![]() |
| মৃদুল শ্রীমানী |
১
টুনির বয়স উনিশ ছুঁয়েছে। তাইতে টুনির মা ভারি ব্যস্ত। মেয়ের বিয়ে দেবার বয়স পেরিয়ে যায়। টুনি যদিও কলেজে পড়ছে, টুনির মা পাত্র দেখছে। যে পাত্রের খবর জুটেছে সে ক্লাস এইটে ফেল করে আর পড়ে নি। তাইতে কি? ব্যাটা ছেলে তো? রোজগার করে এই তো ঢের। কত রোজগার করে সে অবশ্য ধারণা নেই টুনির মায়ের। রোজগারের কোনো প্রমাণপত্র হয় বলেও শোনে নি সে। বাড়িটা কি ছেলেদের নিজের? কি করে তেমন খোঁজ নিতে হয় জানে না টুনির মা। সবাই বলছে, তাইতেই গলে পড়ছে টুনির মা। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা? বিয়ের রেজিস্ট্রেশন? টুনির মা এক কান দিয়ে শোনে আর এক কান দিয়ে বের করে দেয়। টুনির মা টুনির বিয়ে দেবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে যে। সরকার কন্যাশ্রী ২ দেয় মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন্য। আর রূপশ্রী দেয় বিয়ে ঠিক হলে । পঁচিশ পঁচিশ পঞ্চাশ হাজার। একসাথে অতো টাকা টুনির মা চোখেই দেখে নি।
টুনির মা এখন মেয়ে পার করতে পারলে বাঁচে। সামনে ভোট। ভোটের পর কি হয় না হয়? মন বদলাতে কতক্ষণ! ভালোয় ভালোয় কাজ উৎরে যাক। রক্ত পরীক্ষা, রেজিস্ট্রেশন, স্বনির্ভর হওয়া টুনির মা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়।
কার্তিক ঠাকুরটি হাসে।
২
টুনির মা তার কলেজ পড়ুয়া মেয়ের জন্যে এইট ফেল জামাই পেয়ে বর্তে গিয়েছে। জামাই বেশ রোজগারে। হবে নাই বা কেন? আজকাল যে মার্বেল মিস্ত্রিদের মজুরির হার খুব চড়া। পাত্র তার মেয়ের থেকে বছর দশেকের বড়। তা হোক, দশ বছর এমন কিছু বেশি ফারাক নয়। জামাইয়ের দাবি বেশি নয়। মাত্র পঞ্চাশটি হাজার টাকা। টুনির মা কন্যাশ্রী 2 তে পাওয়া পঁচিশ হাজার টাকার একটি পয়সা খরচ করে নি। কন্যাশ্রী ১ এর কিছু টাকা থোক পেয়েছিল একবার। সেই দিয়ে বাড়ির বারান্দাটা বাঁধিয়ে নিয়েছিল। সরকার কন্যাশ্রী নাম করে টাকা কেন দেন, তা জানার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না টুনির মা। সরকার একটা গাছের মতো। নাড়া দিলেই ঝর ঝর করে টাকা পড়ে। আজকের দিনে একটা মেয়ে কন্যাশ্রী২এর টাকা নিয়েও যদি নিজের পায়ে দাঁড়াবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে, সেটাকে টুনির মা অপদার্থতা বলে মানতে নারাজ। আর পণ দিলে বা পণ চাইলে কন্যাজন্মের প্রতি নিদারুণ অসম্মান হয় কি না, সে সব ভেবে দেখার ফুরসৎ পায় না টুনির মা।
তাদের নিজেদের বাড়িতে শৌচাগার নেই। নেই তো নেই। তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা করার কারণ টুনির মা দেখে না। মানগড়ের রজকপাড়ার সব মেয়ে বউ পুকুরের পাড়ে বসেই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়। তারপর পুকুরের জলে নেমে শৌচ করে। এভাবেই বছরের পর বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে। টুনির বিয়ের পর জামাই এলে তাকেও পুকুরপাড়েই প্রাতঃকৃত্য করতে পাঠাতে কোনো সংকোচ করবে না টুনির মা। কেননা সভ্যতার আদিযুগ হতে ওভাবেই চলে এসেছে। ওর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখতে নেই।
এত অসুবিধার মধ্যেও টুনির মা মেয়ের বিয়ের জন্য বাজনা বায়না দিয়েছে। তারা তিনটি হাজার টাকা নেবে। আরে ধুর! বাজনা ছাড়া বিয়েবাড়ি মানায়?

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন