অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল
অভাগীনির নক্সী-গাঁথা : কর্ণধর মণ্ডল

পর্বঃ-৫ম

     এই কথা বলে, কবিরাজ মশাই হতভাগীনি অভাগী নিরুপমার অতীত জীবনের বেদনার গল্প বলতে থাকলেন।রুপসা গ্রামে অনাথ অসহায় গরীব দুলে-বাগদীর মেয়ে হলেন অভাগীনি নিরুপমা!এটাই ছিল ওর সবচেয়ে বড়ো অপরাধ।কারন-ধনীর সঙ্গে ধনীর সম্পর্ক হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।ঠিক তেমনই জমিদারদের কাজ হলো গরীব অসহায়কে যত পারা যায়,তাদেরকে শোষিত-উৎপীড়িত করে ভিক্ষারী বানানো।সহানুভুতি দেখিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা নয়।এই হতভাগী নিরুপমা তোমাকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল,জীবনে সবচেয়ে বড়ো আপন বলে তোমাকে জেনেছিল। ওকে তুমি বিয়ে করলে হৃদয় ভরে সুখ পাবে,ভালোবাসা পাবে।
----কিন্তু,তোমার অহংকারী জমিদার পিতা কি পাবে?
----পাবে না রাজ-ঐশ্বর্য।পাবে না পঞ্চাশ ভরি সোনার গহনা।পাবে না নগত দশ লক্ষ টাকা।তোমাকে এত টাকা খরচ করে শিক্ষিত করেছেন।সেই টাকা তোমার পিতা উসুল করবেন কি ভাবে।তাই তাহার সাধের বিলাস-বাসনা,ধন-সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য মোহ-লোভ-স্বার্থের অভিলাষে পথের কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন।কিন্তু,পরম মঙ্গলময় ঈশ্বরের অশেষ কৃপা তোমার মহৎভবনুতা,মানবীকতা ও নিষ্পাপ ভালোবাসার জোরে ওই হতভাগী পুনঃজন্ম ফিরে পেয়েছেন।

     এরই মাঝে স্মৃতির পাতায় ''অভাগীনির নক্সী-গাঁথা''য় মনে মনে নিরুপমা লিখে ফেললেন,কিছু প্রেম-প্রীতি,অনুরাগ-অনুভুতি,কিছু ব্যথা-বেদনাময়-দুঃখ-স্মৃতি।নিরুপমা বার বার ''এই সমাজেকে চোখে তির্যক অঙ্গুলী তুলে দেখাতে চেয়েছেন - এই জঘন্য সমাজের প্রতিটি মানুষের নির্মম মানসীকতার পরিচয়''।একটা বৃন্ত-চ্যুত কুঁড়িকে কিভাবে পথের ধুলিতে পদ-দলিত করা হয়েছে।তার উজ্জল দৃষ্টান্ত হলো ''অভাগীনির নক্সী-গাঁথা''-বিরহের কাব্য।

     রুপম কবিরাজ মশাইয়ের এই নির্মম সত্যটা জানার পর,নিজের কাছে নিজে অপমানিত হতে লাগলেন।জীবনটা তুচ্ছ মনে হলো।লজ্জায় অপমানে রুপম নিরুপমার পানে মুখ তুলে তাকাতে পারছেন না।নিজের পিতার এমন অমানবিক অত্যচার ও নির্মম ব্যবহারের জন্য।এত দুঃখ-কষ্টের পেয়েও নিজের যন্ত্রণা নিজে বহন করে চলেছেন।ক্ষনিকের জন্য মহান জমিদারকে অপমানিত না করে।রুপম নিজেই  অপমানিত হলেন ও দুঃখ পেলেন।বাবা-মায়ের কর্ম-নীতির সঙ্গে নিজের জীবনের অঙ্কটা কিছুতেই মেলাতে পারছেন না।যতবার ভাগফলের আশায় অঙ্ক কষতে যায়,ততবার ঝর্না কলমের কালির ন্যায় দু'চোখের বিগলিত অশ্রু'ধারাপাতে হৃদয়ের প্রতিটি পাতা ভিজিয়ে দেয়।তার কাছে বাস্তব জীবনের অঙ্কটা কঠিন ও কন্টকাকীর্ণ।একদিকে বাবা-মায়ের অর্থ-পিপাসী ও কু-সংস্কারচ্ছন্ন মানসীকতা। অন্যদিকে সমাজের নিপীড়িত-নিস্পেষিত অসহায় অভাগীর বেদনার বালুচড়ে ভেসে যাওয়া নিষ্পাপ জীবন।সে নিজের ভালোবাসাকে সন্মান জানাতে অর্থ-ঐশ্বর্য ভুলে সত্যের পথযাত্রী।জাত-ধর্ম-বৈষম্য-বিভেদ ভুলে রুপম আজ মানব প্রেমের পুজারী।তার দাম্ভিক বাবা-মায়ের বাস্তব জগৎ ও রুপমের কল্পিত প্রেমের জগৎ সম্পুর্ন ভিন্ন-ধর্মী ও দ্বি-পথগামী।

     রুপম অনেক ভাবনা-চিন্তার করে একটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।বাবা-মায়ের অর্থ-লোভ, মিথ্যা-দাম্ভিকতার অহংকারে গরীব চাষী,প্রজা ও নিম্ন-সম্প্রদায়ের মানুষের উপর যে অমানুষিক,নির্মম-অত্যাচার করছেন।সেই পাপ কর্ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যোগ্য সন্তান হয়ে ভুলটা সংশোধন করবার দায়িত্ব আমার।
 ''সবার উপরে মানুষ সত্য,ভালোবাসা পরম ধর্ম''--রুপম এমনই চিরন্ত-বানী ও সত্যের আদর্শে বিশ্বাসী।একথা ভাবতে ভাবতে নিরুপমার হাত শক্ত মুষ্টিতে ধরে রুপসা-নদীর পাশ দিয়ে মেঠো পথ বেয়ে বাড়ীর অভিমুখে হাঁটা শুরু করলেন।রুপম ও নিরুপমা দুজনের ভালোবাসাকে অভ্যর্থনা জানাতে গাছের সবুজ পাতারা সোহাগে নিত্য করছে।ফুলেরা পাপড়ি মেলে উচ্ছ্বাসে সুগন্ধ বিলাচ্ছে।তটিনীর জল জোয়ার-ভাঁটা খেলছে।গাছের ডালে দোয়েল, কোয়েল,পিউ,কেকা,কোকিল,পাপিয়া গানে সুর-মুর্চ্ছনা, প্রকৃতির চারিধার আকাশ-বাতাস সোগাগে করেছে মুখরিত।সেখানে অহংকারী ভন্ডচারী স্বার্থন্বেষী মানুষের কি ক্ষমতা তাদের ভালোবাসাকে হার মানায়।

     রুপম নিরুপমাকে নিয়ে বাড়ীতে উপস্থিত হলেন।এমন সময় অহংকারী জমিদার গম্ভীর কন্ঠে,রুপমকে বললেন দাঁড়াও......
----তুমি জানো,কাকে হাত ধরে নিয়ে বাড়ীতে ঢুকতে চাইছো?
----তুমি জানো,এর পরিনাম কি হতে পারে?
----প্রত্যুত্তরে রুপম জবাব দিলেন........
----জানি পিতা!আর জেনে শুনে আমি নিরুপমাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।তোমার পাপ কর্ম-টাকে লাঘব করতে।তাই আমি সজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ওকে বিবাহ করে যোগ্য দিতে।দুনিয়ার প্রতিটি মানুষকে আমি জানাতে চাই ধনী গরীব প্রতিটি মানুষ সমান।সবার রক্তের রং লাল।আর আপনি বাঁধা দিতে চাইলে আমি স্ব-ইচ্ছায় আপনার রাজ সিংহাসন ও রাজ ঐশ্বর্য ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করবো না।কারন-আমার জীবনে সবচেয়ে বড়ো ঐশ্বর্য হলো ভালোবাসা ও আত্ম-সন্মান।তাই হাসি মুখে পথে প্রান্তে গাছের তলায় বসে নিরুপমাকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেব।
----অহংকারী জমিদার রাগে অপমানে রুপমকে বললেন.....
----হ্যাঁ হ্যাঁ তাই যাও।তোমার মতো কু-সন্তানের মুখ দর্শন করতে চাই না।এই মুহুর্তে তোমাকে আমি ত্যাগ করলাম আপন পুত্রের অধিকার থেকে।
----আমি জানতাম পিতা!কিন্তু মিথ্যা পাপের সাম্রাজ্যে ও দাম্ভিকতার অহংকারে আবদ্ধ থেকে,কখনো আমি সর্বহারা অসহায় অভাগীনি নিরুপমাকে পথে বসিয়ে বেদনার সাশ্রু-ধারাতে ভাসাতে পারবনা।বিশাল পৃথিবীতে দুঃখের সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কুলের আশায় একটা রিক্ত-ছিন্ন পত্রেকে আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রামে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছে।
----আমি কখনো চাই না,আবার সে ব্যথাময় অতল গহ্বরে তলিয়ে যাক।তাহলে স্বয়ং বিধাতা আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না।

     সকল বাঁধার প্রাচীর  চুর্ন-বিচুর্ণ করে,আত্ম-বিশ্বাসী রুপম বাড়ী থেকে নিরুপমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লেন।যেখানে নিরুপমার শেষ আশ্রয়।রুপসার তীরে সুন্দরী বৃক্ষ তলে।আঁকা-বাঁকা নদীর মেঠো পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে পথে সন্ধ্যা নেমে আসে।কি করবে কিছু ভেবে পেলেন না রুপম ও নিরুপমা।আশে পাশে চেয়ে সংগলগ্ন কোন বাড়ী ঘর দেখতে পেলেন না।কিছুটা দুর দৃষ্টি যেতে হঠাৎ দেখতে পেলেন,দুরে একটা আলোক শিখা দীপ দীপ করে জ্বলছে।দু'জনে পা চালিয়ে সেই আলোর অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলেন।কাছে গিয়ে দেখতে পেলেন নদীর তীরে একটা বহু পুরানো শিবের মন্দির।সেখানে দুজনে রাতটা কাটিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেন।মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করে দেখলেন একটা প্রদীপ জ্বলছে।পাশে এক পুজারী বসে উপসনা করছেন।তারা পুজারীর কাজে বাঁধা না দিয়ে কিছুক্ষণ নিঃস্তব্ধে দাঁড়িয়ে রইলেন।পুজারী কাজ সেরে পিছন ফিরতেই দেখলেন দুজন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
----পুজারী জিজ্ঞাসা করলেন,তোমরা কে?
----এত রাত্রে কোথায় যাবে?
----রুপম আরো একবার অতীতের ঘটনা পুণঃরাবৃত্তি করে শোনালেন পুজারীকে।
----পুজারী বললেন একত্রে দুজন অবিবাহিত নারি-পুরুষ।এই সংকীর্নতা ও দ্বিধা কাটাবার জন্য রুপম পুজারীর আদেশ পেয়ে,
পুজায় দেওয়া সিঁন্দুর নিয়ে স্বয়ং শিবকে সাক্ষী রেখে,নিরুপমার শুণ্য'সিঁথিতে রাঙিয়ে দিলেন। তারপর স্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়ে যোগ্য সন্মানে হৃদয় কমলে জড়িয়ে ধরলেন।এই প্রথম বার দুজন-দুজনে স্পর্শ করলেন।এমন অনিন্দ্য সুখের সাক্ষী রইল আকাশ-বাতাস,চন্দ্র-সুর্য,রাতের সহস্র তারা,সবুজ গাছেরা ও নদীর কুলে আঘাত হানা সহস্র রহরী।সেই মন্দিরে দুজনে রাতটা কাটিয়ে দিলেন বাবা ভোলানাথে উচ্ছিষ্ট প্রসাদ সেবা করে।পুব-গগনে রক্তিমা'ভায় ভোরের সুর্য।পাখির কাকলীতে ঘুম ভেঙে গেলো।দুর থেকে ভেসে আসছে ভোরাই রাগে প্রভাতী সুর।এমন মধুর অনুভুতি,এই প্রথমবার উপলব্ধি করলেন রুপম ও নিরুপমা নব-দম্পত্তি যুগল।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.