লক ডাউন : নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত
লক ডাউন : নৃপেন্দ্রনাথ মহন্ত

কাল্টু ও সুজলা ঘরের এক চিলতে বারান্দায় বসে একপ্রস্থ কষে গাল দেয় সরকারকে।
: ইঃ,নক ডাউন বললেই হোলো!। ছেলের হাতের মোয়া!
: নক ডাউন নয় গো,কথাটা হোলো লকডাউন। সাক্ষর কাল্টু বউয়ের কাছে বিদ্যা জাহির করার সুযোগ ছাড়ে না।
:ওই একই কথা।গরিব মারার ফন্দি! বাবুরা তো বসে বসে মাইনা পাবে। ওদের আর কী চিন্তা?ওরা তো বলবেই,ঘরে থাকো, ভালো থাকো।পেটে কিছু থাকুক আর নাই থাকুক।

 আজ প্রায় দু সপ্তাহ ওদের উপার্জন বন্ধ। রাস্তায় রিক্সা বেরোতেই দিচ্ছে না।বাজারে বিকেলে একটা তেলেভাজা ও ঘুগনির দোকানে এঁটো প্লেট ও গ্লাস মেজে-ধুয়ে দিনে ত্রিশ টাকা পেতো সুজলা। ওদের দুজনের মিলিত উপার্জনে বৃদ্ধ বাবা আর দশবছরের ছেলেকে নিয়ে চারজনের সংসার তেল খাওয়া মেসিনের মতো গড়গড় করে চলতো। এখন সব বন্ধ।জমানো পয়সায় দিন দশেক কোনোরকমে কেটেছে। কিন্তু আর চলছে না। দানখয়রাতির চালডালে দুদিনের বেশি চলে নি। ছেলের ইস্কুল বন্ধ। অতএব মিড-ডে-মিলও নেই। ছেলেটা তিনদিনের বাসি রুটি আর চিবুতে চাইছে না। নিরুপায় স্বামীস্ত্রী তাই অসহায় আক্রোশে সরকারকে বসে বসে গাল দিয়ে গায়ের ঝাল ঝাড়ছে।  
এমন সময় খক্ খক্ করে কাশতে কাশতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো বৃদ্ধ সুখধন।বাইরে এসে একদলা কফ ফেলে হাঁপাতে শুরু করলো।
কাল্টুর চোখে ভেসে উঠলো প্রতিবেশী পরাণ বসাকের বাড়িটা। বাড়িটা এখন খাঁ-খাঁ করছে।জ্বর-সর্দি-কাশির জন্য পরাণ বসাকের ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের একটা বিচ্ছিন্ন কক্ষে আর তার পরিবারের তিন সদস্যকে পাঠানো হয়েছে কোয়ারান্টিন সেন্টারে। দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার আর চিন্তা নেই।
কী ভেবে সুখধনের দিকে এগিয়ে যায় কাল্টু। ওর চোখদুটো যেন জ্বলছে।
: বাবা!
সুখধন থিতু হতেই মোলায়েম স্বরে ডাকে কাল্টু।
: বল্।
: খুব কাশি হচ্ছে,না?
: হ্যাঁ রে বাপ।
: সর্দিও আছে?
: না,শুকনা কাশি।
: শ্বাসকষ্টও আছে,না কেমন স্বগতোক্তির মতো শোনালো কথাকটি। আসলে সে দোকানের টি-ভিতে শোনা করোনার লক্ষণগুলো মেলাচ্ছিল মনে মনে।
: জ্বরও তো আছে নিশ্চয় ?চোখে প্রশ্নচিহ্ন ফুটিয়ে মন্তব্য করলো কাল্টু।
: না,না। তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো সুখধন।
:জ্বরজারি আমার হয়না বড় একটা ।
হয়না,না? কেমন হতাশা ফুটলো তার কথায়। যেন মাত্র এক নম্বরের এদিক-ওদিকে লাখটাকার লটারির পুরস্কার হাতছাড়া হল তার।
অবাক হয়ে ওর হতাশাদীর্ণ মুখের দিকে চেয়ে রইলো বৃদ্ধ সুখধন দেবশর্মা।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.