![]() |
| সমাপ্তি চৌধুরী |
চা পাতা
সমাপ্তি চৌধুরী
চা-এর অন্দরমহল
রাতভোর টিপ টাপ বৃষ্টি, আলসেমিভরা সকালে যাবতীয় ক্লান্তি দূর করে দেয় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা। বাংলোর বারান্দায় বসে বসে, বর্ষারানির অপরূপ সৌন্দর্য গায়ে মাখতে মাখতে সাঁঝবাতি ভাবছিল পুরনো দিনের কথা। কীভাবে বীরভূমের লালমাটি ছেড়ে, শাল পিয়ালের গন্ধ ছেড়ে, ছায়া সুনীবিড় শান্তিনিকেতন, কোপাই, প্রান্তিক ছেড়ে, রেলগাড়ি চড়ে এই উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির কোলে পা রেখেছিল। দেখতে দেখতে প্রায় বছর দশেক হয়ে গেছে। এই পাহাড়, জঙ্গল, নদ-নদী পরিবেষ্টিত উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক শোভা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক পরিবেশ এমনিতেই মনোমুগ্ধকর, তায় আবার চা বাগান----- স্বামীর ( স্বপ্ননীল) কর্মসূত্রে সাঁঝবাতির বর্তমান ঠিকানা চা বাগানের বাংলো। সাঁঝবাতির সকালটা শুরু হয় নীলের ( স্বামীকে সে 'নীল ' বলে ডাকে) বাগানে উৎপন্ন এবং বনোয়ারীলালের হাতে তৈরি এক কাপ গরম চা দিয়ে।
সাঁঝবাতির মতো আমাদের দেশের বেশিরভাগ বাড়ির সকালটাই শুরু হয় 'চা' দিয়ে। জলের পরেই চা বিশ্বের সর্বাধিক উপভোগ্য পানীয়। এর একধরনের স্নিগ্ধ, প্রশান্তিদায়ক স্বাদ রয়েছে এবং অনেকেই এটি উপভোগ করে। চা পান করতে করতেই সাঁঝবাতির মনে জেগে ওঠে হাজারো প্রশ্ন। কিছু সাধারণ তথ্য সবার মতো, সাঁঝবাতি -ও জানে। যেমন-- চা গাছ থেকে চা পাতা পাওয়া যায়। চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সিনেনসিস।চা-এর উৎপত্তিস্হল হলো চীন। ইংরেজিতে চা-এর প্রতিশব্দ হল টি (tea) । গ্রীকদেবী থিয়ার নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। চীনে 'টি'-এর উচ্চারণ ছিল 'চি'।পরে হয়ে যায় চা।
চা বাগানে থাকার সুবাদে চা সম্পর্কে সাঁঝবাতির আগ্রহ বেড়েছে। নীলের সঙ্গে গল্প সূত্রে বিভিন্ন সময় সে বিভিন্ন জিনিস জেনেছে। সাইরেনের আওয়াজ আর পাখিদের কলতানে শুরু হয় চা বাগানের সকাল। সাইরেনের আওয়াজের সাথে সাথে শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে নিজের নিজের কাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে। লনে পায়চারি করতে করতে সাঁঝবাতির চোখ যায় বাগানে। সে দেখে শ্রমিকরা পায়ে গামবুট পড়ে, পিঠে টুকরি নিয়ে 'দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি '- এভাবে মুঠো ভর্তি করে করে টুকরিতে রাখছে। কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ পাতা ওদের প্রতিদিন তুলতে হয়। দেখতে দেখতে সাঁঝবাতি ভাবতে থাকে কীভাবে শুরু হলো, কবে থেকেই বা শুরু হলো এই চা চাষ।
১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে চীনে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। আর ভারতবর্ষে এর চাষ শুরু হয় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে। চা প্রধানত ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের ফসল হলেও উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলেও এটি কিছু কিছু চাষ করা হয়। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এমন পাহাড়িয়া বা উঁচু ঢালু জমি চা চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। তবে জল নিষ্কাশনের সুবন্দোবস্ত থাকলে উঁচু সমতল জমিতেও চা চাষ সম্ভবপর। হিউমাস সারযুক্ত এবং লোহামিশ্রিত দো-আঁশ মাটি চা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। চা চাষের জন্য ১৭৫-২৫০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত আবশ্যক।
মোটামুটিভাবে সকাল ৭টা থেকেই চা বাগানে কর্মব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। মাঝে ঘণ্টা দুয়েক বিরতির পর(১১-১),আবার দুপুরে ১টার সাইরেনের সাথে সাথে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা লক্ষণীয়। এই বর্ষাকাল, মূলত (জুলাই-অক্টোবর) -এই মাসগুলোকে সবচেয়ে উৎপাদনশীল মাস হিসাবে গণ্য করা হয়। সারা বছরে যত চা-পাতা উৎপন্ন হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশ এইসময় উৎপাদিত হয়। এইসময় শ্রমিকদের চাহিদাও বেশি থাকে। বাগানে প্রধানত দু ধরনের শ্রমিক থাকে--স্থায়ী শ্রমিক ( পার্মানেন্ট ওয়ার্কার ) ও অস্থায়ী শ্রমিক (ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার)। স্থায়ী শ্রমিকরা সারাবছর কাজ পায়। কিন্তু অস্থায়ী শ্রমিকদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়োগ করা হয়। হেক্টর প্রতি চা পাতা তুলতে গড়ে ১২-১৫ জন শ্রমিক লাগে এবং হেক্টর প্রতি অন্ততপক্ষে ২-৩ জন স্থায়ী শ্রমিক রাখা হয়। বাকি অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ চালানো হয়। যে বাগানের আয়তন যত বেশি , সেই বাগানের শ্রমিক সংখ্যাও তত বেশী। plantation labour act- এর মাধ্যমে শ্রমিকদের যাবতীয় সুরক্ষাবিধি মেনে চলা হয়।
চা গাছ রোপণ, আগাছা পরিষ্কার করা,সার প্রয়োগ করা, গাছ ছাঁটা, কচি পাতা তোলা, চা-পাতা শুকানো, চা প্যাকিং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য দক্ষ-অদক্ষ প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ে। পাতা তোলার কাজে সাধারণত দক্ষ মহিলা শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। সাধারণত (৬-৮) দিন পরপর চা পাতা তোলার যোগ্য হয়। চা গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করতে ব্যক্তিকে যথেষ্ট নৈপুণ্য ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। কারণ দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি একসঙ্গে তুলতে না পারলে চায়ের উৎকর্ষ ও আমেজ অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে যায়।
চা বাগানের বাংলোয় থাকার সুবাদে সাঁঝবাতির বাড়ির চারিদিকে সবুজের সমারোহ। বাংলোর বারান্দা থেকে মাঝে মাঝেই আকাশ পরিষ্কার থাকলে অপরূপ কাঞ্চনজঙ্ঘার শোভা দেখা যায়। ছোট ছোট পাহাড়ি ঝোরা গুলো এই বর্ষায় স্রোতস্বিনী হয়ে ওঠে। পাহাড়, নদী আর সবুজে ঘেরা অপরূপ মোহময় পরিবেশ সাঁঝবাতি-কে আবিষ্ট করে রাখে। কখনো কখনো নীলের জিপে করে বাগানের মধ্যে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। কখনও চোখের সামনে জোড়া ময়ূর খেলতে দেখে, কখনও বা লেপার্ডের বাচ্ছা চোখে পড়ে। এত ধরনের পাখি যে আমাদের দেশে আছে, তা চা-বাগানে না এলে সাঁঝবাতি জানতেই পারত না। একবার তো সে নিজের বাংলোয় হাতিদের কলাগাছ খেতে দেখেছে। বাংলোর লনে হাঁটতে হাঁটতে চোখের সামনে খরগোশের বাচ্ছা দৌড়ে যেতে দেখেছে।
হরেকরকম পাখির হরেক রকম কলতান, ময়ূরের কেকারব, শেয়ালের হুক্কা হুয়া, মাঝরাতে ধানক্ষেতে হাতির হানা, অন্ধকারে অসাবধানে পথ চলতে গিয়ে লেপার্ডের থাবা, জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাপের কামড়----- এসবকে মানিয়ে নিয়ে, পাহাড়, জঙ্গল, নদী কে আত্মস্থ করে ভালোই আছে উত্তরবঙ্গের এক বিখ্যাত শিল্প 'চা'-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো।
একবার বাগান ঘুরতে ঘুরতে সাঁঝবাতি এক জায়গায় পৌঁছে অনেক ছোট ছোট চা গাছ দেখতে পায়।"নীল , এগুলো কী " উৎসাহিত হয়ে সাঁঝবাতি জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে সেটা নার্সারি,যেখানে চা গাছের চারা তৈরী করা হয়। কথোপকথনে সাঁঝবাতি জানতে পারে দুইভাবে চা গাছ তৈরি করা হয়। একটা ক্লোনাল বা কলম চারা, আর একটা হলো গুটি চারা। কলম চারা চা গাছের ডাল থেকে হয়, আর গুটি চারা চা গাছের বীজ থেকে হয়। বীজ শুকানোর পর সেগুলোকে কাঠকয়লা গুঁড়োর মধ্যে মিলিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। মাটিকে জীবাণু মুক্ত করে, গোবর সার ও সিঙ্গেল সুপার ফসফেট (s.s.p.) দিয়ে মাটি তৈরি করে টিউবে করে চা চারা নার্সারিতে রাখা হয়। সেগুলো বড় হতে মোটামুটি এক বছর সময় লাগে।
৪০-৫০ বছরের পুরনো চা গাছ তুলে ফেলা হয়। তারপর সেই জমিতে আঠারো মাসের মতো সময় ধরে গুয়াতেমালা ঘাস বা মিমোশা লাগিয়ে রাখা হয়,যাতে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। তারপর সেই জমিতে নতুন চা গাছ রোপণ করা হয়। চা গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়। দুটো সারির মধ্যে (৩.৫-৪) ফুট দূরত্ব বজায় রাখা হয় এবং দুটো গাছের মধ্যে (২-২.৫)ফুট দূরত্ব বজায় রাখা হয়। ২০-৩০ ফুট দূরত্বে বিভিন্ন ছায়া প্রদানকারী গাছ লাগানো হয়। জমির ঢাল বুঝে ড্রেন বানানো হয়। হেক্টর প্রতি ১২০০০-১৫০০০ পর্যন্ত চা গাছ রোপণ করা হয়। প্রুনিং, স্কিপিং-এর মাধ্যমে গাছকে বেশি লম্বা না হতে দিয়ে, সর্বাধিক ৩ ফুট উচ্চতার মধ্যে রেখে গাছকে ঝোঁপ ঝাড় বিশিষ্ট বানানো হয়। এক একটি ছোট চারাগাছ উৎপাদনশীল হতে মোটামুটি তিন বছর সময় নেয়।
সাইরেনের তালে তালে সাঁঝবাতির সংসারও তাল মিলিয়ে চলে। সেখানেও নির্দিষ্ট সময় মেনে শ্রমিকদের আসা যাওয়া। চা বাগানের বাংলোগুলিতে সাহায্যকারী হিসেবে বেশ কিছু শ্রমিক কাজ করে। তারা বাংলোর যাবতীয় কাজে সাঁঝবাতিকে সাহায্য করে। চা বাগানের বাংলোগুলি বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সামনে প্রশস্ত লন এবং পেছনে বিস্তৃত বাগান বাড়ি। সামনের লন চারিদিকে ফুলগাছ পরিবেষ্টিত হয়ে থাকে। আর পিছনে বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ এবং নিজের পছন্দমতো বিভিন্ন শাক সবজির চাষ করা হয়ে থাকে। সেগুলো দেখাশোনা করে ওই সাহায্যকারী মানুষগুলোই। কেউ কেউ যেমন চা-পাতা তোলায় সিদ্ধহস্ত, তেমনি কেউ কেউ আবার তন্দুরি, কাবাব, বিরিয়ানি-তেও সিদ্ধহস্ত। এদের বিভিন্ন কাজে পারদর্শিতা দেখে সাঁঝবাতি মুগ্ধ হয়ে যায়।
চা বাগানে ম্যানেজার ছাড়াও তাকে সাহায্য করার জন্য চার-পাঁচ জন সহকারী ম্যানেজার থাকেন এবং একজন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার থাকেন। অফিসে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করার জন্য অন্যান্য স্টাফ আছেন। প্রত্যেক চা বাগানে লেবারদের জন্য একটি করে হসপিটাল থাকে। সেখানে একজন করে ডাক্তারবাবু, কম্পাউন্ডারবাবু এবং নার্স থাকেন। সেখানে নিয়মিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
শ্রমিকদের মধ্যেও বিভিন্ন বিভাজন আছে। সাধারণ শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান করার জন্য আছে সর্দার, সর্দারদের তত্ত্বাবধান করে মুন্সী, তাদের ওপরে আছেন বাগানবাবু। বেশ কতকগুলি পাড়া (যাকে ওরা স্থানীয় ভাষায় গাঁও বলে) নিয়ে এক একটি বাগান অবস্থিত। বাগানের কিছু নিজস্ব নিয়মকানুন থাকে। সাধারণত শহর থেকে একটু দূরবর্তী ও নির্জন জায়গায় বাগানগুলি অবস্থিত। বাগানের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বাগান কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু চৌকিদার নিয়োগ করে থাকেন। দিনে এবং রাতে পাহাড়া দিয়ে এরা বাগানের নিরাপত্তা বজায় রাখে। বাগানের শ্রমিকরা কে কবে কাজে এল বা এল না অর্থাৎ তাদের হাজিরার হিসাব রাখার জন্য বৈদার নিয়োগ করা হয়। বৈদারদের কাজ হলো বাগান ঘুরে এবং বাংলো ঘুরে শ্রমিকদের হাজিরা নিয়ে অফিসে গিয়ে নির্দিষ্ট স্টাফের কাছে হিসাব দেওয়া। এর ভিত্তিতে শ্রমিকদের বেতন হয়। প্রতি ১২ দিনের(পাক্ষিক হিসেবে) কাজের ভিত্তিতে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়ে থাকে এবং সারাবছরের কাজের ভিত্তিতে বছরের একটা সময় (দুর্গা পুজোর সময়) এদের বোনাস দেওয়া হয়।
সাঁঝবাতি ও তার বাগানের বন্ধুরা মিলে মাঝে মাঝেই গেট টুগেদার করে এবং একঘেয়েমি কাটাতে প্রায়ই ঘুরতে বের হয়।এভাবেই একবার ঘুরতে ঘুরতে তারা বাগানের ফ্যাক্টরি-তে পৌঁছে যায়। সেখানে তারা দেখে বাগান থেকে কাঁচা চা পাতা তোলার পর সেই পাতা চলে আসছে ফ্যাক্টরি-তে। সেখানে কত ধরনের মেশিন। কাঁচা চা-পাতা গুলো কত প্রক্রিয়াকরণের পর ব্যবহারযোগ্য চা পাতায় রূপান্তরিত হচ্ছে তা দেখে ওরা আশ্চর্য হয়ে যায়।
নীলের কাছে সাঁঝবাতি অনেক প্রকার চা-এর নাম শুনেছে। যেমন--কালো চা, সবুজ চা, ইষ্টক চা, ওলোং চা, প্যারাগুয়ে চা, সাদা চা, হলুদ চা ইত্যাদি। তবে ওদের বাগানের ফ্যাক্টরি-তে সাঁঝবাতি দেখলো প্রধানত তিন ধরনের চা তৈরি হচ্ছে-- সি.টি.সি. , অর্থোডক্স ও গ্রীন টি।সি.টি.সি ও অর্থোডক্স-এর ক্ষেত্রে বাগান থেকে তুলে আনা চা পাতাগুলোকে বড় বড় ফ্যানের সাহায্যে হাওয়া দিয়ে শুকানো হয়। তারপর সি.টি.সি-র ক্ষেত্রে মেশিনে সেগুলোকে কাটিং করা হয়। (c.t.c.--- cut, tear & curl) ।তাই কাটিং-এর পর আবার অন্য মেশিনে রোলিং করে গোল আকৃতি দেওয়া হয়। তারপর একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কয়েক ঘণ্টার জন্য অক্সিডেশন করা হয়। আর অর্থোডক্স-এর ক্ষেত্রে শুকানো পাতাগুলোকে রোলিং মেশিনের সাহায্যে রোল করা হয়। এখানে পাতাগুলো গোটাই থাকে, কাটা হয় না। তাই এগুলোকে আমরা পাতা চা বলে থাকি। এরপর অক্সিডেশন করা হয়। তারপর সি.টি.সি ও অর্থোডক্স উভয় ক্ষেত্রেই ড্রায়ার মেশিনে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানো হয় এবং তারপর প্যাকিং করা হয়।
অন্যদিকে গ্রীন টি-র ক্ষেত্রে কাঁচা চা পাতা গুলোকে ফুটন্ত জলের বাষ্প দিয়ে সিদ্ধ করে,একটু ঠান্ডা করে নিয়ে, রোলিং মেশিনে রোল করে তারপর ড্রায়ার মেশিনে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকানো হয়। গ্রীন টি-র ক্ষেত্রে অক্সিডেশন করা হয় না, সেজন্য এর রং সবুজ থাকে। এরপর প্যাকিং হয়ে সব চা অক্সেনে চলে যায়। পড়ন্ত বিকেলের মিঠে রোদ গায়ে মাখতে মাখতে,গ্রীন টি-র কাপে চুমুক দিতে দিতে সাঁঝবাতি ভাবে কত বিশাল কর্মকাণ্ডের পর গাছের চা পাতা আমাদের পানীয় চা পাতায় পরিণত হচ্ছে। নীলের সঙ্গে গল্প সূত্রে সে জেনেছে যে,কাঁচা চা পাতার মধ্যে যদি একশো শতাংশ জল থাকে, তাহলে প্রক্রিয়াকরণের পর বাজারে যে চা পাতা আসে তাতে মাত্র তিন-চার শতাংশ জল থাকে।
এই কবছরে সাঁঝবাতি চোখের সামনে অনেক পরিবর্তন দেখেছে। একসময় সাঁঝবাতির বাংলোয় রেণুকা নামে একটি মেয়ে তার সবসময়ের সঙ্গী ছিল। সেই মেয়েটি হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে দু-তিন দিন না আসাতে, সাঁঝবাতি খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে, তার স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে এমন মেরেছে যে সে হসপিটালে ভর্তি। এই ঘটনা সাঁঝবাতির মনকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
নীলের সঙ্গে কথোপকথনে সাঁঝবাতি অবগত হয়েছিল যে, এইসব শ্রমিকদের অধিকাংশের মধ্যেই শিক্ষার আলো পৌঁছায় নি। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পর সন্ধ্যা বেলায় তারা নেশায় মত্ত হয়ে এরকম ধরনের কাজ মাঝে মাঝেই করে। এই ঘটনার পর থেকে সাঁঝবাতি নিজের মতো করে যতটা পারত সবাইকে বোঝাতো। ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতির অনেকটাই বদল ঘটেছে। নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা স্কুলমুখী হয়েছে। বাগান থেকে তাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য স্কুলবাস দেওয়া হয়। আগে যেখানে একবারেই স্কুলবাসে করে ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেত, বর্তমানে সেখানে স্কুলবাসটিকে তিনটি ট্রিপ দিতে হয়। সাঁঝবাতি মনে মনে খুব খুশী হয়। জ্ঞানের আলো, শিক্ষার আলো সবার মনকে এভাবেই আলোকিত করে তুলুক। বাগান কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নশীল। প্রত্যেক চা বাগানে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকে। সেখানে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত শিক্ষক ছাড়াও,বাগান কর্তৃপক্ষ সেখানে বাগানের কোনো শিক্ষিত ছেলে মেয়েকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করে থাকেন। তাদের বেতন বাগান কর্তৃপক্ষই বহন করেন। বাগানের বাচ্ছাদের উৎসাহ প্রদান করার জন্য প্রত্যেক বছর শ্রমিক দিবসের দিন 'বসে আঁকো' প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাগানের মেয়েদের নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানও করা হয়ে থাকে।
ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির পরিবর্তন, সাঁঝবাতি যেন এখন আরো বেশি করে অনুভব করতে পারে। মোটামুটি ভাবে (মার্চ থেকে নভেম্বর) চা বাগানের সিজন। এসময় পুরো বাগান সবুজ পাতায় ভরে থাকে। চারিদিকে তাকালেই মনে হয় যেন গোল গোল সবুজ টেবিল পাতা রয়েছে। শীতের শুরু থেকেই বাগানের চেহারা অন্যরকম হয়ে যায়। চারিদিকে একটা রুক্ষ, শুষ্ক ভাব দেখা যায়। সেই সময় আর পাতা তোলা হয় না। তখন প্রুনিং, আগাছা পরিষ্কার করা, পুরনো গাছ তুলে ফেলা----- এভাবে বাগানের পরিচর্যা করা হয়। এ সময়টায় পালা করে করে বাগানের কর্মীরাও ছুটি নিয়ে বাইরে একটু ঘুরে ফিরে আসেন।
দেখতে দেখতে এসে যায় মোহময়ী বসন্ত। চারিদিকে ফুলের সমাহার। চা- বাগানও আবার কচি পাতায় লাস্যময়ী হয়ে ওঠে। মার্চ মাস--- অর্থাৎ বাগানে তখন ফার্স্ট ফ্ল্যাশের চা। এই চা-এর স্বাদ ও গন্ধ অপূর্ব। বাজারে এই চা-এর কদরও খুব বেশি থাকে। তারপর মে মাসে হয় সেকেণ্ড ফ্ল্যাশের চা। সেই চা-এর স্বাদও অনন্য।
এভাবেই দিন থেকে রাত, মাস থেকে বছর সময়ের সাথে সাথে আবর্তিত হয়ে চলেছে সাঁঝবাতি ও তার স্বপ্নসম প্রকৃতি, গাছ,ফুল, পাখি, নদী, পাহাড় আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো। "মেমসাব" ------ বনোয়ারীলালের ডাকে ফিরে তাকায় সাঁঝবাতি। এখন সাঁঝবাতির বিদায় নেবার পালা। বাকী থাকা গল্পেরা উঁকি মারে মনের জানালায়,,,, আবার ফিরে আসবে সাঁঝবাতি অন্য কোন দিন, অন্য কোনো গল্পের ঝুলি নিয়ে।





0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন