আত্মক্ষর ১০৫ : গোবিন্দ ধর

আত্মক্ষর ১০৫ : গোবিন্দ ধর
আত্মক্ষর ১০৫ : গোবিন্দ ধর

অনিন্দিতা একজন তরুণ কবি।ও ত্রিপুরার ধর্মনগরের মেয়ে।কলকাতার বর্ধমান থেকে হোমিওপ্যাথি ডক্টরেট করছে।তার,দুইটি কবিতার বই স্রোত প্রকাশ করেছে।তার মানবিক চিন্তাচেতনাকে আমি শ্রদ্ধা করি।সে বয়সে আমার অনেক ছোট।তাও তাকে আমি আজকের ভাত বিষয়ক আত্মকথন লেখার জন্য আরো শ্রদ্ধা করবো।যদিও ভাত বিষয়ক ওর কথামুখ আর আমার জীবনের কথামুখ এক নয়।এক হবেই বা কিরকম।ওর বয়স খুব বেশি হলে তেইশ।আর আমার ৫০ রানিং। আমার ছোটবেলা মন্বন্তরের।ওদের ছোটবেলা তো সোনার চামশ মুখে পুরে জন্মগ্রহণকাল।আমরা চাল আনতে পান্তাপুরোনো সময়কে অতিক্রম করেছি।যাপন করেছি।ওরা তা দেখেনি।
আমি ওর ফেইসবুক দেওয়াল থেকে লেখাটি কপি করলাম।

"আজকে একটু খাওয়া দাওয়ার গল্প করি ।
বাড়িতে থাকলে আমি ৪-৫ বার ভাত খাই । আমি একশো ভাগ ভেতো বাঙালী । ভাত ছাড়া চলেনা আমার । আমার সঙ্গীনি রুটি খেয়ে অভ্যস্ত ছিল । এবার আমার সাথে থেকে থেকে সেও দু-বেলা ভাত খেতে শিখে গেছে; যদিও আমি তিনবেলাই খাচ্ছি । ওর কাছে রাতের খাবার মানে রুটি । কখনো কখনো তিনবেলাই রুটি খায় । শুধু্ ও নয় । আমার সকল হিন্দিওয়ালা বন্ধুরাই রুটি খেয়ে থাকে ।

আমার কানের কাছে এসে ঘ্যান ঘ্যান করবে
" আনানন্দিতা তু ইতনা চাবল ক্যাইসে খা লেতি হি ! "

ওরা রুটি খেয়ে খেয়ে জিবের রস শুকিয়ে নিয়েছে । ভাতের রসের স্বাদ ওদেরকে বোঝাতেই পারলাম না । সে যাই হোক এই চাবাল খাওয়ার জন্য প্রায়ই আমার পেছনে লাগতে শুরু করে বন্ধুরা ।

আমি শুধু ভাবি এরা তিনবেলা রুটি খেয়ে কি করে থাকে । ছোটোবেলা থেকেই আমার কাছে, রুটি মানেই সামান্য টিফিন মাত্র । যেদিন ঘুঘনি কিংবা মাংস রান্না হবে সেদিন মায়ের ইচ্ছা হলে রুটি বানায় । ব্যস্ ।

আমি এখনো রুটিকে মেইন কোর্সে আনতে পারি নি । ঠিক বাড়ির মতোই অবশিষ্ট ঝিঙে তরকারি আর মোচার গোধক নিয়ে বসেছিলাম কিছুদিন আগে, অন্ধকারে ।"

-অনিন্দিতা দেবনাথ

তুমি উপন্যাস লিখতে পারবে ডক্টর অনিন্দিতা। এত সুন্দর ভাত না খেয়ে থাকতে পারো না তার অপূর্ব ব্যাখ্যা দিলে।কুর্নিশ ডক্টর।
সত্যি বাঙালির জিবে রুটি মানে পেট ভর্তি খাওয়া নয়।সামান্য টিপিন।আমি তিনবেলা মাংস রুটি খেয়েও দেখেছি ভাত আমার লাগেই।ভাত আমার কাছে মহার্ঘ খাবার।বাকি সব খাবারই টিপিন তুল্য।এমন কি বিন্নি চালের ভাত খেয়েও আমার খিদে থাকে।কোন মতেই আমার খিদে দূর হয় না ভাত পেটে না পড়লে।
কেউ কেউ যেমন বাংলা মদ না খেলে নেশায় বোধ হতে পারেন না তেমনি আমার ভাত না হলে নেশা লাগে না।ভাতের নেশায় আমি হাঁটতে পারি সারারাত।
ছোটবেলা কত দিন ভাত খেতে পারিনি।কত রাত জল খেয়ে ঘুমাতে হতো।ঘুম আসতো না।এদিক ওদিক পাশ ফিরতাম।ঘুম আসতো না।ভাতের কি অপূর্ব স্বাদ তখনই প্রথম বুঝেছিলাম। ভাত জোগাড় করতে বাবা রাতদিন পরিশ্রম করতেন।আমরা আট ভাইবোন।মা অসুস্থ। বড় ভাই তেমন কাজ তখন করার মতো নয়।বাজারে দূর্ভিক্ষ।চাল নেই। টাকা নিয়েও কখনো কখনো রাতাছড়া আমাদের বাড়ির আশপাশ তিন তিনটি বাজার ঘুরঘুর করেও কোন দোকানে চাল পাওয়া গেলো না।সেদিন যেমন অরন্ধন ছিলো আমাদের নিত্য ঘটনা।আবার টাকা নেই তাই চাল আনা যায়নি এমন দিনেও আমাদের অরন্ধন। ভাতের হাঁড়ি চাপতো সেদিনও।এরকম জীবনের সতেরো বসন্ত অব্দি কয়েশদিন ভাত না পেয়ে বেড়ে আমি আজকের গোবিন্দ ধর।
আমার কাছে ভাত মানে শ্রদ্ধাশীল হয়ে পবিত্র মনে পেটপুরে খাওয়াই শুধু নয়।ভাত মানে জীবনের এক চরম বাস্তব।
আমাদের ছোটবেলা ত্রিপুরার মানুষ বনের আলু কাঁঠাল বীচি খেয়ে জীবনরক্ষা করেছেন।
তখন প্রায় সব পরিবারই বড় পরিবার।এখানকার মতো ছোট পরিবার নয়।সকল ঘরেই সাত থেকে দশজন ছেলেমেয়ে। সকলের ভরণপোষণ করা বাবামায়ের সাধ থাকলেও সাধ্যে খুলাতো না।
কত বিনিদ্ররাত ভাতের জন্য চটপট করেছি।কেউ একমুঠো ভাত দিতে এগিয়ে আসেননি।
টাকা হাতে বাজার চক্কর কেটেও চাল আনতে পারিনি কতদিন।তখন ক্যাপস্যুল চাল পাওয়া যেতো।তার স্বাদ বলতে এখনের সুয়িংগাম চিবানোর পর রসকষ হীন সুয়িংগাম যেমন স্বাদের হয় তেমন।তাও সকাালে ভাত বসালে শুধু আঁচ দিয়েই যাও তা আর ভাত হয়ে চাল থেকে বেরুতেই চায় না।ডালের সাথে মিশতো না।কোন তরিতরকারি তার স্বাদ আনতে পারতো না।তাও ভাত না খেলে পেট কিরকম চাউর দিয়ে নাড়িভুড়ি সব বের করে দেবে এমনদিন কত কত দিন তারুণ্য গিলে নিলো আমার তা কি আর অনিন্দিতা মেয়েটি জানে।আমার ছেলে গৌরবও জানে।না গৈরিকাও জানে না।
ভাত শিকার করতে করতে জীবনের পঞ্চাশটি বছর অতিক্রম করতে চললো এখনো নুন আনতে পান্তা পুরোয় নিত্যঘটনা।ভাতের স্বাদের বিকল্প আমার নিকট আর কিচ্ছু নেই। তিন চারদিন ভাত না খেতে পেলে প্রকৃত স্বাদ তখনই আসে জীবে।ভাত আমার জীবনের নেশা।এই ভাত শিকার করতে করতেই বুড়িয়ে গেলাম।

ভাতকে ভাতই বলি

নানা জায়গায় ভাত খেয়েছি
নানা জায়গায় পাত পেড়েছি।

কোথাও ভাত খেয়েছি তো
কোথাও খেয়েছি অন্ন।

কোথাও ভাত নয় ভাতের নাম
হয়েছে আনন্দবাজার।

কোথাও বা প্রসাদ।

আমি ভাতকে ভাতই বলি।
অন্ন বলার মতো সাহস হয়নি।

আমি ভাতকে ভাতই বলি
আনন্দবাজার বলার মতো হইনি।

আমি ভাতকে ভাতই বলি
প্রসাদ ভাবতে পারিনি।

ভাতকে শুধু ভাতই বলতে ইচ্ছে হয় আর কিচ্ছু না।

দিন আনি দিন খাই আমাদের ঘরে বহুদিন অরন্ধন নিত্যঘটনা।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.