![]() |
| কাব্যগ্রন্থ পেখমবাড়ি : সুবীর সরকার |
কিছু কিছু কবি আছেন যারা পাঠকের জন্য অদ্ভুত এক পরিসর রেখে যান।কিছু কবি আছেন যাদের কবিতার ওপর প্রথমে ঝুঁকে পড়তে হয়।তারপর তীব্র এক ঝাঁকুনিতে পাঠক বাধ্য হন সেই কবির কবিতার খুব খুব ভেতরেই প্রবেশ করতে।প্রখর এক জাদুর পাকে পাকে জড়িয়ে ধরেন সেই কবি পাঠককে।তুরীয় এক প্রশান্তি দিয়ে নুতন এক হাওয়ার ভেতর পাঠক এসে দাঁড়ান।আজ তেমনই এক তরুণ কবির কথা বলবো।নবকুমার পোদ্দার।অশোকনগরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই তরুনের দুটি কবিতার বই-'বৃষ্টি ও টবের কোরিওগ্রাফ' ও 'পেখমবাড়ি'।
সম্প্রতি নিবিড় পাঠ সমাপ্ত হয়েছে আমার 'পেখমবাড়ি'-র।নবকুমার পোদ্দারের কবিতা আমি দু'একটি লিটিল ম্যাগ এবং ফেসবুক-এ মূলত পড়েছি।আমার স্যার কবি উত্তম দত্তর কাছে জেনেছি নবকুমার-এর কবিতার প্রখরতার কথা।আর তারপর আমার একাগ্রভাবেই নবকুমারের কবিতার ভেতর তীব্রতা নিয়েই প্রবল প্রবেশ।
'সারাদিন পাতা আঁকি
পাতা নবীন
পাতা বর্মমূল
পাতার উপর কে হেঁটে যায়?
পাতার উপর বসে কোন চুম্বন?
সারাদিন ধরে তো পাতা পাড়ি
পাতার বিচিত্র আবেগ'...
শব্দের প্রয়োগে অসামান্য দক্ষ সাঁতারু এই কবি
বাংলা কবিতায় নিয়ে এসেছেন এক অন্য এসেন্স।বহুমুখী বহুবর্ণের এক পরিক্রমা নবকুমারের।শব্দে শব্দে কি এক সংকেত,কি এক জায়মান ধ্বনিমুখরতা বিছিয়ে রাখছেন তিনি-
'বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুকনো কাঠও বিজ্ঞপন দেয়'
আর তাই হয়তো কবি বলেন-
'সাবধানী না হলে চন্দ্রবিন্দু তোমার সুগন্ধি ছেপে দেবে'...
অসম্ভব পরিণত,দেখার ভিন্ন ও সচেতন চোখ আর গড়পড়তা আত্মজীবনীর উল্টোদিকে তার সফেদ ঘোড়া ছোটে।কপালের ভাঁজে জমে থাকা ঘামের এপিটাফ লিখতে লিখতে আমরা শুনি
মন্ত্রের মত নবকুমার বলছেন-
'কিছু মানুষ হাইফেন
চুপিচুপি ষাঁড়ের পিঠে সূর্যোদয় রাখে'
জীবনের আর যাপনের আলোঅন্ধকার গুলি এক কুহকে ঘেরা টানেলের মুখে গুঁজে দিয়ে কবি আত্মজীবনী লিখছেন।প্রেমের পাশে লিখছেন গ্লানি।করতলে কান্না রেখে কবি তার সময়কে পৌঁছে দিচ্ছেন সময়ের গন্ডীর সকল সীমায়নের বাইরে।তার ক্রোধ,তার বিদ্রূপভাষা স্থূলতম এই কালখণ্ডে বয়ে নিয়ে আসে অলীক এক ম্যাজিককল্প।
![]() |
| নবকুমার পোদ্দার |
বাংলা কবিতায় এক ভুবনমায়ার নাম নবকুমার
বাংলা কবিতায় বহুস্বরিক ধারাভাষ্যের নাম নবকুমার
এক অদ্ভুত মাদকতা আর আছন্নতা নিয়ে
কি তীব্র বিদ্ধ করেন পাঠককে এই তরুণ কবি।
নবকুমার পোদ্দার তার জাত ও দম চিনিয়ে
দিয়েছেন।সারল্য ও অকপট উচ্চারণ তার কবিতার আলো এবং সততা।
কবির জন্য অনন্ত মুগ্ধতা সাজালাম।
ভালোবাসা নব,তোমার আগামী জার্নির জন্য অপেক্ষায় আমরা।
নবকুমার পোদ্দারের কয়েকটি কবিতা এই ফাঁকে বরং পড়ে নিতে থাকি আমরা-
'কয়েকটি ইতিহাসের পাতা
নবকুমার পোদ্দার
দুঃখ
হাসতে হাসতে জানালা হয়ে যায় যে মানুষ
তার দুঃখ বাতাস জানে।
কাজল
চোখে পড়ার সংগে সংগেই
তার মনও ছিটকে যায়।
রঙ
মানুষ বুঝতেই পারে না
কোন রঙ তার সাথে দীর্ঘ হবে
উপায়
সিঁড়ি ধরে ধরে এগিয়ে গিয়েও
সংগঠন হারায়
আর এক পৃথিবীর খোঁজে।
ক্ষমা
যে ক্ষমা করে সে আসলে ঈশ্বরের গোলাম।
রৌদ্র
সারাদিন জ্বলার পরও যার কপালে অন্ধকার ঘিরে ধরে
অন্যায়
ঘাড় ধরে পার করে দিলেও আজীবন
বেহায়া।
পাড়াপড়শি
আকাশ কালো করে এলে যে যার
উঠোন নিয়ে দৌঁড়োয়।
বীমা
পরজন্ম আটকালে
কেউ কথা রাখে না।
অসুখ
আয়তনের চেয়ে দ্বিগুন হলে
মানুষ ঘুমায়।
যন্ত্রণা
নিজের জাত চেনাতে যার জুড়ি মেলা ভার
পোশাক
অন্যের গায়েতেই যার চেতনা
লুকিয়ে থাকে।
বেড়াল
মাছ পেলে আকাশ ভুলে যায়'
প্রকাশক-অভিযান পাবলিশার্স
আলোচনা-সুবীর সরকার



0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন