আশীর্বাদ প্রাপ্তি : ছবি ধর


আশীর্বাদ  প্রাপ্তি 

ছবি ধর

কত সহজে আশীর্বাদ পাওয়া যায়  তাইনা ? নিজের দুঃখ কষ্টগুলো ছাপিঁয়ে  দুহাত বাড়িয়ে দেয় অন্যের মঙ্গল কামনায়, প্রার্থনা করে ঈশ্বরের কাছে, এতোটুকু কার্পণ্য নেই, সংকীর্ণতা নেই;  যা  না দেখলে বিশ্বাস হয়না।  শুধু মনে হয় যে, এও কি সম্ভব ? 

সকালবেলা ঘুমথেকে উঠে আমি চায়ের জল  চাপিয়ে ফ্রেস হয়ে  কিচেনে যাচ্ছি হঠাৎ দরজার বেল  বেজে উঠতে কেমন আঁতকে উঠি।  কারণ এখন তো লক ডাউন, বেল বাজে না।  অনেক দিন হলো, কে হতে পারে  এই ভেবে  ব্যালকনিতে গিয়ে ঝুঁকে দেখি একজন মহিলা, ঘোমটা দিয়ে মুখ আঁচলে ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন।  

আমি বলি কি হয়েছে বলুন? উনি সেই মাসি, যিনি পূজোর আগে আমাদের বাড়ীতে কিছুদিন কাজ করেছিলেন কোনো সময়। বকশিস আর পছন্দের শাড়ি পেয়ে খুশী হয়েছিলেন খুব। তার পর  আর আসেননি কোনোদিন বয়েসের ভারেই  হয়তো। 

মহিলা ঈশারায় হাত দিয়ে বলেন নীচে যেত। যাচ্ছি বলে  আমি  ঘরে এসে  গ্যাস  বন্ধ করে, মাস্কটা  পড়তে পড়তে  নীচে  যাই। উনি আমার দিকে হাত তুলে  দূরেই  থাকতে বললেন।  যেনো আমি আর না এগিয়ে যাই।  আমি দাঁড়িয়ে বলি, কেমন আছেন আপনি? এতো ভোরে এলেন  কিভাবে ? 

গাড়ী চলে না তবে কি  বলতেই  ---  
উনি কান্না ভেজা গলায় বলতে থাকেন হেঁটে হেঁটে এলাম তোর কাছে, মনে পড়লো তোর কথাই, কি করবো  খিদের  জ্বালা, মা-রে  শুধু রেশনের চাল ডালে  আমাদের পাঁচ  জনের চলে বল ?
কাজ নেই  জামাইটার,  মেয়েরও  কাজ বন্ধ। অতি কষ্টে দিন যায়। রাতে  ঘুম আসে না, পরদিন  সকালে  ভাতের  হাঁড়ি  কি করে চড়বে উনুনে সে চিন্তায়। 

ছেলেটা হায়দ্রাবাদ থাকে, কাজ করতে গিয়ে আটকে  পরেছে।  আসবে কবে জানি না।  টাকা পয়সা যা পাঠিয়েছিল, সব শেষ।   তাই মেয়ের বাড়ীতে আছি, কিন্তু অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায় বলে না ?  সবই  কপালের ফের, নইলে দেশ থেকে এসে কি ভালোই বা হয়েছে, এদেশে এসে থেকে কষ্টের চাঁই  একটুও কমেনি,  অভাবও  তেমনি  অটল।  কি করি, নাতি নাতনি দুটোকে ভালো কিছু খাবার তুলে দিতে পারি না দিদা হয়ে,  এর চেয়ে মরে  যাওয়াও  ভালো।  কিন্তু ভগবান না নিলে তো মরতেও  পারি না।  মাসির মুখেই শুনেছি ওনার বাবা ধনী ছিলেন, কিন্তু  বিয়ের পরে স্বামী অকালে মারা গেলে, এদেশে এসে  এই অবস্থার স্বীকার হয়েছেন মাসি।

আমি বললাম  দাঁড়ান আপনি  আমি ওপর থেকে যা হয় কিছু  নিয়ে আসছি।  বলে আমি ওপরে এসে  কিছু  চাল, ডাল, আটা, আলু, সয়াবিন, সাবান এইগুলো একটা ব্যাগে  ভরে আর মানি ব্যাগ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আবারও নীচে গেলাম। দূর থেকে টাকা আর  ব্যাগটা  দিতেই  উনি  এতো  খুশী  হয়ে  আমাকে আশীর্বাদ করে, ঈশ্বরকে  স্মরণ করে কিছু বলতে লাগলেন,   যে আমার  নিজেকে খুব ছোট মনে হলো।   এই সামান্য দানের বদলে এতো  আশীর্বাদ  করতে পারেন  তিনি, কতখানি  উদার  কত বড়ো  মনের মানুষ!  কত অল্পতে খুশি হলেন !

সাদা  থানের কোল আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে বললেন  ''মা  অনেকটা পথ  এসেছি আবার হেঁটেই ফিরতে হবে, তু্ই একটু মুড়ি যদি দিস, খেতে খেতে হাঁটতাম  না হয়। " আমার খুব লজ্জা  লাগছিল, সত্যি তো ১২ কি.মি. পথ  আবারও হাঁটবেন এই বয়স্ক মানুষটি।   রাস্তায় কোনো  দোকানও     নেই  যে ;  কিনে খাবেন  কিছু।  আমি আবার ওপরে এসে তাড়াতাড়ি  একটা জলের বোতল, কিছু মুড়ি, চিড়ে আর এক টুকরো  গুড়  একটা ঠোঙায় ভরে  দিতে গেলাম।  নিয়ে  বলেন,  `মা,  তোর হাতের রান্না রুই  মাছের মুড়ো দিয়ে  কলাই ডাল, কচু শাক  আর শৈল মাছের ঝোল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়েছিলাম।   আজও ভুলিনিরে।   আবারও  বললেন ভালো থাকিস মা, আসি আমি।  আর দেরী করি না,  তোকে অনেক কষ্ট দিলামরে,  বলে চলে গেলেন। 

বাড়ীর  সকলে ঘুমিয়ে ছিল।   কাউকে বলা হয়নি সেদিন।  আর  কেউ জানেও না তাই।  কিন্তু  প্রায় এক মাস  কুঁড়ি পঁচিশ  দিন হয়ে গেলো  সত্যি বলছি  আজকেও একটা কষ্ট অনুভব করি  যে, এই  বিন্দু পরিমান সাহায্য  করে  এক গলা জলে  ডুবে আছি মনে হচ্ছে যেন আমার।   আমরা কত কিছু  অনায়াসে ভুলে যাই, কত কি হারিয়ে ফেলি কিন্তু ওনার এই মহানতার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম।   যা কোনোদিন হারাতে  চাই না।  ওনার কথা না বললে ওনার প্রতি অবিচার হয় বলে মনে করি।  ঈশ্বর যদি  সহায় হোন লকডাউন  উঠে গেলে অবশ্যই  ওনার বাড়ি গিয়ে  একদিন যা হোক কিছু খাবার  দিয়ে ওনাকে দেখে  আসবো।   জানি আমার সাধ্য সীমিত  তবুও অনেক না হোক একজনের মুখেও যদি  এই দুঃসময়ে হাসি ফোটাতে পারি,  সেই হবে আমার প্রাপ্তি।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.