বাংলা ভোটের গল্পগাছা : মৃদুল শ্রীমানী

বাংলা ভোটের গল্পগাছা : মৃদুল শ্রীমানী
বাংলা ভোটের গল্পগাছা : মৃদুল শ্রীমানী

 ১
তখন পাবলিক সার্ভিস কমিশনে কাজ করতাম। ১৯৮৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার আসতে যাচ্ছে অনেকদিন পরে। আমি ভোটকর্মী । ফার্স্ট পোলিং অফিসার। ইকবালপুরে ভোটকেন্দ্র। ঘুপচি গলির ভেতর বিচ্ছিরি স্কুল বাড়ি। জানালার গরাদ নেই। ওই এলাকা না কি একটি বামপন্থী দলের পকেট। খুব জাল ভোটের চেষ্টা হচ্ছে। আমি প্রাণপণে আটকাব ঠিক করেছি। প্রিসাইডিং অফিসার ভয় পাচ্ছেন। আমার কড়াকড়িতে রীতিমত বিরক্ত। কেরানির মন। কোনো মতে কাজ উৎরে ঘরে ফিরতে পারলে বেঁচে যান। সারাজীবন চাকরি করে পেনশন পাবেন বলে জন্মেছেন। এমন সময় নেতা আসছেন খবর পেয়ে হই হই করে বামপন্থী ক্যাডাররা ভোটকক্ষে ঠেলে ঢুকে পড়ল। ক্ষুর ধরল আমার গলায়। সঙ্গে সঙ্গে গুর্খা বাহিনী ঘিরে ফেলে তাদের ঘর থেকে বের করে দিল।  তারপর সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে প্রটেকশন দিয়ে গিয়েছে বাহিনী। সহকর্মীরা আমার ঝুঁকি নেবার দুঃসাহস দেখে গালি দিলে এককান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছি।
অফিসে দেখতাম বৃহৎ বামপন্থী দলের কর্মচারী সংগঠন ভোটের আগে সাধারণ কর্মচারীকে পোস্টাল ব্যালটের ছাপ তাদের সামনে দিতে বাধ্য করতেন। মিনমিন করে তাদের আজ্ঞা পালন করতেন মেরুদণ্ডহীন বেশিরভাগ কর্মচারী। অফিস সময়ে বামপন্থী কর্মচারী নেতাদের থার্ডরেটের বক্তৃতা শুনতে ওঁরা বাধ্য থাকতেন। সরকারি বামপন্থী দলের লোকেরা সেই ট্র্যাডিশন তৈরী করেছেন দীর্ঘকাল ধরে।
পাড়ায় পাড়ায় ভায়ে ভায়ে বিবাদ বাধিয়ে কি যে সাংগঠনিক স্বার্থ এগোতেন কে বা জানে।
বামপন্থা বলতে সত্য সত্য কি বোঝায় বাঙলা বহু দিন দেখে নি।
আজ লেনিনের মূর্তি ধ্বংস হবার বহু আগে নীরবে খুন হয়ে গিয়েছে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ, হ্যাঁ সরকারি বামপন্থীদের হাতেই।

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ২
প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভোটের ডিউটিতে গিয়েছি। অল্পদিন হল কলেজ থেকে বেরিয়েছি। নতুন চাকরি। আবার পরীক্ষা দিয়ে আরো ভাল চাকরিতে যোগ দিতে চলেছি। আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করেছি। গাইড বইটিও যত্ন করে পড়ে নিয়েছি পরীক্ষার্থীর যত্নে।
সন্ধ্যে খানিক বাদে হব হব, এমন সময়ে ঢুকে গেলাম বুথে। হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেননা অজগ্রামের স্কুলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফাই ফরমাশ খাটার জন্যে একটি ছেলে ঠিক করে দেওয়া আছে। তাকে বলা মাত্র কেরোসিন জুটে গেল। টুকটাক খরচের জন্য বাড়তি টাকা দিয়ে রাখা আছে। ভোটসঙ্গীদের আগেভাগেই শুনিয়ে রেখেছি ওই টাকায় সকলের ভাত রুটির বন্দোবস্ত করব আমিই। তাদের কোনো চিন্তা নেই। তাই শুনে সকলে আশ্বস্ত। ওই ক'টা টাকার জন্যে প্রিসাইডিং অফিসারের উপর হিংসেয় গা জ্বলতে থাকে অনেক ভোটকর্মীর। খোরাকি বাবদে টাকা যা খরচ হবে, সব আমি করব শুনে, তাদের প্রাণে খুশি আর ধরে না। আমি উদাত্ত গলায় চা এর অর্ডার দিয়ে ব্যাগ থেকে বিস্কুটের টাটকা প্যাকেট বের করে সকলের হাতে বন্টন করে দিচ্ছি। ভোটকর্মীরা আপ্লুত। বেশ একটা ইউনিটি গড়ে উঠল। হ্যারিকেন জ্বলে উঠতে বোঁ করে দু একটা বোলতা ঘুরে বেড়াতে শুরু করল। ফাই ফরমাশ খাটা ছেলেটা বলল ব্ল্যাকবোর্ডের ওপাশে একটা বোলতার চাক আছে। ওদের কিছু না বললে ওরা কিছু করবে না। আমি সবাইকে সতর্ক করে দিলাম নিয়ম মেনে, রাশভারী হয়ে থেকে, পাবলিকের হামলা আমি সামলাব। কিন্তু বোলতাকে খ্যাপানো চলবে না। বোলতা সামলানো আমার কাজ নয়। বোর্ডের ধারপাশ মাড়াবেন না। সেকেণ্ড পোলিং অফিসারকে ডেকে নিয়ে খবর কাগজ পেতে মুড়ি চানাচুর মাখার নির্দেশ দিতে ওঁরা চমৎকৃত। আমার ঝুলিতে আর কি কি ম্যাজিক আছে আন্দাজ করতে চাইছেন। ততক্ষণে চট টাঙিয়ে ভোটিং কম্পার্টমেন্ট দাঁড় করিয়ে ফেলেছি। থার্ড পোলিং অফিসার একজন বাক্যবাগীশ প্রাইমারি শিক্ষক। তিনি আবার পিয়ারলেসের এজেন্সি করেন। বাগ্ নৈপুণ্যে সকলকে পিয়ারলেস বোঝাতে মরিয়া। ফার্স্ট পোলিং অফিসারকে চটের থলি খুলে ফরমগুলি বের করতে বললাম। ফরম আমি নিজের হাতে পূরণ করে রাখব। পূরণ করা মানে বুথের নাম লেখা। আর বুথের নম্বর সিল দিতে হবে। ফার্স্ট পোলিং একটি একটি ফরম এগিয়ে দেন। আমি ঝপাঝপ লিখি। সেকেণ্ড পোলিং সিল বসিয়ে খামে ঢুকিয়ে রাখেন। বাক্যবাগীশ থার্ড পোলিং অফিসার আমার কাছে পাত্তা না পেয়ে বাইরে থেকে আসা কুতুহলী মুখগুলির মধ্যে সম্ভাব্য পিয়ারলেস আগ্রহী কে কে আছেন, সার্ভে করার উদ্দেশ্যে উঠে গেলেন। আর যেতে গিয়েই বিপর্যয়। হ্যারিকেনের আলো আঁধারিতে তিনি বোলতাওয়ালা বোর্ডে পা দিয়ে ধাক্কা মেরে দিয়েছেন। আর ব্যাস, যায় কোথায়, ঘরময় ভোঁ ভোঁ করে বোলতা ঘোরা শুরু করল। আমি ফার্স্ট পোলিংকে নিয়ে সোজা ঘরের বাইরে ফাঁকা মাঠে। খানিকবাদে থার্ড পোলিং বাপরে মারে বলে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে এলেন। জানা গেল ধুতির নিচ দিয়ে বেশ কয়েকটা বোলতা ঢুকে গিয়ে তাঁকে অস্থানে অতর্কিত আক্রমণ করেছে। আমি বেশ বুঝেছিলাম, ধুতির নিচে অন্তর্বাস পরার রুচি বা অভ্যাস কোনোটাই মাস্টার মশায়ের ছিল না। সুতরাং বোলতারা বিনা বাধায় রাইখস্ট্যাগ  আক্রমণ সফল করেছে। বেশ খানিকক্ষণ বাদে বোলতারা একটু শান্ত ও সংযত হলে আমরা আবার ঘরে ঢুকলাম। ব্যাগ থেকে বের করলাম ডেটল ক্রিম। মাস্টার মশায়ের হাতে দিয়ে বললাম কাজে লাগান। ততক্ষণে ওঁর দেখনসই টাকের উপরেও বোলতার কীর্তিকলাপ প্রতীয়মাণ হচ্ছে। আমরা বাকি কাজ সেরে ভাত খাব। পাড়ার দু একটি লোককে জপিয়ে ছোট মাছের ঝোল আর গরম ভাত তরকারির ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। সবাই ভাল ভাবেই খেল। শুধু শক্ত বিছানায় আধ ঘুমে মাস্টার মশাইয়ের একটু একটু ককানো শুনতে শুনতে রাত পার করে দিলাম।

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৩
নির্বাচনী কৃত্য হিসেবে ভোটের দিন বুথে বুথে টহল দেবার ব্যাপার থাকত। নব্বইয়ের দশকের গল্প বলছি। বুথে গিয়ে পড়া বেশিরভাগ নির্বাচন কর্মী খুব নার্ভাস থাকতেন। প্রিসাইডিং অফিসার ও ফার্স্ট পোলিং অফিসার প্রায়ই কেরানি কুল। সেকেণ্ড বা থার্ড যারা, তারা অনেক সময়েই একধাপ নিচে। ভোটের আগের দিন রাতে কষ্ট করে থেকেছেন। নড়বড়ে বেঞ্চি। ভালো ঘুম দূরের কথা, চলনসই টুকু হয় নি। স্কুলের বাথরুম যাবার অযোগ্য। পরিদর্শনের কাজটুকু হয় নি তা নয়, কিন্তু রিপোর্ট মোতাবেক সাফাইয়ের কাজে গাফিলতি থেকে গিয়েছে। খাবার পেতে সমস্যা হয়েছে। বেশি দাম হেঁকেছে সবাই। ভোটকর্মী হিসেবে সবাই অঢেল টাকা পায়, ধারণা লোকেদের। এদিকে ভোটকর্মী বাবুরা ভোটের ডিউটি বাবদে যে কটা টাকা পান, সে কটা বাড়িতে নিয়ে যাবার অস্বাভাবিক ঝোঁকে ভুগতে থাকেন। এই সব টানাপোড়েনে একটু ল্যাগবেগিয়ে থাকেন। সরকারি কেরানি কুলের মধ্যে যাঁরা একটু নেতা গোছের, একটু বলিয়ে কইয়ে, একটু ড্যাসি পুশি, তাদের বুথের ডিউটি তেমন পড়ে না।  যাঁরা জালার মতো ভুঁড়ি বানিয়ে ফেলেছেন, একটু পেট রোগা হলেও তেলেভাজা দেখলে কিছুতে আত্ম সংবরণ করতে পারেন না, অনেক দিনের পুরোনো প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ওষুধ কিনে খাওয়া যাঁদের মজ্জাগত, ওঁদের দায়িত্ব পড়ে বুথ ডিউটির।
ওঁদের চমকানো সহজ। আবার হাতে মাটন বিরিয়ানির প্যাকেট ধরিয়ে পকেটে পুরে ফেলাও খুব সহজ। ইত্যবসরে বুথে যা খুশি করে নেওয়া সহজ। প্রিসাইডিং অফিসারের বিস্তর ক্ষমতা শুধু বইতে লেখা আছে। ক্ষমতা প্রয়োগ আসলে একটা অভ্যাসের ব্যাপার। সারা বছর তিনশো পঁয়ষট্টি দিন  কেরানিগিরি যিনি করেন, ডিএ'র আর ইনকাম ট্যাক্সের হিসেব ছাড়া অঙ্কের আর কোনো ধরনের প্রয়োগ যিনি ভুলে মেরে দিয়েছেন, পুরোনো নোটশিট না দেখে নতুন নোটশিট যিনি লিখতেই পারেন না, তেমন প্রিসাইডিং বুথ সামলাবেন, এটা ভাবাই অন্যায়। সুতরাং শাসন ক্ষমতায় থাকা টাফ নেতার মদতে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীরা ভোটের আগের সন্ধ্যায় বুথে গিয়ে তাঁর কাছে বাস্তব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন। ওদিকে অফিসে সারাক্ষণ ধরে কাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে, তা পাখি পড়া করে বোঝানো হয়েছে। পলিটিক্যাল পার্টির বিশ্বরূপ দেখে হতভম্ব প্রিসাইডিং অফিসার দুহাত তুলে দিয়েছেন। তাই বুথ দখল হয়ে গিয়েছে। অন্য অফিসাররাও নিশ্চুপ। প্রিসাইডিং অফিসারের দেখা দেখি তারাও হাল ছেড়ে দিয়েছে। বিপক্ষের নেতাদের এলেম নেই বুথে গিয়ে মোকাবিলা করবার। তাঁরা ককাতে ককাতে ফোন করে ইলেকশন আপিসে অভিযোগ জানাচ্ছেন। ছুটলাম নির্দিষ্ট বুথে। সাথে সিনিয়র অফিসার। তিনি পুলিশের থেকে লাঠি কেড়ে নিজেই ছুটলেন বুথ ঘিরে থাকা গুণ্ডাদের দিকে। তারা বেগতিক বুঝে পালাল। অন্য আরো কয়েকটি বুথে গিয়ে ওঁকে আর গাড়ি থেকে নামতে দিলাম না। ইতিমধ্যে রটে গিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট বুথে গিয়ে বেদম লাঠি পেটা করছে। আমায় নামতে দেখেই বুথ জ্যাম করনেওয়ালারা পালালো। ঘামতে থাকা প্রিসাইডিং অফিসারের পিঠে হাত রেখে বললাম, প্রেশারের ওষুধ খেতে ভুলে যান নি তো? ওই পিঠে হাত রাখাতেই অনেক কথা ভেতরে ভেতরে হয়ে গেল।

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৪
আমি বহুবার ভোটের বুথে পোলিং কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। আমার কাজের অভিজ্ঞতা এই যে, প্রিসাইডিং অফিসার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও ন্যায়পরায়ণ, এই দুটি গুণের অধিকারী হলে, বুথের ভিতরের সমস্যা সামলে দেওয়া যায়। ভোটের বুথে সরকারি কর্মী হবেন যথার্থ অর্থে নিরপেক্ষ এবং আইন অনুযায়ী কাজে দক্ষ। তাহলে চট করে সমস্যা দেখাই দেয় না। প্রিসাইডিং অফিসারের দুর্বলতা ব্যক্তিত্বহীনতা আর অপারগতাকে আশ্রয় করে গুণ্ডারা ও গুণ্ডা কন্ট্রোলকারীরা ফিকির খোঁজে।
ভোটের কাজ সামলাতে প্রতিটি প্রিসাইডিং অফিসার নিখুঁত ভাবে ট্রেনিং নিন, হ্যান্ডবুকটি খুব যত্ন নিয়ে পড়ুন। নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিন।

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৫
প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে বারাসতের শহরের মধ্যে একটি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছি। শহর অঞ্চল। স্টেশন এর ধারে পাশেই। একটা প্রেমিসেসেই গোটা চারেক বুথ। স্কুলের বাথরুমটির অবস্থা যাচ্ছেতাই। সব কয়টা ভোটবুথ পার্টির নির্বাচনী কর্মচারী মিলে অজানা অদেখা অনুপস্থিত কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে বাছা বাছা বিশেষণ প্রয়োগ শুরু করলেন। আমি পাশেই একটি ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে এক বয়স্ক মহিলাকে বের হয়ে আসতে দেখে তাঁর কাছে ঝাঁটা বালতি ভিক্ষা করলাম। সে জিনিস মিলতে, আর একটু উপরে তাকাতে দোতলার ব্যালকনিতে এক তরুণী বধূকে দেখে ফিনাইলের আবদার করলাম। তাও মিলল। এবার সবাই ঝাঁটা বালতি ফিনাইল আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেরাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ফেলল।
পশ্চিমবঙ্গে খুব বেশি হলে শতকরা পাঁচটি সরকার পোষিত বিদ্যালয়ের বাথরুম নিয়মিত ভাবে সাফ সুতরো হয়।
শিক্ষাবন্ধুরা শুনছেন?

