সর্বহারা জমিদারের কথা : কর্ণধর মন্ডল

সর্বহারা জমিদারের কথা : কর্ণধর মন্ডল
সর্বহারা জমিদারের কথা : কর্ণধর মন্ডল

      বীরপুর জেলার সোনামুখী গ্রামে অখিলেশ রায় চৌধুরী নামে নামে একজন প্রভাবশালীও প্রতিপত্তিবান জমিদার বাস করতেন। সবাই তাহাকে ভালোবেসে চৌধুরী সাহেব বলে ডাকতেন। ছোট বেলায় পিতা-মাতা স্বর্গীয় হওয়ার পর বংশ পরম্পরায় পৈতৃক জমিদারী ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সকল দায়িত্ব এসে চাপে অখিলেশ বাবুর মাথার উপর।

---এইভাবে জমিদারী প্রথা সামলানোর দায়িত্বে কখন যে, ওনার বয়স আটচল্লিশ ছাপিয়ে গিয়েছে তার কোন হিসাব রাখেননি। পিতা-মাতা গত হওয়াতে তাহার মাথার উপর ছত্রছায়া সম কেউ ছিলেন না। তাই তিনি বিয়ে করেননি। আর সে বয়সও কবে পার করে এসেছেন তার হিসাবও রাখেননি।
---তাই তিনি ভেবে ছিলেন বিবাহ করবেন না। আর সংসারী জীবনে মায়ার বেড়া জালে আবদ্ধ হবেন না।
---কিন্তু,সে প্রতিঞ্জা ভাঙতে হলো। আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী-পরিজনের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হলেন। মহা ধুমধামে চৌধুরী বাবুর  বিবাহ কাজ সুসম্পন্ন হয়ে গেল। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রীর সুখের সংসার ও দাম্পত্য জীবনও খুবই মধুময়।

      কিন্তু,দুঃখ একটাই! সাত আট বৎসর দাম্পত্য জীবন পার করে আসলেন, এখনও পর্যন্ত সংসার আলো করে একটা সন্তান আসলো না। নানান চিন্তা ভাবনা মাথায়। একদিকে জমিদারী এবং অন্যদিকে বয়সও ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে প্রবাহমান। সমস্ত কিছু ভাবতে ভাবতে মাথার ভিতর তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকলো।
---কি করবে,কিছু ভেবে পাচ্ছিলেন না।
---কারন,তিনি না থাকলে! তার অবর্তমানে এসব সম্পত্তি-বিষয়-আশয় দেখা শুনা করবেন কে ?

     একদিন মহোল্লার এক গরীব চাষী শুভকাঙ্খী হয়ে অখিলেশ বাবুকে বললেন।
---চৌধুরী সাহেব, আপনি যদি না আমার অপরাধ নেন, তা হলে বলি.....
---আপনার তো এখনও পর্যন্ত কোন সন্তান হলো না। আপনি ও চৌধুরী কর্তা মা দুজনেই তারকেশ্বর মন্দিরে গিয়ে, আপনাদের মনস্কামনা জানিয়ে 'বাবা তারকনাথের' দুধ-গঙ্গাজল ঢেলে 'মানত' করে আসুন।
---তাহলে বাবা নিঃশ্চয় মনস্কামনা পুর্ণ করবেন।অবশ্যই শুভ ফল কিছু পাবেনই......
---শুনে, জমিদার অখিলেশ বাবুর মনে কথাটা দাগ কাটলো।
---বললেন বেশ.......!
---বাড়ীতে এসে স্ত্রী অন্নপুর্ণা দেবীকে বললেন। বলছিলাম কি....

      আমাদের মহোল্লার চাষী অজিত বলছিলেন। আমাদের কোন সন্তান-সন্ততি হচ্ছে না।তাই যদি,তারকেশ্বরে মন্দিরে গিয়ে 'বাবা তারতকনাথের' মাথায় ভক্তি ভরে জল ঢালতে পারি।
---তাহলে, 'বাবা তারকনাথের' কৃপায় আমাদের সংসারে সন্তান আসতে পারে !
---কথা শুনে, অন্নপুর্ণা দেবী বললেন। চলো তা হলে! 'বাবা তারকনাথের' উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।
---পরের দিন ভোরে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাঁধে বাঁক নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।দু'দিন হাঁটার পর 'বাবা'র চরণতলে আছাড় দিয়ে পড়লেন।

      অখিলেশ বাবু মনে মনে 'বাবা'র কাছে তাঁদের অতৃপ্ত মনের সুপ্ত বাসনার কথা জানালেন। আর বললেন....
---যদি, আমাদের সংসারে কোন সন্তান আসে। তাহলে-আমার সমস্ত সমস্ত জমিদারী ও বিষয় সম্পত্তি, গরীব চাষীদের মধ্যে যথা সাধ্য মতো বিলিয়ে দেব। সর্ব-সাধারণের মতো,স্বামী-স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে অন্তিম দিন'কটা সুখে আনন্দে কাটিয়ে দেব।
---এই রকম, মনের বাসনা ও পার্থণা জানিয়ে 'বাবা তারকনাথের' কাছ থেকে বাড়ী ফিরলেন।
---তারপর একদিন, চৌধুরী বাড়ীতে মঙ্গলিক শঙ্খ-ধ্বনি বেজে উঠলো।তাহার সংসার আলো করে নব-অতিথী এসেছেন।সুখ-আনন্দ ও ঐশ্বর্য্যের বার্তা বহন করে। অখিলেশ বাবু পিতা হয়েছেন ও অন্নপুর্ণা দেবী মাতা হয়েছেন।
---হয়তো,বাবা তারকনাথের আর্শীবাদ স্বরুপ অশেষ কৃপা।

       আজ এই রায় চৌধুরী পরিবারে আনন্দময় মুহুর্তে, কাল বিলম্ব না করে মহোল্লার সমস্ত চাষীদের জানিয়ে দিলেন।
---আগামী জৈষ্ঠ্য মাসে অক্ষয় তৃতীয়ার পুর্ণ তিথিতে, আমার কন্যা ''স্বয়ংসিদ্ধা''-র শুভ অন্নপ্রাশণ। ঐ দিন সমস্ত আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী-পরিজন ও সকল চাষী ভাইরা স্বপরিবারে রায় চৌধুরী বাড়ীতে এসে মধ্যাহ্ন ভোজন করে যায় এবং চৌধুরী কন্যাকে আর্শীবাদ করে যায় প্রাণ ভরে।
---বেশ ! দেখতে দেখতে সেই শুভক্ষণ এসে সম্মুখে উপস্থিত। একদিকে শুভ কর্ম,  অন্যদিকে অতিথীবর্গ। সব কিছু নিয়েই চৌধুরী বাবু অত্যান্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শুভ কার্য সম্পন্ন। সবাই যথারীতি খাওয়া দাওয়া সেরে যে, যার বাড়ীতে চলে গেলেন।

      অখিলেশ বাবু ও স্ত্রী অন্নপুর্ণা দেবী কন্য ''স্বয়ংসিদ্ধা''-কে নিয়ে সুখে দিন যাপন করতে লাগলেন।
---কিন্তু,ভুলে গেলেন সেই প্রতিশ্রুতির কথা। যে কথা মানত(প্রতিঞ্জা) করে বলে ছিলেন। 'বাবা তারকনাথের' চরণে আশ্রয় নিয়ে।
---এদিকে দেখতে দেখতে 'স্বয়ংসিদ্ধা' শৈশব থেকে কৈশরে,কৈশর থেকে যৌবনে পা দিয়েছেন। আঠারোটি বসন্ত পার করে এখন স্বয়ং সম্পুর্ণ।
বিবাহ যোগ্য হয়ে উঠলেন। অখিলেশ বাবু চারিদিকে বার্তা পাঠালেন। কন্যা 'স্বয়ংসিদ্ধা'কে বিবাহ দেওয়ার জন্য। মেয়ে যেমন সুন্দরী,সুশ্রী,সুকন্যা।ঠিক তেমন, সুযোগ্য,সভ্য-ভদ্র,প্রভাবশালী সুপাত্র প্রয়োজন।
---বেশ ! কয়েক দিন ধরে খুঁজে খুঁজে অবশেষে একটা পাত্রের খোঁজ পেলেন। ঠিক যেমনটি অখিলেশ বাবু চেয়েছিলেন। পাত্রের বাড়ী পাশে শান্তিপুরে এক বনেদী পরিবারের একমাত্র সন্তান। পেশায় পৈতৃক জমিদারী দেখাশুনা করেন। সবদিকে খোঁজ খবর নিয়ে সেখানে তাঁর একমাত্র কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার জন্য মনস্থির করলেন।
---আগত দিনক্ষণ,তিথিতে ! শুভক্ষণের শুভলগ্নে, মহা ধুমধামে সাড়ম্বরের সহিত কন্যাকে বিবাহ দিয়ে দিলেন।
---বিবাহের পর,'স্বয়ংসিদ্ধা'র নব-দাম্পত্য জীবন বেশ সুখেই কাটছিল। হঠাৎ কি জানি, ভাগ্যের কোন পরিহাসে সুখের স্বপ্ন মহলে দিবসে অন্ধকার নেমে আসলো। স্বামী স্বপ্নময় এখন রোজ রাত করে,নেশা করে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ী ফেরেন। আগের মতো তার প্রতি আর কোন খেয়াল রাখেন না।
---এই ভাবে বেশ কিছুদিন কাটলো। তারপর,দুজনের মধ্যে প্রতি নিয়ত অশান্তি ঝগড়াঝাটি হতেই থাকে। বাপের বাড়ী থেকে অর্থ,সোনা-দানা, এটা সেটা আনার চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। দিনের পর দিন,তার উপর চলতে থাকে অকথ্য চরম অত্যাচার। মেয়ের বাড়ীর চাহিদার জন্য অখিলেশ বাবুর কোন কিছু দিতে আপত্তি ছিল না। এমন কি দ্বিধা বোধও করতেন না।

      কিন্তু,দিনের পর দিন 'স্বয়ংসিদ্ধা'র আশা,আকাঙ্খা,আগামীর স্বপ্ন আবেগ ধীরে ধীরে ভেঙেচুরে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেতে লাগলো। অবশেষে সে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ছিলো।
---হয়তো এটাই নিয়তি......
---চরম অভিশম্পাত নেমে আসে 'স্বয়ংসিদ্ধা'র জীবনে।যেন,নীলাকাশ থেকে বিনা মেঘে বজ্রপাত বর্ষিত হতে থাকলো তাঁর মস্তকে। যার তীব্র দহনে অকালে ঝলসে যেতে হয় সদ্য ফোটা পুষ্পকলিকে। একদিন, এই নির্মম অমাষিক অত্যাচারে কসাই স্বামীর হাতে, তাঁর মৃত্যুকে বরণ করতে হয়।
---এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটে গেছে অখিলেশ বাবুর বাড়ীতে কেউ খবর পেলেন না। মহোল্লার কোন এক চাষীর মুখে শোনেন যে, তাঁর মেয়ের খুব বিপদ। শুনে কাল বিলম্ব না করে,তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন। গাড়ী থেকে নেমে দুর থেকে দেখতে পেলেন,বাড়ীর সদর দরজার সামনে প্রচুর লোক জমায়েত হয়ে দাড়িয়ে রয়েছেন।
---দেখে হঠাৎ কেমন যেন,অখিলেশ বাবুর বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো। হন্তদন্ত হয়ে রুদ্রঃস্বাসে সেখানে এ পৌঁছলেন। দেখেন উঠানে সাদা কাপড় ঢাকা কে একজন মরে পড়ে রয়েছে। যাকে জিঞ্জাসা করে, কারো মুখে কোন বাক্য নেই।
---কাছে গিয়ে রুদ্রঃস্বাসে মুখের কাপড়টি সরিয়ে দেখেন 'স্বয়ংসিদ্ধা'। দেখার সঙ্গে সঙ্গে অখিলেশ বাবুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।সারা দুণিয়াটা তাঁর সামনে নিমিষের মধ্যে নিগুঢ় অন্ধকার হয়ে গেল। যা হয় একটা সন্তান হারা পিতার কাছে।

     এই বুক ফাটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে, হঠাৎ মনে পড়ে গেল। সেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিঞ্জার কথা। আর মনে মনে ভাবলেন,আমার কৃপনতা ও নিকৃষ্ট মনোভাবপন্ন মানষিকতার জন্য আজ আমার এই সর্বনাশ। বুকে ব্যথার পাহাড় চেপে রুদ্রঃস্বাসে মৃত কন্যাকে ন শ্মশানে নিয়ে গিয়ে স্বৎকারের ব্যবস্থা করলেন,নিজের হাতে।
---এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে,বাড়ীতে ফিরে অখিলেশ বাবুর অনুশোচনা হতে লাগলো। কাহুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথা না রাখার জন্য আমার এই মহা সর্বনাশ।
---পরের দিন সকালে,মহোল্লার সমস্ত গরীব চাষীদের ডেকে, তাঁর যা বিষয়-আশয়-সম্পত্তি ছিল।সব তাদের মধ্যে দান করে দিলেন। রাতের অন্ধকারে সন্তান হারা,অসহায়-ব্যথাহত বৃদ্ধ পিতা স্ত্রী অন্নপুর্ণা দেবীকে হাত ধরে গ্রাম থেকে অনেক দুরে চলে গেলেন।

      কিছু দিন পর,মহোল্লার চাষীরা খোঁজ খবর নিয়ে যানতে পারলেন। সন্তান হারা,সর্বহারা ও সর্বত্যাগী,বেদনায় বিধ্বস্ত বৃদ্ধ অখিলেশ বাবু ও বৃদ্ধা অন্নপুর্ণা দেবী, শেষ জীবনটা তারকেশ্বরে 'বাবা তারকনাথের' চরণে আশ্রয় নিয়ে সেবার মধ্য দিয়ে  অশ্রু'বারি ঢেলে জীবনটা কাটানোর প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.