কিশলয় গুপ্ত'এর একগুচ্ছ কবিতা

কিশলয় গুপ্ত'এর একগুচ্ছ কবিতা
কিশলয় গুপ্ত'এর একগুচ্ছ কবিতা

বাউলানা_৮০

নেই মানে নেই- এমন ভাবনা মিছে
জলের অনেক নীচে
ঘাপটি মেরে প্রচুর কথা থাকে
ময়ূর যখন ডাকে
মাটির কাছে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আসে
সত্যি বলো- কেউ কি ভালোবাসে?
এই অবুঝ হৃদয়টাকে!

নেই মানে নেই- তেমন চিন্তা অনেক
সর্বনাশা মনে
ধ্বংস ধরে ধূলো বালি জন্ম দিয়ে হাসে
এবং খড়কুটোও ভাসে
নাম না জানা বৈতরণীর জলে
প্রেম লেখা হয় চোখের গোলকধামে।

আর কারো নয়; শুধুই আমার নামে।

               ৮১

অনেক অবহেলা রেখে এসেছি শৈশবে
বড্ড তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলাম তাই

বন্ধ চোখের পাতায় কত মুখের ভীড়
মুখের গভীরে সব উজ্জ্বল ভুল

এখন দু'ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত বিড়ি রাখলে
বাবাকে একটা ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করে

অনেক সত্যের মাঝে রয়ে গেল জন্মটা
এখানে কোন প্রবাদের জায়গা নেই

যাবতীয় ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে বাতাসে ওড়াই
প্রতি পৃষ্ঠায় সম্পর্ক লেগে থাকে

বড্ড তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেছি বলেই
সব ধর্মের উপরে বসে আছে মা।

৮২
পাড় ভেঙে গেলে- হাহাকার তুফানে
বুক না রেখে; এসো নদী পার হই
পুনরায় বাঁধা পাড় পায়ের নীচে।

চামড়ার চোখে মৃত্যু দেখলে কখনো
আকাশের দিকে মুখ তুলে দৈব ভাবি
মুখ তুললে মাথাও ওঠে।

দয়া পরবশ যাপনে শীত লেগে থাকে
ঋতু ঘুরে যায় চক্র মেনে
স্বাভাবিক শীতলতা কাটে না।

নদীর গল্প লিখতে হলে সময়ে
সাথে ঝুপ ঝুপ মাটির শব্দ থাকে
এবং আড়ালে চোরাস্রোত।

৮৩
চায়ের দোকানে তিনবার লিকার চা খেলে
পর পর একই জায়গায় বসে
দোকানীর দৃষ্টি বদলে যায়।
তখন আর হাওয়াই চপ্পল ভালো লাগে না।

মাঝে মধ্যে শাদা পাঞ্জাবীতে দাগ লাগে
কড়া লিকারের রঙ বড় খাঁটি
আক্রমণে বয়স বা দিনকাল দেখে না
লক্ষ থাকে শুধু নীরিহ বুক।

এই যে লিকার চায়ের কথায় খরুচে হাত
শব্দ ঢেলে বেহিসাবি সময় খায়
তাতে বিস্কুটের কোন ভূমিকা নেই।

একমাত্র মেজাজী রাজার রাজত্ব আছে।

৮৪
আমার নামটা যদি
হরিরাম মাহাতো অথবা
রজন মূর্মু হত
ক'টা মেয়ে তাকাতো?

আমার মুখটায় যদি
চামড়ার উপরে আর একটা
মুখ এঁটে থাকতো
কে কী ভাবতো?

আমার বুকটা যদি
কিশলয়ের না হয়ে
রাম শ্যাম যদু মধুর হত
কী লিখতো সে?

অলস ভাবনা মধুকর
জল থেকে উঠে এলে
মনসা পূজা পাবে
না হলে...

                 ৮৫

নিয়ম রীতি মেনে পথের বাঁকে
মতের ভীড়ে পথিক বসে থাকে
আকছার জল গলে হাতের ফাঁকে

"সব গল্প অল্প প্রেমের নামে"

জলের টানে যে সব ফসল মরে
তার দায়ে তো আঁধার ঢোকে ঘরে
শূন্য জমি পেয়ে ঘুঘু চরে

"লেখা থাকে সব শ্রমিকের ঘামে"

এসব জেনে ফিরিয়ে নিলাম মুখ
নিলাম হল বুকের সব তমশুক
একলা দুপুর খুব প্রিয় অসুখ

"পা রেখেছি রাতের মধ্যযামে"

