আলোমানুষের বৃত্তান্ত : সন্দীপন নন্দী

কদমতলা ধরে শেয়াল-পাড়ার দিকে হনহন করে হাঁটছিল অনাদি রুদ্র। সুগারফল করেছে। মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। তাই অগত‍্যা নিজেই এই থার্টিফাইভ-ডিগ্রী ভাদ্রে ডক্টর দাশগুপ্তের কাছে ছুটছেন। পঁচাশির ব‍্যাচ। সে সময় ওনারবাড়ি থেকে এপথে একটু এগোলেই তুষার মৌলী কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে দেখা হয়ে যেত। কতগুলো কৃষ্ণচূড়ার ডাল গতিপথকে রক্তিম করে দিত বারবার। সে অনাদির পথেই আজ চিত্ত যেথা ভয়শূন‍্যের মত দাঁড়িয়ে আছে কংক্রিটের দালান। যার ভেতরটা কোন রাজদরবার মনে হয় তাঁর। প্রথম প্রথম ভাবতেন চোখের পাওয়ার বিশ্বাস-ঘাতকতা করছে। পরে দেখলেন বন্ধু বিভূতি চলে যাবার পর, তাদের চিরন্তন আড্ডার সেই বাড়ি জুড়ে আজ উৎসব ভবন। বিয়ের নহবত, শ্রাদ্ধের বিষাদ বেচে, দিন চলে বিভূতির ছেলের। এটাই তো বিশ্ববদলের পাটিগণিত। অনাদির বামদিকের রূপমায়া হলে তখন ম‍্যাটিনি শোয়ের জটলা। এখন সাকুল‍্যে ত্রিশজন। অথচ এখানেই, হ‍্যাঁ এখানেই একদিন নীলু, টগাইরা ব্ল‍্যাক করত। কটা সংসার চলত ব্ল‍্যাকে। একটা প্রোফেশন এভাবে কৃষ্ণগহ্বর-এ হারিয়ে যেতে পারে, অনাদির কষ্ট বাড়ে।

সুগারের রিপোর্ট দেখিয়ে ওষুধ কিনে টোটোতে উঠলেন অনাদি। দেখলেন একসময়ের জলপাইগুড়ির অতিথি-আপ‍্যায়নে মাস্টফুডের দোকানের লজঝরে হাল। একটা টিমটিমে এলইডির তলে কড়াই জুড়ে পাঁচ-পিস কাটলেট তেলের বুদবুদ তুলে ভাসছে। অথচ একদিন এখানেই লাইন দিয়ে চিকেন কবিরাজি, মাটনচপ, ডেভিল কিনতে দাঁড়িয়ে যেত শহর। এখন চলমান নাগরিকের অ্যাপস নিয়ন্ত্রণ করে রবিবাসরীয় ডাইনিং।

সেবার প্রথমদিন একটা টর্চ হাতে দিয়ে রঞ্জনের বাবাকে হল-মালিক বলেছিল, পারবি তো? ছেলে আর স্ত্রীয়েরমুখ চেয়ে সেদিন অনাদির ক্লাসমেট রঞ্জনের বাবার সত‍্যিই কোন অল্টারনেট ছিলনা। যতবার ক্লাসের সবাই জিজ্ঞেস করত, বাবা কি করে? রঞ্জন আজকের এই উঁচু বাড়ি-গুলোরমত মাথা তুলে বলত, টর্চম‍্যান। সেইবাজারে একটা পরিবারকে সত‍্যি-সত‍্যিই আলোর পথে নিয়ে গিয়েছিল একটা টর্চ। রঞ্জন মাধ‍্যমিকে দারুণ ফল করেছিল। মিষ্টি না। সেবার দাবি ছিল ডিফারেন্ট। পঁচাশির ব‍্যাচকে ফ্রিতে দিবার দেখিয়েছিলেন রঞ্জনের বাবা। জীবন আর অভাবের মাঝে প্রাচীর হয়ে আলো দেখানো এক মানুষ। রঞ্জনেরবাবা। আজ আর রূপমায়া হলে টর্চম‍্যান পোস্টে কোন ভ‍্যাকেন্সি নেই। দর্শক মোবাইল টর্চে আসন খুঁজে নেন। অনাদি বোঝে এটাই বদলে যাওয়া।

ভরদুপুরের ব‍্যস্ত কদমতলা একটা সময়ের বিবৃতি দিতে থাকে। বুকপকেটের যন্ত্রটা শব্দ তোলে। মেয়ে পিয়াসীর ফোন। আসছি বলেই ফোনটা কেটে দিল অনাদি। তিনমাস হল ল‍্যান্ডলাইন নেই। বাজে খরচ। সবাই বলে। তাই। তবুও যেখানে দাঁড়িয়ে প্রথম চাকরির খবর, যে যোগাযোগ রূপসাকে কাছে পাওয়ার জন‍্য দায়ী, তাকে চিরতরে অনাত্মীয়ের কাছে পাঠাতে কার ভাল লাগে? কিন্তু সবার চাপেই তাকে বিদায় জানিয়েছিল অনাদি। এটাইনাকি ভূবনায়ন। পিয়াসী কানের কাছেফিসফিস করে বলেছিল।। বিকেলতিনটে। থমথমে দীপ্তি টকিজ। একসময়ের বান্ধব নাট‍্য সমাজ। অনেক টানা-পোড়েনের ইতিহাসে অমলিন এচত্বর। অনাদির বন্ধু রঞ্জনের বাবার আরেক সহকর্মী এগিয়ে এলেন। আগে রূপশ্রীতে ছিলেন। রাতারাতি বুলডোজার অস্তিত্ব বিপন্ন করল। বহু সিনেমার সাক্ষীকে একরাতের যুদ্ধে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। পরদিন টর্চম‍্যান-অ্যাসোসিয়েশনের একটা হতভাগ‍্য মিছিল জাস্ট শহর পথে ঘুরেছিল। একটা পরিক্রমণ কতগুলো জবলেস-মানুষের হয়ে শ্লোগান তুলেছিল সেদিন। গল্প হলেও সত‍্যি। মলের নামেই শুধু রূপশ্রী বেঁচে আছে। বাকিটা যেন ধুলোমলিন এক অপাংক্তেয় বিবরণ। কাছে যেতেই ফুটপাতের ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে এলেন বিড়িপানের দোকানী। খোলা আকাশের তলে সংসার সামলানোর লড়াই জারি রাখছেন আরেক আলোমানুষ। এখন নিজের আঁধার পথে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলার এক বিশ্বস্ত অস্ত্র। চলনে স্থবিরতার শাসন। তবুও নিজের স্বপ্নসম্ভবের বিষয় নিয়ে যখন কথা, তখন এগিয়ে এলেন। রংচটা চেয়ার এগিয়ে আতিথেয়তা করলেন। বললেন ত্রিশবছর ধরেই টর্চের সাথেই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তাই সামনের গ্লাসে চিড় ধরলেও কিছু মায়া রয়ে গেছে। অন্ধকার হলে নাকি ব‍্যাটারির লংসিবিটি এমনি বলেন বেড়ে যায়। ববি, মেরা নাম জোকার ,শোলে, সপ্তপদী, পথে হল দেরীর লাইটম‍্যানসুধাকর। অনাদির ক্লাসমেট। ছেলে বিসিএস। বহু বারণ না শোনা এক অদ্ভুতমানব। নাইট শোয়ে না গেলে মনটা নাকিহু হু করে উঠতো। একশো দুই জ্বর নিয়েও হলমখী সুধাকর। এক আলোমানুষ।

আকাশে বহুদিন বাদে একটু নিঃসঙ্গ মেঘের দেখা পেল ওরা। খানিক বাদেইঝেঁপে নামবে। অনাদির হাতে মাইক।একে একে শিবেন, জগাই, নিরেন, সুধাকর এগিয়ে আসছে। হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্মৃতিস্মারক। এরপর জিনা ইহা, মরণাইহা গাইল সুধাকর। ভায়োলিনে আশাবরীর ধুন তুলল ফেরিওয়ালা জীবন। আফ্রিকা শোনালো রেভিনিউ অফিসার নীলাদ্রি। বিদ‍্যুৎ এর সেতু গড়ছে আকাশ। জানলার সারশী গলেজল নামছে। অবনীর হাতে মাইক। একটা ঝড়রাতের উৎসবে কথামালারা যেনবৃষ্টি হয়ে ঝরছে। পঁচাশির রি-ইউনিয়ন।হঠাৎ লোর্ডশেডিং। সুধাকরের আলোজ্বলে ওঠে। অবনী উদাত্ত কন্ঠে বলেচলে"হে মোর চিত্ত পুণ‍্য তীর্থ জাগোরেধীরে"।অডিয়েন্সে পঁচাশির ব‍্যাচ। নিভুআলোয় একেকটা মুখে মুখে আলো পড়ছে। সুধাকরের নাইট শো একদিনের জন‍্য ফিরিয়ে দেয় পঁচাশির রি-ইউনিয়ন।

লাইটম‍্যান সুধাকর আলো ফেলছে ক্লাসমেটদের মুখে। একটা বৃষ্টিভেজা নাইট শো ক্রমশ কেন্নোর মত গুটিয়ে যায়। আলো ফেরে। সুধাকরের কাজশেষ। সময়ের স্টেশনে একটা রেলগাড়ি হল্টের দিকে বাঁক নেয়। পথ দেখায় এক বৃদ্ধ লাইটম‍্যান।

Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

1 Comments:

Gobinda Talukdar বলেছেন...

নস্টালজিক গল্প। ছোটবেলায় হলে লাইটম্যানের টর্আের আলো দেখেছি। খুব ভালো লাগলো।