মহাভারত কি সত্য ঘটনা? : সঞ্চারী ভট্টাচার্য্য

 সঞ্চারী ভট্রাচার্য্য

মহাভারত কি সত্য ঘটনা? 

সঞ্চারী ভট্টাচার্য্য 

মহাকাব্যের ঐতিহাসিকতা নিয়ে বিতর্ক কোনো নতুন বিষয় নয়। ইউরোপে মহাকবি হোমারের লেখা ইলিয়াড, ওডেসি নিয়ে যেমন ইতিহাসবিদ-প্রত্নতাত্ত্বিকরা যুগে যুগে মাথা ঘামিয়েছেন, তেমনই আমাদের দেশের রামায়ণ ও মহাভারত নিয়েও কম গবেষণা হয়নি। বহুকাল ধরে চর্চা বহমান রয়েছে মহাভারতের ঐতিহাসিকতা নিয়ে। সত্যিই কি ঘটেছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ? কৃষ্ণ নামে সত্যিই কি কেউ রাজত্ব করতেন দ্বারকায়? কৌরব আর পাণ্ডবদের কথা কি পুরোটাই বানানো? নাকি সত্যই এই দুই কুল পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে ধ্বংস করে ফেলেছিল নিজেদের? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশেষজ্ঞরা কখনও প্রবেশ করেছেন ইতিহাসের আঙিনায়, কখনও প্রমাণ খুঁজেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে, কখনও বা ভাষাতত্ত্বের সড়ক বয়ে অগ্রসর হয়েছেন। কী বলছে এই সব প্রমাণ? নিচে তার মধ্যে থেকে কয়েকটি উল্লিখিত হলো।

• মহাভারতকার বেদব্যাস স্বয়ং তাঁর রচনাকে ইতিহাস বলেছেন। এখানে ইতিহাস-এর অর্থ- এইসব ঘটেছিল। যদি মহাভারত কপোলকল্পনা হতো, বেদব্যাস একে মহাকাব্য বা কথা বলে উল্লেখ করতেন।

• মহাভারতের আদিপর্বের ৬২তম অধ্যায়ে ভারত-রাজবংশ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উল্লিখিত হয়েছে। মনু থেকে ৫০ পুরুষ সেখানে উল্লিখিত। যদি মহাভারত কল্প-কথাই হতো, তা হলে এত বিস্তরিত উল্লেখের কী প্রয়োজন ছিল?

• প্রত্নত্ত্বের সাক্ষ্যও মহাভারতের ঐতিহাসিকতাকে সমর্থন করছে। গুজরাটের সমুদ্রতলে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রাচীন দ্বারকা নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। পৌরাণিক বর্ণনার সঙ্গে সেই ধ্বংসাবশেষের মিল যথেষ্ট।

• মৌষল পর্বে দ্বারকা নগরীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে। প্রাচীন দ্বারকা আজ সমুদ্রে নিমজ্জিত।

• এমন ৩৫টিরও বেশি ভারতীয় নগরীর কথা মহাভারতে রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আরও বেশ কিছু জনপদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

• মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে লিখিত রয়েছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর অব্যবহিত পূর্বে কৃষ্ণ হস্তিনাপুরে গমন করেন কার্তিক মাসের সেই তিথিতে, যে দিন চন্দ্র রোহিনী নক্ষত্রে অবস্থান করছিলেন। পথে কৃষ্ণ বৃকস্থল নামে একটি জায়গায় বিশ্রাম নিতে থামেন। চন্দ্র তখন ভরণী নক্ষত্রে বিরাজ করছেন। যেদিন দুর্যোধনের পতন ঘটে, সেদিন চন্দ্র পূষা নক্ষত্রে অবস্থান করছেন। জ্যোতির্বদরা মহাভারতের আনুমানিক কালের সঙ্গে এই সব উল্লিখিত তিথির সাযুজ্য পেয়েছেন।

• পুরাণগুলিতে মৌর্য্য, গুপ্ত এবং ইন্দো-গ্রিক রাজবংশগুলির স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই রাজবংশগুলির ঐতিহাসিকতা মেনে নেওয়া হয় এই কারণেই যে, পুরাণের পাশাপাশি সমকালীন গ্রিক ঐতিহাসিকরা এই সমর্থন করেছেন। গ্রিক আগমনের আগেকার রাজবংশগুলি সেই যুক্তিতে কি 'অনৈতিহাসিক'? এই রাজবংশগুলিই মহাভারতে উল্লিখিত হয়েছে বার বার।

মহাভারত থেকে কিছু দার্শণিক জীবনদর্শন মূলকতথ্য ও ব্যাখা :

পুঁথি ঘেঁটে যা জানা যায়, সে সময়কার জনসংখ্যার আশি শতাংশ পুরুষ মহাভারতের ১৮ দিনের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন।যুদ্ধ শেষে সঞ্জয় কুরুক্ষেত্রের সেই জায়গায় গমন করেন যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল।কুরুক্ষেত্রের জমিতে দাঁড়িয়ে উনি ভাবতে থাকেন, সত্যিই কি সেই জায়গার মাটি যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে,মহাপ্রতাপশালী পান্ডব এবং কৌরবদের রক্তে শুষে নিয়েছে। এই চিন্তা যখন ওনার মস্তিষ্কে বিরাজ করিছে, এক কম্পিত কন্ঠ, বৃদ্ধের কোমল ধ্বনি তাঁর কানে বেজে ওঠে। তিনি শুনতে পান,

"তুমি কখনোই সত্য জানতে পারবে না বৎস..!!"

ঘুরে দাঁড়াতে সঞ্জয় গেরুয়া বস্ত্রধারী এক বৃদ্ধকে ধুলোর স্তম্ভ থেকে উঠে আসতে দেখেন।

-আমি জানি বৎস, তুমি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিষয় জানতে চাও কিন্তু ততক্ষণ তা তোমার বোধগম্য হইবে না, যতক্ষণ না তুমি বাস্তবে যুদ্ধটা কি বস্তু, সেটা বুঝিবে।

মৃদু হেসে বৃদ্ধ বলেন।

-তার মানে..?

মহাভারত একটি দৃষ্টান্ত, একটি মহাকাব্য, হয়ত বাস্তব, হয়ত বা দর্শন।

মৃদু-মন্দ হেসে বৃদ্ধ সঞ্জয়ের দিকে তাকান। তাঁর মনে আরও প্রশ্ন উদ্রেক করাই বোধহয় তাঁর লক্ষ।

-আপনি দয়া করে যদি বলেন ওই দর্শন বস্তুটি কি..??

সঞ্জয় অনুরোধ করেন।

নিশ্চয়, এই বলিয়া বৃদ্ধ আরম্ভ করেন,

-পঞ্চপান্ডব আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয় বই কিছু না। দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্বাদ, স্পর্শ ও ধ্বনি।

আর কৌরবরা কি, তা কি জান তুমি..?? দৃষ্টি সরু করে বৃদ্ধ শুধান।

কৌরব আমাদের একশতদোষ যারা নিত্য, প্রতিমুহূর্ত আমাদের ওই পাঁচ ইন্দ্রিয়কে আক্রমণ করছে। জান কখন..??

সঞ্জয় আবার মাথা নাড়েন।

-শ্রীকৃষ্ণ যখন তোমার রথের সারথি হন, তখন..!!

বৃদ্ধ ঝকঝকে হাসি হাসেন এবং সঞ্জয় এই অন্তর্নিহিত জ্ঞান প্রাপ্তিযোগে অবাক চোখে বৃদ্ধকে দেখেন।

-শ্রীকৃষ্ণ তোমার অন্তর ধ্বনি, তোমার আত্মা, তোমার পথপ্রদর্শনকারি আলোককস্তম্ভ এবং তুমি যদি তাঁর হাতে নিজেকে সমর্পিত করে দাও, তুমি চিন্তামুক্ত থাকবে জীবনে।

সঞ্জয় বোকার মত বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু শীঘ্রই আবার সামলে নিয়ে পরের প্রশ্ন করেন,

-তাহলে দ্রোণাচার্য, ভীষ্মপিতামহ কেন কৌরবের হয়ে লড়াই করলেন, যদি কৌরবরা দোষী হয়..??

ধীরে মাথা সঞ্চালন করে বৃদ্ধ বলেন,

-ইহার মানে, যখন তুমি বড় হও, তোমার ধারণা বয়স্ক মানুষদের প্রতি বদল হতে থাকে। ছেলেবেলায় যে বয়ঃজ্যেষ্টদের মনে হত তারা সঠিক, বড় হয়ে বুঝতে পার, ততটা ঠিক নন তারা। তাদেরও দোষ আছে। এবং একটা দিন আসে যখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাদের সংগ তোমার জন্যে ভাল কি মন্দ। তারপর এটাও হয়ত তুমি উপলব্ধি কর একটা সময়, তাদের সাথে লড়াই করাই তোমার জন্যে মংগলের। বেড়ে ওঠার ইহাই সবচাইতে কঠিন পক্ষ এবং সেইজন্যেই গীতার সারমর্ম জানা দরকার।

বাকরূদ্ধ হইয়া সঞ্জয় মাটির ওপর হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়েন। ইহার কারণ এই নয় যে এই বাণী ক্লান্তিজনিত তাঁর কাছে বরং এই দর্শনের মাত্রাধিকতায় তিনি আবিভূত হইয়া পড়েন।


-তাহলে কর্ণকে কি বলবেন..??


-আহ্, তুমি সর্বোত্তম প্রশ্ন সবার শেষে করেছ। কর্ণ তোমার ইন্দ্রিয়গণের ভ্রাতা। সে বাসনা। সে তোমারই এক অংশ কিন্তু সে সংগ দেয় দোষের। যদিও সে দোষীর সংগ দিয়ে মনে মনে পীড়া অনুভব করে কিন্তু নিজেকে ঠিক সাবস্ত করার জন্যে নানান যুক্তি দেয়, ঠিক যেমন তোমার বাসনা সর্বক্ষণ তোমায় যুক্তি যুগিয়ে চলে। তোমার বাসনা তোমায় মিথ্যে যুক্তি দিয়ে মন ভোলানোর চেষ্টা করেনা কি সর্বদা..??

সঞ্জয় নিঃশব্দে মাথা নাড়ান।

এক দৃষ্টিতে তিনি কুরুভুমির দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে তাঁর লক্ষ-কোটি চিন্তা তোলপাড় করে। প্রতিটি কথা গুছিয়ে তিনি সামঞ্জস্য তৈরি করার চেষ্টা করেন। খানিক বাদে যখন তিনি মাথা তোলেন, বৃদ্ধ তখন সেখান থেকে প্রস্থান করেছেন। ধুলোর স্তম্ভে আবার মিলিয়ে গেছেন।


ধর্ম আর অধর্মের মধ্যে পার্থক্য :

এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই ধর্ম নিয়ে নানা সংশয়ে ভোগে। কোনটা ধর্ম, কোনটা অধর্ম; সেই ধর্ম কোথা থেকে এলো- এই সব নিয়ে আমাদের মধ্য কৌতূহলে শেষ নেই। যদি আপনাকে প্রশ্ন করে হয় যে, আপনার কাছে ধর্মের প্রকৃত সংজ্ঞা কি? তবে আপনার উত্তর কি হবে, সেটা বিবেচনা করে দেখুন। মূলত, আমাদের যা নেই; তাই আমরা ঈশ্বরের কাছে চাই। ভয়, বিপদ, বাধা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঈশ্বরই আমাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে। আর, এটাও ঠিক যে- অভীষ্ট লাভের জন্য দেবতার আশ্রয় নিতে গেলে তার জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার, কিছু ব্রত, নিয়ম, সংযম আর কিছু বস্তু উপহারের মাধ্যমে ঈশ্বরকে তুষ্ট করার চেষ্টাটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্য পড়ে। আমাদের বৈদিক সনাতন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে প্রধানত এই ভাবনা থেকেই। বেদে দেবতা অনেক, মানুষের চাওয়াও অনেক। তাকেই একটা সংযত রূপ দেবার জন্য যাগ-যজ্ঞ, নিয়ম- সংযমের প্রক্রিয়া। অথ্যাৎ, অস্তিত্বের বহু ঊর্ধ্বে উঠে স্রষ্টাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখার প্রচেষ্টা। নিজের চাওয়া পাওয়ার জন্য সেই যে বিশাল নিয়ম-আচার বা কর্মের প্রথা তৈরি হয়েছিল- তা আজও শেষ হয়নি। কিন্তু, মানুষের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিমুহূর্তে সেই আচার অনুষ্ঠান পরিবর্তন হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন ধর্মের, নতুন নতুন মতের।

শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই ধর্ম ব্যাপারটা ভীষণ রকমের পরিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যর জায়গা। সত্যিকার অর্থে ধর্মের তত্ত্ব আমাদের মধ্যে অনেকেই জানে; কিন্তু ধর্মের মর্ম কতজন জানতে পেরেছে? আর সেইজন্যই আমাদের এই ভারতবর্ষে 'ধর্ম' এক শ্রেণীর মানুষকে বানিয়েছে 'অসহায়' এবং আরেক শ্রেণীর মানুষকে বানিয়েছে 'terrorist অথ্যাৎ জঙ্গি'।

প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা উল্টালেই আমাদের চোখে পড়ে ধর্মের নামে গুজব ছড়িয়ে তথাকথিত “ধর্ম রক্ষাকারী”দের নিপীড়ন আর ধ্বংস যজ্ঞ। ধর্মের নামে মুহূর্তেই তারা পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে অন্যের উপাসনালয় ও সাজানো ঘর। বাংলা ভাষায় যাকে বলে “সংখ্যালঘু নির্যাতন”। এগুলো কি আদ্যও কোন ধর্মের নমুনা???

অথচ, আমাদের সনাতন ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছে- “তোমার কাছে যে অন্যায়টা অন্য করলে তোমার খারাপ লাগে, কষ্ট লাগে, সেই অন্যায়টা তুমি অন্য কোন মানুষের ওপর করো না। যে মানুষ নিজে বেঁচে থাকতে চায়, সে যেন কখনোই অন্যের জীবন নষ্ট না করে।” আমাদের ধর্মের সংক্ষিপ্ত উপদেশ এটাই- “তোমার নিজের যেটা ভালো লাগছে না, সেটা তুমি অন্যের উপর প্রয়োগ করো না।”

তাহলে, আজ আমাদের চারিদিকে কোনটি ধর্ম, আর কোনটি অধর্ম- আপনারাই তার সঠিক মূল্যায়ন করে দেখুন|

গীতার 62তম শ্লোক


শ্লোক: 62:

ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে ।

সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে ॥৬২॥

ধ্যায়তঃ, বিষয়ান্, পুংসঃ, সঙ্গঃ, তেষূ, উপজায়তে,সঙ্গাৎ, সঞ্জায়তে, কামঃ, কামাৎ, ক্রোধঃ, অভিজায়তে ॥৬২॥   


অনুবাদ : ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয় । ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত হয়।

কৃষদৈপায়ন বেদব্যাস মুনি :-

মহামুনি বশিষ্ঠের পুত্র শক্তি। শক্তি যখন কল্মাষপাদের হাতে মৃত্যু বরণ করলেন, তখন তাঁর একমাত্র পুত্র পরাশর মাতৃগর্ভে। জন্মের পর থেকে মাতা অদৃশ্যন্তী এবং পিতামহ ঋষি বশিষ্ঠ দেবের রক্ষণাবেক্ষেণে পরাশর ক্রমে মহাপন্ডিত হয়ে উঠলেন। একদিন পরাশর মুনি নদীপার হবেন - খেয়া নৌকা চালাচ্ছে মৎস্যগন্ধা নামে এক ধীবর-পালিত কন্যা (ধীবর একজন জেলেদের রাজা, একদিন ধীবর নদীতে মাছ ধরতে যাই আর যে মাছগুলো ধরেছিলেন তার একটি মাছের ভেতরে এক কন্যা শিশু পায় তখন ধীবর সেই মেয়েটির নাম রাখে মৎস্যগন্ধা)। তখন পরাশর মুনি বলেন মাতা আমি যমুনার ওপারে যাব, আমাকে কি পার করে দিবেন? মৎস্যগন্ধা বলেন হে মুনিবর আসুন। পরাশর নৌকায় উঠে বসলেন। কিছুটা দূর যাওয়ার পর পরাশর মুনি বললেন মাতা আপনার নৌকায় মাছের গন্ধ আসছে কেন? তখন মৎস্যগন্ধা বললেন মুনিবর মাছের গন্ধ আমার শরীর থেকে আসছে। পরাশর জিজ্ঞাসা করলো, কিভাবে? মৎস্যগন্ধা বললেন , আমার জন্ম হয়েছিল মাছের ভেতরে আর জন্ম লগ্ন থেকে আমার শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসছে। পরাশর মুনি বললেন মাতা আপনি নদী পারে আমাকে সহায়তা করেছেন, আপনি যদি চান আপনার এই উপকারের ফলস্বরূপ আমি আপনার জন্ম লগ্ন থেকে অর্জিত করা এই মাছের গন্ধ আমার যোগ তপস্যা শক্তি তেজর্ভূষী (তেজর্ভূষী বলতে ধোঁয়া সংস্কৃত ভাষায় ধোঁয়াকে র্ভূষী বলে) দ্বারা দূর করতে পারি। মৎস্যগন্ধা তখন বললেন, আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ হবো। পরাশর মুনি বললেন, কিন্তু আপনি আমার তেজর্ভূষী ধারন করতে অক্ষম হইবেন যার ন্যায় আপনার কোলে এক পুত্র সন্তানের আবির্ভাব হবে। তখন মৎস্যগন্ধা বলেন, হে মহর্ষি আমি একজন কুমারী মেয়ে। পরাশর মুনি বললেন, এতে আপনার কুমারীত্বের কোনও ক্ষতি হবে না। মৎস্যগন্ধা তখন আর চিন্তা না করে বললো ঠিক আছে মহর্ষি। অতঃপর পরাশর মুনি বললেন,  মাতা সামনে একটি দ্বীপ দেখা যাচ্ছে ঐখানে নৌকা স্থির করুন, অতঃপর মৎস্যগন্ধা যমুনার মধ্যেবর্তী সেই তীরে নৌকা স্থির করলেন। নৌকার একপারে মৎস্য গন্ধা অন্য পারে পরাশর অবস্থিত ছিলেন। তৎক্ষণাৎ মহর্ষি পরাশর নৌকার ওপার থেকে তপস্যা শক্তি দ্বারা তেজর্ভূষী উৎপক্তি করলেন এবং পরাশরের কল্যাণে ঐ কন্যার গায়ের মৎস্যগন্ধ দূর হলো-তখন তাঁর নাম হলো পদ্মগন্ধা। কিন্তু পদ্মগন্ধার কোলে এক পুত্রের আবির্ভাব হয়, তখন পরাশর ঐ পুত্রের নামে রাখে কৃষ্ণ। যমুনার মধ্যেবর্তী এক দ্বীপে জন্ম গ্রহন করেছেন ব'লে তাঁর অপর পরিচয় হলো 'দ্বৈপায়ণ'। মৎস্যগন্ধা ঐ পুত্রসন্তানকে নিয়ে ধীবর রাজ গৃহে চলে যায়। পদ্মগন্ধার কোলে নবজাতক দেখে ধীবর প্রশ্ন করলেন পুত্রী তোমার কোলে এই শিশু কোথায় থেকে এলো? পদ্মগন্ধা তখন বিস্তারিত খুলে বলে, কিন্তু ধীবর রাজ বলেন পুত্রী তুমি কুমারী এই শিশু তোমার কাছে থাকলে তোমার বিবাহ অসম্ভব। তখন পদ্মগন্ধা বলল পিতা আমি আর কি করতে পারতাম? ধীবর রাজ বললো, চলো পুত্রী যার শক্তিতে এই শিশু আবির্ভূত সেই কোনও সমাধান দিবে। অতঃপর ধীবর রাজ ও পদ্মগন্ধা পরাশর মুনির আশ্রমের উদ্দেশ্য প্রস্থান করলেন। আশ্রমে গিয়ে ধীবর রাজ মহর্ষি পরাশর কে বোঝালেন ও পদ্মগন্ধা বললেন, মহর্ষি আমার এই পুত্র সন্তান কে আপনার রক্ষণাবক্ষেণে রাখুন তাকে আপনার মতো একজন মহর্ষি মহাপন্ডিত হিসেবে গড়ে তুলুন। হে মহর্ষি আমি নিরুপায় আমার এই সন্তান আমার কাছে থাকলে আমার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তখন মহর্ষি পরাশর বলে দাও মাতা, ঐ পুত্র হস্তান্তর করার পর পদ্মগন্ধার নাম হয় সত্যবতী (পরবত্তী কালে হস্তিনারাজ শান্তনু এই সত্যবতীকেই বিয়ে করেছিলেন)

(ব্যাসদেবের জীবন বৃত্তান্ত পর্ব) :-

দ্বৈপায়ণ ক্রমে ক্রমে বড় হয়ে উঠেছে কিন্তু তাঁর খেলার মতি বেশি। এ নিয়ে মহর্ষি পরাশর খুব চিন্তিত দ্বৈপায়ণকে কিভাবে পাঠ্যসূচি মনোযোগী করা যায়, এমন কি মহর্ষি বহুবার বোঝাই কিন্তু দ্বৈপায়ণ কিছুতেই বুঝতে রাজি নই। লেখাপড়ায় দ্বৈপায়ণ সম্পূর্ণ অমনোযোগী। দ্বৈপায়ণ যখন আটবছর বয়সী তখন একদিন মহর্ষি পরাশরের পাঠশালায় সব ছাত্ররা যখন জ্ঞান পাঠে মগ্ন তখন মহর্ষি পরাশর দেখলেন দ্বৈপায়ণ ক্রিয়াকর্মে মগ্ন,অতঃপর মহর্ষি দ্বৈপায়ণকে পাঠশালা থেকে তাড়িয়ে দিলেন। মন খারাপ করে দ্বৈপায়ণ আশ্রমের পুকুর ঘাটে গিয়ে বসেন। ঠিক সেই সময় ঐখানে আশ্রমের নারীরা পুকুর থেকে জল মাটির কলসী ভর্তি করে একটা স্থানে শান্ বাধানো(অর্থাৎ পাথরের পাকা ঘাট) ঘাটে রাখে সেখান থেকে আরেক নারী কলসী তুলে নিয়ে যায়। এভাবে (দীর্ঘদিন) দীর্ঘক্ষণ চলতে থাকে। যখন নারীরা পুকুর থেকে চলে যাই তখন প্রায় বেলা শেষ, দ্বৈপায়ণ তখন হাতমুখ দৌত করার জন্য ঘাটে নামে। হঠাৎ দ্বৈপায়ণের দৃষ্টি পরে পুকুর ঘাটের উপর, তিনি দেখলেন শান্ বাধানো ঘাটের ক্ষয় হয়েছে। তখন তিনি ঐ ঘাট স্পর্শ করে দেখলেন, আর গভীর ভাবে চিন্তা করলেন সামান্য মাটির পাত্রের র্ঘষণে যদি শান্ বাধানো ঘাটের ক্ষয় হতে পারে, তাহলে পুনঃ চেষ্টায় আমার জড় বুদ্ধি দূর করে পাঠশালায় অন্য সব শিক্ষাথীর্দের মতো জ্ঞানী হতে পারবো না কেন। দ্বৈপায়ণ তৎক্ষণাৎ  আশ্রমে ফিরে গিয়ে জ্ঞান পাঠে যোগ দেয়। মহর্ষি পরাশর দেখে দ্বৈপায়ণ ফিরে এসে জ্ঞান পাঠে যোগ দিয়েছে। সেদিন থেকে শুরু হয় পাঠ্যক্রম আর ক্রমেশে দ্বৈপায়ণ পাঠশালায় সর্ব শ্রেষ্ঠ শিক্ষাথীর্র গৌরব অর্জন করে। পূর্ণ জ্ঞান অর্জন সমাপন করার পরে দ্বৈপায়ণকে মহর্ষি পরাশর ব্যাস উপাধি প্রদান করে। সেদিন থেকে তাঁর নাম হয় 'কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ ব্যাসদেব'। কিছুদিন পর ব্যাসদেব যোগ তপস্যায় লিপ্ত হয় এবং কঠোর তপস্যা করে। তপস্যায় ব্যাসদেব পূর্ণ রুপে আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করে এবং নিজেকে ত্বত্ত জ্ঞানে জ্ঞানান্নীত করে মহাজ্ঞানী স্বীকৃতি অর্জন করে।

ব্যাসদেব তপস্যা পূর্ণ করে ফেরার প্রায় পনেরো বছর পর, একদিন ব্যাসদেব একটি যজ্ঞানুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করেন। তিনি দেখলেন অত্র যজ্ঞানুষ্ঠানে সকল ভক্তরা অজ্ঞের মতো বসে আছে আর ঋষিরা যজ্ঞানুষ্ঠান পরিচালনা করছেন। ব্যাসদেব নিজের ভেতরে এইটা অনুভব করলেন যে, সনাতন সমাজের ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,শুদ্র,বৈশ্য সবাই ধর্ম পালনে তৎপর হইলেও প্রকৃত ধর্মের জ্ঞান সম্পর্কে অনবিজ্ঞ তার একমাত্র কারণ হচ্ছে ধর্মের নিয়ম, শৃঙ্খলা, অনুশাসন ও জ্ঞানবাণী ঋষিদের মুখাশ্রীত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তখন তিনি চিন্তা করলেন যদি এই জ্ঞানবাণী ঋষি সমাজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে সনাতনী সমাজ বিলুপ্তির পথে দাঁড়াবে। ধর্ম নামক শক্তির কোন অস্তিত্ব থাকবে না, মানুষ অমানুষের আঁকার ধারণ করবে ও সৃষ্টির সেরা এই মানবজাতি হিংস্র দানবের ন্যায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। কেননা ধর্মের নিয়ম শৃঙ্খলা ও আদেশ উপদেশ ব্যতীত পৃথিবীর কোনও জাতি সুশৃঙ্খল, আত্মত্যাগী, ন্যায়পরায়ন ও সমাজবাদী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারবে না। তখন তিনি মনস্থির করলেন ঋষি সমাজের মুখাশ্রীত ধর্মের এই জ্ঞানবাণী সনাতনী মানব সমাজ পর্যন্ত ধর্মের সংবাদ তথা আদেশ উপদেশ সরুপ পৌঁছাতে হবে। এরপর তিনি আশ্রমে ফিরে এলেন। সেইদিনের পর থেকে ব্যাসদেব সবসময় সর্বক্ষণ বিচলিত থাকতেন, তিনি শুধু এই চিন্তামগ্নের সমাধান খুঁজতেন। একদিন তিনি ভাবলেন ঋষিদের মুখাশ্রীত এই বাণীই হচ্ছে ধর্মের জ্ঞান কৌশল তথা নিয়মশাসন ও ধর্মের অনুপ্রেরণা। যদি এই অনুপ্রেরণা গ্রন্থ আকারে লিপিবদ্ধ করে মানব সমাজের জন্য উপস্থাপন করা যায়, তাহলে সনাতন ও সনাতনী সমাজ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। ব্যাসদেবের আশ্রমে ধর্মের গ্রন্থ লেখার কাজ শুরু করার চিন্তা করলো কিন্তু তিনি ভাবলেন শুধু মুখাশ্রীত বাণী লিপিবদ্ধ করলে কিভাবে হবে, তাহলে মানবজাতি ব্রহ্মাণ্ডের ত্রিদেব তথা মহাশক্তির পরিচিতি তাদের কার্যকলাপ ও তাদের সৃষ্টির সৃজনশীলতার গুণাগুণ উপলব্ধি করবে কিভাবে। ব্যাসদেব তখন আরো চিন্তামগ্ন হয়ে গেলেন, তিনি ভাবলেন যদি ঋষির মুখাশ্রীত বাণী ও মহাশক্তিদের গুণাবলি লিপিবদ্ধ করতে যায় তাহলে তো একার পক্ষে সম্ভব নয়। তার সমাধান খুঁজতে তিনি ব্রহ্মলোকের উদ্দেশ্য গমন করলেন। ব্রহ্মলোক গিয়ে তিনি ব্রহ্মদেবকে বললেন, হে সৃষ্টি গুরু আমি সৃষ্টির ইতিহাস তথা মহাশক্তির পরিচিতি গুণাগুণ ও কার্যকলাপ এবং ধর্মের নিয়ম শৃঙ্খলা ও অনুশাসন, অনুশীলন এবং অনুপ্রেরণা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করতে চাই এতে আপনার সুনির্দিষ্ট সাহায্য চাই। ব্রহ্মদেব বললেন অসাধারণ চিন্তা তোমার ঋষি ব্যাস, কিন্তু আমার খুবই দুর্ভাগ্য তোমার এই মহান কার্যে কোনরুপ সহায়তা করতে পারছি না। ব্যাসদেব বললেন হে পিতা, আমি কিভাবে আমার কার্য সিদ্ধি করব? ব্রহ্মদেব বললো ঋষি ব্যাস তুমি বৈকুণ্ঠপতির কাছে যাও তিনিই তোমাকে পথ দেখাবেন। ব্যাসদেব তখন বৈকুণ্ঠের উদ্দেশ্য গমন করলেন। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুদেবের কাছে গিয়ে সেই বাক্য বললেন। বিষ্ণুদেব বললেন ঋষি ব্যাস, আপনি এক মহান কার্য সম্পাদনা করতে যাচ্ছেন যার ন্যায় সৃষ্টি তথা সৃষ্টির মানব আপনাকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করবে। অতঃপর বিষ্ণুদেব বললেন আপনার কার্যসিদ্ধির সমাধান আছে তবে সেটা আমার কাছে নয়। ব্যাসদেব প্রশ্ন করলো তাহলে প্রভু ব্রহ্মদেবের কাছে নেই আপনার কাছে নেই কার কাছে আছে? তখন বিষ্ণুদেব বললেন, কৈলাসপতি আদিদেব মহাদেবের কাছে। আপনি অতিশয় কৈলাস গমন করুন, অন্যতা মহাদেব দক্ষিণ কৈলাসে (দক্ষিন কৈলাস বলতে প্রেত কূল তপস্যা) প্রস্থান করবেন। ব্যাসদেব বিলম্ব না করে কৈলাস গমন করলেন। কৈলাসে গিয়ে ব্যাসদেব মাতা পার্বতী ও মহাদেবের সামনে উপস্থিত হইলেন, তিনি কিছু বলার আগেই মহাদেব বললেন, ঋষি ব্যাস অসাধারণ আপনার চিন্তা ভাবনা যা আজ পর্যন্ত কেউ অনুভব করেনি তা আপনি আঁকার দিতে যাচ্ছেন। ঋষি ব্যাস বললেন হে পরম পুজনীয় প্রভু আপনি অন্তর্লীন, আমার কার্যসিদ্ধির পথ সন্ধান হেতু আপনার শরণাপন্ন হওয়া, আমাকে পথ দেখান প্রভু। মহাদেব বললেন হে ঋষি ব্যাস অবশ্যই, মহাদেব তখন গণেশকে ডাকলেন আর বললেন পুত্র যাও ঋষি ব্যাসের সাথে। গণেশ বললো পিতা ঋষি ব্যাসের সাথে কোথায় যাব? তখন মহাদেব বললেন, ঋষি ব্যাস ধর্ম স্থাপত্যের জন্য কিছু গ্রন্থ রচনা করবেন আর তুমি তা লিপিবদ্ধ করবে। গণেশ বললো এই কাজের জন্য আমাকে কেন প্রয়োজন, এই কাজ উনি নিজেই করতে পারে? মহাদেব বললেন, পুত্র এ এক নতুন ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে যা ঋষি ব্যাসের পক্ষে একা রচনা করা ও লিপিবদ্ধ করা সম্ভবপর নয়, আর পুত্র এই কার্যে নিজেকে জড়িত করা সৌভাগ্যবান মনে কর কেননা যখনই এই শাস্ত্র গ্রন্থের নাম উল্লেখ হবে তখুনি তোমার নাম মানবজাতি শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করবে। ঋষি ব্যাসের সাথে তুমিও অক্ষয় হয়ে থাকবে। তখন গণেশ বললো চলুন ঋষিবর। ঋষি ব্যাস তখন গণেশকে নিয়ে তার আশ্রমে ফিরে আসিলেন। ঋষি ব্যাস গণেশকে নিয়ে অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে বসলেন। ঋষি ব্যাস প্রথমে ঋষিদের মুখাশ্রীত বাণী রচিত করবেন চিন্তা করলো, তখনই গণেশ বললো, ঋষিবর আমি লেখা শুরু করলে আর বন্ধ করতে পারবো না, যদি বন্ধ হয় তাহলে আর লিখিতে পারবো না। ঋষি ব্যাস তখন চিন্তায় পরে গেলেন, তিনি ভাবলেন পার্বতী নন্দন লেখা বন্ধ করলে আমার গ্রন্থ রচনা হবে কি করে আবার গণেশকে যদি স্থগিত করতে না পারি তাহলে রচনা চিন্তা করবো কিভাবে। এদিকে গণেশ বলছে শুরু করুন ঋষিবর। কিছুক্ষণ চিন্তা করে ঋষি ব্যাস মনস্থির করলেন আমি শ্লোক আকারে কিছু রচনা করবো তখন কি রচিত করলাম তা জানার জন্য গণেশের মনে আগ্রহ জাগবে। তখন রচিত শ্লোকের অর্থ বুঝতে বুঝতে আমি আরেকটি রচনা করতে পারবো। তখন ঋষি ব্যাস বললেন হে সিদ্ধিবিনায়ক শুরু করুন তবে, প্রথমে ঋষি ব্যাস একটি শ্লোক রচিত করলো অতঃপর গণেশ বললো, একটু অপেক্ষা করুন ঋষিবর। ঋষি ব্যাস বললো হে গণপতি? গণেশ বললো আপনি কি রচনা করলেন? ঋষি ব্যাস বললো, আপনি সিদ্ধিনাথ দেবকূলের পরম জ্ঞানী আমি যা রচিত করছি তা আপনার না জানার কথা নয়। আমি তো মনে করেছিলাম আমার কোন ভুল রচনা আপনি ধরবেন কিন্তু আমি কি রচনা করেছি তা আপনি জানতে চাইছেন এইটা আমার জন্য কোন পরীক্ষা নয়তো? তখন গণেশ বললো, ঠিক আছে আপনি যা রচনা করবেন তা আমি বোঝে উঠা পর্যন্ত আরেকটি বলবেন না। মনে মনে ঋষি ব্যাস বললো এটাই তো আমি চেয়েছিলাম। গণেশ বললো আপনি কি চিন্তা করছেন? ঋষি ব্যাস বললো, না কিছু না, ঠিক আছে গণপতি আপনার যা ইচ্ছা। এভাবে ঋষি ব্যাস একটি শ্লোক রচিত করে আর গণেশ তা পূণাঙ্গ রুপে বুঝে উঠবার আগে আরেকটি শ্লোক রচিত করে। ক্রমাগত এভাবে ঋষি ব্যাস প্রথমে চারটি বেদ পরে আটারোটি পুরাণ রচিত করে এবং গণেশ নিজের অজান্তে চারটি বেদ ও আটারোটি পুরাণ লিপিবদ্ধ করে। এই গ্রন্থ রচনার পরে তাঁর নাম হয় কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বেদব্যাস।

(যদি গণেশ ছলনা না করত তাহলে আজ আমরা গদ্য আকারে আমাদের সনাতনী শাস্ত্র গ্রন্থ ও পুরাণ পেতাম, আর গদ্য আকারে হলে আজ শাস্ত্র গ্রন্থ কেউ বিকৃতি করার সুযোগ পেতো না। হয়তো এখানে পরমেশ্বরের কোন লীলা ছিল বা আছে।)কিন্তু অত্র জীবনকথা মহাভারতের মধ্যে শুধু ঋষি ব্যাসের জন্ম বৃত্তান্ত টি আছে বাকি সবগুলো নয়।


গীতার সারাংশ


পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মোক্ষদা একাদশী তিথিতে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন । তাই এই মহিমামণ্ডিত তিথিকে গীতা জয়ন্তী তিথি বলা হয়।

গীতাধ্যায়সম্পাদনা

গীতা ৭০০ টি শ্লোক নিয়ে ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত।

১ অর্জুন বিষাদ-যোগ:


কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে সেনা-পর্যবেক্ষণ:রণাঙ্গনে প্রতীক্ষমাণ সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে, মহাযোদ্ধা অর্জুন উভয় পক্ষের সৈন্যসজ্জার মধ্যে সমবেত তার অতি নিকট আত্মীয়-পরিজন, আচার্যবর্গ ও বন্ধু-বান্ধবদের সকলকে যুদ্ধে প্রস্তুত হতে এবং জীবন বিসর্জনে উন্মুখ হয়ে থাকতে দেখেন। শোকে ও দুঃখে তার মন মোহাচ্ছন্ন হল এবং তিনি যুদ্ধ করার সংকল্প পরিত্যাগ করেন।

২ সাংখ্য যোগ

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তার শিষ্যরূপে অর্জুন আত্মসমর্পণ করেন এবং অনিত্য জড় দেহ ও শাশ্বত চিন্ময় আত্মার মূলগত পার্থক্য নির্ণয়ের মাধ্যমে অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ প্রদান করতে শুরু করেন। দেহান্তর প্রক্রিয়া, পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থ সেবার প্রকৃতি এবং আত্মজ্ঞানলব্ধ মানুষের বৈশিষ্ট্যাদি সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

৩ কর্ম যোগ

এই জড় জগতে প্রত্যেককেই কোনও ধরনের কাজে নিযুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু কর্ম সকল মানুষকে এই জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করতেও পারে, আবার তা থেকে মুক্ত করে দিতেও পারে। স্বার্থচিন্তা ব্যতিরেকে, পরমেশ্বরের সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্যে কাজের মাধ্যমে, মানুষ তার কাজের প্রতিক্রিয়া জনিত কর্মফলের বিধিনিয়ম থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আত্মতত্ত্ব ও পরমতত্ত্ব দিব্যজ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়।

৪ জ্ঞান যোগ

আত্মার চিন্ময় তত্ত্ব, ভগবৎ-তত্ত্ব এবং ভগবান ও আত্মার সম্পর্ক -এই সব অপ্রাকৃত তত্ত্বজ্ঞান বিশুদ্ধ ও মুক্তিপ্রদায়ী। এই প্রকার জ্ঞান হচ্ছে নিঃস্বার্থ ভক্তিমূলক কর্মের (কর্মযোগ) ফলস্বরূপ। পরমেশ্বর ভগবান গীতার সুদীর্ঘ ইতিহাস, জড় জগতে যুগে যুগে তার অবতরণের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য এবং আত্মজ্ঞানলব্ধ গুরুর সান্নিধ্য লাভের আবশ্যকতা ব্যাখ্যা করেছেন।

৫ সন্ন্যাস-যোগ


বহিঃবিচারে সকল কর্তব্যকর্ম সাধন করলেও সেগুলির কর্মফল পরিত্যাগ করার মাধ্যমে, জ্ঞানবান ব্যক্তি পারমার্থিক জ্ঞানতত্ত্বের অগ্নিস্পর্শে পরিশুদ্ধি লাভ করে থাকেন, ফলে শান্তি, নিরাসক্তি, , চিন্ময় অন্তর্দৃষ্টি এবং শুদ্ধ আনন্দ লাভ করেন।

৬ ধ্যানযোগ

নিয়মতান্ত্রিক ধ্যানচর্চার মাধ্যমে অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলন মন ও ইন্দ্রিয় আদি দমন করে এবং অন্তর্যামী পরমাত্মার চিন্তায় মনকে নিবিষ্ট রাখে।এই অনুশীলনের পরিণামে পরমেশ্বরের পূর্ণ ভাবনারূপ সমাধি অর্জিত হয়।



৭ জ্ঞান-বিজ্ঞানযোগ

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমতত্ত্ব, সর্বকারণের পরম কারণ এবং জড় ও চিন্ময় সর্ববিষয়ের প্রাণশক্তি। উন্নত জীবাত্মাগণ ভক্তি ভরে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে থাকেন, পক্ষান্তরে অধার্মিক জীবাত্মারা অন্যান্য বিষয়ের ভজনায় তাদের মন বিক্ষিপ্ত করে থাকে।

৮ অক্ষরব্রহ্মযোগ

আজীবন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্তার মাধ্যমে এবং বিশেষ করে মৃত্যুকালে তাকে স্মরণ করে, মানুষ জড় জগতের ঊর্ধ্বে ভগবানের পরম ধাম লাভ করতে পারে।

৯ রাজবিদ্যা-রাজগুহ্য যোগ

শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং পরমারাধ্য বিষয়। অপ্রাকৃত ভগবত-সেবার মাধ্যমে জীবাত্মা মাত্রই তার সাথে নিত্য সম্বন্ধযুক্ত। মানুষের শুদ্ধ ভক্তি পুনরুজ্জীবিত করার ফলে শ্রীকৃষ্ণের পরম ধামে প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব।

১০ বিভূতি যোগ

জড় জগতের বা চিন্ময় জগতের শৌর্য, শ্রী, আড়ম্বর, উতকরশ-সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শক্তি ও পরম ঐশ্বর্যাবলীর আংশিক প্রকাশ মাত্র অভিব্যক্ত হয়ে আছে। সর্বকারণের পরম কারণ, সর্ববিষয়ের আশ্রয় ও সারাতিসার রূপে শ্রীকৃষ্ণ সর্বজীবেরই পরমারাধ্য বিষয়।

১১ বিশ্বরূপ দর্শন যোগ

পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দান করেন এবং সর্বসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষক তার অনন্ত বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন। এভাবেই তিনি তার দিব্যতত্ত্ব অবিসংবাদিতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। শ্রীকৃষ্ণ প্রতিপন্ন করেছেন যে, তার স্বীয় অপরূপ সৌন্দর্যময় মানবরূপী আকৃতিই ভগবানের আদিরূপ। একমাত্র শুদ্ধ ভগবত-সেবার মাধ্যমেই মানুষ এই রূপের উপলব্ধি অর্জনে সক্ষম।

১২ ভক্তিযোগ

চিম্নয় জগতের সর্বোত্তম প্রাপ্তি বিশুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম লাভের পক্ষে ভক্তিযোগ বা শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য শুদ্ধ ভক্তি হচ্ছে সর্বোত্তম পন্থা। যারা এই পরম পন্থার বিকাশ সাধনে নিয়োজিত থাকেন, তারা দিব্য গুণাবলীর অধিকারী হন।

১৩ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগ যোগ


দেহ, আত্মা এবং উভয়েরও ঊর্ধ্বে পরমাত্মার পার্থক্য যিনি উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই এই জড় জগৎ থেকে মুক্তি লাভে সক্ষম হন।

১৪ গুণত্রয়-বিভাগ-যোগ


সমস্ত দেহধারী জীবাত্মা মাত্রই সত্ত্ব, রজ ও তম—জড়া প্রকৃতির এই ত্রিগুণের নিয়ন্ত্রণাধীন। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এই ত্রিগুনাবলীর স্বরূপ, আমাদের ওপর সেগুলির ক্রিয়াকলাপ, মানুষ কিভাবে সেগুলিকে অতিক্রম করে এবং যে মানুষ অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত তার লক্ষণাবলী ব্যাখ্যা করেছেন।

১৫ পুরুষোত্তম-যোগ

বৈদিক জ্ঞানের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে জড়-জাগতিক বন্ধন থেকে মানুষের মুক্তি লাভ এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবানরূপে শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করা। যে মানুষ শ্রীকৃষ্ণের পরম স্বরূপ উপলব্ধি করে, সে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ভক্তিমূলক সেবায় আত্মনিয়োগ করে।

১৬ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ

যারা আসুরিক গুণগুলি অর্জন করে এবং শাস্ত্রবিধি অনুসরণ না করে যথেচ্ছভাবে জীবন যাপন করে থাকে, তারা হীনজন্ম ও ক্রমশ জাগতিক বন্ধনদশা লাভ করে। কিন্তু যারা দিব্য গুণাবলীর অধিকারী এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন আদি মেনে বিধিবদ্ধ জীবন যাপন করেন, তারা ক্রমান্বয়ে পারমার্থিক সিদ্ধিলাভ করেন।

১৭ শ্রদ্ধাত্রয়-বিভাগ-যোগ

জড় প্রকৃতির ত্রিগুণাবলীর থেকে উদ্ভূত এবং সেগুলির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শ্রদ্ধা তিন ধরনের হয়ে থাকে। যাদের শ্রদ্ধা রাজসিক ও তামসিক, তারা নিতান্তই অনিত্য জড়-জাগতিক ফল উৎপন্ন করে। পক্ষান্তরে, শাস্ত্রীয় অনুশাসন আদি মতে অনুষ্ঠিত সত্ত্বগুণময় কার্যাবলী হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং পরিণামে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি-শ্রদ্ধার পথে মানুষকে পরিচালিত করে ভক্তিভাব জাগ্রত করে তোলে।

১৮ মোক্ষযোগ

শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেছেন ত্যাগের অর্থ এবং মানুষের ভাবনা ও কার্যকলাপের উপর প্রকৃতির গুণাবলীর প্রতিক্রিয়াগুলি কেমন হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন ব্রহ্ম উপলব্ধি, ভগবদগীতার মাহাত্ম্য ও গীতার চরম উপসংহার|ধর্মের সর্বোচ্চ পন্থা হচ্ছে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, যার ফলে সর্বপাপ হতে মুক্তি লাভ হয়, সম্যক জ্ঞান-উপলব্ধি অর্জিত হয় এবং শাশ্বত চিন্ময় পরম ধামে প্রত্যাবর্তন করা যায়।

গীতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :-
১। গীতা হচ্ছে সমস্ত শাস্ত্রের সারতিসার।
২। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের (২৫ থেকে ৪২) এই ১৮ টি অধ্যায় হল ভগবদগীতা বা গীতোপনিষদ ।
৩। গীতায় রয়েছে ৭০০ শ্লোক। তার মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র বলেন ১টি শ্লোক, সঞ্জয় বলেন ৪০টি শ্লোক, অর্জুন বলেন ৮৫টি শ্লোক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন ৫৭৪টি শ্লোক ।
৪। গীতার ১৮টি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম ৬টি অধ্যায়কে বলে কর্মষটক, মাঝখানের ৬টি অধ্যায়কে বলে ভক্তিষটক, আর বাকি ৬টি অধ্যায়কে বলে জ্ঞানষটক ।
৫।গীতার পাচটি বিষয় – ভগবান, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম ।
৬। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদিও অর্জুনকে ভগবদগীতা বলেছিলেন ৫০০০ বছর আগে তবুও চতুর্থ অধ্যায়ে ভগবান বলেন, আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেছিলাম। সূর্যদেব তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষাকুকে বলেছিলেন। যদি ধরে নেয়া হয় যে মনুর জন্মের পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য বিবস্বানকে ভগবদগীতার জ্ঞান দান করেছিলেন, তা হলে গীতা বলা হয়েছিল অন্ততঃপক্ষে ১২ কোটি বছর পূর্বে, আর মানব সমাজে এই জ্ঞান বিলুপ্ত হয়েছিল বিগত প্রায় ২০ লক্ষ বছর; এর পর প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে অর্জুনকে এই গীতার জ্ঞান পুনরায় প্রদত্ত হয়। গীতার বক্ততা স্বয়ং ভগবানের বর্ণনা অনুযায়ী এই হচ্ছে ভগবদ্গীতার ইতিহাস ।
৭। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মাত্র ৪০ মিনিটে এই গীতার জ্ঞান দেন ।
৮। পুরো গীতার সারমর্ম মাত্র ৪টি শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে, ১০ম অধ্যায়ের ৮ থেকে ১১ নং শ্লোক-এ।

Sources :

P. Lal. "Kisari Mohan Ganguli and Pratap Chandra Roy". An Annotated Mahabharata Bibliography. Calcutta: Writers Workshop.

Topiwala, Chandrakant (1990). "Bahuk". Gujarati Sahityakosh (Encyclopedia of Gujarati Literature) (in Gujarati). 2. Ahmedabad: Gujarati Sahitya Parishad. p. 394.

In discussing the dating question, historian A. L. Basham says: "According to the most popular later tradition the Mahabharata War took place in 3102 BCE, which in the light of all evidence, is quite impossible. More reasonable is another tradition, placing it in the 15th century BCE, but this is also several centuries too early in the light of our archaeological knowledge. Probably the war took place around the beginning of the 9th century BCE; such a date seems to fit well with the scanty archaeological remains of the period, and there is some evidence in the Brahmana literature itself to show that it cannot have been much earlier." Basham, p. 40, citing HC Raychaudhuri, Political History of Ancient India, pp.27ff.

M Witzel, Early Sanskritization: Origin and Development of the Kuru state, EJVS vol.1 no.4 (1995); also in B. Kölver (ed.), Recht, Staat und Verwaltung im klassischen Indien. The state, the Law, and Administration in Classical India, München, R. Oldenbourg, 1997, p.27-52
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.