স্বপ্ন পূরণ : মিঠুন রায়

 মিঠুন রায়

স্বপ্ন পূরণ 

 মিঠুন রায়

সিটি কলেজের অধ্যাপক সৌগত সেন চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন মাত্র দুই বছর আগে। ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক সৌগত বাবু চাকুরী জীবনে সবসময় ছাত্র -ছাত্রীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি মানবতার পাঠও দিয়েছেন। প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে না উঠলে যে পুঁথিগত বিদ্যা বা বড় বড় সার্টিফিকেট অর্থহীন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।নিজের আদলে দুই মেয়েকেই বড় করেছেন তিনি। পুত্রহীন সৌগত সেন মেয়েদের  মধ্যেই ছেলের সমস্ত কর্তব্যবোধ দেখতে পান। বড় মেয়ে তিন্নি বাবার মতোই প্রগতিশীল ভাবধারায় বিশ্বাসী।

 সৌগত বাবু চাকুরীর ফাকে ফাকে অবসর সময়ে হরিজন কলোনীতে একটি অবৈতনিক  নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। শিক্ষা আছে চেতনা। চেতনাবোধ না হলে মানুষ  নিজের অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারে না। সন্ধ্যার পর বড় মেয়ে তিন্নিকে নিয়ে ঐ স্কুলে যান তিনি। যদিও এই বিদ্যালয় পরিচালনা করতে গিয়ে ওনাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। নিন্ম বর্ণের মানুষদের মধ্যে শিক্ষা পৌছানোর উদ্যোগ অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। যাইহোক,আচমকা হৃদরোগে মারা যায় সৌগত সেন। এবার মৃতদেহ সৎকার নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। এলাকার যুবক সহ প্রবীণরা শবদেহ স্পর্শ করতে নারাজ। কারণ,তিনি নিয়মিত হরিজন পাড়ায় যেতেন। তাদের ছেলেমেয়েদের কোলে নিতেন।তাদের হাতে জল খেয়েছেন। যাইহোক, শেষ পযর্ন্ত দুই মেয়েই হরিজন পাড়ার মানুষদের নিয়ে শবদেহ কাধে বহন করে শ্মশানে রওয়ানা হন। সমাজেতো এমনিতেই নানা সংস্কার। পুরোহিতের আপত্তি  পুত্র যেহেতু নেই,মৃতদেহ  মুখাগ্নি করবে কে? প্রচলিত সংস্কারকে পেছনে ঠেলে তিন্নিই বাবার মুখাগ্নি করলেন। যেহেতু আত্মীয়স্বজন কেউই এগিয়ে আসে নি।তাই বলে কি বিনা মুখাগ্নিতেই বাবার দাহ হবে।

পরিবারের অভাব অনটন শর্তেও তিন্নি,ছোটবোনকে ভালো করে লেখাপড়া করিয়েছেন। ইতিমধ্যে একটি প্রাইভেট জব পায় সে।পরিবারকে সাজাতে গিয়ে একসময় বহমান যৌবনের দিকে ফিরে তাকানোরও সময় পাই নি তিন্নি। ছোটবোন বিন্নি বিদ্যাসাগর গার্লস কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স সহ বি.এ পাশ করেছে।সহপাঠী নবীনবরণকে ভালোবাসে সে। নবীন তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু সংসারে অবিবাহিত বড় বোন থাকতে ছোট বোন বিয়ে করলে এমনিতেই নানা কথা উঠবে। দিদি তিন্নিকে সাহস করে বলতেই খুশি  সে।বলে উঠল, এতো আনন্দের বিষয়। আমি ধুমধাম করে তোদের বিয়ে দেব। চব্বিশে শ্রাবণ বিয়ের দিন ধার্য হল  দুপক্ষের সন্মতিতেই। গোধূলি লগ্নে বিয়ে। বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যায়  শিলিগুড়ি থেকে এসেছেন  তিন্নির ছোট অবিনাশ বাবু।তিনি অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক।বিবাহমন্ডপে বরও এসেছেন। কিন্তু কন্যাদান করবে কে? মেয়ের বাবাতো জীবিত নেই। পাড়ায় বেশ কয়েকজন প্রবীণরা এগিয়ে এসেছেন বিন্নিকে কন্যাদান করতে। ঘরের মানুষ হিসেবে অবিনাশবাবুতো আছেনই। কিন্তু না,এগিয়ে এসেছেন বড় দিদি তিন্নি।বাবার মুখাগ্নি যখন আমি করেছি, তো ছোটবোনের কন্যাদানও আমিই করব।তবেই আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে। সমাজে মেয়েরা নিজেদের সম্মান নিজেরাই অর্জন করবে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.