![]() |
| সুবীর সরকার |
১।
কোন কোন দিন ভারী অদ্ভুত দিন। ভরে ওঠা দিন। অর্জন ও শিক্ষিত হবার দিন। লোকগানের দিন। কোন এক সকালে নজরুল দাকে নিয়ে আমার গাড়িতেই চলে গেলাম অসমের রতিযাদহর বিষখেওয়া গ্রামে। সেখানে থাকেন লোকগানের জাদুকর 'গোয়ালপারিয়া লোকগানের সম্রাট' আব্দুল জব্বার। আজ থেকে ২৭ বছর আগে জব্বারের গান শুনে চমৎকৃত হয়েছিলাম! তারপর তো জব্বার আর নজরুল দা আমার পরমাত্মীয় হয়ে গিয়েছেন।
১৯৭২-এ প্রথম গানের রেকর্ড হয় আব্দুল জব্বারের। সেই নিজের লেখা গান তার-মন মোর কান্দে রে/ গঙ্গাধরের ওই ভাঙণি রে দেখিয়া'। জব্বারের জীবন বহুবর্ন এক যাপনের জীবন। তিনি জাত শিল্পী। গানই তার সব। কিংবদন্তি গীতিকার ও শিল্পী,অসমের প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব আলাউদ্দিন সরকার নিজে হাতে তৈরি করেছেন জব্বারকে। জব্বার পেয়েছেন প্রতিমা বড়ুয়ার স্নেহ। আর এইমুহূর্তে উত্তরের স্বতন্ত্র স্বর নজরুল ইসলাম ।নজরুল গিদাল। আর জব্বার ও নজরুলের যৌথ লোকগানের আসর। আহা! একের পর এক দৃশ্যটুকরো বিনির্মিত হচ্ছে। চারপাশের চিরায়ত দৃশ্যের দিকে আমাদের হন্তদন্ত জীবনের দিকে তুমুল ধেয়ে আসছে লোকগানের জাদু। লোকগানের আদিঅন্তহীন ম্যাজিক। গান শেষে আঞ্জুভাবি কি পরম স্নেহে কি দুরন্ত আদরে ভাত খাওয়ালেন!গান শুনলাম পিঙ্কি দাসেরও। কি বলি! আমি ভাগ্যবান। এমনসব অসামান্য মুহূর্ত বারবার চলেই আসে আমার জীবনে!জব্বার দার বাড়ি থেকে ফিরছি। আর শরীরে লেপ্টে থাকছে অবহমানের এই গান
-'চাষার মুখত আর নাইরে সেই গান
বড় সাধের বাপ কালানী আই মোর
ভাওয়াইয়া ভাষা'।
ভালো থাকবেন জনাব আব্দুল জব্বার।
২।
'তোর্সা পাড়ের সোনার কইন্যা হে
নাইরে নাই মইসের বাথান
আছে রে ভাই ভাওয়াইয়া গান'
তোর্সাদেশ। উত্তরাঞ্চল।আমার যাপনভূমি। মিথ কিংবদন্তি লোকগান কুশান বিসহরা মারফতি সাইটল পালাটিয়া ঢোল দোতরা ব্যানা বাঁশি মেলা উৎসব মুখরিত সোনার বরণ সব জনমানুষের উত্তাপভরা এক মায়াময় জনপদ। এখানে জলাভূমিতে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে অনন্ত মহিষেরা। আর হাঁসের পালক থেকে জল ঝরে। গরুজলদেওয়া ঘাটের পাশে গ্রামীণ শ্মশান। আঞ্চলিক নদীর জলে ভেসে যাওয়া কত কত অঞ্চলকথা। মহারাজার ঘোড়া ছোটে আজও মেঘলা আকাশের নিচে স্মৃতিখামারের দিকে। এই জনপদ আমার জীবনকে গড়ে দিয়েছে। এই জনপদ আমার শিক্ষক।প্রনাম,তোর্সাদেশ...
৩।
অনেকটাই কথাবার্তা হলো শ্রীমতি জয়ন্তী বালা বর্মণের সাথে। শীতদুপুরে।সঙ্গী ছিলো তরুণ কবি নীলাদ্রি দেব। জয়ন্তীবালার
বয়স ৭৬১ কোচবিহার জেলার মধুপুর অঞ্চলে বাড়ি। ঠাকুরদাদা ছিলেন রাজ আমলের নামী জোতদার। মহেন্দ্র ধনী নামে যিনি পঞ্চাশ একশো গ্রামে পরিচিত। নিজের হাতিতে তালুক মুলুক ঘুরে বেড়াতেন। পাতলাখাওয়া ফরেষ্টে কোচবিহার মহারাজার শিকারজুলুসে অংশ নিতেন। ছোটবেলায় দেখা সব দৃশ্যগুলি চোখের তারায় ঝলসে ওঠা আলোয় অনর্গল বলে গেলেন তিনি। হেমন্ত শীতের রাত জুড়ে পালাগানের আসর, কুশান গানের খোসার সাথে অনাবিল সব নাচ, মাঠ মাঠ ধানের গন্ধের ভেতর কাটানো সব দিনগুলির কথা। জয়ন্তী বালা দের মতন আরো অনেক প্রবীণ মানুষেরা আজও রয়েছেন এই উত্তর জনপদে। যাদের সঙ্গে আলাপচারিতা চালিয়ে গেলে পুরোনো সময়খন্ডকে ধরে রাখা যাবে।
প্রনাম শ্রীমতী জয়ন্তী বালা বর্মন,আমার বৃদ্ধা রাজবংশী মা। আপনারাই তো এই মাটির অহংকার। সুস্থ থাকুন।
৪।
'দেশ হারান নি হরিপদ
দেশ বহন করছেন হরিপদ'
১৬ বছর বয়সে দেশ ছেড়েছেন। নদী ছেড়েছেন। গঞ্জহাট ছেড়েছেন। পিঠেপুলির গন্ধ ছেড়েছেন। কিন্তু আজও,এই ৮৮ বছর বয়সেও চোখ বন্ধ করলেই পরিষ্কার দেখতে পান সেই পদ্মবিলে বাইচের নাও দৌড়ানো,নাচতে নাচতে ঘন্টা বাজায় মকবুল ভাই। আর সমবেত গান ভাসে
‘ও রে হাউসের মেলা জোড়া খেলা
যমনা গাঙের কাছাড়ে
ও রে নুরুদ্দিনের নাও ফাইনালে’
যমুনার পাড়ে পাড়ে হেঁটে যাওয়া। কত কত পাখি। কোষা ও ডিঙি।দূরে ভোঁ বাজিয়ে চলে যেত লঞ্চ। বাবার সাথে লন্ঠণ দুলিয়ে দূরের কোন গ্রামে যাত্রা শুনতে যাওয়া।সারারাত ধরে কত কত যাত্রা দেখার স্মৃতি আজও সব পরিষ্কার দেখতে পান। মনে পড়ে বাড়ির থেকে ২ ক্রোশ দূরের সেই বিশাল ‘গাজনার বিল’। শুধু জল আর জল। থই থই জলভান্ডার। সেই গাজনার বিল-এ বছরে একবার হত মাছ ধরবার মেলা। সারাদিন ধরে হাজার হাজার মানুষের সমবেত মাছ ধরা। সে এক উৎসব। সেই মাছ ধরবার উৎসব ঘুরে ছোটখাটো এক মেলাই বসে যেত! সঙ্গে বাদ্য বাজনা। ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে ঢাকিরা বাজাতেন ঢাক। আর হেমন্তের শেষ থেকেই ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যেত পিঠাপুলিপায়েসের দিন। কত রকমের যে পিঠা ছিলো সেই রুপকথার দেশে!এদেশে তা খুঁজে পাইনা আর। আর বিচিত্র সব মাছ ধরবার জাল।ছিপজাল,সাংলা জাল, বেড়জাল, খেওজাল, ঝাঁকিজাল.৮০/৯০ ফুট গভীর জল থেকে উঠে আসতো বিশালকায় সব মাছেরা। নিজের চোখেই দেখে ফেলা হয়েছে এক মণ দেড় মন ওজনের রুই আর বাঘাড় মাছ। বাবা কাকাদের সঙ্গে ছোট থেকেই তাই রক্তে মাছ ধরবার নেশা।যা এদেশে এসেও ছাড়েননি।
এতো কথা লিখে ফেলা হলো। একজন ৮৮ বছরের এখনো সজাগ ও স্মৃতিধর এক প্রবীণের বয়ানেই। তিনি বলে গেলেন অনর্গল। আমি সাজিয়ে দিলাম। তার চোখের জলের ধারায় দেশ হারানো মানুষের ব্যাথা! কিন্তু দেশ তো হারায় নি!দেশ তো হারায় না! সে থেকে যায় শরীরের মেদ রক্ত মজ্জার পরতে পরতে। শ্রী হরিপদ বিশ্বাস। সাকিনঃ বকতারপুর, থানাঃ বেড়া,জেলাঃ পাবনা। নদীঃযমুনা,দেশঃপুর্ববাংলা।
সেই সাকিন ছেড়ে তাকে চলে আসতে হয়েছে চিরদিনের মতোন ১৯৪৮-এ। বর্তমান নিবাসঃ কোচবিহার জেলার পুন্ডিবাড়ি থানার বাহান্নঘর কলোনি। যখন চোখ বন্ধ করেন, সেই বন্ধ চোখের ভেতর আজও জেগে থাকে এক উৎসবগাথার মতন এক দেশ।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন