কবি সন্তোষ সিনহা : বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি

কবি সন্তোষ সিনহা
কবি সন্তোষ সিনহা বাংলা কবিতার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালে, কোচবিহার জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের ফুলবাড়ি কমপ্লিট বেসিক স্কুলে। এরপর কোচবিহার শহরের নৃপেন্দ্রনারায়ণ হাইস্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং এ.বি.এন শীল কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর হন।

১৯৭৮ থেকে মাথাভাঙ্গা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে অবসরপ্রাপ্ত হন ২০১২ সালে। গল্প লেখা দিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও মূলত আশির দশক থেকে কবিতাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে। অবশ্য কবিতার পাশাপাশি কবিতাবিষয়ক গদ্য ও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধও লিখেছেন। আশির দশকে সম্পাদনা করেছেন দুটো লিটল ম্যাগাজিন -- ময়ূখ ও ঋষ্যমূক। প্রচারবিমুখ এই কবি উত্তরবঙ্গের বাইরে নিজেকে সেভাবে না ছড়ালেও আশি ও নব্বই দশকে 'দেশ', 'বসুমতি' 'প্রতিক্ষণ' ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত কাগজগুলোতে নিয়মিত বা অনিয়মিত কলম ধরেছেন।

বর্তমানে শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে দেখা গেলেও দক্ষিণবঙ্গের 'কবিতা আশ্রম', 'একমাত্র'তে এখনও মাঝেমাঝে কলম ধরছেন। এহেন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ "বিধ্বস্ত প্রহরে, প্রিয়মুখ" প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় "রাত্রিভূমি" (১৯৯৩), "স্বপ্নের কবিতাঃ সূর্যাস্তের ভাষা" (২০০০), "কবিতা কুঙ্কুরার সুতা"(২০০৪), " অতিমর্ত্যদেশ"(২০০৫), "মণিবন্ধে এঁকেছ ভৃঙ্গার" (২০০৫), "সফর দরোজা জুড়ে" (২০১১), "দোতোরার ডাং" (২০১২), "হে মধুর" (২০১৩), "নষ্ট পাথর" (২০২৪), "সুদূর কৈশোরের মাঠ" (২০১৬), "অড্ডিম পঙখী অফুলা শাক" (২০১৬), "নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ"(২০১৭) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থগুলি। কবিতার সূত্র ধরে অত্যন্ত স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন কবি অরুণ মিত্র, অশ্রুকুমার সিকদার ও আবুল বাশারের কাছে।

অশ্রুকুমার সিকদার কবিকে নিয়ে আনন্দবাজারে কলমও ধরেছিলেন বেশ কয়েকবার। সন্তোষ সিনহার "শূন্যপুরাণ" পড়ে প্রথিতযশা সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার কবির ঘরে এসে আশির্বাদ করে যান। জানা যায় কবি জয় গোস্বামী ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে কবি সন্তোষ সিনহার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতাও সারেন। শুধু তাই নয়, কবিতার পাশাপাশি অজস্র ছড়া লিখেও ভূয়সী প্রশংসা কুড়োন তারাপদ রায়, জ্যোতিভূষণ চাকি, কার্তিক ঘোষ প্রমুখ প্রখ্যাত ছড়াকারদের কাছ থেকে।

তবে শুধু বাংলা কবিতা নয়, বাংলার পাশাপাশি রাজবংশী ভাষার কবি হিসেবেও কবি সন্তোষ সিনহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ধরে রাখেন। ফলস্বরূপ সম্মানিত হন ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক "রাজবংশী ভাষা সাহিত্য সম্মান"-এ। এছাড়া বাংলা সাহিত্যের জন্য " উত্তরবঙ্গ নাট্যজগত পুরষ্কার"(১৯৮৯), "কিরাতভূমি পুরষ্কার"(১৯৯১), "নবান্ন পুরষ্কার"(২০০৩), " উত্তরবঙ্গ বইমেলা স্মারক সম্মান"(২০১৫), "চিকরাশি সম্মান" (২০১৬) এবং "হিতেননাগ স্মৃতি পুরষ্কার" (২০১৭) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য সম্মান ও পুরষ্কারেও কবির কাব্যভুবন সেজে ওঠে। যদিও কবির বহুল পাঠক আজও মনে করেন যোগ্য বা প্রাপ্য বহু সম্মান থেকে কবি এখনো বঞ্চিত। "শূন্যপুরাণ" কাব্যগ্রন্থ, "অতিমর্ত্যদেশ" কাব্যগ্রন্থের 'রমণীমোহনের সঙ্গে আলাপ'  সিরিজের কবিতাগুলো এবং "স্বপ্নের কবিতাঃ সূর্যাস্তের ভাষা" কাব্যগ্রন্থের জন্য আজও বহু পাঠকের মুখে মুখে আলোচিত এই কবি কবিতা লেখার পাশাপাশি ছবি আঁকাতেও সমান পারদর্শী। অসংখ্য বই ও পত্রিকার জন্য প্রচ্ছদও এঁকেছেন এবং এখনও এঁকে চলেছেন। আসলে কবি সন্তোষ সিনহা বহুমুখী শিল্পের অধিকারী।

কবির লেখা বহু নাটক যেমন মঞ্চস্থ হয় তেমনি ভাওয়াইয়া গানও রেকর্ড হয়। তবে, সবকিছুর উর্ধ্বে কবিতাকেই কবি পাখির চোখ মনে করেন। কবিতাই তাঁর সবচেয়ে কাছের ও অনিবার্য প্রেম হয়ে ওঠে। সম্প্রতি, কবির " স্বপ্নের কবিতাঃ সূর্যাস্তের ভাষা" কাব্যগ্রন্থ থেকে একটি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে প্রকাশিত "হার্বিঞ্জাল এসাইলাম" নামক আন্তর্জাতিক স্তরের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ৬৭ বছর বয়সী কবি বর্তমানে চোখের সমস্যায় ভুগছেন। তাই আক্ষেপ ইচ্ছে সত্ত্বেও দীর্ঘক্ষণ পড়তে পারেন না এবং অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যা থেকে মুক্তি না পেলে জীবনের আরও বহু লেখা হয়তো অলেখাই থেকে থাকে, এই আশঙ্কায় দিন কাটান।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.