স্মৃতিলেখা : মনোনীতা চক্রবর্তী

স্মৃতিলেখা : মনোনীতা চক্রবর্তী
স্মৃতিলেখা : মনোনীতা চক্রবর্তী

অনেক কিছুই লিখতে ইচ্ছে করে। ভাবিও লিখব। কিন্তু লিখতে গেলে কলম বদল করে পথ ও চলা ... আসলে , ইনসিকিওরিটি কার সেটাই ভাববার । হাসি পায়। যার দর্শক-আসনে বসার কথা ছিল,সে মঞ্চে... যার মঞ্চে থাকার কথা পূর্বনির্ধারিত ছিল, সে অডিটোরিয়ামের বাইরে ! কেন এত নিরাপত্তাহীনতা ! আমার বাবা বা আমার ছেলে যখন বলবো তখন আমার ডাক্তার বাবা, কেরানি বাবা, শ্রমিক বাবা বা আমার আই আই টি পুত্র বলার অর্থটাই আলাদা! আসলে , ঘোষণা দেওয়া ... ব্যাপারটা হচ্ছে আমি কত অভিজাত,তোমরা জানো- দ্যা খো গোছের !  নিজেকে তো একটা ক্লাসে রাখা চাই-ই ,চাই... ! আবারও ইনসিকিওরিটি!  প্রমাণ করতে হয় তার প্রতি পদে! আর তা থেকেই এমন ভুলভাল হাস্যকর কাণ্ড!  আগামীকাল শিক্ষক দিবস। আমরা নাকি শিক্ষক !? তাই কি?! দিনের শেষে অস্তিনের ভেতরে থাকা ছুরিটা
কি নিজেকেই রক্তাক্ত করে না?! গোলাম মোস্তফার ওই কবিতাটি কি আজও বেঁধায় না ! " বিশ্ব ধরার ফুল-বাগিচায় আমরা মালির দল/,মানবজীবনের তরুমূলে মোরা বসে বসে ঢালি জল"
আগে খুব ভালো করে 'ছাত্র' হয়ে ওঠাটা খুব জরুরি, তারপর তো  "শিক্ষক" ! প্রতিবার শিক্ষক দিবস আসে, আর অশিক্ষিত-শিক্ষকদের এক-একটা মুখ  মনে পড়ে! কী কাঙাল!  কাঙালপনায় কখন যে এভাবে নিজের অজান্তেই ধরে রাখা দানবাক্স ভেদ করে হাতের নরম ফুটো হয়ে যায়! তুমি আর পিছুটান ক্রমশ সামনে। এগোতে যাও যত, তোমাদের পিঠ ততই সজোরে ধাক্কা খায়... শত-সহস্র হাসি লুটোপুটি খায় তোমাদের জন্য! আজ আমিনুল স্যারের পোস্টটা পড়তে পড়তে মনে হল কত কত কথা !   আগামীকাল শিক্ষক-দিবস। সবেতেই উজ্জ্বল তিনি মাথায় ফুল রেখে পোজড-ক্লিকের নাম দেন 'হঠাৎ ভালোবাসা'! শিশুরা বড় হতে থাকে,আর শিক্ষকেরা মানে বড়রা ক্রমশ ছোট থেকে ছোট তর! আজ, শিক্ষকদিবস, এবং দিবস হারিয়েছে দিক। আজ শিক্ষক দিবস মানেই গাদাগাদি শব্দ।শব্দ শব হয়েছে । আজ শিক্ষক দিবস ডিজিটাল সাউন্ড সর্বস্ব...শিক্ষক দিবস আজ অনর্থক হাত-পা ছড়াছড়ি... ! সর্বত্র এক স্থূল নগ্নতা! আদর্শের মুখোশ ফেরি করা তথাকথিত শিক্ষকদের কাছ থেকে কী-ই-বা পেতে পারে ছাত্রসমাজ! এখন শিক্ষকদিবস মনে 'পার্টি' ... সমাজ কোল্ড শোল্ডার্ড ,বাতাস ঢোকাচ্ছে !  কিশোর কবির অঙ্গীকার কোথায় গেল... আমরা রাখতে পারছি কই... নবজাতকের মুখে বিদ্রূপ কাটা ঘুড়ির মতো ল্যাদ খাচ্ছে!  নিজেকেও বিদঘুটে লাগে আয়নায়! সবখানে শুধু আত্মপ্রচার... আত্মপ্রচার...এর জয়ঢাক! ৯৫ টা নামের ভেতর ৫টা থেকে গেল। বাকি ৮৯ টা নির্মোহ সুতো। কিন্তু একটা তার বাইরে।  আজ যখন শিক্ষকদিবস খুব ঘটা করে 'উৎসব' -হয়... তখন মনে হয় সুনির্মল বসুকে বারবার! মনে হয় কবিগুরুকে ভীষণ! মনে হয় আমার মা-কে! আমার প্রথম দীক্ষাগুরু... আমার বাবাকে... আমার শিক্ষকদের ... প্রথার ভেতরে ও বাইরে থেকে যারা (টাইপের ত্রুটিতে চন্দ্রবিন্দু মাথায় উঠল না) নানাভাবে শিক্ষা দিয়ে চলেছেন! আমার ভীষণ মনে হয় আমার ঘাস,মাটি,ফুল... আলো-হওয়া-জল! আমাকে হাতেখড়ি দেওয়া বাবু মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যু সংবাদ ঝনঝন করে ভেঙে ফেলেছিল! সেদিন যখন হঠাৎ পরিচয় হল বিজয় বাবুর সাথে বাসে! উনিই জানালেন। আমার অ-আ-ক-খ সুরে সাধা হরি মাস্টারমশাই,বেলা দিদিমনিদের। হেড মাস্টারমশাই ,কোনোদিনই তোমায় 'আপনি' বলতেই পারিনি।কারণ তুমি শেখাওনি! আজ যখন আমাদের শ্রদ্ধেয় আমিনুল স্যারের মুখে বারবার 'শিশুবান্ধব' কথাটা শুনি... তখন মনে হয় শব্দটা নতুন শোনা কিন্তু ঢেউটা কবির কথায় ---' অনেকদিনের আমার যে গান..'! আর তাই  তো সেদিন সঙ্ঘমিত্রা দিদিমনির পায়ে যখন চিরকালীন অঞ্জলি দিয়েছিলাম ,তখন স্মৃতি এতটুকুও প্রতারণা করেনি,আমার এবং তাঁর! ওই একই কারণ... 'বন্ধু'... আসলে ,প্রতিটি সম্পর্কের ভেতরই বন্ধুবাস খুব জরুরি। না-হলে ভুল বানানের  মতো থেকে যায় কালশিটে কিছু দাগ... তাই তো ভুলতে পারি না তাঁদের... ! আজও ভুলিনি রীনা ম্যামকে ! কী গভীর!কত বন্ধু! নতজানু করবী দিদিমনির প্রতি... শিবাণী দিদিমণি,আর বুকে টেনে নেওয়া অঞ্জু দিদিমণি কে! স্বরূপা দিও ... খুব কাছের ... আমি অভিবাদন জানাই জীবনকে... কারণ, তার মতো করে আর কেউ শেখাতে পারেনি কেউ। হ্যাঁ, মাঝ-নামের প্রয়োগের ব্যঙ্গ করেছে, বানানের ভুল নিয়ে বাঁকা ঠোঁটে ঠোঁটে আলাপ জমিয়েছে... ডেকে ডেকে পাখি ফিরে গেছে... তাতে কী! আমি তো তাদের কাছেও ঋণী! ভাগ্যিস তারা রূপান্তরে থেকেই যা ন! নতজানু, তার কাছেও ... যিনি, প্রকাশ্যে নাম না-করে সম্পাদকদের ভিখিরি বোঝাতে চেয়েছেন। সম্পাদক লেখকের কাছ থেকে পয়সা নেন না। তবে অক্ষরবৃত্ত-এর মত সম্পাদক, সাম্মানিক ও পাঠান লেখকদের খামে ,ভালোবেসে।  বিনিময়ে ঘরের খেয়ে বনের মোষ থেকে লোভী মশা-মাছিদেরও তাড়ান। মাননীয়/মাননীয়া ,ঠান্ডাঘরে বসে ছোটো কাগজের যন্ত্রণা বোঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই। হ্যাঁ, নেই। থাকলে ভূমিকা অন্য হত। শুধু দেখে যাই। আবার , ছোট কাগজের পকেট ভরানোর কথাও শুনি।শুনতে হয় সম্পর্কের কথা।সম্পর্ক গড়ার কথা। দাদা-দিদি ,কাকু-কাকিমার ভু-স্বর্গ বানাতে আপনার জুড়ি মেলা ভার ! সমস্যা, বেসিক্যালি রাম-রহিমের একটাই স্বার্থে আঘাত। কারও লেখা না-ছাপা তো কারও নাম ! তখুনি... অথচ , আপনাদের গাড়ির ধুলো ছোটো কাগজের জন্য মঞ্চে চোখ-নাক-প্যান্ট ভাসিয়ে যান... অথচ , ব্যতিক্রমী কিছু মানুষ ছাড়া , আপনারা কখনও সৌজন্য কপি ছাড়াও আরও পাঁচটা কপি কিনে পত্রিকাকে বাঁচাতে এগিয়েআসার সৌজন্য দেখান না!  আপনাদের নামে কারবার। খ্যাতিতে কারবার  । বাকি সব চুলোয় যাক। ...  হুম , তারপরও আপনারাই শেষ কথা বলেন। বলে থাকেন। এত কথার সাথে শিক্ষকদিবসের কী সম্পর্ক ... বললে... বলাই যায় , এই এরাও আমাকে ও আমাদের প্রতিমুহূর্ত  শিক্ষা দিয়েই চলেন ... তাই, তোমাদের কাছেও আমি নতজানু...  কী নিপুণ এ শিখন শৈলী!  আগামী আলোয় স্কুলে গাছের ফুলের বদলে গিফটের বন্যা বইবে। কোলডড্রিঙ্কসের বোতল শ্যাম্পেনের আদলে ফোয়ারা তুলবে ... আর আমরা 'হ্যাপি হ্যাপি' করে জগৎ মাতাব একলা-নিমাইয়ের মত। শুধু 'হরিনাম' থাকবে না !  এত ভিড়ের মাঝেও সে  জেগে থাকে। তাঁকে জেগে থাকতে দেখেছি বন্ধুর মতো... গাছের মতো! আলাপের বয়স খুব বেশি নয়। নাবালকত্বেই। তবু বলতে  দ্বিধা নেই ,য ত দেখছি ভোরে যাচ্ছি... ভরে যায় চোখ ... সেদিনের মাঠে বুঝেছি ... প্রকৃত শিশুবান্ধব কারা... তারপর, রোজ তাঁর দেওয়াল রেখে যায় আলোর প্রকরণ... আর গুটিগুটি পায়ে কখনও না-বলে, কখনও বলে টুকটুক করে কুড়িয়ে আনি রোদ.... স্যার, আপনাকেই সেই অভিবাদন আমার ...  নতজানু ও ...!  হুম , আমি আমিনুল স্যারের কথাই বলছি... আজ শিক্ষকদিবস... এভাবেই সার্থকতা লেগে থাক ড সর্বপল্লি রাধা কৃষ্ণান-এর জন্মদিনে...
স্যার, যেন একটু হলেও আপনার মত হতে পারি, আশিসটুকু রাখবেন ... 
শেষ করতেই হবে । রাত শোয়া দুটো।  বেঁচে থাকলে ভোর পাঁচ টায় এলার্ম বাজবে। ফর্সা আকাশ আমাকে ছুঁয়ে ফেলবে। তাই যেতে যেতে আসুন -না সকলে মিলে উচ্চারণ করি----আর বলি...
" সবার আমি ছাত্র.."

Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

3 Comments:

Tapos Das বলেছেন...

সুন্দর!!! কবি

Biplab Pal বলেছেন...

খুব ভাল লাগল লেখা। নানাবিধ দিবসগুচ্ছ মূল্যবোধের অভাবে পীড়া দেয়। আয়োজনের কোন ত্রুটি থাকে না আধুনিকতার মোড়কে। অন্তসারশূন্য। শুধু মোড়কের চমৎকার। বেশ ভাল লাগল

titas rahman বলেছেন...

অসাধারন প্রকাশ...।