শেষ ইচ্ছা : শামিমা এহেসানা


শেষ ইচ্ছা : শামিমা এহেসানা

শেষ ইচ্ছা : শামিমা এহেসানা

(গল্পের বিষয়- মৃত্যু আর ভালোবাসার লড়াই)

"এমন বিয়েতো সিনেমায় হয়"- মনে মনে ভাবে রিমা। আবিরের হাতে সিন্দুরের কৌটো। মা এর হাতে গোপাল ঠাকুরকে পুজো দেওয়ার ছোট্ট ঘন্টা। এই ঘন্টাটা নিয়ে ফ্রক পরা ছোটো রিমা দৌড়ে পালাতো। ও ভাবতো ওটা খেলার জিনিস। মা যখন বলতো, "ঠাকুর পাপ দেবে এই ঘন্টায় হাত দিলে," তখন রিমা রেখে দিয়ে যেতো। বিনিময়ে মা প্রসাদ দিত। আট আনার বাতাসা।

আরে। আজও পুজোর থালায় মা বাতাসা এনেছে। "বধূ বরণে বাতাসা"। রিমা ভাবে, "আহা শরীরটা সাথ দিলে ফেসবুকে ক্যাপশন লিখতাম, 'বধূ বরণে বাতাসা।'" "হাসপাতালে
পুরোহিত আনাটা বাড়াবাড়ি হয়েছে"-  মনে মনে ভাবছিল রিমা। কিন্তু কিছু বলেনি। আবির কষ্ট পাবে ভেবে।

পুরোহিত মশাই শুরু করতে বললেন, তারপর মন্ত্র শুরু হলো। 'যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব......'

আবির রিমার কপালে সিঁদুর দিচ্ছে। রিমার মাথায় কালো ফেট্টি বাঁধা। ওর কোমর ছাড়ানো বাদামী চুল আর নেয়। কেমোর ডোজ সব উপড়ে ফেলেছে। স্বপ্ন, সৌন্দর্য আর চুলও। শুধু রিমা হাসছে। আর কারো মুখে হাসি নেয় আজ। আবিরের বাড়ি থেকে কেও আসেনি। না আসাটাই হয়তো স্বাভাবিক। "ক্যান্সারের শেষ স্টেজের রোগীকে কেও বিয়ে করে নাকি? ওদের কোনো দোষ নেয়"- নিজেকে নিজেই বোঝায় রিমা। রিমাকে আবিরের মা-বাবা সামনা সামনি দেখেনি। ছবিতেই দেখেছে শুধু। কিন্তু আবিরের বোন রিমার সাথে শপিং করেছে। অনেক বার ওরা তিনজন একসাথে সিনেমা দেখতেও গেছে। তাই বোনের, আবিরের এমন আত্মহনন বিবাহ দেখতে ভালো না লাগলেও, রিমার প্রতি দরদের কারনেই আজ সে এসেছে। মেয়েটার চোখে জল, কিন্তু শাঁখ বাজাচ্ছে কেমন সুন্দর করে। যেন কিছুই হয়নি। আবিরের মুখ দেখে বোঝা কঠিন, সে আজ নিজের বিয়েতে খুশি হচ্ছে, না কাঁদতে চাইছে। আর বাবা-মা স্বীকার করে নিয়েছে, তাদের মেয়ে ফিরবেনা আর। তাই ওদের চোয়াল শক্ত হয়েই রয়েছে।
রিমার মনে হয়, গোটা স্বর্গের দেবদেবী ওকে দেখে হাসছে আজ। ওর করুণ পরিনতি দেখে মাটি কাঁদছে আজ। অথচ ইশ্বর কেমন নিষ্ঠুর হয়ে হাসছে। কল্পনা করতে করতে রিমা অনেকদূর পৌছে যায়। আজ মনে মনে ভাবে সে- এই জন্যেই ইশ্বর তাকে প্রবল কল্পনাশক্তি দিয়েছিলো। যাতে কল্পনাতেই বেঁচে নিতে পারে অনেক বছর।

আফসোস হয় রিমার। সে অনেক দূর হাঁটতে চেয়েছিল আবিরের সাথে। তা আর হলনা এই জন্মে।

নিজেকে একটি বার আয়নায় দেখতে চায় সে। সিঁদুর পরে তাকে কেমন লাগে দেখার জন্য। কিন্তু সাহস হয়না। ন্যাড়া মাথা, আর ফুলে ওঠা চোখ মুখ দেখলে নিজেকে এক্ষনি শেষ করে দিতে ইচ্ছা হয় রিমার। তাহলে সে দেখবে কিভাবে? আবিরের চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া, সুন্দর দেখতে লাগার আর কোনো পথ খুঁজে পায়না সে।

আর কিছুদিন আগে যদি ধরা পড়তো, তাহলে ফেরানো যেত রিমাকে। কিন্তু এখন আর হয়তো হবেনা। রিমা জানে সে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যাবে। সব কাজই তার অসম্পূর্ণ  রয়ে যাবে। শুধু আবিরের জেদের জন্য এই একটা শখ তার আজ পূর্ণ  হয়েছে। নিজেকে সিঁদুর পরে একদিন দেখতে চেয়েছিল রিমা। আজ হয়েছে। অথচ দেখার সাহস নেয় তার নিজেকে। সরকারী হাসপাতাল থেকে এনে আপাতত বাড়ির কাছের একটা নার্সিংহোমে রাখা হয়েছে রিমাকে। কারন, আবির চেয়েছিল, রিমা যাওয়ার আগে সে বিয়ে করতে চায় রিমাকে। যাতে রিমার যাওয়ার পর ওকে প্রেমিকা নয়, স্ত্রী বলে পরিচয় দিতে পারে আবির।

রিমা বাবা-মার একমাত্র মেয়ে। তাই তাদেরও টাকা পয়সা নিয়ে তেমন ভাবনা নেয়। রিমার বিয়ের জন্য ওর বাবা মা যা কিছু সঞ্চয় করেছিল, তার সবটা হয়তো হাসপাতালের বিল মেটাতে শেষ হবে। সে হোক গে। রিমা শেষের দিন গুলো যেন শান্তিতে কাটাতে পারে, এইটুকুই চায় ওর বাবা মা।
এখন সবাই বেরিয়েছে। কেও নেয় কেবিনে, আবির আর রিমা ছাড়া।
রিমা আবিরকে শুধায়, "আমাকে সিঁদুর পরে ভালো লাগছে?" আবির এতক্ষন নিজেকে সামলাতে পারলেও রিমার সরল প্রশ্ন কান্নার বাঁধ ভেংগে দেয় তার। রিমা জানেনা কি বলে শান্তনা দিতে হয়, তাই দুষ্টুমি করে বলে, "আমি যাওয়ার পর একটা সুন্দর মেয়ে খুঁজে বিয়ে কোরো। কেমন!"
আবিরের রাগ হয়, বলে, "আর একটাও বাজে কথা যদি শুনি তাহলে কিন্তু........"

রিমা বলে, "তাহলে কি? মারবে বলো?  ইশ। বেচারা আজ এটাও বলতে পারছেনা। আহা কি কষ্ট।" বলেই হেসে ফেলে রিমা।

রিমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। সে জানেনা, কালকের সূর্য-আবির-মা-পাপা কে আর দেখা হবে কিনা।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.