মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয় : মৃদুল শ্রীমানী

মৃদুল শ্রীমানী
মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয় : মৃদুল শ্রীমানী
 
১.

বৌদিকে ভালবাসতেন তরুণটি। অলকমঞ্জরীকে সতীদাহের নামে পুড়িয়ে মারার ঘটনা তাঁর মর্মমূলকে বিদ্ধ করেছিল। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ভাষায় সুপণ্ডিত তিনি হৃদয়ের ভাষাও শুনতে পেতেন। প্রথার কাছে মাথা নোয়াবেন, না অন্তরের কথা শুনবেন? সতীদাহের নামে অধর্মের চর্চার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন রামমোহন। বাংলায় সেই প্রথম পোলেমিকস। তত্ত্ব ও তথ‍্যের সমাহারে যুক্তির নিপুণ বিন‍্যাসে মসীযুদ্ধ। সমাজ জীবনে প্রগতিশীল সংবাদপত্রের ভূমিকা ঠিক কি, তা তিনি দেখিয়ে দিলেন। বাংলাভাষাকে করে দিলেন বড়মাপের চিন্তা বহন করার দার্ঢ‍্য। দিলেন যুদ্ধের সাজপোশাক। ক্রমে তিনি বাঙালির হৃদয়ের রাজা হয়ে উঠবেন। কিন্তু প্রথমটা তাঁকে পালাতে হয়েছিল। তিব্বতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন প্রথা ভাঙার নায়ক যুবক রামমোহন রায়। তিব্বতী মেয়েরা তাঁকে লুকিয়ে থাকতে সাহায‍্য করেছিল।  তারা বাংলা জানত না। হৃদয়ের ভাষা জানত।
 
২.

জিভের নিচে আলতা দিয়ে কি একটা লিখে দিয়েছিলেন পিতামহ। কথা বলতে গেলে জিভ যেত জড়িয়ে। তোতলামি ছিল। কিন্তু তিনি হয়ে উঠলেন বঙ্গভূমির সবসেরা যুক্তিবাদী নায়ক। বালক বয়সে বাবার সঙ্গে কলকাতায় এসে লেখাপড়া। বাবা জানতেন, ছেলে মোটেও ভালমানুষ নয়। সহজ কথা ক‌ইতেন না বালকের সাথে। উলটো কথা ক‌ইতেন। মাঝে মধ্যে উত্তম মধ‍্যম। তখন বাড়িওয়ালি রাসমণি দেবী, বিধবা তরুণীটি বালককে প্রহারের হাত থেকে বাঁচাতে ঠাকুরদাস বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়কে নিরস্ত করতেন। সারাজীবন স্নেহময়ী রাসমণিকে ভুলতে পারেননি বিদ‍্যাসাগর মহাশয়। ভালবাসার পথ দিয়ে হৃদয়দুয়ার খুলে গিয়েছিল বালকের। কৈশোর সমাপনে ঊনিশ বছর বয়সে বিদ‍্যাসাগর হয়ে সেই খেতাবকে সার্থক করে তুলতে জীবনভর লড়াই করেছেন ঈশ্বর, হয়ে উঠেছেন মেয়েদের ঈশ্বর।

শকুন্তলা, সীতার বনবাস লিখে বাঙালি মেয়ের হৃদয়ের যন্ত্রণাকে কোন্ গভীর থেকে দেখিয়েছিলেন, জানতে পারি। শেক্সপিয়রের নাটকের ঘটনাপ্রবাহ আত্মস্থ করে লিখলেন ভ্রান্তিবিলাস। বাঙালি যুবতী অপরিচিত চিরঞ্জীবকে ভালবাসবে, আর সে ভালবাসা প্রণয় থেকে পরিণয়ে পৌঁছে যাবে, এটা কলমের ডগায় লিখতে পারা সহজ ছিল না। সুদূর কুয়াশাচ্ছন্ন  প্রদোষান্ধকারে  অতীতের নায়ক নায়িকার ভালবাসা নয়, একেবারে পাশের বাড়ির সজীব মেয়েটির বাস্তবের মাটিছোঁয়া ভালবাসা। শেষ বয়সে লিখলেন প্রভাবতী সম্ভাষণ। বালিকার মৃত‍্যুতে পণ্ডিতের অশ্রুগাথা। হৃদয়ের এমন ব‍্যাপক চর্চা বাঙালি আগে দেখে নি।

৩.
 
বাঙালির জীবনে কঠিনেরে ভালবাসিলাম, কথাটা বলতে শেখালেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাঙালির জীবনে প্রফুল্লর মতো পিপি, ও পিপি, ও পোড়ার মুখী ছিল; বিধবা মায়ের কন‍্যাদায় ছিল, বরযাত্রীদের মতো করে কন‍্যাপক্ষের লোকদের পাকা ফলারের বন্দোবস্ত করতে না পারলে মিথ‍্যা অপবাদে জাতিচ‍্যুত করার ঘটনা ছিল, তার জেরে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিরপরাধ কিশোরীর গৃহচ‍্যুত হবার ঘটনাও ছিল। আবার বাংলাদেশের কোণে কোণে ডাকাতবাহিনী ছিল, তাদের দীর্ঘকায় বলিষ্ঠ সর্দার ছিল, তাদের হাতে সালঙ্কারা বধূর লুণ্ঠন পর্যন্ত ছিল। যেটা ছিল না, তা হল বাঙালির কন‍্যাকে কন‍্যাশ্রী করে তোলার যুক্তিসিদ্ধ বলিষ্ঠ পাঠক্রম। এক‌ই সাথে দর্শন ও শাস্ত্রচর্চা এবং শারীরিক ব‍্যায়াম, কসরৎ, লাঠিখেলা, অসিচালনা শিখিয়ে, ভেতো বাঙালির ছিঁচকাদুনে মেয়েকে লড়াকু করে তোলা ছিল অভাবনীয়। বাঙালির পুঁথিপোড়ো পণ্ডিত নারী নরকের দ্বার আর পথি নারী বিবর্জিতা ছাড়া অন‍্য কোনো কিছু বলতে জানত না। রায়বাহাদুর গিন্নি ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট ছেলের বিয়ের কথা পাড়তে বিশ হাজার টাকা পণ আর হাতে হাতে আদায়, এর বেশি ভাবতে জানত না।

একদিকে দুর্গাকে ঘরের আদরিণী কন‍্যা উমা বলে ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে বালবিধবা কন‍্যার নির্জলা একাদশী উপবাস ভাবতে বাঙালি বাপ মায়ের অসুবিধা হত না। এই দুইয়ের মধ‍্যে কোনো রকম যে আশ্চর্য অসামঞ্জস্য আছে, তা বাঙালির চিত্তপটে উদয় হত না। বাঙালির মেয়েকে দেবী চৌধুরাণী করে দেখালেন সাহিত‍্য সম্রাট। নারীজীবনকে আশ্চর্য রকম করে ভাল না বাসলে প্রফুল্লকে দেবী চৌধুরাণীতে বিকশিত করার কথা ভাবতে পারাই অসম্ভব। আম বাঙালির মেধা মননে সেই যেন প্রথম কঠিনেরে ভালবাসিলাম।

৪.
 
সমস্ত হিসেবের বাইরে গিয়ে শরীর, শরীরই যে আমাদের সর্বপ্রকার আবেগের আধার, তা বুঝিয়ে দেয় বালি, আশাসুন্দরীর চোখের বালি, বিনোদিনী। বিনোদিনী বিধবা। কিন্তু তাতে কি? সে যে সুন্দরী। সর্বাঙ্গ তার নিটোল সুগোল সুপরিপুষ্ট। তার উপর তার মেধা মনন আর পারিপাট‍্য। বিনোদিনী লেখাপড়া জানে আর সাংসারিক বিষয় পরিচালনা কাজে পটু। তার এই মেধাগত সামর্থ্য তাকে শারীরিক সৌন্দর্যকে আরো সুপরিস্ফূট করে তোলার সুবিধা দিয়েছে। বিনোদিনী নারীরত্ন। তাহলে কেন সে ভালবাসা পাবে না? প্রশ্ন তুলে দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি প্রাক্ যৌবনে পিতার অঙ্গুলিহেলনে কোনো বিধবা আত্মীয়াকে পুনর্বিবাহ থেকে নিবৃত্ত করে শাসিত করতে গিয়েছিলেন। প্রবীণ বয়সে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুত্রের বিধবাবিবাহ দেবেন। বিনোদিনী সেই পথ তৈরি করে। আর দামিনী? দামিনীকে আঁকতে রবীন্দ্র আরো বল্গাছাড়া, বাঁধনহারা। গুহাজীবনে রাত্রি নিশীথে ব্রহ্মচারী শচীশের শয‍্যায় এলো গায়ে বিধবা তরুণীর অভিসার যাত্রা আঁকেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভালবাসা। ভালবাসা থাকলে স্বামী "প্রভু আমার প্রিয় আমার"। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পূজাকে প্রেম করে তোলেন, আর প্রেমকে করে দেন পূজা। প্রেম আর পূজা মিলেমিশে অদ্বয় চেহারা নেয় তাঁর গানের কাননে। আর প্রেম না থাকলে স্বামী রাক্ষস। স্ত্রীকে প্রাপ্য সম্মান না দিতে চাইলে সে স্বামী রাক্ষস। হিন্দুর শাস্ত্র বিবাহ পদ্ধতিতে দৈব ও ব্রাহ্ম বিবাহ, এবং প্রাজাপত‍্য বিবাহের কথা যেমন ভেবেছ, তেমনি গান্ধর্ব বিবাহ ভেবেছে। ভেবেছে রাক্ষস বিবাহ ও পৈশাচ বিবাহের কথাও। শাস্তি গল্পের চন্দরা ছিদাম রুইকে রাক্ষস চেহারায় দেখতে পায়। কেন দেখতে পায়? না, ছিদাম তার বিয়ে করা বৌকে সহ‍্য করতে পারে না। বৌয়ের বুদ্ধি থাকলে, সে বৌকে সহ‍্য করা খুব কঠিন। এই রাক্ষস বিবাহকে অনাবৃত করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর শাস্তি গল্পে।

৫.
 
 যথার্থ ভালবাসা বিকশিত হয় সুপুষ্ট সবল স্বাধীন মনে। মার্গারেট নোবলের তাই হয়েছিল। মেয়েটি পেশায় ছিলেন শিক্ষক। অত্যন্ত ব‍্যক্তিত্বগুণসম্পন্না, তেজস্বিনী, প্রখর ধীশক্তির অধিকারিণী মার্গারেট নিজের এতখানি সামর্থ্যকে কোন্ পথে চালিত করবেন ভেবে অস্থির হচ্ছিলেন। "এ জীবন ল‌ইয়া কী করিতে হয়।" এমন সময় যৌবনবাউল বেশে বিবেকানন্দ এলেন। এলেন নবজীবনের সোনার কাঠি নিয়ে। দুটি অসম্ভব শক্তিশালী সত্তা কাছাকাছি এলেন। তার পরেরটুকু ইতিহাস। প্রিয়তমের টানে রাধা নিশীথ রাথে বিজন বনে শ্বাপদসঙ্কুল পথে পা বাড়াতে দুবার ভাবে নি। কবির মুখ দিয়ে বৃহন্নলা আয়ান ঘোষের স্ত্রী বৃষভানু নন্দিনী বলেন, "কুলমরিযাদ কপাট উদ্ঘাটলুঁ, তাহে কাঠ কি বাধা..." রাধা শুধু বিপদের মুখে নিজেকে ঠেলে দেন নি, তিনি কুলমর্যাদা ত‍্যাগ করে অসম্মানের জীবন বেছে নিতে ভয় পান নি। অভিসার, মিলনের বৈষ্ণব পদগুলি সুন্দর, কিন্তু মাথুর হল সেরার সেরা। বৃন্দাবন ছেড়ে, কুঞ্জবন ছেড়ে কৃষ্ণ চিরতরে চলে যাবেন মথুরায়। এই বেদনা হল মাথুর। নন্দপুরচন্দ্র বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার। এই তো মাথুর। 'জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে' বলে আর্তি বুকে পুষে কাটবে রাধার বাকি জীবন।  

তেমনি করে মার্গারেট নিবেদিতা হতে চেয়ে নিজের পরিবার ছাড়বেন, নিজের রাষ্ট্র, দেশ, সমাজ, ভাষাগোষ্ঠী, জাতিসত্তা সব ছেড়ে ভারতের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে আত্মনিবেদন করে দেবেন। ভারতের স্বাধীনতা নিবেদিতার কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠবে। ভারতের বিজ্ঞানচর্চা নিবেদিতার প্রিয়বস্তু হবে। ভারতের শিল্প কলা ভাষা সংস্কৃতি সবকিছু নিবেদিতার ভালবাসায় মথিত হবে। ভারতের সাধারণ মেয়েদের মধ‍্যে শিক্ষাবিস্তারে নিবেদিতা অগ্রণী হবেন। প্লেগের প্রাদুর্ভাবে জীবনের মায়া ছেড়ে দুর্গত মানুষের সেবাকার্যে প্রাণ ঢালবেন নিবেদিতা। আর ওইখানেই শিকলদেবীর পূজারীদের যন্ত্রণা। তাদের ঠাকুর যে মন্দিরের মধ‍্যে বন্দীদশা কাটাচ্ছেন। আর্ত মানবের মধ‍্যে, স্বাধীনতা পিপাসু যৌবনের মধ‍্যে তারা তো ঈশ্বরকে দেখতে শেখেনি। বিবেকানন্দ দেহরক্ষা করার পর রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল নিবেদিতাকে। আমার চোখে সে এক আধুনিক মাথুর।
 
৬.

 সুভাষচন্দ্র বসু অসম্ভব স্বাধীনতা স্পৃহায় ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ গড়তে চেয়েছিলেন। ভগতরাম তলোয়ারকে সঙ্গী করে মৌলবী জিয়াউদ্দিন সেজে তিনি উত্তর পশ্চিম কোণ দিয়ে বেরিয়ে চলে যান প্রথমে রাশিয়া, পরে ব্রিটিশ বিরোধিতায় রাশিয়ার নেতৃত্বের অনিচ্ছা ও  অপারগতা লক্ষ্য করে জার্মানি, ও একেবারে শেষে ভয়াবহ বিপদসঙ্কুল পথে সাবমেরিনে জাপান।

সেরা রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনি ও হার মানে সুভাষ বসুর জীবনের এই পর্বের কাছে। ভেতো বাঙালির হাড়ের ভিতর কী অসামান্য গুণ আছে দেখিয়ে দেন সুভাষ। বিদেশে একাকী যাপনের অসহ‍্য প্রহরে তিনি কোনো মেয়েকে হৃদয়দুয়ারে অভ‍্যর্থনা জানিয়েছেন কি না, সে কন‍্যার কাছে নিজের পূত জীবনের কোনো অভিজ্ঞান রেখে গিয়েছেন কিনা, সে রোমান্স চর্চার সময় আমার নেই। কিন্তু জাপানে আজাদ হিন্দ ফৌজে তিনি যে ঝা‍ঁসি কি রাণি বাহিনী গড়েছিলেন তা ঐতিহাসিক সত‍্য। নারী জীবনকে সম্মানিত না জানলে দেশমাতৃকার সেবায় তাঁদের কাছে টানা শক্ত।
 
৭.
 
প্রকৃত ভালবাসা আদরণীয়কে সম্মাননীয় করে তোলে। শ্রদ্ধার আসনে বসায়। প্রেম ও পূজা অদ্বয় হয়ে ওঠে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.