সাহিত্যের আঙিনায় পাঠকের একাল সেকাল : পিনাকী চৌধুরী

সাহিত্যের আঙিনায় পাঠকের একাল সেকাল : পিনাকী চৌধুরী 
সাহিত্যের আঙিনায় পাঠকের একাল সেকাল : পিনাকী চৌধুরী  

 একসময় লেখকের কলম কথা বলতো শুধুমাত্র যেন পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য ! আজও হয়তো লেখকের কলম কথা বলে, তবে একটু অন্য ভাবে ।   অতীতের সেইসব দিনে আমাদের আটপৌরে অনিশ্চয়তার জীবনে আলোড়ন তুলতো রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , কিম্বা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কিছু ভালো সাহিত্য সমৃদ্ধ উপন্যাস , ছোট গল্প ! ভাষার লালিত্যে উজ্জ্বল সেইসব অসাধারণ উপন্যাস ! বিশেষ করে বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস, ছোট গল্প কিন্তু মূলত তিনটি ভাগে আমরা ভাগ করতে পারি , যথা- পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ।

আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেন তাঁর " পল্লীসমাজ" উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন ! মোট ১৯ টি পরিচ্ছেদে সমৃদ্ধ এই " পল্লীসমাজ" প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৬ সালের জানুয়ারি মাসে । আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান যেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য ! ১৮৮৩ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত তিনি মোট ১৩ টি উপন্যাস রচনা করেন , যার মধ্যে ' চোখের বালি', ' গোরা', ' শেষের কবিতা' উল্লেখযোগ্য । আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বা ষাট বছর আগে গভীর রাতেও একশ্রেণীর পাঠক এইসব সুস্থ রুচির গল্প, উপন্যাস পড়ে পরম তৃপ্তি লাভ করতেন ! বলা ভাল, সাহিত্যের রস আস্বাদন করতেন ! পাঠকমহলে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হতো এইসব কালজয়ী উপন্যাস কিম্বা গল্প !  সেইসব গল্প বা উপন্যাসের কিছু চরিত্রের মাধ্যমে পাঠক যেন নিজেকে খুঁজে পেতেন ! 

পাঠক মনে মনে ভাবতেন " আরে , এতো আমারই গল্প "!  সময় থেমে থাকেনি ! তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে ! পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের হাল ধরলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট সাহিত্যিক ।  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পাঠকের পালস্ বুঝতেন বেশ ভাল ! তিনিও তাঁর কালজয়ী উপন্যাস " প্রথম আলো' কিম্বা ' পূর্ব পশ্চিম' এর মাধ্যমে পাঠকদের তৃপ্ত করেন ! কিন্তু তাঁর কিছু বিখ্যাত লেখায় যেন অবধারিত ভাবে অবাধ যৌনাচার স্থান পেলো ! তখন থেকেই যেন পাঠকের রুচির আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় ! তবে যৌনতা ছাড়াও কিভাবে পাঠকের মনে রেখাপাত করা সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন অপর এক বিখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় । লেখকের "যাও পাখি' , ' উজান ' কিম্বা ' কাগজের বউ ' যেন সত্যিই সাহিত্যসমৃদ্ধ !

তবে এই একবিংশ শতাব্দীর চরম ব্যস্ততার যুগ এটা ! এখন বোধহয় সময় পাওয়ার সময়টুকুও নেই কারোর ! হয়তোবা অনেকেরই বই পড়ার অভ্যাসটাও কমে গেছে ! তবে  কৈশোর কালে বিভিন্ন পুজা বার্ষিকী আমরা যেন গোগ্রাসে গিলতাম ! আর এই মাঝ বয়সে উপনীত হয়ে দেখছি পাঠকের রুচির আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে! হাতে হাতে স্মার্টফোন ! ইন্টারনেটের দৌলতে এখন সবকিছুই হাতের মুঠোয় ! হ্যাঁ, বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, এখন আর অতীতের সেইসব পাঠকদের মতো রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী, কিম্বা শরৎচন্দ্র সমগ্র পড়ে কেউ মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন না ! সুস্থ রুচির সাহিত্য আজ যেন সোনালী অতীত ! আজকাল অনেকেরই ধারণা,  সাহিত্য মানেই যেন একটা সেকেলে ব্যাপার স্যাপার !

তবে এখন আর সাহিত্যের রস আস্বাদন করবার সময় কোথায় ? সাহিত্য খায় ? নাকি মাথায় দেয় ? তাই বোধহয় অতি  ও নব্য বাঙালি জানেনা !এই প্রজন্মের টিন এজ ছেলেমেয়েরা গভীর রাতে দুষ্টু দুষ্টু ওয়েবসাইটে বিচরণ করে ! সেইসব তথাকথিত টিনএজার ভুল করেও রবীন্দ্ররচনাবলী খুলে দেখেনা , অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে তাদের কাছে একান্ত আপন হল যৌনতা, পরম আদরেরও বটে ! হ্যাঁ, সেইসব সুস্থ , সুন্দর সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে তারা অপারক ! তারা প্লেজার খোঁজে প্লেজার ! এবং অবশ্যই যৌনতার মাধ্যমে ! তবে আজকাল সবক্ষেত্রেই যে পাঠক যৌনতা খোঁজে , এমনটা নয় !

শতাংশের হিসেবে খুবই নগণ্য হলেও একশ্রেণীর সুস্থ এবং সংস্কৃতিমনস্ক পাঠক কিন্তু আজও ছাপার হরফে সাহিত্য সমৃদ্ধ উপন্যাস, ছোট গল্প পড়ে এক স্বর্গীয় অনুভুতি লাভ করেন ! বস্তুতঃ তাঁদের বাড়ির ড্রয়িং রুমের বুক সেল্ফে কিন্তু আজও স্বমহিমায় বিরাজ করে রবীন্দ্র রচনাবলী কিম্বা শরৎচন্দ্র অমনীবাস ! হ্যাঁ , বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, আজও কিন্তু সাহিত্যের সঙ্গে সহবাস করার অভ্যেসটা বাঙালির বড়ই একান্ত ! তবে একথা নির্দ্বিধায় বলাই যায় যে, বর্তমানে পাঠকের রুচির আমূল পরিবর্তন হয়েছে, আর পাঠক কি খাবেন , তা ভেবেই একশ্রেণীর প্রকাশক বই ছাপেন এবং অবশ্যই মুনাফা লাভের আশায় ! বাঙালি পাঠকের হৃত গৌরব আদৌ কি ফিরবে ? সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন !
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.