![]() |
| নোবেল কথা : মৃদুল শ্রীমানী |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভদ্র, সদালাপী ও সংবেদনশীল ছিলেন। মানে বেশিরভাগ সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এইরকম রূপ। মাঝে মধ্যে কবির মাথায় অন্য রকম খেয়াল চাপত। বলে বসতেন, ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন! "ভাল মানুষ" বলতে লোকজন সাধারণ ভাবে যে গোত্রের জীব বোঝে, সেই ছক থেকে তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চেয়ে বলতেন, ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা..। বলতেন, যেন রসনায় মম সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়্গ সম.. । নিজের দেশের লোকগুলি ঠিক মত গোটা একটা মানুষ কি না, সে নিয়েও তাঁর অনুযোগ ছিল। গরিব লোক মানেই দারুণ সৎ, গ্রাম্য লোক মানেই ঠকাতে জানে না, এই ধরা বাঁধা গড়পড়তা ধারণাকে আঘাত করতে চাইতেন কখনো কখনো। মিটমিটে হিসেবীপনার চাইতে ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে বাছাই করা ভুলকে ভালবাসতে ইচ্ছে করত মাঝে মধ্যে।
সাহিত্য বিষয়ে নোবেল পুরস্কার জুটুক, এমন একটা আগ্রহ একসময় ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ওইজন্য নিজের গোটা দশেক কবিতা ও নাটকের বই ঘেঁটে বেছে, সেই বাছাই করা কবিতা ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন তিনি। আর সেই অনুবাদ নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে ইংল্যান্ড পাড়ি দিয়েছেন। সাথে বড়োছেলে আর বৌমা। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বেশ একটু আলাভোলা টাইপের। তিনি বাপের সাধের পাণ্ডুলিপিখানি লণ্ডনের মেট্রোরেলে হারিয়ে ফেললেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু 'যা গেছে তা যাক' বলে বসে রইলেন না। মেট্রোরেলে যোগাযোগ করে হারানো পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা গেল। তা হবে না কেন? ইংরেজ জাতটা ভদ্রলোকের। অন্যের জিনিস না বলে কয়ে পকেটস্থ করার অভ্যাস তাদের নেই। তারপর সেই অনুবাদ করা স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনালেন গুণী সাহিত্য বোদ্ধাদের এক সভায়। সভা আয়োজনে আইরিশ কবি ইয়েটস এর হাতযশ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজিতে কবিতা পাঠ সবাই চুপচাপ বসে শুনল। তারপর হল খালি করে চলে গেল। তা দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ মনখারাপ হল। এত খেটেখুটে শেষমেশ এই! একটা প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত ব্যক্ত করল না কেউ!
ভুল ভাঙল পরদিন। কাগজে কাগজে প্রশংসায় ছয়লাপ। টেলিগ্রাম করে শুভেচ্ছা বার্তার ছড়াছড়ি।
নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জানতে পেরে কবি পাশের লোককে বলে বসলেন, ওই তোমার নর্দমা গড়ার টাকা এসে গেল। নর্দমা যে দরকারি জিনিস তা অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুবই ভালো করে বুঝতেন। বাঙালি চিরকাল হুজুগে। একটা হুজুগ পেলে হল। বাঙালি ফূর্তিতে মাতবে। কবীন্দ্র রবীন্দ্র নোবেল লভেছেন, এই সুযোগে কলকাতার সাহিত্য বোদ্ধারা দলবেঁধে গোটা একটা ট্রেন ভাড়া করে কবির্মনীষীকে সম্বর্ধনা জানাতে চললেন।
কবিও ওই উৎসাহী বাঙালিদের যথাশক্তি আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সম্বর্ধনার উত্তরে সভ্য মানুষের মতো ভাল ভাল বাক্য বলবেন বলে ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু হুজুগে বাঙালি পাণ্ডাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিলেন রবীন্দ্র বিদ্বেষী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় ছিদ্রান্বেষণ করে তাঁরা পরম তৃপ্তি পেতেন। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে সেই তাঁরাই চলে এসেছেন মুখে হাসির পমেটম মেখে। আর বসেছেন সদলবলে একেবারেই সামনের সারিতে।
ওঁদের দেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজাজ গেল খাপ্পা হয়ে। সাজানো গোছানো মিঠে বুলির পশরা ছুঁড়ে ফেলে কবি বাছা বাছা চোখা চোখা বাক্য বাণে ভূষিত করলেন ছিদ্রান্বেষণকারীদের।
তাই বলি, খেয়াল গেলে মিঠে শোভন বেশটুকু দূরে ছুঁড়ে ফেলতে জানতেন রবীন্দ্রনাথ।
এই রকম আরেকজন ছিলেন জর্জ বার্ণার্ড শ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির বছর বারো পরে ১৯২৫ সালে সাহিত্য বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জর্জ বার্ণার্ড শ। আইরিশ নাট্যকার শ ছিলেন সুরসিক। ১৯২৬ সালে আজকের দিনে অর্থাৎ আঠারো নভেম্বর, বার্ণার্ড শ নোবেল সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রত্যাখ্যান করেন। এই বিপুল অঙ্কের টাকা প্রত্যাখ্যান করে শ বলেন, "I can forgive Alfred Nobel for inventing dynamite but only a fiend in human form could have invented the Nobel prize."
তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি সৃষ্টি হল ম্যান অ্যাণ্ড সুপার ম্যান (১৯০২), পিগম্যালিয়ন (১৯১২) আর সেন্ট জোয়ান (১৯২৩)। এরমধ্যে পিগম্যালিয়ন এর চিত্রনাট্য লেখার জন্য তিনি ১৯৩৮ সালে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার পেয়েছেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি একই সঙ্গে নোবেল জয়ী ও অ্যাকাডেমি প্রাপক। এই মহান সাহিত্যিক ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে জন্মেছিলেন। আর প্রয়াত হন চুরানব্বই বছর বয়সে, ১৯৫০ সালে, এই নভেম্বর মাসেই, দুই তারিখে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অর্ধ শতাব্দী পরে ১৯৬৪ সালে ফরাসি দার্শনিক সাহিত্যিক জাঁ পল সার্ত্র নোবেল সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। চিন্তা জগতে বিপুল অবদানের জন্য সার্ত্রকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে মনোনীত করা হলে, তিনি পুরস্কারের অসারতা নিয়ে মতপ্রকাশ করেন। তিনি জানান, তিনি সব সময়েই অফিসিয়াল সম্মানকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। আরো বলেন, একজন সাহিত্যিকের পক্ষে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা ঠিক নয়।'
নানা বিষয়ে মৌলিক চিন্তার দ্যুতি ঠিকরে ওঠে সার্ত্র'র কলমে। 'When the rich wage war, it is the poor who dies', বলেছিলেন জাঁ পল সার্ত্র।
বিবাহ, বিবাহিত জীবন যাপন নিয়েও সার্ত্র'র ভিন্ন ধরনের মত ছিল। সিমোন দ্য বুভুয়া নামে অসাধারণ বিদূষী বুদ্ধিজীবী মহিলার সাথে তিনি জীবন যাপন করতেন, কিন্তু বিবাহ নামের সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের জীবনে সার্ত্র ও বুভুয়া গ্রহণ করেন নি।
সার্ত্র ১৯০৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৮০ সালে মারা যান।
সিমোন দ্য বুভুয়া ১৯০৮ সালে জন্মেছিলেন। তিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে বুভুয়া প্রয়াত হন।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন