অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল
অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

পর্বঃ-১

     ছোট্ট বেলা থেকে দুঃর্ভাগ্য নিপীড়িত, ব্যথিত, দিশাহারা, মাতৃ-পিতৃ হারা, অপরের দয়াতে বেঁচে থাকা এক অসহায় অভাগীনি হলো নিরুপমা।এই বিশাল পৃথিবীতে ঠিকানাহীন কুলহারা নাবিকের মতো,অজস্র বেদনার জল-তরঙ্গ রাশির আঘাতে আঘাতে বেদনা'সৃক্ত।এমনই সংসার সমুদ্রে ভেসে যাওয়া গন্তব্যহীন আপন-স্বজন হারা অবিরত অশ্রু-সিঞ্চিত বারিতে গন্ডক'স্নাত অসহায় অভাগীনির জীবনের দৃষ্টান্ত-মুলক প্রতিচ্ছবি হলো এই ''অভাগীনির নক্সী-গাঁথা''র বিবর্ণমালা।

     ছোট্ট নিরুপমার জন্ম এক দরিদ্র দুলে-বাগদীর ঘরে।যখন তার বয়স মাত্র ৩ মাস,তখন তার দরিদ্র পিতা অজানা অসুখে মারা যায়।অসহায় অভাগীনি মাতা শত চেষ্টা করেও ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি।সদ্য স্বামী হারা স্ত্রী-র একমাত্র শেষ অবলম্বন হলো নিরুপমা।সদ্য বিধবা সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সহায় সম্বল হারা নারী ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে এখন তার স্বপ্নের পৃথিবী।ছোট্ট নিরুপমাকে বুকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখে রোজ। মেয়েকে মানুষ করে তোলার সংকল্পে ব্রতী হয়।লোকের বাড়ীতে কাজ করে,বাসন মাজে,রান্না করে সংসার চালায়।বাকী সময়টা বাড়ীর পাশে দীগন্ত বিস্তৃত সবুজ ঘেরা মাঠে গোবর কুড়িয়ে,ঘুঁটে বেচে তার কোন রকমে দিন অতিবাহিত হয়।

     অভাবে দুঃখ-দারিদ্রতার মধ্যে দিয়ে বাঁচার রসদ জুগিয়ে চলেছেন সদ্য স্বামী হারা ব্যর্থ অসহায় নারী।অভাগীনি 'মা' খেয়ে না খেয়ে অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে মেয়ে নিরুপমাকে বড়ো করে তোলে।সবে মাত্র বুঝতে শিখেছে পিতৃ হারার যন্ত্রণা।এরই মাঝে ছোট্ট নিরুপমার জীবনে চরম বিপর্জয় নেমে আসে।হাড় ভাঙা পরিশ্রমের পর একদিন বাড়ী ফিরেছেন।হঠাৎ নিরুপমার মা-য়ের শরীরে প্রচন্ড জ্বর।ভালো করে ডাক্তার কবিরাজ দেখাতে পারলোনা। মা বিছানা শয্যা হয়ে পড়লেন।অভিশপ্ত দুই-তিন দিনের জ্বরে অসহায় মা গেলেন মারা।তখন অভাগীনি নিরুপমার বয়স সবেমাত্র চার বৎসর।তিন কুলে আপন স্বজন বলতে কেউ নেই।মৃত মা-কে জড়িয়ে ছোট্ট শিশু কাঁদতে লাগল ক্ষুধার জ্বলায়।ছোট্ট শিশুতো জানে না।তার মা আর এজগতে নেই।বাড়ীর আশে পাশে কোন প্রতিবেশীরা অসহায় শিশুকে কোলে তুলে নিতে এগিয়ে আসলো না।পাশে রুপসা গ্রামে বাস করতেন এক নিঃসন্তান বৃদ্ধ দম্পত্তি।লোক মুখে এই দুঃসংবাদের কথা শোনেন।শোনার পর কাল বিলম্ব না করে দম্পত্তি যুগল এগিয়ে আসে ছোট্ট অভাগীনি মাতৃহারা নিরুপমাকে কোলে তুলে নিতে,পরম স্নেহে মানুষ করবার জন্য।পরম মঙ্গলময় ঈশ্বরের অশেষ কৃপা।আমাদের শেষ জীবনে অপত্য-স্নেহ সুধা পরশ পান করবার জন্য,এই অসহায় অভাগীনি নিরুপমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।আমাদের শেষ জীবনে বাবা-মা ডাকটি শোনাবার জন্য ও বংশের শেষ প্রদীপটি জ্বালা বার জন্য।

     পরম স্নেহে আপন সন্তান জ্ঞানে ছোট্ট নিরুপমাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন।মৃত নিরুপমার মা-য়ের দেহটা নিয়ে পাশে রুপসা-নদীর তীরে চিতা জ্বালিয়ে শেষ-কৃত্য সম্পন্ন করেন।অভাগীনি নিরুপমাকে নিয়ে বৃদ্ধ-দম্পত্তি এক অনন্য-স্বাদের অনুভুতি নিয়ে নিজের বাড়ীতে ফিরে এলেন।তাদের কাছে নিরুপমা বড়ো আদরের।বাবা-মায়ের অভাব কোন দিনের জন্য বুঝতে দেয়নি ওই বৃদ্ধ-দম্পত্তি। নিরুপমাকে বড়ো করে তোলা ও পড়াশুনা শিখিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে, তাকে দশের মধ্যে একজন করে তোলার দৃঢ় সংকল্পে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

     নিরুপমা যখন বড়ো হলো,সে পুর্বের সমস্ত অতীত তার স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে ফেলেছে।কিছু তার মনে নেই।
----মনে থাকবেই বা কেমন করে?
---সেই কোন কালে বাবা-কে হারিয়েছে।মা-কে হারিয়েছে।তার মা যখন মারা যায় তখন ভালো করে কথা বলতে শেখেনি নিরুপমা।তাই নিরুপমা মনে প্রাণে জেনে এসেছে,এই বৃদ্ধ-দম্পত্তি শুভময় বাবু ও আশাপুর্ণা দেবী তার নিজের বাবা-মা।

     শুভময় গাঙ্গুলী জাতে ব্রাম্ভন।কিন্তু মানুষে গড়া ধর্ম নামক কুসংস্কারকে বিশ্বাস না করে,দুলে-বাগদী নীচু জাতের সন্তানকে আপন সন্তান মনে করে কোলে তুলে নিয়ে ছিলেন।আশাপুর্ণা দেবী স্বামীর মতো একই আদর্শে বিশ্বাসী।শুভময় বাবু ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক ও আদর্শবান শিক্ষক।তিনি পেশাতে নীতিবান শিক্ষক হলেও সামাজিক কাজ-কর্মে সুনাম ও কৃতিত্ব রয়েছে।এক সময় তিনি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।সামাজিক কার্য-কলাপের উপর ভিত্তি করে।তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান আধুনিক সমাজ সংস্কারক।

     এমন একজন স্বত্ ও ন্যয়-নিষ্ঠাবান ব্যক্তির কাছে আপন কন্যা রুপে মানুষ হলে......
-----নিরুপমা কি আর অভাগীনি থাকতে পারে?
----কিন্তু,গ্রামের মানুষের সুখে খেলে ভুতে কিলোয়।আমরা একের সুখ দেখে,অপরে হিংসে করি।কখনো নিজের ছাড়া অপরের ভালো চাইনা।আজ-কাল আমাদের সমাজে এমন মানুষ দেখা মেলে ভুরি ভুরি।বর্তমান সমাজে মানুষের মানসীকতা এতটাই নিকৃষ্ট যে,গরীবকে কিভাবে ঠকিয়ে আরো ভিক্ষারী করা য়ায়।অার নিজের আখের গুছিয়ে স্বার্থ-সিদ্ধি লাভ করা যায়।যে ভালো হতে চায় তাকে কিভাবে ক্ষতি করা যায়।এই আমাদের জঘন্য সমাজের মানুষের নিকৃষ্ট মানসীকতা বাস্তব পরিচয়।

     নিরুপমা এখন নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে।বিবেক জ্ঞান জাগ্রত হয়েছে।পড়াশুনাতে খুব ভালো।রুপসা গ্রামে নিরুপমার সমকক্ষ দ্বিতীয় আর কেউ নেই।প্রতি ক্লাসে প্রথম হওয়াটা তার কাছে একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।এমনই দৃঢ় সংকল্পে তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছেন পিতা শুভময় বাবু।নিরুপমা যখন এই আদর্শ ও মেধা নিয়ে বড়ো হয়ে উঠতে চাইলো,ঠিক তখন এমনই ঘটনা ঘটল।ক্লাসের সহপাঠি বন্ধুরা হিংসা করতে লাগলো।ঠিক তেমনই গ্রামের প্রতিটা মানুষ তাঁকে, কুনজরে দেখতে লাগলো।তার সঙ্গে গ্রামের কোন বাবা-মা,তাদের ছেলে-মেয়েদের খেলা-ধুলা করতে দিতেন না।মেলা-মেশা করতে দিতেন না।কারন-নিরুপমা নিচু জাতের।দুলে-বাগদীর ঘরে জন্ম।তাই গ্রামের প্রতিটা মানুষ তাকে বিধ্বস্ত করবার জন্য ও তাঁকে দুঃখ দিয়ে আনন্দ পাওয়ার জন্য,তার অতীত জীবনের সমস্ত কথা শোনাল।কথা গুলো শুনে খুব ভেঙে পড়ে ও ব্যথায় ব্যথিত হয়ে পড়লেন।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.