![]() |
| অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মন্ডল |
পর্বঃ-৬ম
পরের দিন সকালে নব-দম্পত্তি যুগল মন্দিরে প্রণাম ও পার্থনা জানিয়ে,পুজারীর নিকট হইতে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। অজানা পথিক হলেন কিনারাহীন অজানার অসীম সৈকতে।রুপম রাজকীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে অভাগীনির হাত ধরে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে,সুখে-শান্তিতে থাকার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলেন।
----রুপম স্বার্থের দুনিয়াকে বোঝাতে চাইলেন যে,অর্থ-ধন-সম্পত্তি জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য মেঠাতে পারে নাজীবনে সুস্থ ভাবে বাঁচতে,আনন্দের মাঝে থেকে সুখ'শান্তির নীড় বাঁধতে একটা বিশ্বস্থ অবলম্বন দরকার।সেই রকম রুপমের একমাত্র ভালোবাসা ও কাছের মানুষ হলো নিরুপমা।যার কাছে জীবনের সুখ-দুঃখ,ব্যথা-বেদনাকে আধা-আধি ভাগ করে নেওয়া,এমন একজন হলো স্ত্রী-নিরুপমা।কারন-রুপম বুঝেছিলেন অর্থ ও অহংকার দিয়ে যেমন ভালোবাসার পরিমাপ করা সম্ভব নয়।ঠিক তেমনই দাম্ভিকতার পরিচয় দেখিয়ে প্রকৃত মানষ হয়ে ওঠা অসম্ভব।ভালোবাসা হলো একটা মনের গভীরান্তের অনুভুতির প্রকাশ।
----তাই,অর্থ ও দাম্ভিকতার অহংকারে রুপম নিজের ভালোবাসাকে অসন্মান ও কলুষিত হতে দেয়নি।রুপমের কাছে "প্রকৃত ভালোবাসা হলো-একমাত্র স্বপ্ন-সুখের সাম্রাজ্য ও রাজ'ঐশ্বর্য"।এমন পবিত্র ভালোবাসার স্নেহ-সুধার সংস্পর্শে অতিবাহিত করলেন বেশ কয়েকটি বছর দুজনের দাম্পত্য জীবন।সকল অভাব অভিযোগ তাদের ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ।এ যেন,পরম মঙ্গলময় ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।
এই সুখের দিন যাপনের মাঝে,হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন নিরুপমা।কিছু খেতে পারে না।বছানা সয্যা হয়ে পড়লেন নিরুপমা।নিরুপমা মনে মনে অনুভব করতে থাকলেন,মাতৃত্বের অনুভুতি।রুপম কাল বিলম্ব না করে,নিরুপমাকে নিয়ে গেলেন কবিরাজ মশাইয়ের আলয়ে।
----দুজনের একত্রে দেখে কবিরাজ মশাই খুবই আনন্দিত হলেন।
----বললেন!বলো রুপম,অভাগীনিকে নিয়ে তোমার দাম্পত্য জীবন কেমন কাটছে?
----আজ কি মনে করে,আমার আলয়ে তোমাদের শুভা'গমন?
----তখন রুপম বললেন, কবিরাজ মশাই আপনি আমার নিরুপমাকে বাঁচান।গত কয়েকদিন ধরে নিপমা অসুস্থ।কিছু খেতে পাচ্ছেন না।
----কবিরাজ মশাই রুপমের কথা মতো,নিরুপমাকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করে বুঝতে পারলেন।নিরুপমার অসুস্থতার কারন কি।
----কবিরাজ মশাই রুপমকে ডেকে বললেন,এমন সময় প্রতিটি মায়েদের এমনটাই হয়।
----শুনে,নিরুপমা একটু লজ্জিতবোধ করে মাথাটা নিচু করে রইলেন।সহজ সরল রুপম কিছু বুঝতে পারলেন না।যে,তাদের দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার সাক্ষী-স্বরুপ নতুন অতিথি আসতে চলেছেন।
----এই শুভ সংবাদটি নিরুপমা রুপমের কানে কানে চুপিচুপি জানালেন।এই সু-সংবাদটি রুপম শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে,নিরুপমাকে জড়িয়ে ধরে নতুন করে আবার এক অনিন্দ্য-সু'খানুভুতি অনুভব করলেন।
----এরপর,আনন্দের সহিত কবিরাজ মশাইয়ের নিকট হইতে অনুমতি চাইলেন।নিজের পর্ণ-কুঠিরে ফিরিবার জন্য।কবিরাজ মশাই রুপম ও নিরুপমাকে খুব ভালোবাসতেন,তাই কিছতেই দুজনকে ছাড়লেন না।
----বললেন!তোমরা দু'জনে যখন এতদিন পর,এই বুড়োটার বাড়ীতে এসেছো।নিশ্চয় কয়েকটা দিন কাটিয়ে তারপর যেতে হবে।
----এ আবার "নিরুপমার জীবনে কোন অদ্ভুত ভবিতব্য"?
----কবিরাজ মহাশয় বললেন!তোমরা তো সব জানো,আমার আপন-স্বজন বলতে কেউ নেই।নিজের স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়েছি সেই কোন সকালে।একাকীত্বে নিভৃতে দিন কাটাই,বিরহ-বিয়োগ যন্ত্রণায়।তাই তোমরা আমার সন্তানের মতো।একথা বলতে বলতেই কবিরাজ মশাইয়ের দু'চোখ দিয়ে অশ্রু-শ্রাবনের ধারা নামতে লাগলো।
----এমন কথা শুনে!দুজনের মনে কবিরাজের প্রতি স্নেহ জন্মাল।তাই রুপম ও নিরুপমা বৃদ্ধ-কবিরাজ মশাইয়ের বাড়ীতে রাত কাটানোর জন্য মনোস্থির করলেন।রাতের খাওয়া-দাওয়ার জন্য কবিরাজ মশাই জোগাড় করলেন।আর বললেন,আজ সমস্ত কিছু রান্না করে আমাকে খাওয়াবে আমার নিরুপমা' মা।বহুদিন হলো আমি কারো হাতের রান্না খাবার খাইনি।
----শুনে,অভাগীনি নিরুপমা খুবই আনন্দ পেলেন।আর ভাবতে লাগলেন সেই কোন কালে পিতা-মাতাকে হারিয়েছি।আজ পিতৃ-সমতুল্য কবিরাজ মশাইকে শ্রদ্ধা ভরে নিজের হাতে খাইয়ে দেব।সমস্ত কিছু রান্না করলেন এমন ভাবনা ভেবে।এরপর,তিনজনে একই সঙ্গে পাশাপাশি বসে রাতের খাবার খেলেন।খাওয়ার পর অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছে।এরপর ঘুমানোর জন্য একটা ঘর দেখিয়ে দিলেন রুপম ও নিরুপমার থাকার জন্য।আর তার বিপরীতে দক্ষিণের যে ঘরটা সেই ঘরে থাকেন কবিরাজ মশাই।ঘরে প্রবেশ করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন,তখন ঘন্টার কাঁটা বারোটার ঘর ছুঁই ছুঁই।রাতে রুপম ও নিরুপমা ঘুমিয়ে পড়লেন।কবিরাজ মশাই ঘুমালেন না।চেয়ারে বসে টেবিলের উপর ডায়েরিটা রেখে তাঁহার অতীতের কিছু কথা লিখতে থাকলেন।লিখতে লিখতে রাত প্রায় শেষাগত।পুর্বে সুর্যের রক্তি'মাভা সারা আকাশ ছেয়েছে।
নিরুপমার ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে চমকে উঠলেন।ঘুম ভাঙতেই হঠাৎ শুনতে পেলেন, কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ।নিঃস্তব্ধ হয়ে চুপ করে বসে রইলেন।সকাল হতে রুপমের ঘুম ভাঙতে দেখেন,নিরুপমা না ঘুমিয়ে চুপ করে বসে রয়েছেন।জিজ্ঞাসা করতে নিরুপমা কেঁদে ফেললেন।আর বললেন,আমি ঘুমের মধ্যে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
----রুপম জিজ্ঞাসা করলেন নিরুপমাকে।তুমি কি দুঃস্বপ্ন দেখেছো?
----নিরুপমা বললেন! আমি দেখলাম,আমার মৃত বাবা-মাকে নিয়ে শ্মশানে দাহ করতে চলেছি।
----তুমি কেঁদো না।ঘুমের মধ্যে এমন স্বপ্ন অনেক সময় দেখা যায়।আজ তুমি স্বর্গীয় বাবা-মায়ের কথা ভাবছিলে সেই জন্য।এই বলে নিরুপমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চোখের বিম্বিত অশ্রুজল মুঠিয়ে দিতে লাগলেন।
ভোরের কুয়াশা সরিয়ে,সুর্যের সোনালী রোদ গাছের ফাঁক দিয়ে জানালায় প্রবেশ করলো।পাখির কাকলীতে সকাল হলো।দুজনে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন।সময় অতিক্রান্ত না করে।কিন্তু কবিরাজ মশাই উঠলেন না। দু'জনে ভাবলেন হয়তো,কবিরাজ মশাই একা থাকেন বেলাতে ঘুম থেকে ওঠেন।বাড়ীতে ফিরতে হবে রুপসার নদীবাটে সন্দরীবৃক্ষ তলে পর্ণ-কুঠিরে।তখন সুর্যের গাছের মাথায় উঁকিঝুঁকি।দুজনে গিয়ে কবিরাজ মশাইকে ডাকতে লাগলেন।তিন-চার বার ডাকার পর সাড়া না দেওয়াতে।ধাক্কা মেরে দরজা খুললেন।দরজা খুলতেই রুপম ও নিরুপমা আশ্চার্য হয়ে গেলেন।
----এ কি! কবিরাজ মশাই মেঝেতে পড়েছেন কেন এই ভাবে?ছুটে গিয়ে টেনে তুললেন।গায়ে স্পর্শ করতেই দেখলেন সমস্ত দেহটা ঠাণ্ডা পাথর হয়ে গেছে।দুজনে কোলে নিয়ে বারান্দায় এসে শোয়ালেন।মুখের কাছে হাত নিয়ে দেখলেন নিঃশ্বাস-প্রঃশ্বাস চলছে না।নিরুপমা কাঁদতে লাগলেন।রুপম ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন টেবিলের উপর একটা খোলা-মেলা ডায়েরী।রুপম ডায়েরীর পাতাতে চোখ মেলতেই দেখলেন,লেখা রয়েছে আমি মারা যাওয়ার পর;আমার দেহটা যেন অভাগীনি নিরুপমা নিজের হাতে রুপসার তীরে দাহ করেন।ও যে আমার,ছোট্ট বেলার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের মতো।নিরুপমার স্পর্শে আমার মৃত আত্মা চির শান্তি পাবে।
---- এরপর,নিরুপমা ও রুপম,কবিরাজ মশাইয়ের মৃতদেহ নিয়ে রুপসা নদীর তীরে শ্মশানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন.........

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন