![]() |
| আর্য ভারত ও শূদ্র ভারত: একটি তুলনা : মৃদুল শ্রীমানী |
এক বালকের কথা মনে পড়ে। সে প্রাচীন ভারতের কথা। বালকটি মুনিপুত্র। মুনির একটু বয়স হয়েছে। ছেলেকে কাছে নিয়ে পাঠ দিচ্ছেন। এমন সময় এক যুবা এসে বালকটির মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে যাচ্ছে দেখে বালকটি ককিয়ে উঠে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো, বাবা কিছু করো। ওই লোকটা যে মাকে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ব্রহ্মবিদ মুনি নির্লিপ্ত কন্ঠে বললেন, বাবা, মেয়েরা গাভীর মতোই স্বাধীন। শাস্ত্রে আছে, মেয়েরা যখন যার সাথে ইচ্ছা গমন করতে পারে। তুমি বিচলিত হোয়ো না। (এখানে গমন মানে শুধু হেঁটে চলে যাওয়া ভাববেন না। গমন মানে সুরতক্রিয়া, অর্থাৎ যৌন সঙ্গম) মুনির ছেলে বড়ো হয় সব শাস্ত্র ওলট পালট করে দিলেন। মেয়েদের চলা ফেরা, কথা বলা, আচার আচরণের উপর প্রবল বিধি নিষেধ চাপানো হল।
পাণ্ডবেরা যখন অজ্ঞাতবাসে ছিল, তখন তাদের গোপনে মেরে ফেলার জন্য দুর্যোধনের উদ্যোগে কৌরবেরা সক্রিয় ছিল। কৌরবদের তরফে লাক্ষা দিয়ে একটা বাড়ি বানিয়ে সেখানে পাণ্ডবদের বসবাসের ব্যবস্থা হয়। বাড়িটিতে ঢোকার সময়েই পাণ্ডবেরা লাক্ষার গন্ধ পেয়ে দুর্যোধনের কুপ্রবৃত্তি আঁচ করতে পারেন। তার পর নিজেরাই ওই জতু গৃহে আগুন লাগিয়ে গা ঢাকা দেন। তার আগে একটি খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হয়েছিল। গরিব গুরবোরা খেতে এসেছিল। একটি দলিত পরিবারের পাঁচ ছেলে মা সহ ওই জতুগৃহে থেকে যায় ও পুড়ে মরে। তাদের পোড়া শরীর দেখে যাতে দুর্যোধনেরা নিশ্চিন্ত হয়, এমন একটা বোকা বানানোর কৌশল পাণ্ডবদের তরফে নেওয়া হয়েছিল।
দলিতেরা পুড়ে মরলে আসলে কোনো ক্ষতি হয় না। কেন না, তারা শূদ্র এবং ব্রহ্মার শরীরের পা থেকে জন্মেছে। শূদ্র ভারত এই রকমই । তার পুড়ে মরায় বা ধর্ষিত হওয়ায় বা বিবস্ত্র করে ঘোরানোয় প্রকৃত ভারতের সম্মান হানি হয় না। সমস্ত রকম নিষ্ঠুর অত্যাচার এর শিকার হবার জন্যেই শূদ্র ভারতের সৃষ্টি ।
কুরুসভায় যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ হচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন ধৃতরাষ্ট্র। আর ছিলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য । এঁরা প্রত্যেকে বিরাট বীর। ধৃতরাষ্ট্র দৃষ্টিগত প্রতিবন্ধী হলে কি হবে, "অন্যভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন" বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন ঠিক তাই। কাউকে তেমন ভাবে চেপে ধরতে পারলে পিষেই মেরে দিতে পারতেন। ছিলেন সাক্ষাৎ ধর্ম বিদুর। পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই তো ছিলেনই। কিন্তু নিয়ম, নিয়মের ফ্যাস্তাকলে পড়ে কেউ কিছু বলতে চাইলেন না। পাঞ্চালী যাজ্ঞসেনী সেই দিনটাতে রজস্বলা, মানে মাসিক চলছে, আর একটাই কাপড় পরা, সেই তাঁকে প্রকাশ্য রাজসভায় রাজপুরুষরা বিবসন করতে কাপড়টা ধরে টানছেন। এই দেখে ভীম একটু তেড়ে মেরে উঠেছিলেন। সেও আপন অগ্রজের নির্বুদ্ধিতার উপর। কিন্তু "দুর্যোধন, দুঃশাসন, তোমরা এটা করতে পারো না। এই তরবারি ধরলাম। তোমাদের এ অন্যায় সহ্য করছি না", এ কথা কোনো বীর বললেন না।
যে সমাজে শিক্ষিত, পদস্থ, গুণী, মান্য ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে ভুলে যান, নিয়মের যাঁতাকলে আছেন ভেবে চুপ করে থাকেন, সেই সমাজটা ফ্যাসিবাদের রাহুগ্রাসে পড়েছে। ওই নিয়মটা, যেটাকে পূজা করেন সেই সমাজের নিয়মনিষ্ঠ সুনাগরিকেরা, ওটা আসলে কোনো নিয়মই নয়। ওটা নির্লজ্জ সুবিধাবাদ। অবিমিশ্র স্বার্থপরতা। নিজেকে টিঁকিয়ে রাখার কল কৌশল। ধান্ধাবাজির প্রকারভেদ।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন