ত্রিচরিত্র : প্রীতম বোদক

ত্রিচরিত্র  :  প্রীতম বোদক
ত্রিচরিত্র  :  প্রীতম বোদক

(একটি বিশ্বাস ঘাতকের ইতি কথা)


"প্রেম" এই ছোট্ট শব্দ টির মধ্যে কতো টা ভালোবাসা কতো টা কষ্ট কতো টা অবহেলা আবার কতো টা বিশ্বাসঘাতকতা লুকিয়ে আছে তা হয়ত জানতাম না যদি সোনালি কে ভালো না বাসতাম। সোনালি আমাদের পড়ার ব্যাচে এক শান্ত ও মেধাবী ছাত্রী ছিলো। পড়াশোনা তে এতোটাই ভালো ছিলো যে শ্যামল স্যার বারবার ওঁকে দিয়ে উদাহরণ দিতেন সব সময়ই। আমাদের বন্ধুত্ব টাও অটুট ছিলো, রীতিমত ওঁর বাড়ি তে খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে ওঁর আত্মীয়দের বাড়ি নিমন্ত্রণ সবই পেতাম। আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কের বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো সেই ছেলে টা কে নিয়ে যার নাম আমার ঠোঁটে কোনে সব সময়ই থাকতো, রাজু। তিনজনের মধ্যে যে সরলতা ছিল তাতে হাজার আঘাত করলেও আমাদের কেউ বিভক্ত করতে পরত না। রাজু আর আমি একই ক্লাবে ফুটবল খেলতাম, ইচ্ছা ছিল বড় ফুটবলার হবার বড় দলের হয়ে খেলার। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি তিনজনই, আমাদের ছেলে মানসি বন্ধুত্ব টা আরো গভীর হচ্ছে আরো যৌবন হয়ে উঠছে। তখন কার্টুন চরিত্র খুবই কাল্পনিক লাগতে শুরু করল। একটা সময় যে ছেলেটা "শক্তিমান" ধারাবাহিক দেখতো টিভি তে আজ সেই "কহোনা প্যার হে" "মহব্বতে" মতো সিনেমা  দেখতে শুরু করলো। আমরা তিন জনেই দেখতাম। বারবার দেখতাম। কেনো যে দেখতাম তাও জানি না। আসলে ভালো লাগতো বলেই দেখতাম। আসতে আসতে নারী পুরুষের ভালোবাসা শুধুই ভাই বোন মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তা বুঝতে শিখলাম। তখন স্কুলে যাবার আগে বেশি সময় টা আয়নার সামনে কাটিয়ে দিতাম চুল ঠিক করতে আর মা এর ব্যবহার করা ফ্রেশ ক্রিমের সত ব্যবহার করতে। সে এক অদ্ভুত ভালো লাগার মধ্যে যাচ্ছিল দিন গুলো। এই পরিবর্তন টা শুধুই যে আমার মধ্যে ছিলো তা কিন্ত নয় এটা ওঁদের মধ্যেও ছিলো মানে সোনালি আর রাজুর মধ্যে। তখন পড়ার ব্যাচে সোনালি ছিলো সব থেকে সুন্দর, চোখে কাজল পরত ঠোঁটে গোলাপী রঙের লিপস্টিক পায়ে নুপুর পরে যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যেতো মনের ভেতরের সেই শাহরুখ খান জেগে উঠতো। খুব ভাল লাগত। আর সেই ভালো লাগা থেকেই যে কখন ভালোবাসে ফেললাম ওঁকে তা আমি জানিনা। জানি না কী মায়া ছিলো ওঁর দু চোখের কাজলে, জানিনা কী মধুর শব্দ ছিলো ওঁর নুপুরে, সামনে দিয়ে যখন যেতো ওর শরীর থেকে অ পার্থিব মুক্ত  ভালোবাসার গন্ধ পেতাম। আমাকে বারবার আকর্ষণ করেছে ওঁর কথা ওর নিষ্পাপ চাউনি, আর পড়ার ঘরের দক্ষিণের জানালা টা খুললে ওঁর চুল গুলো যখন উড়ে যেতো আমি জেনো অগভীর সমুদ্রের ডুবে যাচ্ছি আর ওঁ আমার অক্সিজেন হয়ে বারবার বাঁচিয়ে আনতো, আমার হাত ধরে কিনারায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতো। এই প্রথম বার কাউকে এতো টা ভালোবাসে ফেলেছি। কিন্ত তার মাঝেও একটা ভয় আমাকে গ্রাস করে রেখেছে বলবো কি করে তাকে? আমার ভালোবাসার নিবেদন, আমার প্রেমের প্রকাশ করবো কি করে?! ভয় ছিলো এতো বছরের বন্ধুত্ব হারানোর। যদি ওঁ রাগ করে, যদি ওঁ স্যার কে বলে দেয়, যদি ওঁ নিজের বাবা মা কে বলে দেয়, যদি ওঁ যদি ওঁ আর কথা না বলে আমার সাথে, তখন তখন কী হবে আমার?! এই ধরনের হাজার হাজার সংকোচের কাঁটা তারের বেড়া ওঁর আর আমার মাঝে মাথা উঁচু করে আছে। রাতে ঘুম হচ্ছে না, খেতে ইচ্ছা করছে না, পড়াশোনায় মন নেই অথচ সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা, আমি কি করবো আমার মাথা কাজ করছে না, আমি জেনো উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি ওঁর চোখে চোখ রাখতে পারছি না। অবশেষে থাকতে না পেরে ওঁকে বলতে যাবো কী রাজুর কাছ থেকে শুনলাম ওঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, খুব খুব  খারাপ ভাবে। আমার সমস্ত জোস যেনো লিক্ খাওয়া বেলুন এর মতো এক কোনে পড়ে রইল।প্রথমে ভেবেছিলাম বলব না, তারপর না বলে যে থাকতে পারলাম না, কিন্ত সোনালি কে নয় রাজু কে বললাম। ওঁকে সমস্ত ঘটনা বললাম কতো টা ভালোবাসে ফেলেছি কতো টা আকর্ষিত হয়েছি কতোটা আমার রাতের ঘুম কেরেছে সব বললাম সব সব। প্রথমে মুচকি হাসে রাজু বলল "তুই ওঁকে ভালোবাসিস? আগে বলিস নি তো আমায়!!" তোকে সব বলতাম কিন্ত খুব ভয় হচ্ছিল রে তাই কিছু বলতে পারি নি। রাজুর পরামর্শ দিলো এখন কিছু বলার দরকার নেই ওঁর বাবা অসুস্থ আছে ওর মাথা ঠিক নেই পরে অন্য সময় বলিস। আমি ওঁর কথা মতো কাজ করলাম কিছুই বললাম না। কিন্ত মন টা কে মানাতে পরছিনা। যতোটা পারছি ওঁর সাহায্য করার করছি তবে সবটাই রাজুর হাত দিয়ে কারণ ওঁর সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আমার জেনো নেই সামনে থাকলে হয়তো বলে বসবো যে ওকে কতো টা ভালোবাসি, কিন্ত এখন যে ঠিক সময় নয়, নিজেই নিজের মন কে বোঝালাম। একদিন খবর পেলাম যে ওর বাবার ওষুধ কিনতে কিছু টাকা লাগবে যা ওদের কাছে নেই। বেসরকারী হসপিটালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় জমানো সব টাকাই শেষ হয়েগেছে। পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিলো না কেউ না। আমি আর সাত পাঁচ না ভেবে বাবার আলমারি থেকে দুটো হাজার টাকা আর একটি পাঁচশ টাকার নোট চুরি করলাম আর সেই টাকা রাজুর কে দিয়ে বললাম ওঁকে দিয়ে দিস বলবি আমি আমি সবসময়ই ওঁর পাশে আছি। মাস খানেক পর ওঁর বাবা সুস্থ হয়ে উঠল দীর্ঘ যমে মানুষে টানা টানির পর। এখন সব ঠিক আছে আগের মতোই পড়তে যাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছিল। আমি ভাবলাম এই সুযোগে ওকে বলে দিই, হ্যাঁ বলেই দিই। নিজেকে প্রস্তুত করলাম। মনে মনে ভয় টা কে কাটিয়ে ওঠার পর একটি দিন ঠিক করলাম।
২২শে অক্টোবর  দুর্গা পুজোর দশমীর রেস কাটেনি তখনও একাদশী দিন সকাল ওঁর বাড়ির সামনে গিয়ে ওঁকে ডাকলাম আর দরজা খুললো ওঁর মা। কাকিমা কেমন আছেন বলে প্রণাম সেরে নিলাম আর জিজ্ঞেস করলাম সোনালি কোথায় কাকিমা? ও তো রাজুদের বাড়ি গেছে। ও আচ্ছা ঠিক আছে বলে বাবার সেই পুরাতন সাইকেল টা নিয়ে জোরে শব্দ করে চললাম রাজুদের বাড়ির পথে। কি সৌভাগ্য দেখো আমার বেশি দূর যেতে হলো না ওই মুচি পাড়ার গলির মুখে দেখা হয়েগেলো আমার রাজকন্যা আমার সোনালির সাথে। তোর সাথে কিছু কথা আছে। আমার কথা শেষ হবার আগেই একটু লজ্জিত ভাবে অও বলল আমারও কিছু কথা আছে তোর সাথে। আমি তো মনে মনে আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেলাম। তাহলে কি ওঁ এতো দিন আমাকে ভালোবাসতো?! ওঁ কি এতো দিন চেপে রেখে ছিলো?! আমি ওঁর কথা শোনার জন্য চোখের পলক পর্যন্ত ফেললাম না ওঁর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে শুরু করলাম। ঠিক সেই সময়ই স্যার ওখান দিয়ে যাচ্ছিল আর আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করল কি করছিস তোরা এখানে? যা বাড়ি যা। আর তোর বাবা সাইকেল টা দিয়ে আয় খুঁজছে সে কাজে যাবে বলেল। আমি মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছি ঠিক তখনই সোনালি কিছু একটা হাতে দিয়ে দিলো আর বলল দুপুর দুটো নাগাদ ফোন করিস আমি বুথে থাকবো। মনের ভেতরের সেই জমে থাকা কালো মেঘ কেটে গেলো, নিভে যেতে বসা প্রদীপ টা জেনো আগুনের স্পর্শ পেলো। দুপুর দুটো বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে থাকা টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করলাম ওঁর দেওয়া নাম্বারে। ফোনটি তুলে হ্যালো বলার সাথে সাথে আমার সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেলো।
--হ্যাঁ সোনালি বল।
--তুই কি বলবি বলছিলি।
-- তুই আগে বল।
-- কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না। জানিস রাজু... রাজু আমাকে প্রপোশ করেছে। আমি ভবতে পারি নি ওঁ আমাকে এতোটা ভালোবাসে শুধুই আমাকে নয় আমার মা বাবা কেউ খুব ভালোবাসে। আমি হ্যাঁ বলে দিয়েছি। আর হ্যাঁ বলবো নাই বা কেনো বল ও আমাদের খুব সাহায্য করেছে। যখন ওষুধ কেনার টাকা ছিলো না ওঁ  দিয়েছে। আমার বাবার পাশে থেকেছে। আমিও খুব ভাগ্যবানরে ওর মতো কাউকে পেয়ে।
আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি কথা বলার সুযোগ পেলাম না। আমার হাত পা কাঁপছিল জেনো হাজার হাজার টা তির এসে বুকে আঘাত করল, বিশ্বাসে আঘাত করলো, বন্ধুত্বের সম্পর্কে আঘাত করল। বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর জন্য যে ক্ষমতার দরকার হয় সেটা বোধহয় হারিয়ে ফেলেছিলাম তাই হয়তো বুথ এর মধ্যেই লুটিয়ে পরলাম।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.