![]() |
| মৃদুল শ্রীমানী |
হিটলার। এই নামটা বললেই কেমন গা শিউরে ওঠে। কিভাবে একজন সামান্য সৈনিক দেশের সকলের মাথা গুলিয়ে হিটলারি কায়েম করে। কিভাবে আর্য অনার্য তত্ত্ব খাড়া করে বিস্তর মানুষের বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয়। এক চূড়ান্ত অমানুষিক ব্যবস্থা কায়েম করে। হিটলার সেই সাংঘাতিক অমানবিকতার প্রতীক। আজ অ্যাডলফ হিটলারের জন্মদিন। ১৮৮৯ সালের এর ২০ এপ্রিল তারিখে তিনি অস্ট্রিয়ার ব্রাউনাউ আম ইন এ জন্মেছিলেন অ্যাডলফ হিটলার। অত্যন্ত কুখ্যাত এই স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় থাকাকালীন জার্মানিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখে জার্মানিতে সদ্য পরিণীতা দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ইভা ব্রাউনকে সাথে নিয়ে নিজের বন্দুক দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
হিটলারের বিখ্যাত বই "মেইন ক্যাম্পফ"। এতে ওঁর রাজনৈতিক দর্শনের হদিশ পাওয়া যায়। ১৯২৫ সালে জেলে বসে তিনি এই বইয়ের প্রথমাংশ লিখিয়েছেন। সমাজতন্ত্রের কথা বলতে বলতে ক্রমশঃ জাতিঘৃণা জাতিবিদ্বেষ ও নিজের জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারে মনোনিবেশ করেন হিটলার। ১৯৩৩ সালে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হন। ১৯৩৪ সালে নিজেই নিজেকে ফুয়েরার বা সর্বাধিনায়ক উপাধি দেন। "মেইন ক্যাম্পফ" বইটির প্রথম খণ্ড বের হয় ১৯২৫ ও দ্বিতীয় খণ্ড বের হয় ১৯২৬ সালে। প্রথমে এই বইয়ের কাটতি ভাল না থাকলেও ১৯৩৩ সালে লেখক জার্মানির চ্যান্সেলর হলে বইটির বিক্রি সাংঘাতিক রকম বাড়ে ও বেস্ট সেলার হয়। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হবার কালে এর নাম ছিল "ফোর অ্যাণ্ড এ হাফ ইয়ারস এগেইনস্ট লাইজ়, স্টুপিডিটি অ্যাণ্ড কাওয়ার্ডিস।" পরে প্রকাশকের ব্যবসাবুদ্ধিতে বইটির নাম পরিবর্তন করা হয়।
১৯৩৬ সালে পঁচিশ অক্টোবর তারিখে জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার আর ইটালির বেনিতো মুসোলিনি চুক্তি স্বাক্ষর করে অক্ষশক্তি গড়ে তোলেন। এর ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘনিয়ে ওঠে। হিটলার। এই সাংঘাতিক স্বৈরতন্ত্রী ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখে পোল্যাণ্ড আক্রমণ করে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেন। হিটলার বা মুসোলিনি একলা পারেন নি। হিটলারের সাথে ছিল হিমলার। ছিল গোয়েরিং। সাথে ছিল ব্রাউন শার্ট, এস এস বাহিনী। আর ছিল তথাকথিত আর্যামির স্লোগান। জাতিবিদ্বেষ খুঁচিয়ে তোলার কৌশল। দেশপ্রেমের মিথ্যে চটক। বিরোধী শিবির ছিল ছন্নছাড়া। একটা দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষকে জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাড়িয়ে দেওয়া, যাকে বলে এথনিক ক্লিনজিং, সেটা একটা সাংঘাতিক ব্যাপার।
হিটলার শেষ পর্যন্ত জেতে না। হিটলারির অবসান হয়। সাধারণ মানুষ যুক্তিসঙ্গত পথে ঐক্যবদ্ধ হলে হিটলারির অবসান ঘটে।হিটলারী জমানার সেই জাতিঘৃণা জার্মানিতে আজ পরাজিত। কিন্তু দেশে দেশে জাতিঘৃণা, জাতি অহমিকার কারবারি হিটলারী মানসিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি রাখতে হবে। শেষ অবধি জার্মানির বুকে হিটলারকে বাঙ্কারে ঢুকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছিল। একটি সভ্য দেশে মানুষ নিজের কথা ভদ্রভাবে অন্যকে শোনাবে আর যুক্তিসঙ্গত সহমর্মিতার সাথে তার কথাটাও শুনবে - এই পরিসর বজায় রাখা সকলের দায়িত্ব। অস্ত্রের হুঙ্কার নেহাতই অযৌক্তিক । অস্ত্র শেষ কথা বলে না। শেষ কথা বলে যুক্তি আর নৈতিকতা । শুভবোধে প্রগাঢ় আস্থা নিয়ে একটা সভ্য দেশের মানুষেরা কথা বলুক। মনে রাখুক অত্যাচারী শেষ কথা বলে নি কোনোকাল। শেষ কথা বলেছে মানুষের অন্তহীন শুভবোধ। হিটলারির জয়, শেষ অবধি নয়।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন