বাংলা নাটকের কাল কল্লোল : মৃদুল শ্রীমানী

 মৃদুল শ্রীমানী
বাংলা নাটকের কাল কল্লোল : মৃদুল শ্রীমানী

(উৎপল দত্ত ও কল্লোলকে মনে রেখে)


বাংলা ভাষায় আধুনিক সময়কালে মঞ্চ নাটকের পথিকৃৎ একজন রাশিয়ান। নাম তাঁর গেরাসিম লেবেদফ। কলকাতা শহরের রাইটার্স বিল্ডিংসের কাছাকাছি একটি জায়গায় তিনি তাঁর নাটক "কাল্পনিক সংবদল" মঞ্চস্থ করেছিলেন। বাংলায় নাটকের চর্চা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশের উৎসাহে। কিন্তু যে সব পণ্ডিতেরা নাটক লিখেছিলেন তাঁদের প্রতিভা ছিল না। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এমন নাটক দেখেছিলেন এবং নাটকের প্লট সংলাপ উপস্থাপনা পরিচালনা দেখে হতাশ হয়েছিলেন। তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন "অলীক কুনাট্য রঙ্গে
মজে লোক রাঢ় বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়....."

মাইকেল নিজেই নাটক লিখলেন। নাটকের নাম "শর্মিষ্ঠা"। সেই প্রথম প্রতিভাধরের হাতে বাংলা নাটক। নাটক লিখে সকলের মন কেড়ে নিলেন দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর "নীলদর্পণ" সাড়া ফেলে দিল। নিপীড়িত মানুষের মনের কথা পড়তে পেরেছিলেন নীলদর্পণকার আর নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে কলমের মুখে রূপ দিয়েছিলেন শাসকের অকথ্য অত্যাচারের। অসামান্য জনপ্রিয়তা দেখে নাটকটিকে নিষিদ্ধ করে তদানীন্তন শাসক।
 নাট্যামোদী মহল নীলদর্পণ এর ইংরেজি অনুবাদ করান। শোনা যায় অদ্বিতীয় প্রতিভাধর মধুকবি ওই ভাষান্তরণের কাজটি করেছিলেন। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু থেকে মহাকবিকে আড়াল করতে পাদ্রী জেমস লং সাহেব নিজের নাম সামনে রেখে ইংরেজি ভাষায় নীলদর্পণ পেশ করলেন। ইংরেজ শাসকের বিচার লং সাহেবকে ছাড়ে নি। তাঁর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হয়েছিল। একটি ছড়ায় তা ধরা পড়েছে।
নীল বাঁদরে সোনার বাংলা করলে এবার ছারেখার
 অসময়ে হরিশ মোলো লঙের হল কারাগার
প্রজার প্রাণ বাঁচানো ভার।
লং সাহেবের হয়ে জরিমানার টাকাটা গুণে দিয়েছিলেন আর এক বঙ্গ সুসন্তান কালীপ্রসন্ন সিংহ ওরফে হুতোম পেঁচা।

বাংলায় "নীলদর্পণ" দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। এই আপাদমস্তক জনদরদী সমাজসেবী মানুষটি বাংলা সাহিত্যের উন্নতিতে প্রাণপাত করতেন। কিন্তু তাঁর আসল লক্ষ্য ছিল জনমানসের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি। নীলদর্পণ নাটকে বাংলার চাষির উপর শাসকের সীমাহীন অত্যাচার দেখে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্থান কাল পাত্র ভুলে নিজের চটি ছুঁড়ে দেন মঞ্চে নীলকর সাহেববেশী নট অর্ধেন্দু মুস্তাফির দিকে। তখনই বিদ্যাসাগর প্রবাদ পুরুষ। তাঁর ছুঁড়ে দেওয়া চটি নাট্যচর্চার প্রতি অভিজ্ঞান হিসেবে মাথায় নিয়ে অভিনেতা বর্ণপরিচয়কারকে প্রণাম করেন।
নীল দর্পণের আগে বাংলায় নিজের সম সময়ে যে নাটক অভিনীত হচ্ছিল, তা দেখে তাঁর মোটেও ভাল লাগে নি মাইকেল মধুসূদন দত্তের। অবশ্য বড় মানুষদের মধ্যে একটা মহৎ অতৃপ্তি বোধ কাজ করে। তিনি তাঁর সমসময়ের বাংলা নাটককে "কুনাট‍্য" আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি নিজেই নাটক লিখে দেখিয়ে দিলেন নাটক কেমন হতে পারে।
শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী আর কৃষ্ণকুমারী নাটকে তাঁর দীপ্ত প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ সালের মধ‍্যে এই কাজ করে ফেলেছেন তিনি।

নাটকের সাথে প্রহসনও লিখেছিলেন। সমকালীন বাঙালি জমিদার বড়লোকের নারীঘটিত কুঅভ্যাসকে ব্যঙ্গ করে দুটি নাটিকা। একেই কি বলে সভ্যতা, আর বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ ।
নারীমাংস ভোগের বেলা জমিদার মহাজনের জাতবিচার কোথায় থাকে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে জমিদার মহাজনেরা যে গরিবের ঘরের নারীর ইজ্জত লুটতে সমান দক্ষ ছিল, তিনি কলমের মুনশিয়ানায় সেটা দেখিয়েছেন। জাত নয়, এদের শ্রেণীচরিত্র উন্মুক্ত করেছেন কবি। শ্রেণীচরিত্র অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁর কলমের জাত চিনিয়ে দেয়।

বাংলা নাটক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নাট‍্যচর্চা নিয়ে বলতেই হবে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বেশ একটা সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ ছিল। একে তো ব্রাহ্ম সমাজের সূত্রে নানা কাগজ বের করা হয়েছে। সে গুলিতে কম বেশি সবাই লেখালেখি করত। বাড়িতে কবি সাহিত্যিক চিত্রকরের যাওয়া আসা ছিল। রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন তাঁর কুড়ি বছরের বেশি বড়দাদা স্বপ্ন প্রয়াণ লিখছেন। মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনী বেশ বলিয়ে কইয়ে মানুষ। বিলেতে থাকতে রবীন্দ্রও অনেক গান আর সুর বুকে পুরে এনেছেন। নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্র পিয়ানোয় ঝমাঝম সুর তোলেন। তাতে কথা বসান রবীন্দ্র। ..জ্বল জ্বল রে চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ পরাণ  সপিবে বিধবা বালা।.. পাশের বাড়ির গণদাদা গুণদাদার ও উৎসাহ আছে। আছেন রবিজীবনের ধ্রুবতারা নতুন বৌঠান। তিনি নিজের স্বামী জ্যোতিরিন্দ্র, নামী কবি বিহারীলাল আর সদ্যোতরুণ রবীন্দ্র এই তিন প্রতিভাধরকে উৎসাহিত রাখেন। গ্রীসের তিনমাথা ওয়ালা দেবী হেকেটির সাথে মিল খুঁজে ওঁর মজার নাম হল শ্রীমতী হে। গ্রীসের নাটক, আর স্যাটায়ার নিয়ে কিছুই কি চর্চা হত না নতুন দা আর বৌঠানের সাথে? আর আইরিশ অপেরা। বাড়িতে নাটকের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল। জমিদারি ছড়ানো ছিল সারা বঙ্গের নানা স্থানে ও উড়িষ্যায়। জমিদারির আয়ে চলে বিপুল সংসার। বাড়ির অনেক মেয়েই জামাইসহ থাকেন। সুতরাং নিজেরাই কুশীলব, নিজেরাই আয়োজক, আর বাড়ির সদস্যরাই দর্শক। কেবলমাত্র জমিদারি জড়তার কারণে মেয়েরা চিকের আড়ালে বসেন। বালিকা ভাইঝি প্রতিভাকে নিয়ে রামায়ণকার বাল্মীকির সারস্বত উত্তরণ নিয়ে লেখা নাটক অভিনয় করলেন রবীন্দ্র। বাল্মীকি প্রতিভা। ঠাকুরবাড়ির সকলেই বেশ সুদর্শন। অনেকেই গানের সমঝদার। গানের গলায় রবীন্দ্র অতুলনীয়। নাটক জমে যেতে আর কি লাগে?

বাংলা গীতিকাব‍্যের "ভোরের পাখি" বিহারীলাল চক্রবর্তী মশায়ের কলম থেকে উৎসারিত হয়েছিল "কে রে বালা ব্রহ্মরন্ধ্রে বিহরে"। এই কথা গুণগ্রাহী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ওই যে বালা, বালা শব্দের অর্থ মেয়ে, ও যেন রবীন্দ্রনাথের নন্দিনী হয়ে উঠল। ও মেয়ে ভালবাসতে জানে আবার যুদ্ধ করতেও জানে। নন্দিনী যোদ্ধা, নন্দিনী সংগঠক, নন্দিনী স্বপ্নদ্রষ্টা। নন্দিনীর ভেতর একটা রাঙা আগুন আছে। ও সংগ্রামী, কিন্তু সন্ত্রাসবাদী নয় কিছুতেই। লুকিয়ে চুরিয়ে চোরাগোপ্তা আক্রমণে ব্যক্তি হত্যায় নন্দিনী নেই। নন্দিনী বশ করবে রাজাকে। রাজাকে সর্দারি খাঁচা থেকে বের করে আনবে। নন্দিনী ফাগুলালকে সচেতন করে। বিশুকে উদ্দীপ্ত করে। কিশোরকে সংযত করে। একটি দূরদর্শী সংগঠকের নৈপুণ্যে ওই মেয়ে সকলের মধ্যে শুভবোধকে জাগিয়ে দেয়। 

নাটক জনজাগরণের কাজ করে। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় চাষা ভূসো লোকেরা তলস্তয়ের নাটক মনোযোগ সহকারে দেখছে, এ ঘটনা রবীন্দ্রনাথের নজর কেড়েছিল। আজ নানা জায়গায় রক্তকরবী অভিনয় হবার কথা শুনি। সাঁওতালি ভাষায় রক্তকরবী হয়। জেলখানার সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিরা রক্তকরবী করে। রক্তকরবী নাটকের মধ্যে প্রবল এক জাগানিয়া শক্তি আছে। অথচ এই নাটক লিখতে কবিকে গোটা দশেক খসড়া করতে হয়েছিল। স্বপ্নলব্ধ দৈব লব্ধ জিনিস নয় নন্দিনী। কবি তাকে গড়েছেন বুকের রক্ত নিংড়ে। কে রে বালা ব্রহ্মরন্ধ্রে বিহরে! বাংলা নাটককে বিশ্বের আঙিনায় পৌঁছে দিতে "ডাকঘর" বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ডাকঘর, আর তার ভিতরে অমল আর ঠাকুরদার সম্পর্ক বিশ্ব নাট‍্যসাহিত‍্যের চিরকালের সম্পদ।

ছোট শিশু যেন কেমন করে বিশ্বের দুঃখবাণীগুলি জেনে ফেলেছে। জেনে ফেলেছে যে এ সাধের পৃথিবী ছেড়ে বড়ো অসময়ে তাকে চলে যেতে হবে। কেন যে যেতেই হবে, কেন এ অমোঘ ডাক, সেই নিয়ে কোনো অভিযোগটুকুও নেই বালকের। কিন্তু তা বলে পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ হতে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায় না সে। জানতে চায়। জানতে পেলে খুশি হয় অমল। কল্পনার মায়া কাজল মাখানো অমলের চোখ দুটি। নিজের বাপ মা নেই। গ্রাম সম্পর্কে পিসির কাছে মানুষ। রোগা ছেলেটিকে পিসেমশাই মাধব দত্ত ভারি ভালবাসে। আর অমল যে পৃথিবীতে বেশিদিন টিঁকবে না সেটা মাধব দত্ত জানেন। ছোটো ছেলেটির সামনে কাঁদতেও পারেন না। কেবল ওর চলে যাওয়াটুকু একটু সুসহ হলে যেন বেঁচে যান মাধব।

তাকে জীবনীশক্তিতে বঞ্চিত করলেও ভালবাসা আকর্ষণের শক্তির কোনো খামতি দেন নি প্রকৃতি। জানালার ধারটিতে বসে সে আপনমনে চলমান জনজীবনের স্পন্দন দেখে চলে। বিশ্ব সংসারের নাচের তাল এসে ঘুরে ফিরে যায় ওর শয্যাপার্শ্বের জানালার ওপার দিয়ে। যা কিছু জীবন্ত, যা কিছু প্রাণময়, তার প্রতিই অমলের অমোঘ কৌতূহল। সবাইকে ডাক দেয় অমল। কাজের মানুষ অনেকে রাগ করে। রাগ করে, কেন না তাদের খেটে খেতে হয়। তারপর অমলের মিনতি মাখা চোখদুটো দেখে তাদেরও হৃদয় পাত্র উপচে আবেগ আসে।

গোটা "ডাকঘর" নাটকে ঘরের মানুষের একটা ডাক, আর ঘরের বাইরের মানুষের আর একটা ডাকের মধ্য দিয়ে যাত্রাপথের আনন্দ গান শুনেছে অমল। ঘরের মানুষ যাঁতায় ডাল ভেঙে গেলে ঘরের বাইরের কাঠ বিড়ালীরা এসে খাবার নিয়ে গিয়েছে। ঘরের মানুষ বাইরের বাতাসকে ভয় পেয়েছে। জানালা বন্ধ করে দুর্ভাগ্যকে দূরে ঠেলতে চেয়েছে। আর রাজার ডাকঘরের সম্ভাবনা আর দূরের ঘন্টা আর নাম না জানা গ্রাম, সেখানকার পাহাড় নদী দুধ দোয়ানো বালিকা,  অমলের কল্পনায় রঙ্গিন হয়ে তাকে উসুখুশু করে দিয়েছে। অমল পাড়াগেঁয়ে পেশি পলিটিক্সটাও দেখে নিয়েছে। চিনেছে মোড়লীর কাঠখোট্টা ভাষা। ভাষা সন্ত্রাস। আর ঠাকুর দাদা। যে ঠাকুরদা অমলকে গল্প শোনায়, সে একদিন নিজেই অমলের কাছে বলে ফেলে - বাবা, তোমার ওই নবীন চোখ পাবো কোথায়! ঘরের মানুষের চোখে জল এনে দিয়ে একদিন অমল মিলিয়ে যায় বহুদূরের তারার আলোটির সাথে। চির ঘুমন্ত অমলের জন্যে ফুলওয়ালি মেয়ে স্বচ্ছ ভালবাসাটুকু জানিয়ে গেল। সমস্ত আগল খুলে সাদামাটা পৃথিবীর ওই ভালবাসাটুকুই সম্বল করে শূন্যলোকে পাড়ি দেয় অমল, যেখানে আর কোনোদিন ঘরের ডাক পৌঁছবে না।

বাংলা নাটকে নতুন মাত্রা আনতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। তাঁর "সাজাহান" নাটকে তিনি জাহানারার মুখ দিয়ে অসুস্থ অশক্ত অথর্ব শাহজাহানকে উদ্বুদ্ধ করার ছলে বাস্তবে ইংরেজ অপশাসনের বিরুদ্ধে জনমনকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। নবান্ন বাংলা নাট্যচর্চার আরেক মাইলস্টোন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, তার প্রশাসন ও বিচারশালা সহ আসলে যে মুনাফাখোর কালোবাজারীদের পোষে ও রক্ষা করে, সেটা দেখাতে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ভয় পান নি। মিডিয়ার আত্মবিক্রয় তাঁর কলমে উন্মোচিত হয়েছে।

 "কল্লোল" ছিল আরেক অসাধারণ নাটক। ভাল ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নাটককে বাংলার মানুষ বুকভরা ভালবাসা দিতে ভোলে নি।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.