নির্জন রাখাল : মৃদুল শ্রীমানী

নির্জন রাখাল : মৃদুল শ্রীমানী
নির্জন রাখাল : মৃদুল শ্রীমানী

সেই যে মেয়েটি। বয়সে যেন আমার অর্ধেক বয়সী। কিন্তু রোজ বেশি রাতে আমার সাথে ফোনে গল্প না করলে তার চলে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সে। নির্বাচনের কাজে অন্য একটি বিদ্যালয়ে ভোটার দের আবেদন পত্র জমা নেবার কাজ তাকে করতে হচ্ছে। মেয়েটি ভাল গান জানে, নাচ করতেও ভালোবাসে, ছবি আঁকতেও দড়। ওর মুখেই শুনেছি ও বাচ্চাদের ক্লাস বেশ জমিয়ে রাখে। এমন শিক্ষককে দেওয়া হল ভোটার তালিকায় নাম তোলানোর কাজ। মেয়ে মনঃ ক্ষুণ্ন। আমাকে সেদিন ফোন করে বললে শিক্ষকদের দিয়ে এসব কাজ করানো কেন?
তাকে বলা গেল ছাত্র পড়ানো ফেলে ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন বিয়োজনের কাজ করতে তোমার ভাল লাগছে না? মেয়ে বললে, তেমন তো লাগার কথাও নয়। আমি শিক্ষক। ছাত্রদের সঙ্গই আমার ভাল লাগে। বললে, আমার ছেলেদের আমি খুব মিস করছি।
দুষ্টুমি সুরে তাকে বললাম, তুমি পড়াও মানে বইটা পড়ে পড়ে বাচ্চাদের বুঝিয়ে দাও, তাই তো? মেয়ে বললে হ্যাঁ। আর পড়ার মধ্যে একটু গান একটু ছড়া বোর্ডে একটু আঁকিবুকি আর কার্টুন এঁকে পড়াটাকে ওদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই।
শুনে আমি বললাম বেশ।
মেয়ে ফোনেই ঘন হয়ে উঠল। আমি বেশ টের পাচ্ছি বিছানায় আরাম করে বসে বুকের কাছটায় বালিশ আঁকড়ে কানের কাছে মোবাইলে সে একান্ত নিজের কথাটি বলতে চায়।
জানো, সেরা ছাত্রেরা কিন্তু ও রকম করে পড়ে না। সে যেন ভ্রু ভঙ্গী করে জানতে চাইল, তাই না কি মশায়, সেরা ছাত্রেরা কেমন করে পড়ে?
এই মনে করো গুরু একজন আয়ুর্বেদাচার্য । বেশ বলো, শুনছি। তিনি ছাত্রদের বললেন জঙ্গল থেকে ঔষধ তৈরী হতে পারে, এমন উদ্ভিদ বেছে আনো। যে ছাত্র যত আনতে পারবে, তার তত নম্বর।
বেশ তো। তারপর?
ছেলেরা গুরুর কথায় জঙ্গল ঢুঁড়ে গাছ গাছালি বোঝাই করে আনলে।
মেয়ে বলল, ওহো, জানি, জানি, অন্য ছাত্ররা সব বোঝাই করে লতা পাতা আনছে। কিন্তু সেরা ছাত্রটি একেবারে শূন্য হাতে ফিরেছে দেখে গুরু ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত। তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, গোটা জঙ্গলে তুমি এমন কি একটাও উদ্ভিদ পেলে না, যার কিছুমাত্র ভেষজ গুণ আছে?
হ্যাঁ, ছাত্র গুরুকে অবাক করে বললো, মহাত্মন, আমি এই জঙ্গলে এমন একটিও উদ্ভিদ দেখি নি, যার কোনো না কোনো ভেষজ গুণ নেই। গোটা জঙ্গল তুলে আনার কোনো মানে হয় না।
গুরু এহেন ছাত্র দেখে হতবাক।
তার পর? আরো বলো। মেয়ের গলায় আবদারের সুর।
তা হলে সেই ছাত্রটির কথা বলি। গুরু তাকে কিছু গাভীর দায়িত্ব দিয়ে বললেন, যতদিন না এই গাভী দশ সহস্র পূৰ্ণ হচ্ছে, ততদিন তুমি ফিরবে না।
সুমেধ ছাত্র সেই গাভী নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পথে। গাভী গুলিকে পেট পুরে খাইয়ে, সুরক্ষিত রেখে, হিংস্র শ্বাপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে, রোগ ব্যাধিতে চিকিৎসা করে, সুপ্রজনন করতে করতে ছাত্র এগিয়ে চললো পৃথিবীর পথে। ওই গাভীর আহার এর জন্য তাকে মাথা ঘামাতে হয়, সুরক্ষার জন্য তাকে অস্ত্র ধরতে হয়। সুপ্রজননের জন্য খোঁজ রাখতে হয় বীর্যবান ষণ্ড কার কাছে আছে। পথে তাকে দশ দিক হতে দিকপাল গণ শিক্ষা দিয়ে যান। বাতাসের শক্তি, জলের শক্তি, আলোর শক্তি এসে তাকে উপদেশ দান করে সমৃদ্ধ করে তোলেন। এইভাবে গো পালন করতে করতে সেই গুরুনির্দিষ্ট সংখ্যায় উপনীত হয়ে সে সমিধপাণি হয়ে গুরুর আশ্রমে প্রবেশ করলো। তখন তার চেহারা গিয়েছে বদলে। মুখে চোখে আশ্চর্য আভা। গুরু বলেছিলেন, নির্দিষ্ট সংখ্যায় উপনীত হয়ে ফিরতে পারলে ছাত্রকে ব্রহ্মজ্ঞান দান করবেন। কিন্তু, ব্রহ্মচারী কে দেখে গুরু অবাক। এ কি জ্যোতির্মণ্ডিত মুখমণ্ডল ! একে তো আর ব্রহ্মজ্ঞান দিতে হবে না। পরম চেষ্টায় ছাত্র নিজেই তা অর্জন করেছে। তুমি দীক্ষা দিয়েছিলে, আমি তাই নির্জন রাখাল।
হুম। বুঝেছি। তুমি বলছো আমার পড়ানোর কোনো দরকার নেই। ছাত্রেরা নিজে নিজেই শিখে নেবে?
আমি শুধু একটু হাসলাম। বললাম, রাগ করলে তোমায় ভারি মিষ্টি লাগে!
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.