                 ৮৬

ভিতরে খিল এঁটে যে ঘরে তোমার বাস
ঘুলঘুলি দিয়ে কতটা আলো ঢোকে
কতটুকু আলো খেলে গোটা ঘর
স্বস্তি থাকে কি টলোমলো চেয়ারে

বিছানার দিকে চোখ রেখে এত মিছিল
এত মোমবাতি প্রার্থনায় কাটে দিন
ফুটপাতের বদল দেখিনি আজও
শুধুই রঙ বেরঙের মশারীর কাহিনী।

খিল খুলে দিলে যতটা আলো বুকে
তাকে দুই দিয়ে ভাগ করে আসে সুখ
বোকা হাত জানে না মৃত্যুর উল্লাস
জানে না চুলের ভিতরে টিকার ভূমিকা।

ঘুম ভেঙে গেলে মাথা তুলে দেখো
মশারীর দড়িতে বাঁধা আছে অন্ধকার।

৮৭
গন্তব্যের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছি।

ভোজ সভায় উপস্থিত অনাথ বুক
দু'রকমের ডাল,ঘ্যাঁট, চাটনি পাঁপড়
শেষ পাতের রসগোল্লা সহ
গৃহস্থালি দাওয়া আশীর্বাদ কুড়ায়।

এখন ক্ষুধার গল্প ঘুরে যাচ্ছে সহসা
ফিরে এসে লক্ষ অঘোরী প্রেম রাখে
নির্দয় নিপীড়িত প্রেমিক ত্রিশূলে
শেষ সময়ের নিমন্ত্রণে অনুপস্থিত চোখ

তৃপ্তির বাড়িতে বড় অভাব হে শিল্প
সৃষ্টির উঠানে তাই কাঙালী ভোজন
এখানেই আমার আগামী গন্তব্য

৮৮
গভীর খাদের নীচে পড়ে থাকে ক্ষুধা
পাড়ে পাড়ে হাজার প্রলোভন
বস্তুতঃ এখানেই জন্মের শর্ত বাঁধা আছে
দৌড় ঝাঁপের সব ওঠানামা।

নজরে ভালো লাগা কুয়োতলা জুড়ে
সবুজ শ্যাওলার অকারন দাপাদাপি চলে
তৈজসপত্রের কিছুই যায় আসে না
জলের আদরে নতজানু সব হরতাল।

লোভের হাতছানি তোমাকে আমাকে
ভাসিয়ে রাখে সম্পর্কের থালায়
এবং হাঁড়ি কাঠ বিধিসম্মত হাসে
সব ক্ষুধা এখানেই জন্মের কথা লেখে।

৮৯
হাত পাতো- কিছু শীত দিচ্ছি দানে
আলগা মুঠোর বাক্য নতজানু মাটিতে
এবার বিশ্বাস রাখো বুকের আঁচলে
চাদরের লিপি পড়ে বাঁচে প্রেম।

হাত পাতো- নাগা সন্ন্যাসীর ইচ্ছা
বেঁধে দিচ্ছি আদুরে অনামিকায়।
কী কথা শিল্প আদরে দেয় আলো
যারা জানে তাদের ঘরবাড়ি নেই ‌

হাত পাতো- একমুঠো লাশ পোড়া ছাই।
বিভূতি সুখে তুলে দেবো কপালে
তারপর ভালোবাসতে ইচ্ছে হলে
মধ্যরাত দেখে শেষ করো ঘুম।

৯০
এই খরুচে জন্মের জন্য
কাকে ধন্যবাদ দেবো
খুঁজি
সে কি আমাকে খোঁজে?

অনুসন্ধানের ব্যস্ত সময়ে
মাঝে মধ্যে পদবী ভুলে যাই
খুঁজি
পিছনে পড়ে থাকে পরিচয়

গোঁসাই- যৌবনবতী ভীড়ে
পালনকর্তা সেজে আছো
জীবন
একটা ছাড়া দুটো তো নয়।

এত শব্দ বিছিয়েছি বুকে
একটা ধন্যবাদ তো কেউ পাবে।


৯১
পলায়নপর পায়ের নীচে মাটি হাসে
মাটির গভীরে শিকড় টেনে নেয় জল
জলের অতলে আমাদের ইতিহাস
লক্ষ বছরের চাপে তাপে কয়লা হয়
কয়লা মানুষের ক্ষুধার ঈশ্বর
ঈশ্বরের চোখ বাঁধা দাদা কাপড়ে
কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে লজ্জা

এসো- লজ্জাকে ন্যাংটা করে দেখাই।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.