![]() |
| পরশপাথর : নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত |
টি টেবিলের ওপর পড়ে ছিল সে দিনের খবরের কাগজটা।এলোমেলো। ঋতু এতক্ষণ দেখেও দেখেনি। আসলে অনেক কিছুই তার চোখে পড়ে--ছাদ, সিলিং ফ্যান, ল্যাম্প, দরজা, জানালা, জানালার ফাঁক দিয়ে একটুকরো আকাশ, আকাশের নানান সম্পদ--মেঘ, সূর্য, একটা-দুটো পাখি, বাড়িঘর গাছপালার আবক্ষ মূর্তি। কেবল চোখে পড়ে।দেখে না কিছুই।
ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নার্সিংহোমে কেটেছে মাসাধিক কাল।তারপর সম্ভবত ভুল অস্ত্রোপচারের ফলে কঠিন স্নায়ুরোগে আক্রান্ত ঋত্বিক দাসের ঐচ্ছিক পেশিগুলো হারাতে থাকে তাদের কর্মক্ষমতা। এখন সে প্রায় স্থবির।জড়ভরতপ্রায়।কোনো কিছুই এখন তাকে আকৃষ্ট করেনা।তার চেতনার রঙে আর পান্না সবুজ হয়না,চুনি রাঙা হয়ে ওঠে না।গোলাপের সৌন্দর্যও তাকে আকৃষ্ট করে না।ঋতু এখন প্রায় নিঃসঙ্গ। তার স্কুলের বন্ধুরাও এখন আর বড় একটা আসে না।এখন তার সর্বক্ষণের সঙ্গী তার দাদু-- অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দুলালবাবু।তিনি নিয়ম করে প্রত্যহ ঋতুর ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়েন,নানাবই,পত্রপত্রিকা পড়েন এবং নানান অছিলায় ঋতুর সঙ্গে কথোপকথনের চেষ্টা চালিয়ে যান।মাধ্যমিকে স্টার পাওয়া ঋত্বিক দাস,গানবাজনা,খেলাধূলা, গল্প কবিতা নানা বিষয়ের প্রতি যার ছিল প্রচণ্ড আকর্ষণ সে হঠাৎ কেমন যেন নিঃস্পৃহ হয়ে পড়লো।মনটা হাহাকার করে ওঠে বৃদ্ধ দুলালবাবুর।
খবরেরকাগজটা আজ যেন চুম্বকের মতো ঋতুর দৃষ্টি টেনে ধরলো।ঠিক কাগজটা নয়।একটা ছবি--প্রতিকৃতি।তারই মতো হুইল চেয়ারে বসা একটা পঙ্গু মানুষ।মুখ ও শরীর খানিকটা বাঁকা।কিন্তু তাঁর চশমার ফাঁক দিয়ে ঝলক দিচ্ছে আশ্চর্য অনুসন্ধানী দুটি চোখ!অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটা যন্ত্রমানব যেন।
কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গিয়েছিলেন দুলালবাবু।ফিরে এসে নাতিকে খবরের কাগজ বুকে আঁকড়ে ধরে হুইল চেয়ারে বসে থাকতে দেখে খানিকটা অবাকই হলেন।এরকম ঘটনা এই প্রথম।কাগজটা নেবার জন্য কত কষ্ট করে তাকে টি টেবিল পর্যন্ত যেতে হয়েছে। ভাবতে ভাবতেই তাঁর চোখ দুটো আনন্দে বিস্ফারিত হল।
: দাদুভাই,কী দেখছিলে?ছবিটা?চেনো ওটা কার ছবি?
কোনো উত্তর নেই।উত্তর আশাও করেন নি বৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর হতাশাচ্ছন্ন হৃদয়ের ব্ল্যাকহোলে আজই প্রথম একটা বিকিরণ হল যেন। তাঁর মনে হল- হকিংয়ের মতোই ঋত্বিকের হৃদয় ও মস্তিষ্ক সমান সচল। তিনি অসীম ধৈর্য নিয়ে নাতিকে সদ্যপ্রয়াত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং-য়ের জীবনযুদ্ধের কাহিনি,মৃত্যু ও প্রতিবন্ধকতাকে পদাবনত করে যাপিত জীবন ও ছায়াফেলা মৃত্যুকে একাকার করে কালের যাত্রায় ভেসে যাওয়ার কাহিনি একতরফা বলে যেতে লাগলেন দিনের পর দিন।
দুলালবাবু দেখলেন, তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ঋত্বিক।মনে হল আগ্রহের সঙ্গে সে বিজ্ঞানী হকিংয়ের কথা শুনছে।
বৃদ্ধের বুকে সহস্র আশাদীপ জ্বলে উঠলো........

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন