গল্পের নাম- বস্তির বখাটে : শামিমা এহেসানা

শামিমা এহেসানা

গল্পের নাম- বস্তির বখাটে 

শামিমা এহেসানা

অণুগল্প


"বাবা আমি ওদের সাথে ক্রিকেট খেলতে যাব?"
-না। ওদের সাথে খেলবে না। আমি বারবার বারণ করেছি তোমাকে। ওরা পড়াশোনা শেখে না, গালাগাল করে, তুমিও কি ওদের মত হতে চাও?
ছোট্ট সাহিল মুখ ভার করে ফিরে গিয়ে জানলার ধারে বসে নিচের ছোটো ছোটো ঝুপড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা কি সুন্দর দুপুর বেলা কানামাছি, বিকেলে ক্রিকেট খেলে। এক বাড়িতে নতুন বৌ আসলে শাঁখ বাজে, আর এক বাড়িতে শিশু জন্মালে আজান হয়। লড়াই যে হয়না, তা নয়। সেইদিন দুই বাড়ির বৌ একে অপরের চুল ধরে ক্যাট ফাইট শুরু করেছিল। আবার সন্ধ্যা বেলা দুবাড়ির ছেলে একই মাস্টারের কাছে পড়তে গেল। রাত পেরোলেই ঝগড়া মিটে যায় এদের। যেন সূর্য এসেই এদের নতুন করে বন্ধুত্ব করে দিয়ে যায়। পরের দিন ই আবার এবাড়ির মিষ্টি ওবাড়িতে যায়।


সাহিল ওদেরই একজন হতে চায়। কিন্তু পারে না। তার সামনে বাধা, বাবা এবং মা, আর ওদের গোটা ফ্ল্যাটটা। সাহিল এর বায়না শুনে মা রেগে গিয়ে সাহিলের বাবাকে বললেন, কোন কুক্ষণে যে আমি তোমাকে বলেছিলাম এই এলাকায় ফ্ল্যাট কিনতে কে জানে। সাহিলের বাবা বললেন, আসলে এই সব বস্তি দখল করা হয়েছে৷ এগুলো সরকারের জায়গা। এখানে অনেক বড় মাপের প্রোজেক্ট হবে বলেই জানতাম। তাছাড়া ঘুম ভেংগে   বাইরের দিকে তাকালেই নদী। এত সুন্দর জায়গাটার লোভ ছাড়তে পারিনি। কিন্তু ছেলে আমার, জানলা দিয়ে নদী না দেখে ড্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তা ভাবতে পারিনি।

সাহিলের সবসময় নিজেকে বন্দী মনে হয়। ফ্ল্যাটে যে কজন বন্ধু হয়েছে সাহিলের, তারা সবাই ভিডিও গেমে ক্রিকেট, ফুটবল,  আর কার রেসিং খেলে। সাইকেল চানালোর জন্য নিচে কেও নামেনা, আর সেই সূত্রে সাহিলের বাবা মা ও ওকে ছাড়তে রাজি হয়না।

এভাবে বন্দী দশা চলার মধ্যেই একদিন সন্ধ্যা বেলা সাহিলের বাবা মা র মাথায় বাজ পড়ল। বিকেল পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু সন্ধ্যাবেলা হঠাত সবাই আবিষ্কার করল, সাহিলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা ফ্ল্যাটের সব দরজায় কলিং বেল বাজানো হল, কিন্তু সাহিল কোথাও নেই। ছাদ, বেসমেন্ট এমনকি জলের ট্যাংক পর্যন্ত দেখা হল, কিন্তু সাহিল নেই। সিসিটিভি ফুটেজ দেখাচ্ছে,  সাহিল ফ্ল্যাটের বাইরে একা বেরিয়েছে। পাশের দুটো পরিবার থানায় ফোন করে অভিযোগ দায়ের করার কথা বলল, কিন্তু ওরা ভয় পাচ্ছিল, যদি কোনো কিডন্যাপারের কাজ হয়ে থাকে, তাহলে ছেলের বিপদ বাড়বে। 

অনেকে, এই ঘটনায় বেশ ভয় পেয়ে "বাবা, কি অবস্থা। দেখলে তো, একা বেরোলে কি হয়। কোনোদিনও এমন করবে না। কেমন!" এসব বলতে বলতে নিজেদের সন্তানদের নিয়ে ফিরে গেল। গোলমাল দেখে বস্তির একটা ছেলে এগিয়ে এসে, সিকিওরিটি গার্ডের সাথে কথা বলে দৌড়ে এগিয়ে গেল।সাহিলের মা বললেন, হ্যাঁ গো। ছেলে আবার খেলার নেশায় বস্তিতে ঢুকে পড়েনি তো। কিন্তু সাহিলের বাবা বস্তির কাছে গিয়ে খোঁজ নিয়েও ছেলের হদিশ পেলেন না। অসহায় হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন সাহিলের বাবা মা। পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার কথা বলছেন বারবার। আর কোনো পথা না দেখে থানায় যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে গেলেন সাহিলের বাবা মা। ততক্ষণে কলিং বেজে উঠলো। 

দৌড়ে গিয়ে সাহিলের বাবা দরজা খুলে দেখলেন ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে সাহিল, পিছনে বস্তির বেশ কয়েকটা ছেলে।
বাবা মা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুই কোথায় গেছিলিস। বল।" কিন্তু সাহিলের মুখে একটা কথাও নেই। ভয়ে হাঁটু কাঁপছে তার।"

তখন ওই ছেলেদের মধ্যেই একজন গুটখা চিবোতে চিবোতে বলল, "আর বলবেন না কাকা। আপনার ছেলে আমাদের ঘোল খাইয়ে ছাড়লো মাইরি। গোট্টা এলাকা আমরা খুঁজলাম, ব্যাটা কোথাও নেই। পাসের পার্ক, রাস্তা, নদীর পাড়, মন্দির সব জায়গায় খুঁজলাম, কিন্তু সালা কোনো পাত্তা নেই। তারপর আমাদের এই কেল্টে গনেস বাস স্টপেজে দেখেছে আপনার ছেলে বসে আছে। তারপর তাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসলাম। ব্যাটা আসতেই চাইনা। হেব্বে জেদি মাইরি।"

হাত জোড় করে সাহিলের বাবা মা ওদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতেই, লাল শার্ট পরা গুটখাখোর ছেলেটা বলল, ধূর! আপনারা আমাদের বাবা-মার বয়সের। হাত জোড় করলে পাপ হবে আমাদের। এসব আমাদের বস্তিতে লেগেই থাকে। কত ছেলে পুলে।  কে কখন কোথায় পালিয়ে যায়। এসব রোজ হয়। আমরা কাটলাম। পাসের ঘরের বাচ্চাটার অন্নপ্রাশন্ন। বাপটা মাতাল, বাড়িতে এক পয়সা দেয়না। পাড়ার ছেলেরা চাঁদা দিয়ে মালটার অন্নপ্রাশন্ন করছি। বেশ কাকা। চলি। ছেলেটাকে দেখবেন। বেচারার মন খারাপ মনে হচ্ছে।"

ছেলেগুলোর হাওয়াই চটির চটপট, পা ঘঁষে হাঁটার আওয়াজ, আর একে অপরকে দেওয়া গালাগাল,,,আজ ইশ্বরের পায়ের শব্দ বলে মনে হচ্ছে সাহিলের বাবার।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.