![]() |
| হারিয়ে পাওয়া : সোনালী মুখার্জী |
দৌড়ে গেল ঝুম খাতাটা নিয়ে ওর মায়ের কাছে..মা মা দেখো??আমি এইমাত্র বসে বসে কেমন কবিতা লিখছি??ঝুমের মা আর বাবা সবে অফিস থেকে এসে চা টা নিয়ে ব্যালকনি তে বসে নিজেদের কাজকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন.মেয়ের কথায় ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন অনুভা. কি??ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়া ক্লাস এইট এর ছাত্রী কিনা সাহিত্য চর্চা করছে??তাও আবার ...মাথাটা হটাৎ গরম হয়ে গেল অনুভার..চিৎকার করে উঠলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে..বললেন এই জন্য তোমাকে এত টাকা খরচ করে ইংলিশ মিডিয়াম এ পড়াচ্ছি??ওই পাতি বাংলায় কবিতা রচনা করবে বলে??ছি:ছি: তোমার বুদ্ধি শুদ্ধি লোপ পেয়েছে নাকি??ঝুমের বাবা অরুন বাবু মেয়েকে কাছে ডাকলেন..খাতা টা ওর হাত থেকে নিয়ে বললেন..শোনো ঝুম..আমরা দুজনেই চাই তুমি সমাজে ডঃ ঝুমঝুম মুখার্জী নামে প্রতিষ্ঠিত হও.. আর আমাদের চাওয়াই তোমার কাছে শেষ কথা..যাও ..এইসব বাজে কাজ ছেড়ে নিজের পড়াশোনায় মন দাও..ঝুম অবাক জলভরা চোখে আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো..।
কিন্তু তার কলম থামলো না..সে নিজের মতো লিখে যেতে লাগল..তবে আর কিন্তু কখনো ঝুম তার লেখার খাতা কাউকে এগিয়ে দেয় নি..একান্ত গোপনেই তার লেখাগুলি কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে লাগলো সবার অলক্ষে..
এইভাবেই মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও ঝুম তার মা বাবার আকাশ টা বোধয় ছুঁতে পারলো না..কিছু নাম্বার কম হলো..এর জন্য ওর বাবা মা দুজনেই অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন মেয়ের উপর।আর এই সবটাই যে তার সাহিত্য ও কবিতা প্রীতির ফল এটাও জানাতে ভুললেন না ।
যাই হোক,বাবা মায়ের তত্ত্বাবধানে ঝুম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো..কলেজে ভর্তি হয়েই তার পরিচয় হলো ধীমান এর সাথে..ধীমান চক্রবর্তী।পড়াশোনায় তুখোড় চৌখস ,কি উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি...প্রথম দেখাতেই ঝুমের মনে হলো এই সেই পুরুষ ,যার হাত ধরে সে নিশ্চিন্তে অনিশ্চিয়তার পথে ভেসে যেতে পারে...এর পর তাদের সম্পর্ক আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব থেকে এক নিবিড় সম্পর্কে পরিণত হলো..দুজনেই দুজনের প্রেমে ভেসে যেতে লাগল..
ঝুম কিন্তু তখনো ওর সাহিত্য চর্চার কথা ধীমান কে বলে নি..শুধু ধীমান কেন??কাউকেই কখনো আর নিজের মনের গভীরে যে ফুল সর্বদাই বিকশিত হয়ে কলম দিয়ে পাতা ভরিয়ে ফেলে ,তারপর শুকিয়ে আপনি ঝরে পড়ে মনের গভীর গহনে,তার কথা বলে নি..
একদিন কথায় কথায় ধীমান কে ঝুম জিজ্ঞাসা করে তার কি ইচ্ছে??ধীমান তাকে বলে সে অনেক বড় ডক্টর হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়,আর সেই জন্য তাকে খুব ভালোভাবে তৈরি হতে হবে..ধীমান ঝুমের কথা জিজ্ঞাসা করে..কিন্তু ঝুম সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দেয় না..হয়তো মনে মনে নিজেকে গুছিয়ে নেয়..ভাবে..যা তার একান্ত নিজের সে কথা কি ও বলবে??অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব পেরিয়ে শেষপর্যন্ত ও বলেই ফেললো ওর মনের কথা ,ইচ্ছের কথা...বললো আমি সাহিত্যিক হতে চাই..কবি হতে চাই..
একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করা মেয়ের মুখে এই কথা শুনে ধীমান চমকে ওঠে..এবং হেঁসেও ফেলে,আর বলেই ফেলে ..তুমি বাংলার কি বোঝো??পড়তে লিখতে পারো ভালো করে??এই কথায় ঝুম মনে মনে ভীষণ আঘাত পায় ।ও ভেবেছিল ধীমান অন্তত তার লেখার মর্যাদা দেবে..একবার অন্তত ওর খাতাটা দেখতে চাইবে..আনন্দিত হবে...ধীমান খেয়ালই করলো না ঝুমের হতাশা আর দুঃখ ভরা নিটোল জলভরা চোখ দুটো..কিছুক্ষন একথা সেকথা র পর ওরা দুজনে নিজের নিজের বাড়ির পথ ধরলো..
আর কিন্তু কখনো ঝুম তার কথা আলোচনা করে নি ধীমানের সঙ্গে..দেখতে দেখতে দশটা বছর কেটে গেল ,ওরা দুজনেই এখন সফল ডাক্তার হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত.. আর বাড়ির মতে দুজনেই এখন স্বামী স্ত্রী..।
বিয়ের পর ঝুম আর কিন্তু কবিতা গল্প কিছুই লেখে না..সারাদিন কাজের পর যেটুকু সময় পায় বই পড়ে বা নিজের লেখাগুলো পরেই কাটিয়ে দেয়..।এখন ওর লেখার খাতগুলোর স্থান বাড়ির স্টোররুমে র এক কোনের সেলফে..
এবারের পুজো বার্ষিকীর বইটা হাতে নিয়েই ঝুম প্রতিবারের মতো এবারও গল্প আর কবিতার পাতায় চোখ রাখলো..আর বিদ্যুৎ পৃষ্টের মতো চমকে উঠলো..এ কি??কি দেখছে সে??চোখ দুটো কচলে আবার ভালো করে তাকালো..হ্যাঁ এ তো তার ই লেখা ,পর পর চারটি কবিতা ছাপা হয়েছে, আর নিচে তার নাম জ্বলজ্বল করছে..আনন্দে অভিভূত ঝুম ,যা সারাজীবন কল্পনায় দেখেছে সে ,যা তার চিন্তার ও অতীত ,এটা সে কি দেখছে??দৌড়ে ধীমানের কাছে গেল সে ,হাতে তার তখনো কবিতার পাতাটা খোলা,তার চোখে হাজার বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা ...
ঝুমকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধীমান হেঁসে ফেললো..বললো ,কি??কি ভাবলে??আমি সব চুরি করে পড়ে ফেলেছি..কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই মেলাতে পারছি না ...আমার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বউ ,বাংলায় তার এত দক্ষতা কি করে??আমি সত্যি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না ঝুম..তার পর কি মনে করে তোমার লেখা কয়েকটা এবারের পুজো বার্ষিকী তে পাঠিয়ে দিলাম..তোমার লেখা পেয়ে ওরা অভিভূত আনন্দিত ,ওরা তোমায় এবারের পুজোর বিজয়া সম্মিলনী তে সেরা সম্মান প্রদান করবে ঝুম..আরো একটা আনন্দের খবর শোনো ওরা তোমার কবিতা গল্প নিয়মিত ছাপতে চায় ওদের মাসিক পত্রিকায়..
ঝুম শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ,ও বলার কোনো ভাষা খুঁজে পায় না..আজ যেন ধীমান শুধু ওকে দিয়েই যাচ্ছে..
এবার ধীমান ঝুমের কাছে এসে দাঁড়ায়।বলে ,ঝুম আমি তোমায় না বলে আর একটা কাজ করে ফেলেছি।বলে আস্তে আস্তে একটা বই এগিয়ে দেয় ঝুমের দিকে..বইটার নাম...(হারিয়ে পাওয়া)...নিচে সোনালী কালীতে নিজের নাম জ্বলজ্বল করছে "ঝুমঝুম মুখার্জী" (চক্রবর্তী)।সাহিত্যিক ও কবি....।।
ঝুমের চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগলো ।দুঃখে নয় এ যে আননন্দাশ্রু...তার কতদিনের স্বপ্নেরা আজ ঘর ছেড়ে মনের আকাশে ডানা মেলে উড়ছে...ধীমান একটা কাগজ এগিয়ে দিলো ঝুমের দিকে ।এ বছরের সেরা সাহিত্যিকের পুরস্কারটি ঝুমের করায়ত্ত..ধীমান কে আঁকড়ে ধরে ঝুম একটা কথাই শুধু বলতে পারলো..ইংরাজি স্কুলে পড়া ছেলেমেয়েরা বাংলা মাকে সম্মান করতে পারে গো.....আমি পেরেছি...পেরেছি.....ধীমান আরো নিবিড় ভাবে ঝুমকে কাছে টেনে নিল..দুজনের চোখেই তখন জল...হয়তো আমাদের চোখেও.....

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন