অনিশ্চিত পথোযাত্রা : রনি হোসেন

অনিশ্চিত পথোযাত্রা : রনি হোসেন
অনিশ্চিত পথোযাত্রা : রনি হোসেন

১||
যতদূর চোখ যায় শুধু ধূ-ধূ সবুজ মাঠ। আর এই মাঠের মাঝ বরাবর চলে গেছে শতাব্দির পুরোনো আঁকাবাঁকা বড় রাস্তাটি। রাস্তার দু'ধারে সারি সারি খেজুর গাছ। তার মাঝে মাঝে আবার দু একটি বড় বড় তালগাছ সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তালগাছের পাতার শেষপ্রান্তে বাবুই পাখি সযত্নে তার ছোট্ট বাসা বেধেছে। এ রাস্তাটির শেষপ্রান্তের গ্রামটির নাম শ্যামনগর। আর রাস্তাটির ঠিক অপরপ্রান্তে, যেখানে আরো কয়েকটি গ্রামের পথ এসে একত্র হয়েছে, সেখানে গড়ে উঠেছে বড় বাজার। সপ্তাহে একদিন সে বাজারে হাট বসে। এদিন আশেপাশের সব গ্রামের মানুষ তাদের উৎপাদিত নানা প্রকার দ্রব্য নিয়ে আসে হাটে ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য।

২||
আজ শনিবার। হাটের দিন। এখন ভরদুপুর। সূর্য মাথার উপর উঠে এসেছে। চৌত্রের কড়া খাঁ খাঁ রোদ্দুরে ঝলসে যাচ্ছে দিগন্ত। কি প্রচন্ড তার উত্তাপ! জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে চারদিকটা। হাট শেষ করে অনেকেই বড় রাস্তা ধরে নিজ বাড়ি ফিরে যাওয়া শুরু করেছে। কেউ একজন একটি ছোট্ট ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফিরে আসছে। তার মাথার উপর বড় একটি বাঁশের বানানো ঝুপড়ি। কাধে ময়লা গামছা ঝুলানো। পরনে জীর্ণশীর্ণ লুঙ্গি। রোদে পুড়ে যাওয়া মুখ দিয়ে ঝরঝর করে ঘামের ফোটা গড়িয়ে পড়ছে। ওর নাম ফরিদ। ফরিদ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে। ছয় বছরের ছোট ছেলেটা বাবার সাথে তাল মিলিয়ে হাটতে পারছে না। সে অনেকটা দৌড়াচ্ছে। ছেলেটির নাম নয়ন। নয়ন বারবার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর তার বাবাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এটা সেটা নিয়ে প্রশ্ন করছে।
একসময় বড় রাস্তাটি শেষ করে তারা গ্রামের পথে ঢুকে পড়লো। বাড়িতে এসেই প্রথমে নয়ন চিৎকার করে উঠলো,"মা! ও মা! কই তুমি? বাইরে আসো।"
তারপর ফরিদ মাথার ঝুপড়ি টা মাটিতে নামিয়ে ডাকলো,"নয়নের মা! বাইরে আসো।"
এক হাতে হাতপাখা, আরেক হাতে কাঁসার গ্লাসে করে ঠান্ডা পানি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলো নূরজাহান। তাড়াতাড়ি পানির গ্লাসটি ফরিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে শুরু করলো। ফরিদের ডান হাতটা আস্তে করে ধরে টান দিয়ে নূরজাহান মায়া জড়ানো কণ্ঠে বললো," কি যে মরার গরম পড়ছে! আসো, গাছতলায় আইসা বসো।"
ফরিদ হাতটি ছাড়িয়ে কাধ থেকে গামছা টা নিয়ে হাতমুখ থেকে ঘাম মুছতে মুছতে ছায়াঘেরা বড় আমগাছটির নিচে এসে বসল। চৈত্রের শেষ দিক। গাছের আমগুলো বেশ বড় হয়েছে। চারদিকটা অসহ্য গরম হলেও গাছতলাটা বেশ শীতল। ঝিরিঝিরি বাসন্তী বাতাস বইছে। গাছতলায় বসে ফরিদ ঢকঢক করে ঠান্ডা পানি খাওয়া শেষ করে একটা দীর্ঘঃশ্বাস ছাড়লো! নিশ্বাসটা প্রশান্তির নাকি অশান্তির তা ঠিক বুঝা গেল না।
নূরজাহান বললো,"কাচা মরিচ দিয়ে আম মাখায় দিমু নাকি?"
ফরিদ আস্তে করে বললো,"না, থাক।"
তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। নূরজাহান উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। সে এবার খানিকটা ভীত গলায় প্রশ্ন করলো,"মরিচের বাজার কেমন? কত কইরা দাম পাইলা আইজ?"
"বাজার ভাল না। আজ দুই টেকা কেজি গেছে।"
"গরীবের কপালি এইরকম। যা করবা তাতেই মাইর খাইবা। গতবার পেয়াজের চাষ করলা, পেয়াজের দাম পইরা গেলো। আর এইবার মরিচ__"
ফরিদ ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলো,"নয়ন গেলো কই?"
"বাড়ি আসার পরি তো দৌড় দিয়া বাইর হইয়া গেলো। মনে হয় সাব্বিরগো বাড়ি গেছে খেলতে।"
"বউ!"
নূরজাহান মাথার ঘোমটা টা আরেকটু টেনে দিয়ে ফরিদের দিকে উৎসুক চোখে তাকায়।
ফরিদ বলে,"একটা খারাপ সংবাদ আছে।"
"কি সংবাদ?"
"থাক পরে বলবো নি__। এখন ভাল্লাগতেছে না। মাথাডা ঘুরতেছে। চোখটা জ্বালাপোড়া করতেছে। লুঙ্গি আনো। গোসলটা কইরা আসি।"
নূরজাহান আবার প্রশ্ন করবে ভাবল। কিন্তু ফরিদের দিকে তাকাতেই তার আবার মায়া হলো।
 "আহ! বেচারা! সারাটাজীবন কষ্ট করতে করতে চলে যাচ্ছে! থাক বলতে যখন চাচ্ছে না তখন নাই বলুক। শুধু শুধু লোকটাকে বিরক্ত করা উচিৎ নয়। এমনিতেই এই ভরদুপুরের কড়া রোদ্দুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাট থেকে এসেছে।"
সেইসাথে তার মনে একটা অজানা আশংকা এসে ভর করলো। কি খারাপ খবর?

৩||
গ্রামের বাইরে বড় রাস্তাটির পাশে এক টুকরো জমি আছে ফরিদের। সেটুকু চাষ বাষ করে কোন রকমে চলে যায় তাদের তিন জনের ছোট্ট সংসার। তার যখন আঠারো বিশ বছর বয়স তখন তার বাবা তার মা জীবিত থাকতেই আরেকটি বিয়ে করেন। বিয়ের কয়েকদিন পরেই ফরিদকে আর তার মাকে ফরিদের বাবা আলাদা করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। থাকার জন্য অন্য ভিটায় একটি ছোট্ট একচালা ঘর তুলে দেয়। যার ছাদটা টিনের হলেও চারদিকের বেড়াটা পাটখড়ির। আর বেঁচে থেকে কোনরকমে জীবন পার করার জন্য দেয় বড়রাস্তার পাশের একটুকরো জমি। ফরিদের মা ফরিদের বিয়ের কয়েক বছর পরই মারা যায়। তার বাবা নতুন বিয়ে করা বউ নিয়ে বেশিদিন সুখে বাঁচতে পারলেন না। কয়েক বছরের মাথায় বাবা মারা গেলেন। কিন্তু মারা যাবার আগে তার সমস্ত সম্পত্তি নতুন বউ এর নামে উইল করে দিয়ে গেলেন। মহিলা তখন তার আগেকার স্বামী পোলাপান নিয়ে এসে রাজার হালে ফরিদের বাবার বিশাল সম্পত্তি ভোগ দখল করতে লাগল।

যেটুকু জমি সে পেয়েছে তাতে তার কোনরকমে বছর চলে যায়। কিন্তু পুরোনো একচালাটি এখন আর বসবাসের উপযোগী নাই। তার চাল ফুটো হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘর পানিতে ভেসে যায়। নূরজাহান স্বামীর কষ্ট বুঝে। তাই সে কোন অযৌক্তিক দাবী তার স্বামীর কাছে করে না। কখনো মুখ ফুলিয়ে বলে না,"নতুন ঘর দেও। এই ঘরে কি মানুষ বাস করে!" তাই বৃষ্টিতে যখন ঘর ভেসে যায়, তখন সে নয়নকে কোলের মাঝে জড়িয়ে রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বিকট শব্দের সাথে বিদ্যুৎ চমকালে ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক গলে সমস্ত ঘর আলোকিত হয়ে উঠে! ভয়ে চিৎকার করে উঠে মা ছেলে। ফরিদ চুপচাপ দেখে। তার মনটা হুঁ হুঁ করে কাঁদে। কিন্তু চোখ মুখ কিছু বলে না। ভাঙ্গা ঘরটির এবার এমন অবস্থা যে কোনরকম একটু বাতাসের ছোঁয়া পেলেই ঘরটা নিশ্চিত ভেঙ্গে পড়বে। এসব দেখে সে এবার যেভাবেই হোক না কেন ঘরের চাল, বেড়া পাল্টে নতুন ঘর দেয়ার পণ করেছিল।

কিন্তু ভাগ্য সবসময়ই তার প্রতিকূলে। গতবার সে পেঁয়াজের চাষ করলো। কিন্তু গতবার পেঁয়াজের দাম একেবারেই অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল। আর মরিচের দাম হলো আকাশ ছোঁয়া। আর এবার সে তাই মরিচের চাষ করলো। কিন্তু মরিচের দাম এবার কমে গেল। অতএব, ঘরের চালা যে এবার পরিবর্তন হবে না তা নিশ্চিত।

৪||
রাতে ভাত খাওয়া শেষ করে ফরিদ বিছানায় বসে আছে। নয়ন ঘুমিয়ে গেছে। নূরজাহান তখন চুপিচুপি পাশে এসে বসল ফরিদের। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলো,"তখন কি খারাপ খবরের কথা যেনো বলতে চাইছিলা?"
ফরিদ কিছুক্ষণ তার বউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আহ! কি ভাল একটি মেয়ে! কি সুন্দর মায়া চেহারা! ভাসা ভাসা চোখ। অথচ তার মতো অধমের সাথে মেয়েটির বিবাহ হয়ে সারা জীবনই কষ্টে কষ্টে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতো সুন্দর পুতুলের মতো বউকে সে পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখা তো দূরের কথা একটা ভাল ঘরেই রাখতে পারে না। পারে না বউএর কোন সখ আহ্লাদ পূরন করতে। নূরজাহানো কোনদিন অযৌক্তিক কোন কিছু দাবী করে নি স্বামীর কাছে। তার চাওয়া খুবই সীমিত। নতুন নতুন বিয়ের পর কয়েকবছর ফরিদ তাকে যাত্রা দেখাতে নিয়ে যেতো মেলাতে। তখন সে সমস্ত মেলা ঘুরে দেখে সমস্ত দামী দামী জিনিস বাদ দিয়ে ফরিদকে বলতো,"আমারে এই সাদা কাঁচের চুড়িগুলা কিনা দিবা?"
এসব কারণে, নিজেকে তার ভীষণ অপরাধী মনে হয় মাঝে মাঝে।

কিছুক্ষণ পর ফরিদ গলা ঝেড়ে বললো,"চৈত্রের আর কয়দিন আছে? মাস শেষ হইব কবে?"
"এইতো শেষের দিকে। আর কয়েকটা দিন আছে। কেন? মাস শেষ দিয়া কি হইবো?"
"বাজারে যে দোকান থেকে বাকি জিনিসপত্র চাল ডাল আর ক্ষেতে দেয়ার জন্য সার কিনছিলাম ঐ দোকান থেইকা হালখাতার দাওয়াত দিছে।"
নূরজাহান চোখ বড় বড় করে বললো,"কত টেকা হইছে ঋন?"
"নয় হাজার পাঁচশো আটত্রিশ টেকা।"
"আল্লাহ! এতো টেকা কই পামু? এখন কি হইবো? কবে হালখাতা?"
"বছরের প্রথম বিষ্যুদবার।"
"আল্লাহ! আর মাত্র কয়ডা দিন! এহন কি হইবো?"
ফরিদ জড়ানো কণ্ঠে বললো,"জানি না। কিচ্ছু জানি না। আমার খুব অস্থির লাগতেছে !"
কিছুক্ষণ পর আবার বললো,"ভাবছিলাম মরিচ বিক্রি কইরা টেকা শোধ দিয়ে দিমু। কিন্তু দেহো, আমাগো কি কপাল, মরিচে দাম এমন কমা কমলো যে টাকা জমায়ে শোধ দেয়া তো দূরে থাকুক, নিজেগো তিনবেলা ভাত খাওয়ার টাকায় নাই!"
"মহাজনরে বইলা কয়া সময়ডা একটু বাড়ানো যায় না? এই ধরো আষাঢ় শাওন মাস?"
"না। আইজ এই কথা কওনে আমারে ভরা বাজারে যা তা বইলা অপমান করছে।"
বলতে বলতে ফরিদের চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। একটু পর সে সত্যই হুঁ হুঁ করে কাঁদতে লাগলো। নূরজাহান স্বামীর কান্না শুনে দিশেহারা হয়ে গেলো। সে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার ভেতরটা যেন কেমন করছে সে বুঝাতে পারছে না। মনে হচ্ছে হঠাৎ আসা ঝড়ে তার ভেতরের সবকিছু ভেঙ্গে চুড়ে যাচ্ছে। ফরিদ শান্ত হয়ে আবার বললো,"সামনে আবার আসতেছে কালবৈশাখী! কয়েকদিনের ভিতর শুরু হইব ঝড়ি তুফান! ঘরটাও ঠিক করা হইলো না!হইবোও না। আমরা কেমনে বাঁচুম রে বউ?"

৫||
একটা করে দিন যায়। ফরিদের মাথায় চিন্তার ভাঁজটা তত গাঢ় হয়। কি করবে সে কিছুই বুঝতে পারে না।
এর ভেতর সে একদিন বাজারে গিয়েছিল। সে মহাজনকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছে। হাতে পায়ে ধরেছে। সে এখন কিছু টাকা দিতে চেয়েছে বাকিটা আস্তে আস্তে পরে শোধ করে দিবে বলেছে। মহাজন রাজি হয় নাই। উল্টো তাকে ফকিন্নির বাচ্চা বলে গালি দিয়েছে। বলেছে,"ফহিন্নির বাচ্চা! টাকা শোধ দিতে পারবি না তাইলে বাকি নিছস ক্যা? পেটের মধ্যে পাথর দিয়া গুতা দিলেই যা যা নিয়া খাইছস সব বাইর হইয়া যাইবো। আমার টাকা আমি যেনো বিষ্যুদবারে পাই। দাওয়াত দিছি, খাবি, টাকা দিবি, চইলা যাবি। আবার নতুন করে বাকি নিয়া খাইবি।"

আগামীকাল নতুন বছর শুরু হবে। পহেলা বৈশাখ। এখন মাঝরাত্রি। দূরের জেলে পাড়া থেকে একটানা বাজানো ঢোলের শব্দ ভেসে আসছে। চৈত্র পূজা হচ্ছে। ছোটবেলায় ফরিদ তার বাবার সাথে চৈত্র পূজা দেখতে গিয়েছিল একবার। পূজার একপর্যায়ে পুরোহিত মন্ত্র পড়ে এক ব্যক্তির জিহবার ভেতর দিয়ে আস্ত বড় একটা লোহার শিক গেথে দেয়। সেই শিক গাথা দেখে সে সেদিন খুব কেঁদেছিল। তারপর থেকে প্রতি পহেলা বৈশাখের আগের রাতে সে শুধু ঢোলের শব্দটাই শুনে, কিন্তু পূজাটা দেখতে যায় না। এদিক থেকে অনেকেই যায় পূজা দেখতে। কিন্তু ফরিদের এসবের কিছুই মাথার ভেতর নাই এখন। সে চিন্তা করছে আর মাত্র কয়েকটা দিন! সে এতোগুলো টাকা কোথায় পাবে? তার রাতে ঘুম আসে না। টাকা দিতে না পারলে পুলিশ পাঠিয়ে তাকে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়েছে। ইদানীং এসব নানান চিন্তায় তার রাতে ঘুম আসে না। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে সব ছেড়ে। সকল বন্ধন ভেঙ্গে!

৬||
বৈশাখের দ্বিতীয় দিন। সারাটা সকাল দুপুর কি প্রচন্ড গরম। মৃদু হাওয়া ফসলী মাঠ থেকে বইয়ে নিয়ে আসছে ভ্যাপসা গরমের ফুলকি!  বিকেলের দিকে হঠাৎ করে আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেলো! মেঘ জমতে জমতে এমন ভয়ংকর রূপ ধারন করলো যে দিনের বেলাতেই রাত নেমে এলো! চারদিকের গুমোট আবহাওয়া। ভ্যাপসা গরম। হঠাৎই শুরু হলো প্রচন্ড জোড়ে বাতাস। ফরিদের একচালাটা ভয়ংকর ভাবে নড়ে উঠলো। ফরিদ ক্ষেত থেকে দৌড়ে বাড়ি এসে দেখলো তার বউ সন্তান শোবার চৌকির নিচে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। এটাই একমাত্র নিরাপিদ জায়গা। তার দাদার আমলে বানানো চৌকিটা বেশ মজবুত। সমস্ত ঘর উড়িয়ে নিলেও তাদের কিছু হবে না। আবার চৌকির উপর টিনের চাল কিংবা ভাঙ্গা ডাল এসে পড়লেও আহত হওয়ার সম্ভাবনা কম। নয়ন ভয়ে মায়ের বুকটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিশ্চল হয়ে আছে। তারপর ফরিদও কিছু না বলে চুপিচুপি আমকাঠের বানানো চৌকির নিচে ঢুকে নূরজাহান এবং নয়নকে বাহুতে টেনে বসে রইলো। নূরজাহান এবার চিৎকার দিয়ে উঠলো। সে এতক্ষণ ভয়ে চিৎকার দেয়ার শক্তি হাড়িয়ে ফেলেছিল। ফরিদকে দেখে সে যেন অনেকটা সাহস পেলো। মেয়েটা জড় তুফানে খুব ভয় পায়। মায়ের সাথে সাথেই কেঁদে উঠলো নয়ন।
"আজকে আমরা মইরা যামু। আল্লারে আমাগো বাঁচাও।"
ফরিদ দিশেহারা হয়ে গেলো। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। যেমনভাবে বসে ছিল ঠিক তেমনি গুটিসুটি মেরে বসে রইলো।
ঝড়ের তান্ডবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। গাছলালা ভেঙ্গে পড়ছে, শিকড় উপড়ে যাচ্ছে।ডালপালা ভেঙ্গে উড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মটমট করে ফরিদদের উঠানের আমগাছটার একটা বিশাল ডাল ভেঙ্গে পড়লো। নয়ন আর তার মা একযোগে চিৎকার দিয়ে উঠলো,"ওরে মাগো! ওরে বাবাগো!"
মাঝে মাঝে এমন ভয়ংকর বিকট শব্দে বজ্রপাত হচ্ছে যার শব্দে আর আলোয় তাদের অন্তরাত্মা পর্যন্ত শুঁকিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত ঘর পানিতে ভেসে গেছে। তাদের পুরো শরীর ভিজে গেছে। তাদের ঘরের ভেতর নানান ধরনের গাছপালার ভাঙ্গা ডালপালায় ভরে গেছে।

অনেকক্ষণ, কতক্ষণ তারা জানে না। ঝড় যখন থামলো তখন তারা আস্তে আস্তে চৌকির নিচ থেকে বের হয়ে আসলো। চারদিক কি নিশ্চুপ! ঠান্ডা অল্প বিস্তর হাওয়া বইছে। ফরিদের ঘরটা আর নেই। কোথায় চালা? কোথায় বেড়া? কিছুই নেই। তীব্র বাতাস সব উড়িয়ে নিয়া কোথায় ফেলেছে, কে জানে! আমগাছটার ডালপালা ভেঙ্গে উঠান জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কতশত সবুজ কাঁচা আম পড়ে আছে চারদিক! হাস মুরগীর খোপটা উল্টে পড়ে আছে। ভেজা ছাগলটা ম্যা ম্যা করে ডাকছে। ছাগলটা ঝড়ে মরে যায় নি, এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার! নূরজাহান চিৎকার করে কেঁদে উঠলো,"ওরে আল্লারে! আমাগো এহন কি হইবো রে! আমরা এহন কই যামু! কই থাকুম!"
নয়ন চোখ মুছতে মুছতে বুঝার চেষ্টা করছে সে কোথায় আছে। তাদের ঘরটা কোথায় গেলো? সেখানে তো শুধু একটা শোওয়ার চৌকি পড়ে আছে।

এই ঝড়ের পর ক্ষেতের মরিচগাছগুলোর যে আর একটিও আস্ত নেই সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যে দু একটা বাঁচা আছে সেগুলোও ক্ষেতে জমা পানির কারণে একটু রোদ উঠলেই শিকড় পঁচে মারা যাবে। অতএব আয়রোজগার যা কিছুটা ছিল এখন তাও হবে না।

আশেপাশের পাড়া থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বললো,"নয়নের মা! দেহোতো ট্রাংকের সব জামাকাপড় শুকনা আছে নাকি?"
চৌকির নিচ থেকে ট্রাংক টা টেনে বের করে দেখলো সেখানে পানি যায় নি। তারা খোলা আকাশের নিচে ভেজা কাপড় পাল্টালো।
ফরিদ কিছুক্ষণ বাড়ির চারদিকটা ঘুরে দেখলো। তারপর বললো,"সব গোছগাছ করো যা যা আছে।"
নূরজাহান জিজ্ঞেস করলো,"কেন?"
"ভোরের বাস ধইরা আমরা ঢাকায় চইলা যামু।"
নয়ন ফরিদের একটু কাছে আসতেই তাকে কোলে নিয়ে ফরিদ আস্তে আস্তে করে অদ্ভুত কণ্ঠে বলতে লাগলো,"আহারে বাজান! আমাগো আর কিছুই নাই রে! আমাগো আর কিছুই নাই। সব শেষ হয়া গেলো রে!"
আজ তার সকল বন্ধন মুক্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতিই তাকে সকল ঋন, দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সে কেন তা গ্রহণ করবে না?

 পরিশিষ্ট||

বড় রাস্তাটি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে তিনজন মানুষের ছোট্ট একটা দল। তাদের সাথে রয়েছে একটি ছাগল, কয়েকটি হাস মুরগী, জমানো অল্পকিছু টাকা আর ঝড়ের পর অবশিষ্ট থাকা জিনিসপত্র। মাঝে মাঝে বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে ফরিদ জলভরা নয়নে পেছনে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে চিরপরিচিত ভিটা মাটি, ক্ষেতের ফসল আর গাছপালা সবাই একযোগে তার জন্য কান্না করছে তার জন্য।

তবু তারা ধীর পায়ে নিঃশব্দে হেটে যাচ্ছে বড় রাস্তাটি ধরে। ভোরের আগেই তাদেরকে বাসস্ট্যান্ডে পৌছাতে হবে। তদের মাথার উপর শুক্লপক্ষের অর্ধচন্দ্র। চাঁদের আলোতে ঝিকিমিকি করছে হালকা বাতাসে দোল খাওয়া খেজুর গাছের পাতাগুলো। জোছনার আবছা আলোতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চিরপরিচিত আঁকাবাঁকা বড় রাস্তাটি। মাঝে মাঝে অজানা আশংকায় ভরে উঠছে ফরিদ আর নূরজাহানের মন! কেমন হবে তাদের এই অনিশ্চিত পথোযাত্রা?
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

6 Comments:

MD Amir বলেছেন...

প্রিয় বন্ধু রনি...
গল্পটি সত্যিই মুগ্ধ করার মত ছিল😍😍😍

MD Amir বলেছেন...

প্রিয় বন্ধু রনি...
গল্পটি সত্যিই মুগ্ধ করার মত ছিল😍😍😍

Rejaul Karim বলেছেন...

বন্ধু রনি, গল্পটি তুই মনে হয় আমাকেই প্রথম দেখিয়েছিলি।সেদিনই আমি মুগ্ধহয়ে গেছিলাম।। আগামীতে আরও
সুন্দর লেখার প্রত্যাশায় রইলাম����

Unknown বলেছেন...

খুব ভালো লাগছে ভাই গল্পটি ভবিষ্যতে আরো ভালো কিছু কামনা করছি

নামহীন বলেছেন...

মানিক বন্দোপাধ্যায় এর উত্তরসূরী।

মাহমুদুল হাসান বলেছেন...

মানিক বন্দোপাধ্যায় এর উত্তরসূরী।