পুঁজির কাছে পরাধীন হয়ে পড়ি : রুদ্রাসাগর কুন্ডু

প্রতীকী চিত্র
পুঁজির কাছে পরাধীন হয়ে পড়ি : রুদ্রাসাগর কুন্ডু

আমরা কেউ বস্তিতে জন্মাই আর কেউ জন্মাই মধ্যবৃত্তের কুটিরে। তারপর আমাদের মায়েরা শিশুকে বড়ো করে তুলতে নানান প্রচেষ্টা করতে থাকে। মায়ের স্তন থেকে যতক্ষন দুধ আসে ততক্ষন স্বাধীন থাকি আমরা। মায়ের বুকে দুধ না এলে প্রথম পরাধীনতা শুরু হয় আমাদের। ক্ষুধার্ত শিশুকে মানুষ করতে মা-ই প্রথম বহুজাতিক কোম্পানির প্যাকেটভর্তি দুধ কিনে এনে পুঁজিকে স্বীকৃতি দেন। আর এই পুঁজি-ই ক্রমান্বয়ে শ্রেণীর রেখাকে মোটা আলোয় প্রকাশ করে। দুধের প্যাকেট, সুজির প্যাকেট, চিনি, মিশ্রি, ঔষধ-পথ্য নানা উপকরণে আমাদের বস্তিতে আর মধ্যবৃত্তের ঘরে উঁকি দিতে দিতে ঝুঁকে পড়ে পুঁজি। ২০১১ সালের আগে প্রায় বস্তিতে লেনিন বা কার্লমার্কসের অযত্নে মলিন, কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ফটো, বাঁশের বেড়ায় ঝুলে থাকতে দেখা যেত। এখন সেখানে মমতা ব্যানার্জির ফটো। এই ফটো জায়গা বদল করলেও পুঁজি তার চরিত্র বদল করে না। চরিত্র এক কথার মানুষ, সবসময় এক-ই স্বভাবের। কিন্তু বাড়ে। অনন্ত কালধরে সে শুধু বেড়ে চলে। ধীরে ধীরে সে আদানি, আম্বানি হয়। বি.এস.এন.এল.কে টেক্কা দিয়ে জিও হয়ে যায়। 
 রুদ্রাসাগর কুন্ডু
শিশুটি বস্তির মায়ের কাছে হোক কিংবা মধ্যবৃত্তের অনটনসমৃদ্ধ সংসারে। একটু বেড়ে উঠলে পুনরায় মা আরেকটি বহুজাতিক সংস্থার কাছে নিজেকে চিহ্নিত করে। তিনি ক্রয় করে খেলনা রিকশা বা সাইকেল। শিশুটির মুখের হাসির সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। আমরা আমাদের অগোচরে ঢুকে পড়ি পুঁজির অলিতে গলিতে। শিশুর সাইকেল কেন, মমতা ব্যানার্জীর শাড়ি ও হাওয়াই চটি পর্যন্ত বহুজাতিকের শ্রেণীবৈষম্য আর শোষিত শ্রমিকের রক্তঘামে বোনা। পুঁজি তো থাকবেই, তবে তা যেন সর্বগ্রাসী না হয়। শিশুবেলার খেলনা সামগ্রী যখন বড়োবেলার পেশায় পরিণত হয়, তখন আমরা দুবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে শান্তিতে বাঁচতে পারতাম, যদি না আমরা বহুজাতিক কোম্পানির  যাঁতাকলে পিষে যেতাম। কি সেই বহুজাতিক কোম্পানি? তার নাম বিবিধ। কখনো সরকার।  মানে, রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্র মানে, রাজনীতি। এই রাজনীতির ছত্রছায়ায় থাকা কোম্পানিও রাষ্ট্রের অংশ, যেমন প্রিয়াঙ্কা টোডির বাবা অশোক টোডি।  যেমন, ন্বীতা আম্বানির স্বামী মুকেশ আম্বানি।

এভাবে পুঁজি আমাদের ঘরের অন্দরে নীরবে-নিভৃতে ঢুকে পরে। পুঁজি ভোট চাইতে আসে, ভোট নেয়; পরে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন করে। পুঁজি আমাদের মা-বোনদের নগ্ন করে বিছানায় শোয়ায়, মুখে রং মেখে দাঁড় করিয়ে রাখে বৌবাজারের গলিতে। পুঁজিকে ১০ টাকার টিকিট মূল্য প্রদান করে শিয়ালদাহ থেকে বনগাঁ যাওয়া যায়, কিন্তু বনগাঁ যেতে যেতে জলের বোতল কিনতে হয় ৪০ টাকার। বহুজাতিক সংস্থা আমাদের হাতে জলের বোতল তুলে দেয়। সরকার বা পুঁজির একটা ক্লাব থাকে। তার নাম রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র আমাদের বিশুদ্ধ জলের বিষয়ে ছোটবেলা থেকে শেখায়। আমরা হন্যে হয়ে ঢুকে পড়ি বিশুদ্ধ জলের জ্ঞান-গরিমায়। রাষ্ট্র আমাদের জন্য নামমাত্র জলের ব্যবস্থা রাখে, তাতে আন্ত্রিক, আর্সেনিক থাকে। লেবেল লাগানো জলের বোতলে থাকে জীবন, থাকে পুঁজির দাসত্ব; রাষ্ট্রের অধীনতা। আমরা খুশি। রেশনে এক কিলো চাল দুটাকা দরে কেনা গরিবের কাছেও ইন্ডিয়ান রেইল ১৫ টাকা দরে জলের বোতল বিক্রি করে। এই হল পুঁজি।

ন্বীতা আম্বানির সঙ্গে করমর্দন করে পুঁজির প্রতিনিধি, এন.আর.সি-তে আটকে যাওয়া মানুষের ভোটে জিতে যাওয়া, গরিবের রক্তচোষা পুঁজির প্রধানমন্ত্রী। সেই প্রধানমন্ত্রীকে, আম (ম্যাংগো) খায় কিনা; জিজ্ঞেস করেছিল অভিনেতা অক্ষয়কুমার। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলে না পুঁজি। আমের কথা বলে। আমাদমির কথা বলে না। পূজনীয়  পুঁজি, পুঁজিকে তোষামোদ করে। আমি সংক্ষেপে যে সূত্র প্রয়োগে পুঁজি নিয়ে বর্ণনা করলাম, তাই অনেকের বোধগম্য নাও হতে পারে।  কেননা, পুঁজি বোধগম্য না হওয়ার জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করে স্বয়ং পুঁজি ;পৃথিবীব্যাপী। 



Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.