গ্রন্থ সমালোচনা : লতায় ঢাকা গুল্মরা

গ্রন্থ সমালোচনা : লতায় ঢাকা গুল্মরা
কবি : বাবলু আহির
সমালোচক : বিকাশ দাস বিল্টু  
(আল্পনার কবিতার সম্পাদক )
প্রকাশক : কর্পোরেট পাবলিসিটি
প্রচ্ছদ :চূড়ামণি
মূল্য :১২০ টাকা 


" সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বদলে যেতে বাধ্য হয় অনেক কিছুই।কিন্তু সেটা যে কেবল মাত্র পোশাকি রূপ তার সবচেয়ে  উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত  হল যান্ত্রিক জীবনের নাগপাশে  কঠিনভাবে জড়িয়ে পড়া মানুষের হৃদয়ে আজো কবিতার প্রতি তৃষ্ণার বোধ এই ভাবে জাগ্রত.... "

    আমার কথা নয় ;কবি বাবলু আহির তার প্ৰথম কাব্য গ্রন্থ  :"#লতায় #ঢাকা #গুল্মরা"র মুখবন্ধ।

      স্বাভাবিক ভাবে কতটা বলিষ্ট কলম না হলে এই শ্বাশ্বত  কথা আসে, জানার আগ্রহ বেড়েই গেলো কবির সম্পর্কে। ছোট্ট জীবনীতে কবি উল্লেখ করেন তিনি জন্মগ্রহন করেন 1988 এর 03রা এপ্রিল  মেদিনীপুরের  এক প্রান্তিক গ্রামে। বর্তমান কবি গৃহ শিক্ষকতার  সাথে যুক্ত।আরও বেড়ে গেল আগ্রহ।কারণ বেকারত্বের জ্বালা আর সাংসারিক অনটন  সত্যিই সাহিত্যের মানদন্ড তৈরি করে।
   
        সত্যি'ই তাই।কবির প্ৰথম কবিতায়  কবি "#রহস্যের  #লিপ্সায় " পাঠককুলকে রহস্যময় জীবনে নিয়ে যায়।প্রেম বিরহী অনুসন্ধিৎসু  কবি অনায়াসে  ব্যক্ত করেন :
                 নিত্যান্তই খেলার ছলে
              স্যান্ডউইন  ফুটিয়ে ছিলাম তোমার অবয়ব /
        ঢেউয়ের ছন্দে তাল মিলিয়েছিল  যৌবনের বাঁশি
         তোমার প্রকাশের ক্ষনে।

    করুণ আকুতির মূর্ছনায়  হৃদয়বীনা আজও খোঁজে, আজও অব্যক্ত যন্ত্রনা  কথা কয় :

           " অতিষ্ট প্রাণ বলেই ফেলে /এখন ঘুমিয়ে পড়ো নয়তো ঝড়ে পড়ো নির্দ্বিধায়।"


    অনুভূতি যখন মেটাফোর হয়ে কথা বলে, জীবন যখন রেলগাড়ি।তখন" ক্ষণিক হারায়" কবিতার শেষ পংতি হৃদয়ে গেঁথে দেয়; হৃদয় ঝংকার :

             "ছুটে চলে রেলপথ  /স্টেশনের কোলাহলে  /ক্ষণিক হারায় পীড়নের ক্রন্দনে"

    গভীর বিশ্লেষণ না করলে কখনও কবিতার অস্থি মজ্জায় যাওয়া সম্ভব নয়;কবি তার তীক্ষ্ণ কলমের আঁচড়ে প্রকাশ করেন;হারিয়ে গেলাম মন্ত্র মুগ্ধের মত  :

         "  বর্ণহীন জলের পথ কেন সাদা? "

    মানবতা যখন ধুঁকে মরে, বিবেক যখন পিষে যায় সভ্যতার যাঁতাকলে। তখন কবি তার লবি টিউশনের ফাঁকে লিখে ফেলেন :

         " রক্তের বন্যায়  ভেসে গেলো মানহুশ  /আর কত লাশ বইবে মা, এবার টানো রাশ "

    কিংবা কবি কিভাবে মিলন সুখে সবাই সুখী হওয়া যায় তারই ঝংকার :

        " এসো হে, মানুষ /পিচ্ছিল হাত ধুয়ে ফেলি সত্যের সাবানে  /শপথের উৎসবে ভুলে যাই অভিমান "

    বিরহী প্রেম কিংবা অব্যক্ত কিছু কথা গুমরে মরে কিংবা ঘুমিয়ে পরে। ছাদ উড়ে যাওয়ার আশঙ্কায়  কবির মনে মন আনচান:

   " মাথার উপর ছাদটা /হারিয়ে যাওয়ার পর /স্মৃতির শিখায় /যদি নামে শীতঘুম "

    কবি নিত্য যাপন করেন, নিত্য বাস্তব দেখেন, নিত্য রোজনামচা কাহিনী কথা কয় তাই তার কবিতায়  :

      "ছবির ওই সূর্যটা উদয়ের  নাকি অস্তের "

    অমলীন যেমন কিছু কথা, কিছু কথাতাইতো  ভাস্বর। কবির আঁচড়ে :

                     " কিছু কথা তার পরেও থেকে যায় "

    গভীর ভাবাত্মক লেখুনী ছাড়া কবির কবিতার রসদ নেওয়া দুস্কর; গভীর নীরবে কবির আকুতি :

          " বুক পকেটে লুকিয়ে রাখা /একফালি চাঁদ /তলিয়ে গেছে /অমানিশির গভীর নীরে"

    মানবিক আয়নাতে সমাজের বাস্তব ছোঁয়া প্রকাশিত হয়, আয়নায় একটা প্ৰতিচ্ছবি কথা বলে :
              "দেখছি কিন্ত স্বীকারোক্তি  গেলেই /আলগা হয় মাটি "

    বাংলা  মায়ের প্রতি কবির শ্রদ্ধাঞ্জলি সত্যিই সহজ করে এত সুন্দর কথাও বলা যায় !

      " শুধু স্বার্থের প্রয়োজনে সাজাই ফুল- চন্দনে /ও আমার বাংলা তারিখ।"

   লুকোচুরি খেলতে খেলতে কখন যে বয়ঃসন্ধি পার হয়ে তরতাজা যৌবন যখন কথা বলে; কবির আক্ষেপ তখন :

        " জল কাদায় খেলতে খেলতে --
         শৈশবের সীমা পেরিয়ে গেল,
         পৌঁছে গেল যৌবনের মেলায় !"
   
    কিংবা সময়ের সাথে যখন সময় হারিয়ে যায়, কিংবা হেরে যায় যখন নিয়তির কাছে...
 "বন্ধু তুমি" কবিতায় স্বাভাবিক ভাবে ফিরে যাই আবেগঘন যৌবনের মনিকোঠায় :

                    "কৈশোরে সদ্য গজানো গোঁফের মতো /লিকলিকে ঝুড়িগুলোর সুড়সুড়িতে শাখায় শাখায় ছিল যৌবনের স্পষ্ট ইঙ্গিত "
   
    ইট বালি সিমেন্টের বেড়া ডিঙিয়ে সবুজের মাঝে সবুজ মাখতে কবি সবুজের মাদকতায় স্নান সারতে বেরিয়ে যেতে চান বেবাক এক সবুজ মাখা প্রেমিক হয়ে......

       " চলো, কিছু খড়খড়ে ব্যস্ততা চিবাতে/    চিবাতে আলো মাখা ধানের   আলে আলে //আস্ত সবুজ হয়ে উঠি /তোমাকে নিয়ে "

প্রেমের রূপের ছোঁয়াও  যে আত্মভাবনারও বহিঃপ্রকাশ :
   
     " প্ৰথম দৃশ্যের শেষ অঙ্কে /
      প্রসারিত পারদ পাঠ করে চলে /
       অভিলাষের প্ৰথম অধ্যায় "
   
    এক জায়গায় আমাকে থমকে যেতে হলো।কবি "স্বাধীনতার কবিতায়" কী দারুনভাবনার বহিঃপ্রকাশ করলেন ! কত সহজ করে কবির ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দিলেন --

        "কবি চাঁদের আলো
        কবি আশার আলো
        কবি মানুষের
         কবি প্রেমের
          কবি সত্যের
          কবি মুক্তির
          কবি স্বাধীনতার "
   
    নতুন ভোরের  ভোরাই গাইতে গিয়ে কবি :
      "আমাকে যে গেয়ে যেতে হবে নতুন ভোরের শ্বাশত ভোরাই "
   
কবির বইয়ের শেষ কবিতায় "বাম দিকের জানালার ফাঁকে "কবি সামাজিক প্রেক্ষাপটের সুচারু বর্ননা করেছেন এবং যথার্থ :

     "এখন রাজ্য জুড়ে কার শাসন?
      কার হাতে রাজদন্ড -রাজ্য ভার?
       কর্মমুখর রাজার হাতে নাকি রানীর স্নিগ্ধ আঁচলে? "

বলা বাহুল্য বাবলু আহির তার প্ৰথম কাব্য গ্রন্থ অনায়াসে পাঠককুলের হৃদয়ে জায়গা করে নিবে। তবে আমার যেটা মনে হয়েছে কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কবি মাঝে কিছু কবিতা একটু অন্যরকম নির্বাচিত করেছেন, হয়ত এটাই উনি।সেখানে কবিকে কবির মতন পেলাম না। সেক্ষত্রে কবিকে আরও সময় নেওয়া উচিত ছিল। আর কিছু কবিতার গঠনগত বৈশিষ্ট আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল। মেটাফোর প্ৰথম দিকে থাকার পরেও মাঝে সেই খামতি দেখা যায়।আবার শেষে কবির আকুতি,নির্যাস ঝলসে আসে সেদিক থেকে অনন্য।

   তবে "কর্পোরেট পাবলিসিটির" আরও একটি পেপার কোয়ালিটির উপর জোর দেওয়া উচিত ছিল।একটা বই নির্ভর করে অনেকটা তার পাতার উপরেও।

    যাইহউক, আমি আমার এই ছোট্ট প্রয়াস করলাম।তবে আপনারা অবশ্যই বাবলু আহিরের কাব্যগ্রন্থটির স্বাদ নিতেই পারেন। দামও নাগালের মাঝে :120টাকা।আপনারা বই প্রেমী হয়ে থাকলে তথা কবিতার নির্যাস মাখতে অবশ্যই কিনতেই পারেন :"#লতায় #ঢাকা #গুল্মরা "।
           কবি বাবলু আহিরের জন্য রইলো এক আকাশ শুভেচ্ছা।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.