতা-মাতা কে?
---আমার জন্মস্থান কোথায়?
---তখন শুভময় বাবু বললেন!তোমার অতীতটাকে শোনালে তুমি কষ্ট পাবে।তাই আমি বলতে গিয়েও আমি বার বার বিরহের কাছে হেরে গিয়েছি।তুমি আজ যখন তোমার অতীতটাকে তুমি জানতে চাইছো,তাহলে বলছি......
---এই বলে শুভময় বাবু নিরুপমার অতীত জীবনের সমস্থ বিরহ-বেদনা'সৃক্ত দুঃখের কাহিনী পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে স্মৃতি চারণ করলো।
---শুনে নিরুপমা বোধির হয়ে গেল।ক্ষণিকের জন্য বাক্ শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।নিঃস্তব্ধ-নিঃশ্চুপ! দু'চোখ দিয়ে অনর্গল বেদনার অশ্রু-ধারাপাত নামতে থাকলো।নিরুপমার চোখের জল দেখে আশাপুর্ণা দেবী নিজের চোখের জলকে ধরে রাখতে পারলেন না।মা যেমন কাঁদে,মেয়েও তেমন কাঁদে।কেউ কাহুকে সান্ত্বনা দেওয়ার নেই।বুকে সহস্র বেদনার পাথর চেপে আশাপুর্ণা দেবী নিজেকে সামলে নিয়ে পরম-স্নেহে নিরুপমাকে কোলে টেনে নিয়ে মমতার আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে লাগলেন।
---দেখে!শুভময় বাবু তাঁর স্ত্রীকে বললেন।আশা,ওকে একটু কাঁদতে দাও!সোনা যেমন আগুনে পুড়তে পুড়তে খাঁটি হয়।ঠিক তেমন,আমাদের নিরুপমা-মা' ওর আপন বাবা-মা-য়ের জন্য কেঁদে,তাঁদের মৃত আত্মার-মুক্তি শান্তি কামনা করুক।সজ্ঞানে নিজের বাবা-মায়ের উপস্থিতি দেখেনি, অনুভুতিতে ওর বাবা-মায়ের উপস্থিতি অনুভব করুক।আর নিজের মৃত মায়ের শেষ ইচ্ছাটুকু পুরণ করবার জন্য,নতুন করে নিজেকে আর একবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আগামীর পথিকৃত যাত্রী করে তুলুক নিজেকে।ওকে তুমি বাঁধা দিয়ো না।

     পালিত পিতা,শুভময় বাবুর মুখে অমুল্য-অক্ষয় কথাটি শুনে,নিরুপমা চোখের জল মুছে বাবা-মা-কে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলো।আর বললো,স্ব-জ্ঞানে আমি জেনে এসেছি তোমরাই আমার বাবা-মা।এভাবেই সারা জীবন বাবা-মা হয়ে ভালোবেসে বুকে আগলে রাখবে।আজ না হলেও এই চরম সত্যটি দুদিন পরে তোমাদের মুখে শুনতাম।তাই ওদেরকে অপরাধী বানিয়ে,তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে চাইনা।

     অাজ থেকে তোমাদেরকে ছুঁয়ে আমি শপথ করছি,আমি পড়াশুনা করে শিক্ষিত হবো।তোমাদের আদর্শে মানুষ হয়ে দুনিয়ার বুকে প্রতিটি স্বার্থন্বেষী মানুষকে বুঝিয়ে দেব,মানবতার ঊর্দ্ধেঃ কোন ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত কিছুই নেই।মিথ্যা জাত-ধর্ম শুধুমাত্র কুসংস্কার।ধর্ম আর জাতের মাঝে শুধু হিংসা-বিভেদ আর বিদ্বেষ।তাই সবার মাঝে আমি এই মানবতার মন্ত্র বিলিয়ে দেব.......
              "সবার উপরে মানুষ সত্য;
              মানবতাই সর্ব-শ্রেষ্ঠ ধর্ম!
              বিবেক-চেতনা ঘুমিয়ে ঘার আঁধারে,
              জড়িয়ে মোহ-কুসংস্কারের বর্ম"।

     এই আদর্শে দীক্ষিত হয়ে,নিরুপমা উদ্বীপ্ত দুটি-চোখে স্বপ্ন নিয়ে বড়ো হতে থাকলো সমাজ সেবার ব্রতে পথিকৃত অভিযাত্রী হয়ে।নিরুপমা দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের মাঝে বিবেকের বীজ বসিয়ে মানবতার ফসল ফলাতে চেয়েছেন।হিংসা-বিবাদ-বিদ্বেষ-কুসংস্কার ভুলে,যেখানে থাকবে শুধু সততা-প্রেম-প্রীতি;আবেগ-সহানুভুতি,শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।এই ভাবে মানব সেবার মধ্য দিয়ে,পেরিয়ে এসেছেন নিরুপমার জীবনের আঠারোটি রঙীন-বসন্ত।দেখতে যেমন সন্দর-সুশ্রী,ব্যবহারে তেমন স্নেহ সুধা বিরাজমান।এভাবে কেটে গেল নিরুপমার জীবনের মুল্যবান কয়েকটি বছর।

     হঠাৎ একদিন,নিরুপমার জীবনে চরম দুঃখ নেমে এলো।''অভাগী যে দিকে চায়;সাগর শুকিয়ে যায়''!শুভময় বাবু ও আশাপুর্ণা দেবী সকাল বেলা বেরিয়ে যায় এক মন্দিরে পুজা দিতে।শত শত মানুষের ভিঁড়ে লাইন ঠেলে,ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ চাইলেন।তার আদুরিনী নিরুপমার জন্য।পুজা-পার্থনা সেরে মন্দির থেকে ফেরার পথে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক চরম দুঃর্ঘটনা।পথে একটা গাড়ীর ধাক্কায় দম্পত্তি যুগল একই সঙ্গে প্রাণ হারালেন।
---হায়রে বিধাতা!
---এ কেমন তোমার বিধি লিপি.......??
---নিরুপমার জীবনে নেমে এলো দুঃখ-বিরহ-বেদনাময়-বিষাদের ছায়া।
---তা হলে কি সত্যিই......!
---নিরুপমা অপয়া,অসহায়-অভাগীনি?
---এই আবেগী কৌতুহল পাঠকের মনে আবারও তীর ছুঁড়লো.......
---যে ডাল আঁকড়ে ধরতে চায়,তখনই ঠিক সেই ডাল বেদনার ঝোড়ো দমকা হাওয়ায় নিমেশে ভেঙে দিয়ে যায়।
---এটাই কি নিরুপমার জীবনের বিধিলিপি?
---না কি ভবিতব্য?
---এমনই প্রশ্ন;বারংবার পাঠকের মনে অসমাপ্ত থেকে যায়।

     দু'চোখে ভরা শ্রাবণ নিয়ে,অভাগী নিরুপমা তার মৃত বাবা-মা-কে নিয়ে রুপসা নদীর তীরে, যে শ্মশানে অভাগীনির নিজের বাবা-মাকে দাহ করতে শুনেছিল।সেই খানে পালিত বাবা-মাকে নিজের হাতে মুখাগ্নি করে শেষকৃত্য কার্য সম্পন্ন করে।জলন্ত চিতা বার বার নিভে যায়,তার দু'চোখের বেদনার অশ্রু-ধারাপাতে।একের পর এক নিরুপমার জীবনে নেমে আসে দুঃখ-দৈন্য-অভিশাপ।জীবনের দুঃখ যন্ত্রণা ভোলার জন্য প্রতিদিন ওই রুপসার তীরে বসে উন্মত্ত ঢেউয়ের সাথে নীরবে কথা বলে।আর একান্তে চোখের জল ফেলে।তার অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া সকল সুখ-দুঃখ-ব্যথা-বেদনার কথা খাতার পাতায় স্মৃতির আঁখরে লিখতে থাকে।যার নাম দিয়েছিল ''অভাগীনির নক্সী-গাঁথা''।
---যে কাব্যে রয়েছে রয়েছে নিরুপমার জীবনের হাজার স্মৃতি জড়ানো দুঃখ-যন্ত্রণা।শত সহস্র বেদনা'সৃক্ত এক অভাগীনি মেয়ের হাজার বিরহ-অশ্রু ঢালা ইতিকতা।

     প্রতিদিনের মতো অভাগীনি নিরুপমা রুপসার তীরে গিয়ে নির্জনে নীভৃতে গাছের ছায়ায় বসে নীরবে সবুজ গাছেদের সঙ্গে নিঃশব্দে কথা বলে।আর গাছের সবুজ পাতারা বিরহে ঝরে পড়ে অভাগীনিকে সহানুভুতি জানাতে।এরকমই কোন একদিন কোন এক সময় অচেনা-অজানা এক তরুণ যুবক দুর থেকে একান্তে একাকীত্বে বসে থাকা অভাগীনির দুঃখময় ভঙ্গিমাটি অনুধাবন করলো। এরকম ছেলেটি প্রতিদিন রুপসার তীরে আসে মুক্ত বাতাস খেতে।আর একই দৃশ্য বারংবার তার চোখে পড়ে।

     একদিন ছেলেটা কৌতুহলী হয়ে সুন্দরী বৃক্ষের পাদদেশে দাঁড়ায়।চুপিচুপি দেখলেন,মেয়েটি একান্তে খাতার পাতায় কি সব আঁকছে আর লিখছে।নীরবে চোখের জল ঝরিয়ে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.