মৃদুল শ্রীমানী
সকাল সকাল চা খাইয়া কাগজের হেডলাইনে চোখ বুলাইতেছি, গৃহিণীকে পুনরায় এককাপ চা করিতে বলিলে তিনি কি বলিতে পারেন, হিসাব করিতেছি, এমন সময় বিড়াল বলিল, আত্মনির্ভরশীল হও।
আমি বলিলাম, আমি চা করিব?
বিড়াল বলিল, তা করিতেই পার, বিশেষতঃ, এক্ষণে অস্মদ্দেশে চা করা রাজধর্ম বলিতে পার।
আমি বলিলাম, চা করা এমন কিছু কঠিন শ্রমসাধ্য ও বুদ্ধিদীপ্ত কাজ নহে।
বিড়াল বলিল, না, তুমি শ্রমসাধ্য ও বুদ্ধিদীপ্ত কাজে বিলক্ষণ অভ্যস্ত, এরূপ অপবাদ আমি দিই না।
বিড়ালের কথাটি কোন্ দিকে ঘুরিতেছে, বোঝার চেষ্টা করিতেছি, এমন সময় সে কাষ্ঠহাসি হাসিয়া বলিল, "দুরূহ কাজে নিজেরই দিয়ো কঠিন পরিচয়", একথা হিন্দুস্তানে যিনি বলিতে সাহস করিতেন, তিনি বহিরাগত।
আমি বলিলাম, "বহিরাগত" কথাটির অর্থ জান?
বিড়াল বলিল, জানিব না কেন? বড়লোক দেশের বড়সড় নেতা আসিলে রাস্তার পাশের কুটির হইতে যাহাদের তাড়াইয়া দিয়া সব কিছু শোভন সুন্দর করিয়া তোলো, সেই গরিবেরা সব সভ্যদেশেই বহিরাগত।
আমি বলিলাম, গৃহীর অনেক দায় থাকে। ধনী ও প্রতিপত্তিশালী প্রতিবাসী আসিলে তাঁহার সম্মান রক্ষার্থে ঝাড়াই বাছাই সাফাই করিতে হইবে বৈকি!
বিড়াল বলিল, ধনীর পায়ে তৈলমর্দন ও দরিদ্রদের প্রতি লাথিবর্ষণই সভ্যতা। এক্ষণে অস্মদ্দেশে সভ্যতার বিপুল চর্চা হইতেছে।
বলিলাম, তুমি জান না, তামাম হিন্দুস্তান আত্মনির্ভরশীল মন্ত্র কায়মনোবাক্যে জপ করিলে হিন্দু জাতির অসামান্য উন্নতি হইবে।
বিড়াল বলিল, সারা সকাল তো ওই মহামন্ত্র তোমার ভুক্তাবশিষ্ট টোস্টরুটি ও অমলেট সহযোগে জপ করিয়াছি। এক্ষণে জপধ্যান করার পর পুনরায় ক্ষুধা অনুভূত হইতেছে।
হাসিয়া বলিলাম, তুমি তো পরের ঘরের মাছটা দুধটা চুরিচামারি করিয়া খাইয়া থাক। তোমার আর আহারের আয়োজনে অসুবিধা কিসের? তোমার আয়োজনের সবটুকুই পরস্মৈপদী।
বিড়াল আমার ব্যঙ্গ গায়ে মাখিল না। বলিল, দেখ, আমি যে পরিশ্রম করিয়া, প্রাচীরের সামান্য পরিসর দিয়া আসিয়া দুগ্ধ ও মৎস্য ভক্ষণ করিতেছি, তাহাতে জাতীয় স্তরে বিরাট অর্থনৈতিক উপকার সাধিত হইতেছে। চাহিদা সৃষ্টি হইতেছে। যোগান বাড়িতেছে। তাহাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হইতেছে। গোপালনের প্রয়োজনীয়তা বাড়িতেছে। গোময় ও গোমূত্র টনিকের উৎপাদন বাড়িতেছে। জাতীয় উন্নতি তো ওইসব গব্যেই।
বলিলাম, আর হাসাইও না। আত্মনির্ভরশীল মন্ত্রজপ অন্ততপক্ষে বিড়ালের সাজে না। তাহার সবটুকুই চৌর্যবৃত্তি। পরস্বাপহণ।
বিড়াল ফ্যাঁচ করিয়া হাসিয়া বলিল, আত্মনির্ভরশীল বলিতে কি বোঝায়, তাহা তোমাকে দেখিয়া শিখিয়াছি।
আমি জানি, এই মার্জারকুলতিলক অতিশয় ধূর্ত। সে আমার গৃহের দুধ ও মাছ খাওয়া সত্ত্বেও আমার গুণগান করিবে, এহেন ভদ্রতা তাহার পক্ষে রীতিমতো বেমানান। বলিলাম, আত্মনির্ভরশীলতার তুমি কি বোঝো? বিড়াল বলিল, মহাত্মন্, আপনি যাহা যাহা করেন, সবই অসামান্য আত্মনির্ভরশীলতার উদাহরণ।
কিঞ্চিৎ প্রীত হইব কি না ভাবিতেছি, এমন সময় বিড়াল বলিল, আপনি দেশের সুরক্ষা স্বার্থে বিদেশ থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয় করেন। ইহা আত্মনির্ভরশীলতার জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ। নিজের দেশে মসজিদ ভাঙিয়া সেই স্থলে মন্দির নির্মাণে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করিয়া, বিদেশি শক্তির তৈরি করোনা মহৌভ্যাকসিন খোঁজ করেন, ইহাও আত্মনির্ভরশীলতার পরাকাষ্ঠা। তাহার উপর চিরবৈরী চিনের সংস্থাকে মাত্র তিনহাজার কোটি টাকা দিয়া সাগরতীরে স্ট্যাচু অফ ইউনিটি করিলেন, ইহাও আত্মনির্ভরশীলতা বৈকি। ভয়াবহ ক্রোধান্বিত হইয়া কাগজ পাকাইয়া বিড়ালকে আঘাত করিতে উদ্যত হইলাম। সে আমাকে মুখ ভেঙচাইয়া বলিল, বিকালে দুধের যোগাড় রাখিও। আমি পুনরায় আত্মনির্ভরশীল হইতে আসিব।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন