সূতাহাটার মেয়ে : মৃদুল শ্রীমানী

সূতাহাটার মেয়ে : মৃদুল শ্রীমানী
সূতাহাটার মেয়ে : মৃদুল শ্রীমানী

অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের ভাষাতত্ত্বের গুণী মানুষ। দমদমে ট্রেন থেকে নেমে ওঁর সাথে দেখা। অটোরিকশার লাইনে আর দাঁড়ানো হল না। আপনজনের সাথে সুখ দুঃখের গল্প করব বলে রিকশায় উঠতে হল। অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় ফিরছিলেন সূতাহাটা থেকে। পূর্ব মেদিনীপুরের সূতাহাটা। সেখানে একটি ১৭ বছর বয়সিনী মেয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে ইচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানায়। সে নিয়ে কিঞ্চিৎ নড়ে চড়ে বসেন বঙ্গীয় প্রশাসন।
আর টেলিভিশনের পর্দাতেও বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়। বঙ্গীয় মহিলা কমিশনের একসময়ের চেয়ারপার্সন ভারতী মুৎসুদ্দি, সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ আর অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়, এই তিনজনে সূতাহাটার মৃত্যু আকাঙ্ক্ষী মেয়েটির সাথে এদিনই দ্বিতীয়বারের জন্য কথা বলতে গিয়েছিলেন।
অধ্যাপক মহাশয়কে প্রশ্ন করলাম
"কেন, মেয়েটি মরতে চাইছেন কেন? মাত্র সতেরো বৎসর বয়সে মেয়ের কি এমন হল, যে তাকে মরতে হবে?"
অধ্যাপক বললেন, "সেটাই তো কথা। স্থানীয় একটি ধনীপুত্র মেয়েটিকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস করার পর এখন প্রত্যাখ্যান করেছে। মেয়েটি গর্ভবতী অবস্থায় ইউথানাশিয়া মানে ইচ্ছা মরণ প্রার্থনা করেন। এখন বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটি এখনো যন্ত্রণায় কাতর।"
অধ্যাপক জেনেছেন, ধনীপুত্র মেয়েটির গর্ভাবস্থার জন্য সকল দায় তো অস্বীকার তো করেছেনই, এমন কি উর্দিপরা লোকেদের দিয়েও মেয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করেছেন।
আমি বললাম "সতের বছর বয়সী মেয়ের সাথে যৌনসঙ্গম তো পকসো আইনে অপরাধ বলে গণ্য হবার কথা। আঠারোর নিচে মেয়ের বিয়েই তো বেআইনি। আর উর্দি পরিহিত লোকের পক্ষে এই অবাঞ্ছিত যৌনসঙ্গম উপলক্ষে মেয়েকে ধমক দেওয়াও পকসো আইনের নিরিখে অপরাধ।"
অধ্যাপক বললেন "সে তো জানিই। কিন্তু de jure আর de facto, দুটো বিষয় তো আলাদা। গাঁয়ের লোকে যে মেয়েটিকে ঘেন্না করা শুরু করেছে।"
বলা গেল "সেকি? মেয়ের বাড়ির লোকে, মানে মেয়ের বাপ মায়ের বক্তব্য কি?"
অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন "তারা মেয়ের পক্ষে। কিন্তু আর্থিক ও অন্যান্য প্রশ্নে তারা ভারি দুর্বল। মেয়ের বাবা একটি কোল্ড স্টোরেজে কুলির কাজ করেন।"
অধ্যাপক আরো বললেন মেয়ের বাপ মায়ের চিন্তা মেয়েটার চলবে কি করে।
আমি বললাম, মেয়ে কি চায়?
তিনি বললেন "বধূর সম্মান। ও এবারও বলছে ওকে ওদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে যেতে হবে। এদিকে ছেলের সম্বন্ধে যা তথ্য পেয়েছি তাতে বড়লোকের বখাটে ছেলের সব ধরণের গুণই তার আছে। ওই বাড়িতে এই মেয়েকে রেখে দেওয়া মানে কিছুদিন বাদে আমাদেরই এসে মেয়ের লাশ উদ্ধার করতে হবে।"
আমি বললাম "মেয়েকে কেন বোঝাচ্ছেন না যে, যে পুরুষ সন্তান জন্মের দায়িত্ব অস্বীকার করতে চায়, সে আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। মানুষ হিসেবেই সে হীন। মেয়েকে শোনাবেন কুন্তীর কানীন পুত্র কর্ণের কথা। সেদিন কুন্তীর উচিত ছিল বুক চিতিয়ে নিজেকে সিঙ্গল মাদার হিসেবে ঘোষণা করা। তা না করে তিনি শিশুটিকে ভাসিয়ে দিলেন। কি হল তাতে? হল কর্ণ আর পাণ্ডব , বিশেষত অর্জুনের সাথে নিগূঢ় হিংসা। "কেন চিরদিন
ভাসাইয়া দিলে মোরে অবজ্ঞার স্রোতে -
কেন ?"
বললাম রবীন্দ্রনাথের কর্ণ কুন্তী সংবাদের কথা।


সেই যে রিকশা চড়ে সিঁথি আসতে আসতে আড্ডা মারছিলাম অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় মশায়ের সাথে। তাঁর কাছে শুনছিলাম, সূতাহাটার গ্রামে ধর্ষিতার দুঃখ কথা। সেই নিয়ে বলতে বলতে রবীন্দ্রনাথ, আর তার কর্ণ কুন্তী সংবাদ। স্মৃতি হাতড়ে বললাম "কেন চিরদিন
ভাসাইয়া দিলে মোরে অবজ্ঞার স্রোতে -
কেন দিলে নির্বাসন ভ্রাতৃকুল হতে?
রাখিলে বিচ্ছিন্ন করি অর্জুনে আমারে,
তাই শিশুকাল হতে টানিছে দোঁহারে
নিগূঢ় অদৃশ্য পাশ হিংসার আকারে
দুর্নিবার আকর্ষণে।"
আমি অধ্যাপকের কাছে বললাম মেয়েটিকে বলুন কুন্তীর ভুলের জন্যই এই ঘৃণার যুদ্ধ ঘনিয়ে উঠেছিল। আরো বললাম জাবাল সত্যকামের কথা। সে গুরুগৃহে গিয়েছিল। গুরু গৌতম তার পিতৃপরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। বালক মায়ের কাছে পিতৃ পরিচয় জানতে চাইলে মা জবালা বলেছিলেন "বহু পরিচর্যা করি পেয়েছিনু তোরে। গোত্র তোর নাহি জানি তাত।"
অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, "মৃদুল, কলকাতায় টেলিভিশনের সামনে আমরা যে সিঙ্গল মাদার এর কথা বলি নি, তা কিন্তু নয়। বলেছি। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকার গাঁ ঘরে গিয়ে সিঙ্গল মাদারহুডের কনসেপ্ট বোঝানো সহজ নয়।"
বললাম "ছেলেটি এখানে কি দিয়েছে? সামান্য একটু বীর্য, তাই নয় কি? ওটুকু দিতে তাকে কোনো ত্যাগ তিতিক্ষার পরিচয় দিতে হয় নি। এই সামান্য বর্জ্যবৎ জিনিস দেবার জন্য তাকে পিতার আসন দিতে হবে কেন? গর্ভাবস্থায় যে কোনো যত্ন নিল না, সুরাহা করল না, তাকে নিজের নাড়িছেঁড়া ধনের পিতার আসনে বসতে দেবে কেন মেয়েটি?"
অধ্যাপক বললেন, "তোমার সাথে আমি সহমত মৃদুল। কিন্তু গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েকে এটা বোঝানো খুব সমস্যা।"
বললাম, "যা সত্য, তা কলকাতাতেও সত্য, সূতাহাটাতেও সত্য। স্বচ্ছলের জন্যেও সত্য, গরিবের জন্যেও সত্য। সত্য এই ভৌগোলিক দূরত্ব নিরপেক্ষ, আর্থিক অবস্থান নিরপেক্ষ। সকলকেই বিজ্ঞানের সত্যটা মেনে নিতে হবে।"
অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় একটু হাসলেন। আর কিছু বললেন না।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.