'অযোগবাহবর্ণ', এবং 'আদি ধর্ম কথা ' ও মাধবী দাস : রুদ্রসাগর কুন্ডু

'অযোগবাহবর্ণ', এবং  'আদি ধর্ম কথা ' ও মাধবী দাস : রুদ্রসাগর কুন্ডু

সম্প্রতি কবি মাধবী দাস রচিত, দুটি কবিতার বই হাতে পেলাম। একজন কবিতাপ্রেমী-পাঠক হিসেবে মনোযোগ সহকারে কাব্যগ্রন্থ দুটো পড়ে ফেললাম দ্রুততার সঙ্গে। মাধবী দাস রচিত ২০১৭ সালের বইমেলায় প্রকাশিত কবিতার বই, 'অযোগবাহবর্ণ' এবং ২০১৮ সালের মে মাসে প্রকাশিত 'আদি ধর্ম কথা'।

উল্লেখিত কাব্য গ্রন্থ দুটি, অমোঘ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুর মতো আমাকে মুগ্ধ করেছে । অধিক মনোযোগ সহকারে পড়ার দরুণ; কিছু অনন্য অনুভবের অভিজ্ঞতা হলো। একজন কবি তাঁর কাব্য রচনার গুণে, কীভাবে পাঠককে আকর্ষণ করেন, এই গ্রন্থ দুটি পড়লে, তা সহজেই অনুভব করতে পারা যায়।

কবি মাধবী দাস একজন প্রথম শ্রেণির কবি। প্রতিটি কবিতার গঠন, ও প্রকাশের ভঙ্গিতে তার প্রমাণ মেলে সহজেই। আসলে সত্যি কথাটা হল, কাব্যগ্রন্থ-দুটোর নামের-উপরে মাধবী দাস-এর বদলে কোনও খ্যাতনামা কবির নাম ছাপা থাকলে, হয়তো আমার মত অনেকেই লিখতেন, `এই কবির কলম বেশ বলিষ্ঠ।'

কোথাও কোনও শব্দ-বিরোধ নেই। শব্দ ব্যবহারের নৈপুণ্য, উপমা ব্যবহারের সুচারু দক্ষতা, কবির দুটি গ্রন্থের কবিতার মাধ্যমে সহজেই প্রমাণ মেলে। তাঁর কাব্য প্রতিভার স্বাভাবিক ক্ষমতাই প্রমাণ করেছেন, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। যেখানে পাঠক অবশ্যই কবিতার ছত্রে ছত্রে নিজের প্রাত্যহিক জীবন-যাপনের স্বাক্ষর খুঁজে পাবেন, যে কবিতা পাঠককে বারবার পড়তে হাতছানি দেয়। আর নিমগ্নতার আবেগ বারবার হাতছানি দেয় কবিতার গভীরে।
মাধবী দাস

আসলে, কবিতাকে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক সামঞ্জস্যপূর্ণ সংমিশ্রণ-এ নির্মাণ করেছেন তিনি। মানুষ, সে--যে ধরনের পাঠকই হোক না কেন, সব সময় শব্দে শব্দে কবির রচনায় নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। বাক্যের নিবন্ধন হারিয়ে ফেলতে চায় নিজেকে। শব্দের উপর অসামান্য দখলদারি নিয়ে মাধবী দাস কবিতা রচনা করেছেন। দুটি বিপরীতধর্মী শব্দকে তিনি অনায়াসে, দক্ষতার পাশাপাশি রেখে, জীবনের কথা বলতে পারেন। যে কাজ কোনও মধ্য-মেধার কবির পক্ষে অসম্ভব। অর্থাৎ কিনা কবিকে মেধাবী বলার পক্ষপাত ছাড়া আমার আর গত্যন্তর নেই।

তাঁর কাব্যচর্চা যে, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল, সেটা তাঁর কবিতা পাঠ করলে খুব সহজেই বোঝা যায়। কষ্টকর হাফ অবান্তর কল্পনার আশ্রয় তিনি নেননি। অযথা দুর্বোধ্য শব্দের জাগলারি করে কবিতাকে ভোঁতা করেননি। তিনি যে, কবিতার জন্য বহু বছর এবং এখনও প্রতি মুহূর্তে ভাবেন, মেধা খরচ করেন, সেটারই স্বাক্ষর তার প্রতিটি কবিতাই বহন করছে।

৫১১ টি লাইক পাওয়া একটি কবিতা 'বৃত্ত' যেখানে একটি লাইনে এসে পাঠক থমকে যাবেন--'সব জীবনের ক্ষেত্রফল থাকে না ' এটা অতি সাধারণ একটি কথা, কিন্তু যে কোনও পাঠক স্তব্ধ হবেন। আমাদের আটপৌঢ়ে অনুভবে বৃদ্ধ পণ্ডিতের ছুরির মতো দাগ দিয়ে যায় রক্তমাংসের মেধায়। লেখাটির শেষ হয় এভাবে -'আমি ব্যাসার্ধের হাত ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়াবো' এটি একটি গণ-মিডিয়া। ফেসবুক থেকে পাওয়া আরও একটি কবিতার কথা জানাই, ত্রিভুজের কোণ-এর নাম যদি হয় শাবানা নামের কোন উদাসী মেয়ে আর অন্য দুটি কোণে বসে থাকে মেয়েটির মন খারাপের বাবা-মা (কৌণিক দূরত্ব)।

কবি মাধবী দাস তার কবিতায় এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দক্ষতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারেন। এজন্য তাঁকে কষ্টকর কল্পনার আশ্রয় নিতে হয় না। তিনি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই প্রেম, প্রকৃতি এবং বিষয় ভিত্তিক অনুষঙ্গে বিচরণ করতে পারেন অনায়াসে। পণ্য-নির্ভর সমাজে সাহিত্য-শিল্প বিজ্ঞান সবই যে বিক্রয়যোগ্য এ বোধ কবিকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করে, তার কবিতায় সে প্রমাণ পেতে আমাকে কষ্ট করতে হয়নি । তিনি যখন লেখেন -' আমার বিশ্বাস পুড়ে বিশ্বায়ন আসে' বুঝতে বাকি থাকে না মাধবী দাস একজন আদ্যোপান্ত সমাজ সচেতন কবি।

যাঁরা কবিতার প্রতি নির্মোহ তাদের কাছে আমার আবেদন থাকল মাধবী দাস এর কবিতা পড়ুন, তারপর বলুন যে, বাংলা সাহিত্যে ভালো কবি উঠে আসছে কিনা। আসলে মাধবী দাস এর মতো বলিষ্ঠ কবিরা প্রচারের আলোয় আসার সুযোগ পান না। যে কারণে আমরা অনেক আগামী দিনের মাধবী দাসকে অসময়ে হারিয়ে ফেলি। এই কবি কবিতার নির্বাচিত বিষয়বস্তুতে সাহারার বালি থেকে প্রাসঙ্গিকভাবে সাগরের শব্দতে নিয়ে যান। যাঁরা কবিতার নিয়মিত পাঠক তাঁরা বুঝবেন যে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে বিষয়টা বেশ কঠিন কিন্তু এই অসম্ভবকে অনায়াসে কাব্যিক মাধুর্য বজায় রেখে এগিয়ে চলেন তিনি ।

লেখেন --

"পুরোহিতের রং চটা নামাবলীর মতো অবিশ্বাস ঝুলে রয়েছে সংসারের গিঁটে গিঁটে ।"

অথবা

"এক কাপ চা যথেষ্ট/ কত দূরে যাবে যাও না
আমি চা দিয়েই বিরহ গিলবো।
রং নিয়ে মাথা ঘামানো আমার কাজ নয়
রং থেকে প্রেম তুলে নিলেই
শুন্য বুকে সুখ যাপন করে বিশ্বাস"
"যতটুকু ছুঁলে স্পর্শকে ছোঁয়া যায় সেই নিয়তির অনুভূতি ছুঁয়ে আছি।"

বাংলা ভাষার দশকওয়ারী কবি, উত্তরবঙ্গের কবি, সুন্দরবনের কবি... এই অভিবাসন কৃশ মনে হয়। তবুও স্থানিক বিচারে বলতে হয়, এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে আরও অনেক কবি উঠে আসছেন। অনেককেই দেখি আগ্রাসী। কবির প্রতি সম-নির্মাণের এসব একটি যাপন অনেকটাই এগিয়ে দেয় বৈকি। যতদূর শুনেছি, মাধবী দাস এইসব বৃত্তের বাইরে।  তিনি শিক্ষকতা, স্কুল, ছেলে-স্বামী নিয়ে ভরপুর কবি ও সংসারী। ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি কুচবিহার জেলার ২ নং কালীঘাট রোড এ আটপৌরে পরিবেশে কবির জন্ম । বাবা মা দুজনেই শিক্ষকতা করতেন। বিবাহ সূত্রেও কুচবিহারের স্থায়ী বাসিন্দা।

কবি মাধবী দাস বিভিন্ন দৈনিক পত্র পত্রিকায় নিয়মিত বুক রিভিউ, ফিচার, প্রবন্ধ, গল্প কবিতা লিখে ইতিমধ্যে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। 'অযোগবাহবর্ণ 'একটি অনবদ্য নির্মাণ বিশেষ। 'গোল্লাছুট' নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘদিন। এই পত্রিকার দায়িত্ব তিনি নিজেই সামলাচ্ছেন। বেশিরভাগ কবিতাতেই ছন্দ সচেতনতা রাখেন। আবার তাঁকে দেখা যায় ছন্দের জাল থেকে মুক্ত হয়ে উত্তর আধুনিকতার ছাপ নিয়ে, তার মেধাবী অনুশীলন। কবিতা যাপন কতটা সার্থক তা চিহ্নিত হয়ে থাকবে সময়ের নিরিখে। অভিনন্দন নামক একটি কবিতার এক আত্মিক উচ্চারণ-
"অভিনন্দন সকলকে
এভাবে পিছনে ফেলেছো বলেই
এত অশ্রু জমাতে পেরেছি দুচোখের আঁধারে "

একজন কবির অবশ্যই রক্তমাংসের প্রেম ঘৃণা একাকিত্ব দহন যাতনায় সমৃদ্ধ হতে হতে চিন্তায় ফুটতে ফুটতে লেখা হয়ে ওঠে উপরে আলোচিত এই কবিতাংশ গুলি।

কবি মাধবী দাস সহজ-সরল শব্দের মায়াজালে পাঠক কে ধরে রাখতে পারেন, এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস মাধবী দাস, একজন লম্বা রেসের ঘোড়া, বিপুল সম্ভাবনাময় কবি। তাঁর কবিতার শব্দগুলোতে নকশিকাঁথার সুন্দর কাজ বর্তমান। যে কোনও দিনও কবিতা পাঠ করেননি তিনিও মাধবীর কবিতার কাব্য রসে খুব সহজেই সিক্ত হবেন ।একাধিক বিপরীত ধর্মী শব্দকে একই লাইনে সাজিয়ে দেওয়া বড় কঠিন কাজ হলেও এই বিষয়টা তিনি সাধারণ পাঠকের কাছে অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। একটি উদাহরণ দিয়ে প্রসঙ্গ শেষ করলেই পাঠক বুঝতে পারবেন যে, তার কাব্যচর্চা শুধু সৌখিন মজুরি নয়---


মোহবন্ধ

মাধ্যম হিসেবে চাইনি কাউকেই কোনোদিন আমি

রৌদ্র-রং মেখে যেন দাঁড়ালেই গান ভুলে যাই

মেঘ দে পানি দে আল্লা মেঘ দে পানি দে...

কবিতাকে ভালোবেসে যে আত্মহনন করে রোজ

অসময়ে গেয়ে ওঠে রবি ঠাকুরের গান - চটকা

কবিতাকে ভালোবেসে একটু একটু করে প্রতিদিন
যে কবিতা হয়ে ওঠে
ভালোবাসে তাকে এই মন
তাঁর হাত ধরে ধরে মেঘে মেঘে স্বপ্ন বুনি রোজ

শরতের ছেড়া মেঘ জুড়ে জুড়ে ওড়না বানিয়ো না
সমস্ত লজ্জার মাথা খেয়ে বসে আছি অবেলায়
ওড়নার মোহগন্ধে সিঁড়ি গুলো সাপ হয়ে যায়
দুর্বল যা ভঙ্গুর তা, অক্ষম সিঁড়ি বেয়ে উঠব না

এসব থেকে বরং আরও ছন্দময় করে তোলো

ছন্দেবন্ধে ভেসে ভেসে তোর্ষা তিস্তা মহানন্দা হয়ে

আত্রেয়ীর বুক বেয়ে গঙ্গানগরের কোণে কোণে

কবিতার মতো প্রিয় ভালোবাসা খুঁজে পেতে চাই

Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.