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৬
ইলেকশন এসে গেলে কত কাজ জোটে। আমি যেতাম স্কুলে স্কুলে। নজরদারি কাজ। দরজা বন্ধ হয় কি না। টিউব ওয়েল চালু কি না। টয়লেট সাফ কি না।
একটা স্কুলে গিয়ে দেখি প্রস্রাবাগারে প্রচুর সিগারেট বাট পড়ে আছে। হেড মাস্টার কে ডাকিয়ে বললাম, স্কুলে এত বাচ্চারা সিগারেট খায় কেন?
তিনি বললেন, বাচ্চারা খায় না।
তাহলে কে খায়, আর ইউরিনালে ফ্যালে কেন?
তিনি বললেন, পরিষ্কার করিয়ে দেব।
আমি বললাম, হবে না। আমি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখে তবে যাব।
উনি রেগে উঠলেন। এত বেলায় কি করে হবে?
 আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, দেখবেন তবে?
ওঁর চেম্বার থেকে গট গট করে বেরিয়ে পাশের বাড়ি কড়া নাড়লাম। একটি বধূ বেরিয়ে এলেন। বললাম বালতি দিন। সরকারি সাদা গাড়ি দেখে বধূটি বিনা বাক্যব্যয়ে বালতি দিলেন।
আমি বালতি নিয়ে নিজের হাতে টিউবওয়েল পাম্প শুরু করেছি দেখে প্রধান শিক্ষক বেরিয়ে এলেন। হাত লাগালেন। দুজনে মিলে প্রস্রাবাগার সাফ করে ফেললাম।
চেষ্টা করলে কি না হয়?

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৭
একজন ভোটার কেমন হবেন
১ একজন ভোটার নিজের এলাকার ভোটের নির্দিষ্ট তারিখটি জানবেন। ভোটের বুথের অবস্থানটি জানবেন।
২ দায়িত্বশীল নাগরিক ভোটার তালিকায় নিজের নামটি আছে কিনা জেনে রাখবেন।
৩ নিজের এপিক (পড়ুন ভোটার কার্ড) তিনি গুছিয়ে রাখবেন। ভোটের দিনে বুথে যাবার সময় কার্ডটি নিয়ে যাবেন।
৪ এপিক অর্থাৎ ভোটার কার্ড হারিয়ে গিয়ে থাকলে সে বাবদে স্থানীয় থানায় লিখিতভাবে জানিয়ে রাখবেন। বেশ আগে থেকে উদ্যোগী হলে মহকুমা অফিস থেকে ডুপ্লিকেট এপিক পাওয়া সম্ভব।
৫ হারানো এপিক বাবদে থানায় লিখিত দরখাস্তটি এবং আধার / ড্রাইভিং লাইসেন্স, সরকারি ব্যাঙ্কের পাসবই ইত্যাদি ছবি ওয়ালা কোনো মান্য ডকুমেন্ট নিয়ে ভোট দেওয়া যাবে, এই মর্মে যদি ইলেকশন কমিশন নির্দেশ দেন, তার সদ্ব্যবহার করবেন।
৬ ভোটের দিন বেশ সকালে বুথে চলে যাবেন। আপনি বেশ সকালে ভোট দিতে চলে গেলে জাল ভোট পড়ার সুযোগ কমে। লাইনে দাঁড়াবেন। কাঁধে ব্যাগ রাখবেন। তাতে রাখবেন জলের বোতল, সকালে খাবার ওষুধ, আর একটু বিস্কুট। আর ছাতা। তাহলে লাইনে দাঁড়িয়ে খিদে পেলে সামলানো সহজ হবে।
৭ ভোটের বুথে ঢুকে নিজের এপিক, অভাবে আধার কার্ড, বা অন্যান্য নির্দেশিত ডকুমেন্ট দেখিয়ে নিজের পরিচিতি নিশ্চিত করবেন।
৮ ভোটার তালিকায় নাম থাকলে একমাত্র তবেই ভোট দেবার সুযোগ মিলবে। সে সুযোগ পেলে বিনা বাক্যব্যয়ে তর্জনীতে অমোচনীয় কালি লাগাতে দেবেন।
৯ বাড়ির যে কয়জন ভোটার আছেন সবাই একসাথে বুথে যাবার চেষ্টা করুন। তাহলে চ্যালেঞ্জ ভোটের সময় সাক্ষী হিসেবে বাড়ির লোকের সাহায্য পাবেন। পল্লীর দু একজন প্রতিবেশিকেও সাথে নিতে পারেন।
১০ কাকে ভোট দেবেন বলে ভাবছেন, এ নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে আলোচনা করবেন না।
১১ বুথে ঢুকে আপনার পছন্দের রাজনৈতিক দলের নাম, প্রতীকের  নাম বা প্রার্থীর নাম উচ্চারণ করবেন না। এটি বেআইনি। অপরাধও বটে।
১২ নীরবে নিশ্চুপে আপনার পছন্দের বোতাম টিপে ভোট দিন। ভোট দিয়ে অহেতুক আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে পছন্দের প্রার্থীর নাম জাহির করবেন না। নীরবে বুথ ত্যাগ করে বাড়ি চলে যান।
১৩ বুথে ঢুকে বুথের ভিতর কাজ করতে থাকা কোনো দলীয় এজেন্টের সাথে আপনার বিশেষ পরিচিতি বা হৃদ্যতা প্রকাশ অবাঞ্ছিত। স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ আচরণ কাম্য।
১৪ ভোটের আগে বিভিন্ন দলের প্রার্থীর সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজ নিয়ে নিজের মত তৈরি করুন। প্রার্থী আগের বার জিতে থাকলে তিনি সংসদে ঠিক কি ভূমিকা পালন করেছেন, কতদিন হাজিরা দিয়েছেন, কয়টি আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ও কতগুলি প্রশ্ন তুলেছেন জেনে নিন। এম পি ফান্ডের টাকা কোথায় কোথায় ব্যয় করেছেন জানতে চান।
১৫ প্রার্থীকে জানতে চিনতে বুঝতে হলে তিনি কতদূর শিক্ষিত জেনে নিন, কোনো ফৌজদারি মামলার দাগি আসামি কি না জানুন। আর্থিক অপরাধে জড়িত কি না, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টে অভিযুক্ত কি না খোঁজ নিয়ে রাখুন।
১৬ নোটা নামে একটি বোতাম থাকবে। প্রার্থীদের কাউকেই পছন্দ না করার বৈধ এক্তিয়ার আপনার আছে। ইলেকশন কমিশন আপনার এই অধিকারকে সম্মান জানিয়ে নোটা বোতামের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অপছন্দের লোককে ভোট দিতে আপনি বাধ্য নন। চিন্তা ভাবনা খোঁজ খবর আগে করে রাখুন। ভোটের দিন বুথের লাইনে বা বুথের ভিতর মন্তব্য প্রকাশে বিরত থাকুন। ভোট দিয়ে কি হবে, যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ ইত্যকার হতাশায় না ভুগে সদর্থক ও ইতিবাচক ভূমিকা নিন।

 বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৮
ধুতি নিয়ে কি কাণ্ড, কি কাণ্ড !
কে না কে শপিং মলে ঢুকতে পায় নি, তাই সবার নাক থেকে শিকনি গড়াচ্ছে।
ওদিকে লোকের বউ মরে গেলে গাড়ি ভাড়া করার ক্ষমতা নেই বলে ঘাড়ে করে লাশ বয়ে  আনছে। তার ছবি দেখার পরেও দিব্যি ঘুমোচ্ছি বাপু!
মেয়েরা পায়খানা করছিল, তার ছবি তুলছিল সরকারি ভৃত্য । কে এক বুরবক তার প্রতিবাদ করতে গেল। মার খেয়ে পটল তুললে ।
তা বেশ হয়েছে। রাস্তায় হাগবে, আর সরকারি স্বচ্ছ লোক ফোটো খিচবে না?
সাংসদ সরকারি মোবাইলে সংসদে বসে বসে কূট কচালি না শুনে বুলু ফিলিম দেখে... সে তো তার মানবাধিকার ...
একটা জিনিস আচে জ্যাখন, ত্যাখন দেকলে কি চোক অসুদ্দুর হয়ে যাবে?
যাদবপুর কি দোষ করেচে যে ঝে ঝা খুসি করবে, আর তাকে মোম বাত্তি নিয়ে রাস্তায় বেইরে পড়তে হবে?
তোমাদের ট্রাম্প কি বাপের জম্মে গরু খায় নি? তাকে জইড়ে ধল্লে দোষ নেই , তো গরিব মুসলমান টা গরু খেয়েচে বলে চোখ খুবলে নেবে ? জিপে বেঁধে কাশ্মীরে ছেলেটাকে ঘোরালে , তার বেলা কি চোকের মাতা খেয়েছিলে বাপ? ত্যাখন কদ্দিন না খেইয়ে ছিলে?

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ৯
হবু রাজার দেশে মেয়েদের ধর্ষিত হবার বিরাম নেই, আর গবু মন্ত্রীর তরফে "এমনটা তো হয়েই থাকে", ন্যাকা ন্যাকা গলায় এমন কথা বলারও বিরাম নেই। জনগণের ভোট পেয়ে পটলবাবু ফিলিমষ্টার "সাংসদ"  বনে গেলে, ধর্ষণের ঘটনা জানতে পারলে গ্রে ম্যাটার খরচ করে বলবেন, "অমন খাটো পোশাক পরা ঠিক হয় নি",  কিংবা "রাত বিরেতে রাস্তায় বেরোনো ঠিক হয় নি।" যেন কে কি পোশাক পরবে, কে রাত্রে ঠিক কটা অবধি বাইরে থাকবে, সব গাইড বইতে লিখে রাখা আছে। তার বাইরে গেলেই ফাউল। গবু মন্ত্রীর পুলিশ বলবে "পক্ষীরাজ যদি হবে, তার ন্যাজ নেই কেন? ধর্ষণ হলে তুমি আটকাতে পারো নি কেন?" আদালতে ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কারো মনে পড়বে না, এ কথাটা বলাই বেআইনি।
হবু রাজার দেশে মেয়ে আর তার আপনজনদেরকেই প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

বাংলা ভোটের গল্পগাছা ১০
কোনো কোনো সাংসদ যেমন দেখতে
ভুল নয়, একদমই মানুষের মতো দেখতে... শুধু জানেন না, সাংসদ হলে নিয়মিত ভাবে সংসদের অধিবেশনে সক্রিয়ভাবে হাজির থাকাটাই কর্তব্য...
শুধু জানেন না, হাটে মাঠে রেলস্টেশনে যেভাবে বক্তৃতা করে নেতার স্নেহচ্ছায়া অর্জন করেছেন, সংসদে সেভাবে বলা চলে না। অনেক তথ্য সমৃদ্ধ, যুক্তিপূর্ণ ও মার্জিত ভাষা ও সমগ্র ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাগ বিন্যাস করতে হবে।
সরকারের দেওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল সরকারি কাজে, ও সরকারি তথ্য জমাতে, বিশ্লেষণ করতে কাজে লাগাতে হবে। সংসদে বসে পর্নোগ্রাফি দেখার জন্য নয়।
তিনি ফিল্মস্টার হলে পরিশ্রমসাধ্য শুটিং করে বলতে পারবেন না যে, মনে হচ্ছে ধর্ষিত হয়ে উঠলাম। ধর্ষণ যে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, তা মাথায় রাখতে হবে।
বলতে পারবেন না যে, ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেব। এই ধরণের কথা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে। বলতে পারবেন না যে, মেয়েরা স্কার্ট পরে বলে বা সন্ধ্যার পরে রাস্তায় বেরোলে ধর্ষিত হতেই পারে।
এগুলো বলা কোনো ভদ্রলোকেরই কাজ নয়। সাংসদের তো আরোই নয়।
সংসদে হল্লা পাকানো, কাগজের গুলি পাকিয়ে ছোঁড়া, চোখ পাকানো, চোখ নাচানো, জনমনোমোহিনী নায়িকার স্টাইলে চোখ মটকানো, কারো দিকে তেড়ে যাওয়া, হুড়মুড় করে গিয়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া, কথায় কথায় ওয়াক আউট ..না না, এগুলি সাংসদের কাজ নয়। আগে কখনো সাংসদ হয়ে থাকলে সংসদে আপনার কি কি ভূমিকা ও অবদান ছিল, তা তথ্য সহকারে তুলে ধরুন। মা বাপ অনেকেরই মারা যায়, সে বাবদে ভোটারদের কাছে মড়াকান্না আর কাঁদুনি গাওয়া দায়িত্বশীল ভোটপ্রার্থীর কাজ নয়।
সাংসদ হতে চাইলে মানুষের মতো চালচলন দেখান, ভাষাপ্রয়োগ হোক মানুষের মতো।

Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.