![]() |
| স্বপ্নঝরা পাতা : কর্ণধর মন্ডল |
পাশের গ্রামের ছোট্ট মেয়েটা রোজ পুতুল সাজিয়ে পুতুলের বিয়ে বিয়ে খেলা খেলতো। মনে মনে স্বপ্ন দেখতো পুতুলের সাজে লাল শাড়ী পরে কনে সাজতে। তার বয়স যখন ছয় কি সাত, তখন থেকে তাঁর হৃদয়ান্তে সুপ্ত বাসনা অজান্তে অনাবৃত কুঁড়ি হয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে অজানা স্বপ্ন সুখের অভিলাষে।এক রত্তি মেয়ে পুতুলের সাথে কনে সেজে লাল শাড়ী পরে কপালে টিপ পরে নব-বধুর সাজে নিজেকে রাঙিয়ে তুলতো। সবাই যখন পুতুল খেলা পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন তার মনে জাগে নব-যৌবনা কিশোরী মেয়ের ন্যয় হৃদয়ে বসত করা সুপ্ত বাসনা, যা ঐশ্বরিক স্বপ্ন সুখে মোড়া ছোট্ট সংসার সৃজনের অভিপ্রায়।
-----তাঁর এই পুতুল খেলার বউ সাজ দেখে কেউ আনন্দিত হতো, আবার কেউ কেউ রেগে যেত। ওর বাবা কখনো সহ্য করতে পারতেন না এই বর-বউ খেলাটাকে। বকা দিতো, সাজানো পুতুল গুলোকে আছড়ে ভেঙে ফেলতো। কারন- ছোট্ট মিঠি ছিলো মুসলমান কন্যা। হিন্দু বধুর সাজে বর-কনে সাজটাকে, মিঠির বাবা কোনদিন মেনে নিতে পারতেন না। তিনি ছিলেন একগুঁয়ে, একনিষ্ঠ ও ধর্মপরায়ন ব্যক্তি। নিজের ধর্ম, আভিজাত্য ও কর্মনীতিকে বেশী ভালোবাসতেন এবং সমাদর করতেন। অন্য ধর্মকে ঘৃণা না করলেও তাদের নিয়ম নীতি, কার্য-কলাপকে একাত্ম ভাবে মেনে নিতে পারতেন না।
-----ছোট্ট মিঠি আস্তে আস্তে বড়ো হতে থাকে। পড়াশুনা করে। প্রাথমিক স্কুল শেষ করে এখন হাই স্কুলে পড়াশুনা করছে। কিন্তু, মনের ভিতর একটা আকাঙ্খা বীজের মতো হৃদয় মাঝে আগলে রেখেছে। কপালে রাঙা চেলি পরে, আলতা পায়ে হিন্দু রমনীর সাজে; রাঙা নব-বধু সাজে নিজেকে সাজিয়ে তোলার অভিলাষ। মিঠি এখন যৌবনে পা দিয়েছে। ছোট্ট থেকে স্বপ্ন দেখা মিঠি মনের মতো জীবন সঙ্গী খুঁজতে লাগলো পুতুল খেলার ছলে। কি জানি, একই ক্লাসে পড়া সহপাঠি অর্নিবাণকে মিঠি এক মুহুর্ত না দেখলে, কথা না বললে থাকতে পারতো না। তাহলে এই কি তাঁর ছোট্ট বেলার স্বপ্ন দেখা পুতুল খেলার রাজকুমার?
-----পড়াশুনার ফাঁকে দিনের পর দিন, স্বপ্নে দেখা মনের মানুষের নাম হৃদয়ান্তে আঁকতে থাকে। এই ভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। তার সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেনা যে, অর্নিবাণ আমি তোকে ভালো বাসি। এই ভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর, তার ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসা স্বপ্ন ও সুপ্ত মনের বাসনার কথা অর্নিবাণকে জানালো।
------মিঠির মুখে গল্প শোনার পর অর্নিবাণ মনে মনে খুব হেসে ছিল। অর্নিবাণ ভাবতে পারেনি; তাকে কেউ ভালোবাসবে। কারণ-অসহায় অনাথ সে। পালিত বাবা-মা'য়ের কাছে মানুষ। এমন দুঃর্ভাগ্য নিয়ে জন্মানো কোন ছেলেকে কেউ কি ভালোবাসতে পারে সেই ভেবে। এক সময় অর্নিবাণ তার গল্প শোনার পর, অজান্তে কখন মিঠির প্রেমে পড়ে যায়; সে নিজেও কোনদিন বুঝতে পারেনি। এই ভাবে অর্নিবাণ ও মিঠির মধ্যে একটা পবিত্র প্রেমের সম্পর্ক দানা বাঁধতে থাকে। এক সময় সম্পর্ক চরম পর্যায়ে আসে যে, দুজন দুজনকে এক মুহুর্ত না দেখলে থাকতে পারতো না। এর অন্তিম পরিনতি হলো শুভ পরিণয় ঘটিয়ে ভালোবাসার স্রোতে ভেসে যাওয়া অসীম সমুদ্রে অজানা ঠিকানায়।
-----অন্যদিকে সেই আবেগঘন মুহুর্তে অর্নিবাণ ও মিঠির বাড়ীর লোক জনেরা জেনে যায়। তাদের দুজনের ভালোবাসার কথা। কিন্তু লাভ কিছু হয়নি। মৃত্যুর পরোয়ানা না করে; মিথ্যা ধর্ম নামক কুসংস্কারকে পিছনে ফেলে দুজনে মরণ পণ অঙ্গীকারে শপথ নেয়। শত বাঁধা শত আঘাতেও দুজন দুজনকে ছেড়ে আলাদা হবে না। শুধুই মৃত্যুই পারবে দুজনকেই আলাদা করতেই।
-----সত্যিই একদিন তাই হলো........
-----একদিন চরম সংকট নেমে আসে মিঠির জীবনে। মিঠির বাড়ীতে জানতে পারে যে, সে একটা অন্য ধর্মের ছেলেকে ভালোবাসে। তারপর অকথ্য অত্যচার ও শত যন্ত্রণা ভোগ করলেও ক্ষণিকের জন্যে দু-চোখের স্বপ্নকে ম্লান হতে দেয়নি। কারণ তারা যে, ভালোবাসার শপথের অঙ্গীকারে আবদ্ধ।
-----একই ঘটনার পুণঃরাবৃত্তি হয় অর্নিবাণের জীবনেও। কিন্তু,একটা চরম বাস্তব সত্যকে নিয়তির দোহাই দিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়। অর্নিবাণের বাবা-মা। কারন-অর্নিবাণ ছিল তার বাবা-মা'য়ের একমাত্র দত্তক নেওয়া পালিত সন্তান। চরম লজ্জা,কষ্ট,অপমান সহ্য করেও অর্নিবাণ ও মিঠির ভিন্ন ধর্মীয় ভালোবাসাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়, অর্নিবাণের বাবা-মা।
-----অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে, দুজনের ভালোবাসা আপন স্রোতে প্রবাহমান। দুজনের বয়স যখন প্রাপ্ত হলো। তখন ছোট্ট বেলা থেকে স-যত্নে লালিত-পালিত সুপ্ত বাসনাকে জাগিয়ে তুললেন। অর্নিবাণ ও মিঠি দুজনে বাড়ীর লোকজনের অমতে পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
-----মিঠি সাজলো পুতুল মেয়ের বেশে, লাল শাড়ী, ললাটে রাঙা সিঁন্দুরে নব-বধু সাজে। ছোট্ট বেলার দেখা স্বপ্ন-বাসনা মিঠির জীবনে বাস্তব রুপে রুপায়িত হয়েছে।
-----এই মিলন যেন এক ঐশ্বরিক দান।
-----এই সম্পর্ক অর্নিবাণের বাবা-মা মেনে নিলেও মিঠির বাবা-মা,ভাই-বোন কেউ মেনে নিতে পারেনি। কারণ, ভিন্ন ধর্মের ছেলেকে বিবাহ করবার জন্য। আজো মিঠি তার বাবা-মা'র কাছে মৃত। শুধু মাত্র বেঁচে আছে স্মৃতি হয়ে।
-----অন্যদিকে অর্নিবাণ ও মিঠির দুজনের সুখের সংসার। দাম্পত্য জীবন খুব সুখ দায়ক ও মধুময়। এই ভাবে দেখতে দেখতে দাম্পত্য জীবন বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। এক সময় তাদের সুখের সংসারে একটা সন্তান এলো তাদের স্বপ্নের জগৎ আলো করে। খুবই আনন্দের মুহুর্ত, ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে তাদের আলাদিনের সংসার।
-----অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে অর্নিবাণ ও মিঠির ভালোবাসার উপহার সাক্ষী স্বরুপ এই ছোট্ট সন্তান। আদর করে নাম রাখলো আকাশ। যার স্নেহের আলতো স্পর্শে দুজনের মনের আঁধার ম্লান হয়ে যায়। অর্নিবাণের স্ত্রী-সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা'কে নিয়ে স্বপ্নে ঘেরা সুখের সংসার। এই ভাবে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর.....
-----একদিন সেই স্বপ্ন ঘেরা সুখের সংসারে ন্মে এলো বিষাদের ছায়। হঠাৎ যেন আকাশ বাতাস চমকে গেল! চন্দ্র-সুর্য থমকে গেল। সুখের সংসার ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়ে গেল এক মাতাল কালবৈশাখী ঝোড়ো হাওয়া। মিঠির স্বপ্নে সাজানো পৃথিবীটা নিমেশে ঢেকে গেল নিগুঢ় অন্ধকারে। হৃদয় হলো ক্ষত-বিক্ষত, ব্যথায়-ব্যথিত।
-----অভিশপ্ত দিনটা ছিল ভাতৃ-দ্বিতীয়া। অর্নিবাণ যাবে ফোঁটা নিতে এক দিদির বাড়ীতে। হঠাৎ ঘটে গেল এক চরম দুঃর্ঘটনা। পাড়়ার সবাই মিলে নিয়ে গেল তাকে হসপিটালে। সেখানে ডাক্তার দেখে তাকে ফিরিয়ে দেয়।
-----বললেন না!আমার কিছু করার নেই।
-----মানে?
-----মানে একটাই; অর্নিবাণ আর বেঁচে নেই। ও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে, সবার মমতা বন্ধন ছিন্ন করে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে।
------শুনে, সবাই স্তম্ভিত! মুখে কথা বলার মতো কোন ভাষা নেই। মিঠির মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত নিক্ষেপ হলো। না.....এ কখনো হতে পারেনা। আর একথা মেনে নেওয়া কখনো সম্ভব নয়। যে অর্নিবাণ, সকালে ব্রাশ করতে করতে ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল দিদির বাড়ীতে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ একি হয়ে গেল! কেউ কাহুকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু, মানতে হবে; বিধির লিখন মানতে বাধ্য। তাকে এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য যে কারো নেই।
-----ছোট্ট বেলার স্বপ্নে আবেগ মোহিত হয়ে; যে মেয়েটা স্বামী সোহাগে, স্বপ্ন সুখে বুক ভরা আশা নিয়ে দিন যাপন করছিল হিন্দু বাড়ীর কুল বধু সেজে; ক্ষণিকের মধ্যে তার স্বপ্ন হয়ে গেল ছিন্ন-ভিন্ন। ভেঙে যাওয়া মাটির পুতুলের মতো। সকল আশা আকাঙ্খা নিমেশের মধ্যে হয়ে গেল লীন; ভঙ্গুর কাঁচের মতো টুকরো টুকরো।
-----একদিকে,পিতৃহারা-আপন স্বজন হারা; অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে প্রিয়। একমাত্র ধ্যান-ধারনা,আশা-আকাঙ্খা যাকে নিয়ে ছিল তাঁ একমাত্র স্বপ্নের পৃথিবী। নব-যৌবনা বছর পঁচিশের সর্বহারা কুল-বধুর কপালে জুটলো সাদা থান আর রাশি রাশি ব্যথার বিবর্ণমালা। বিষাদময় বিরহ-বেদন ও বৈধব্য যাতনা।
-----আজ তার সেই, ছোট্ট বেলার পুতুল খেলার স্বপ্ন গেছে ঝরে! চৈত্রের শেষ বিকেলের ব্যথায়-ব্যথিত বৃন্ত-চ্যুত "স্বপ্ন ঝরা পাতা" হয়ে.....
খুঁজে না পাওয়া অজানা এক ভীন দেশে! মহাশুণ্যে নীহারিকা মাঝে উজ্জ্বল দীপ্তিময় তারাদের পাশে।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন