আমাজনে অগ্নিদেব ও খাণ্ডবদাহন : মৃদুল শ্রীমানী

আমাজনে অগ্নিদেব ও খাণ্ডবদাহন : মৃদুল শ্রীমানী

অগ্নিদেব স্বর্গের বিশিষ্ট অপ্সরী অলম্বুষার প্রাসাদের দোরগোড়ায় মুখ কালো করে বসেছিলেন।

 এদিকে কৃষ্ণ সেই অপ্সরীর রূপমুগ্ধ হয়ে অদৃশ্য টানে সকাল সকাল গেটে ঘোরাঘুরি করতে করতে অগ্নিদেবকে দেখে ফেললেন। অগ্নি একজন প্রধান বৈদিক দেবতা। কৃষ্ণ মাত্র‌ই পৌরাণিক। এলিট রাশভারী দেবতা অগ্নি ঘোরাঘুরি রত কৃষ্ণকে পাত্তাই দেননি। কৃষ্ণ ইদানিং পলিটিক্যাল কারণে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। তাতে অনেকেই কৃষ্ণকে মান‍্যগণ‍্য করে। কিন্তু কৃষ্ণের পাঁচটি প্রাসাদে রুক্মিণী,  সত‍্যভামা, লক্ষ্মণা, সুশীলা, জাম্ববতী প্রমুখ পাঁচ  পাঁচটি মহারাণীর পরেও গোপিনীদের সাথে ফস্টিনস্টি লোকের মুখে রসালো আলোচনা হয়ে ঘোরে। পলিটিক্যাল সুতোর টানে দলদাস কবিদের দিয়ে রাধা প্রেম সম্পর্কে বিস্তর উচ্চমার্গীয় দার্শনিক কথা লেখালেও পাঁচ পাবলিক জানে ও বিশ্বাস করে যে মন জয় করার আগেই কেষ্ট ঠাকুর রাধার শরীরের সংবেদনশীল স্থানে ইঙ্গিতপূর্ণ স্পর্শ করেছিলেন। বিশেষতঃ, বিবাহিতা রাধা পারিবারিক ব‍্যবসার কাজে যাবার সময় কেষ্ট ঠাকুর নানা প‍্যাঁচ কষে অনিচ্ছুক রাধাকে স্পর্শ করতেন। পলিটিক্যাল কারণেই পুলিশের তরফে কেষ্টর বিরুদ্ধে অভিযোগ নেওয়া হয় নি। ভিডিও ফুটেজ পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। তবু লোকে আড়ালে কেষ্টলীলা বলে ওইসব গপ্পো করে।

এলিট দেবতা অগ্নি অপ্সরী সন্নিধানে কেন এসেছেন, সেটা জানবার জন‍্যে কৃষ্ণের মন উতলা হয়ে উঠল। গেটের সামনে দারোয়ানের টুলে উপবিষ্ট অগ্নির কাছে গিয়ে ভালমানুষের মত মুখ করে কেষ্টবাবু কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন। তেতো মুখ করে অগ্নি বললেন, আর বোলো না বাপু, সকাল থেকে বড্ডো শরীর খারাপ। ডাক্তার কে ফোন করতে সে বললে, পুরো বেড রেস্ট।

গোঁফের আড়ালে ফিচেল হাসিটি লুকিয়ে নিয়ে কৃষ্ণ জানতে চাইলে বেডরেস্ট নিতে এসে দারোয়ান ব‍্যাটার টুলে বসে থাকতে হবে একজন এলিট দেবতাকে?

অগ্নি বললেন, মাথা খারাপ কোরোনা বাপু। অপ্সরী অলম্বুষা কাল বিষ্ণুলোকে লেট নাইট পার্টি করে ভোররাতে ফিরে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে। তুমি ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ো না। অলি খেপে গেলে ইন্দ্রকে পর্যন্ত রেয়াত করে না।

ইন্দ্রের কথা শুনে কৃষ্ণের একটু মেজাজ গরম হয়ে গেল। ইন্দ্র দেবতাদের রাজা এটা যেমন ঠিক, তেমনি চরিত্রের দোষের জন‍্য কুখ‍্যাত, এটাও তো ঠিক। ইন্দ্র দেবের গায়ের হাজারো চোখ যে আসলে কী, তা সবাই জানে। এই ভয়ঙ্কর বদমাইশ ইন্দ্র গোপজনকে বিপদে ফেলবে বলে সাংঘাতিক বৃষ্টি পাঠিয়েছিল। শেষে কৃষ্ণ গোবর্ধন ধারণ করলে তবেই গোসম্পদ বাঁচে।

কৃষ্ণ বলে বসলো এই আপনার ইন্দ্র এতগুলি অপ্সরীর টিম চালায়, তার পুরোটাই কি ওর বাপের টাকায়? পাবলিক মানি খরচা করে অপ্সরী পোষার দরকারটা কি?

অগ্নি বললেন, শোনো, তুমি জানো আমি কেন এসেছি। আর তোমারটাও আমি জানি। কাগজের পাতায় বিজ্ঞাপন দেয় বটে "বান্ধবী চাই? ১০০% স‍্যাটিসফ‍্যাকশন", কিন্তু আমার মতো পুরোনো পাপীদের ওসবে মন উঠবে না। তুমি ও তো দেখছি গোপিনীদের ফেলে এ পাড়ায় ঘুরছ? রাধারাণীতে আর মন উঠছে না বুঝি?

 রাধারাণীর কথা আর বলবেন না। তার সাথে আমার যে নিত্যলীলা।

অগ্নি বললেন, সে তো জানি বাপু। আয়ান ঘোষের ব‌উয়ের কামাগ্নি দমন লীলাখেলাকে তুমি ভাড়াটে লেখক দিয়ে বেস্টসেলার বানিয়েছ। কিন্তু তাতে সত্য ঢাকা পড়ে নি।

পঞ্চায়েত ভোটের নির্বাচন কমিশনারকে যত সহজে পকেটে পুরেছ, তত সহজে পাবলিকের মুখে কুলুপ আঁটতে পারো নি। আড়ালে আবডালে তুমি আর ইন্দ্র, দুজনকে নিয়েই কানাকানি চলে।

 কৃষ্ণ দেখল অগ্নি তাকে আর ইন্দ্রকে এক‌ই গুণাবলীর ধারক বাহক হিসেবে লক্ষ্য করেছেন। তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘোরানোর ছলে অগ্নির কাছে জানতে চাইল, তাঁর ঠিক কি হয়েছে।

অগ্নি বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি শুনে কি করবে বাপু?

বিনীতভাবে কৃষ্ণ বললেন, অনুগ্রহ করে বলেই দেখুন না।

অগ্নি বললেন, এই বামুন ব‍্যাটাদের যজ্ঞ আর হোমে ঘি ঢালার বাতিক থেকে আমার অগ্নিমান্দ‍্য হয়েছে। অজীর্ণ, অম্বল, আমাশয়। অত্যন্ত ক্ষুধার অভাব। সারাক্ষণ পেট ভুটভাট করে। বাহ‍্যে গিয়েও শান্তি নেই।

 কৃষ্ণ বলল, তা রোগ তো আপনি ভালোই পাকিয়েছেন। আই বি এস।
অগ্নি বললেন, কি বললে বাপু? আইবিস?
কৃষ্ণ বলল, আইবিস তো পাখি। আই বি এস হল পেট গুড় গুড় রোগ। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম। বারবার  কোষ্ঠসাফ করেও শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না। কাশ্মীর সমস্যার মতো । সানাইয়ের পোঁ এর মতো। ধরলে ছাড়ে না। আমাদের এক মুখ‍্যমন্ত্রীর অমন হয়েছিল।

অগ্নি উৎকর্ণ হয়ে বললেন, কেন কেন, মন্ত্রী মশায়ের অমন হল কেন?

কৃষ্ণ বলল, তিনি যে বারো লাখ টাকা খরচা করে নিজের অফিসের বাথরুম সারিয়ে ছিলেন। তাইতে বিরোধী রাজনীতিকেরা চোঙা ফুঁকে প্রতিবাদ করে করে তাঁর কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আপনার এমন অসুখ হল কেন?

অগ্নি বললেন, আরে এত ঘি খেলে আর অজীর্ণ হবে না?

কৃষ্ণ বললেন, কেন, ঘৃতে বৃদ্ধি বল। শাস্ত্রে বলেছেন।

অগ্নিদেব বললেন, ধ‍্যাৎ, রাখো তোমার শাস্ত্র। বিজ্ঞান তো পড়লে না। ঘি হল ফ‍্যাট। ফ‍্যাট বেশি খেলে লিভারের বারোটা বেজে যায়। যে কোনো গ‍্যাস্ট্রোলজিস্ট ডাক্তারের কাছে বুঝে নিও। সেকালে ছিল হৈয়ঙ্গবীন। মানে খাঁটি গব‍্য ঘৃত। আমার বয়স ছিল কম। ঋকবেদ যখন লেখা চলছে, অগ্নিমীলে ইত্যাদি পড়ে মুনি ঋষিরা গোমাংসের তোফা কাবাব সেবন করতে দিতেন বাপু। নধর সুপুষ্ট বাছুরের মাংসের কাবাব তো কোনোদিন চেখে দেখলে না ভায়া, সেকালে অতিথিকে বলা হত গোঘ্ন। অতিথি এলেই তাঁর সম্মানে গোবৎস উৎসর্গ করা হত। আর ছিল সোমরস। ধোঁয়া ওঠা মাংসের কাবাব আর সাথে হরিণীর মত চঞ্চলা মুনিকন‍্যার হাতে তৈরি সোমরস। আহা, সে যে কি স্বাদ তোমরা তো জানলে না!
কৃষ্ণ নাক সিঁটকে বললেন, আম‍রা গরুকে ভগবতী জ্ঞানে সেবা করি। গোমাতা বলি।

অগ্নিদেব বিরক্ত হয়ে বললেন, গরু যে তোমার মা, সে তো তোমার আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সামাজিক  বোধবুদ্ধি থাকলে কেউ মেয়েদের পুকুর ঘাটে গাছের ওপর উঠে বাঁশি বাজায়? আইপিসি তে কগনিজেবল কেস হয়ে যাবে। তারপর সুভদ্রাকে ইলোপ করতে প্ররোচনা দিয়েছিলে।

বলতে বলতেই অগ্নিদেব নিজের পেট খামচে ধরলেন। কাতর কণ্ঠে বললেন, উঃ গেলাম রে! বলেই দারোয়ানের টুল থেকে মাটিতে পড়লেন। আর পড়েই ভির্মি গেলেন। হাঁ হাঁ করতে করতে ছুটে এল অপ্সরী অলম্বুষা। সে এসেই কৃষ্ণকে বকাবকি করতে শুরু করল। বুড়ো অগ্নিদেবের বয়স হয়েছে, তাকে অতো বকানোর কি দরকার ছিল।

কৃষ্ণ মিনমিন করে কিছু বলতে যেতেই অপ্সরী তেড়ে ধমক দিল, দেখছ, একটা মানুষ খাবি খাচ্ছে, ডাক্তার ডাকবার বুদ্ধিটাও কি তোমার নেই। যতো সব হাড় হাভাতে মিনসে এসে জুটেছে আমারই কাছে । 

অবশ্য ততক্ষণে গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে অশ্বিনীকুমারদ্বয় হাজির। বুকে স্টেথো ঠেকাতেই উঠে বসে পড়ে অগ্নিদেব বললেন, অলি সোনা, এয়েচ?

অপ্সরী অলম্বুষা তার টিকোলো নাকে হীরের নথ নেড়ে বললে, দ‍্যাখো তো দাদু, কি রকম ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।

অলম্বুষার মুখে দাদু সম্বোধন শুনে  অগ্নিদেব রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। তাঁর রাগ কমাতে দেব চিকিৎসকদ্বয় বললেন, অগ্নিদেব, আপনার লিভারের কারণে ঘি আর মোটেও খাওয়া চলবে না। এখন স্রেফ মাংস খেতে হবে।  কোপ্তা কোর্মা কালিয়া কাটলেট কবিরাজী নয়, শুধুই কাবাব। পুরোনো দিনে যে ডায়েটে অভ‍্যস্ত ছিলেন।
কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে প‍রম তৃপ্তির হাসি হেসে অগ্নিদেব বললেন, দেখেছ, আমি যা ধরেছিলাম ঠিক তাই। বাব্বাঃ, মাংসের কাবাব ছাড়া খাঁটি দেবতার পেটে সয় না কি? তা ডাক্তারবাবু্রা কাবাবের অনুপান হিসেবে একটু ঢুকুঢুকু চলবে তো? বেশি নয়, মেডিসিন ডোজে খাব। অপ্সরী অলম্বুষার চোখটিপুনি ইঙ্গিতে অশ্বিনীকুমারদ্বয় রাজি হয়ে গেলেন। তবে চেতাবনি দিলেন, হোমমেড সোমরস টুকু চলতে পারে। কিন্তু মাধ্বী পৈষ্টী ইত্যাদি মোটেও নয়।
কৃষ্ণ বুক চিতিয়ে বলল অগ্নিদেবকে পেট পুরে মাংস খাওয়ানোর ভার আমার। অ্যায়সা খাণ্ডবদাহন করব না, একটা চামচিকে বা গিরগিটি প‍র্যন্ত ছাড়া পাবে না।
তারপর খাণ্ডববনে বেড়া আগুন লাগানো হল। কৃষ্ণ আর অর্জুন বায়ু বেগে বনের সীমারেখা ধরে রথ ছোটালেন। কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলেন ময় দানব। অসামান্য প্রতিভাবান স্থপতি বাস্তুকার তিনি। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জন‍্য ইন্দ্রপ্রস্থে স্ফটিকের প্রাসাদ বানিয়ে দেবেন। যেখানে অতিথি হিসেবে গিয়ে সর্ব সমক্ষে লাঞ্ছিত হবেন দুর্যোধন। মনে মনে পণ করবেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের। ময়দানবের সাথেই বেরিয়ে এসেছেন তাঁর মহিষী ও অন‍্যান‍্য অন্তঃপুরিকাগণ। কলম্বাসের সামনে রেড ইণ্ডিয়ান যুবতীর দল যেমন অসংকোচ সহজিয়া নগ্নতায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনিভাবে বদ্ধাঞ্জলি এসে দাঁড়িয়েছিলেন বনের মেয়েরা। সকলের অলক্ষ্যে জিভটাকে ওষ্ঠাধরে একবার বুলিয়ে নিলেন কৃষ্ণ। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা তাঁর নির্দেশ ছাড়া ভূ ভারতে না কি কিছুই হয় না।

সেই আগুন আমাজন জঙ্গলে আজও জ্বলছে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.