![]() |
| একটি খুন : প্রসেনজিৎ রায় |
আজ বাড়িতে কেউ নেই,আসবি...? ফোনের ওপার থেকে জিতুর কাছে জানতে চায় প্রিয়া |
——সত্যি বলছিস..?আসবো...? কৌতুহলী কন্ঠে আবার জানতে চায় জিতু |
—আরে হ্যাঁ, মা বাবা মামার বাড়ি গেছে,আজ আর আসবে না...চলে আয়.. |
—তাহলে আজ তৈরী তো..?
— ঈশ,জানিনা .....রাতে দেখা হচ্ছে ৮ টায় ...এখন কাজ আছে,রাখি বলে ফোনটা কেটে দেয় প্রিয়া |
সদ্য যৌবনে পদার্পণ করা জিতু এপাশে উত্তেজনায় ঠগবগ ফুটছে | নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপে সঞ্চিত নিষিদ্ধ ছবির ভিডিওতে নিজেকে ভাসিয়ে দিলো জিতু..আর কিছুক্ষণ..এরপরই এমন আনন্দে নিজেকে ভাসাবে কল্পনায় অন্য এক জগতে বিচরণ করছে কলেজ পড়ুয়া জীতু |
জীতু আর প্রিয়ার মাস সাতেকের প্রেম, প্রিয়া তার একবছর জুনিয়র ,সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে | স্কুলে এত বেশী কথা বলতো না, কলেজে উঠেই ফেসবুকের কল্যাণে দুজনের ভাব জমে উঠে,সেখান থেকেই মনের দিক দিয়ে দুজনার কাছাকাছি আসা,দু তিনদিন প্রিয়া টিউশন বাদ দিয়ে লুকিয়ে দেখাও করেছে জীতুর সাথে,কিছুদিন ধরেই জীতু শারীরিক ঘনিষ্টতার দাবী করে আসছিলো প্রিয়ার কাছে...প্রিয়া প্রথম প্রথম না বললেও জীতুর নাছোড়বান্দা স্বভাবের কাছে নতি স্বীকার করেছে...তাছাড়া বান্ধবীদের অনেকের অভিজ্ঞতা শুনে তার মনেও খানিকটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল প্রেমিকরূপী পুরুষের উদ্দাম যৌবনে নিজের নারীত্বকে নিগড়ে দেবার | সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই আজ মা বাবার অনুপস্থিতিতে জীতুকে রাত ৮টায় আসতে বলেছে প্রিয়া |
রাত ৭টায় মাকে জীতু বললো- আজ অনুপমের জন্মদিন,ওর বাড়ীতে থাকবো, কাল কলেজ বন্ধ...
—তোর না সামনে ইন্টারন্যাল ?
— আরে পুরো সিলেবাস শেষ | এতো ঘ্যানঘ্যান করো না বলেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল জীতু|
মা বাবার একমাত্র ছেলে জীতু | ছোটোবেলা থেকেই কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেননি মা বাবা | একটা জামা চাইলে তিনটে এনে দিয়েছেন | ছোটোছোটো দোষ না দেখার ভান করে আড়াল করেছেন অতি আদরে | শাসনের দড়িটা এতোই দুর্বল হয়ে গেছে যে আজ ছেলেটা কোনো বারণই শুনেনা | এসব ভেবে নীতাদেবীর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ..
রাত আনুমানিক ১১.৩০টা | হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় নীতাদেবী আর অনিলবাবুর | কারা যেন গেটের বাইরে থেকে অনিলবাবুর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে | আলো জ্বেলে বাইরে এলেন দুজন | গেট খুলেই চমকে গেলেন অনিলবাবু ও নীতাদেবী | গেটের বাইরে ২০-২৫ জন মানুষ...জীতুর কলারটা চেপে ধরেছে একজন,জীতুর মুখে খানিকটা কেটে গেছে..ততক্ষণে চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়ার সকলেই জমতে শুরু করেছে অনিলবাবুর বাড়ীর সামনে | কি হয়েছে... অনিলবাবু জিজ্ঞেস করতেই একজন এগিয়ে এসে বলল- মেয়ে কেস | মেয়ের বাড়ীতে মা বাবা নেই,সেই সুযোগে আপনার ছেলে চলে গেছে রাত কাটাতে | নানা দিক থেকে আরো কিছু অশ্লীল গালি আসছিল অনিলবাবুর উদ্দেশ্যে | মাথা নামিয়ে সব অপমান সহ্য করছেন | জীবনে কোনোদিন এত অপমান কেউ করেনি ,এর থেকে হয়তো খোলা বাজারে জুতোর ঘা-ও অনেক সন্মানের | অপমানে বুক ফেটে চৌঁচির হয়ে যাচ্ছিল | নীতাদেবী ততক্ষণে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন | আশেপাশের বাড়ির মানুষরা জমিয়ে মজা দেখছে,কেউ বা বলাবলি করছে- আরো প্রশ্রয় দাও ছেলেকে..এবার ঠেলা সামলাও |
হঠাৎ করে একজন একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে জীতুকে তার মা বাবার সামনেই মারতে লাগলো | নীতাদেবী স্নেহবশে দৌঁড়ে গিয়ে আবারও আড়াল করে নিজের সন্তানকে | অনিলবাবু অনেক কষ্টে নিজের যন্ত্রণাটা সামলে করজোড়ে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন ছেলের হয়ে | কোনোভাবে পরিস্থিতি সামলে স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে ঘরে গেলেন |
পরেরদিন সকালে নীতাদেবীর চিৎকারে পাশের বাড়ির লোকের ঘুম ভাঙ্গলো | সবাই ছুটে গিয়ে দেখলো জীতু অপমানে গলায় দঁড়ি দিয়েছে | নীতাদেবী কেঁদে ভাসাচ্ছেন , অনিলবাবু কোথাও নেই, শেষে দেখা গেলো অনিলবাবু পেছনের বারান্দায় দেওয়ালে মাথা ঠেঁকিয়ে নির্বিকার হয়ে বসে আছেন, চোখে জল..সদা অল্পভাষী অনিলবাবু শোকে পাথর হয়ে বসে আছেন | বেলা গড়ালো...জীতুকে শ্মশানে নিয়ে যেতে হবে | তারই আয়োজন চলছে | যাবার সময় অনিলবাবু পেছনে ফিরে নীতাদেবীর বুক ফাটা কান্না দেখে মনে মনে বলে উঠলেন- আমায় ক্ষমা করো,তোমার কোল আমিই খালি করেছি | গতরাতে ঘরে আসার পর কথা কাটাকাটি চরমে পৌঁছায় বাবা- ছেলের | দোষ করেও কোনো লজ্জা নেই জীতুর চোখেমুখে | উত্তেজিত হয়ে অনিলবাবুকে ধাক্কা মারে জীতু,রাগে কখন ছেলের গলা টিপে ধরেছিলেন বুঝতেই পারেননি | যখন বোধ ফিরেছিল ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছিল | ভেবেছিলেন আইনের শাস্তি মেনে নেবেন, নীতাদেবীই আটকালেন...যা গেছে গেছে,তুমিও চলে গেলে একা আমি বাঁচবো না বলে পা- টা জড়িয়ে ধরেছিলেন নীতাদেবী | এরপর নীতাদেবীই এই অজান্তে খুনটাকে আত্মহত্যার রূপ দেন | কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেলো- জীতুর আসল খুনী কে..অনিলবাবু নাকি মা বাবার অন্ধ অপত্যস্নেহ নাকি আধুনিক সমাজের অতি আধুনিক জীবনযাপনের ধরণ...?

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন