![]() |
| মাসুদ সুমন |
জীবিত থাকাকালে তিনি নিজেকে একজন কবি ভাবতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। যদিও তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ এবং এই প্রচারবিমুখিতাটাই ছিল তার অহংকার। কেননা আর সবার মত তারও ভিতরে ভিতরে প্রচ- বাসনা ছিল- সকলে তাকে চিনুক এবং গুরুত্ব দিক এবং তিনি সত্যি সত্যি চাইতেন লোকেরা সৃষ্টিশীল মানুষ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে একটা মহান ধারণা পোষণ করুক। তবে এজন্য কখনই তিনি কোন প্রচেষ্টা চালাতেন না। তবে হ্যা তিনি যখন পরিচিত রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন কিংবা নদীর পাড়ে বিকেলবেলা একা একা বসে থাকতেন তখন মনে মনে কল্পনা করতেন, যখন আমি জীবিত থাকব না তখন লোকেরা এই রাস্তা কিংবা নদীর পাড় ধরে হেঁটে বেড়াবে আর স্মরণ করবে- ঠিক এখান দিয়েই তিনি হেঁটে বেড়িয়েছেন। আর হয়ত এই বটবৃক্ষের তলায় বসেই অবলোকন করেছেন নদীর বুকে বয়ে যাওয়া অসংখ্য ঘটনাবলীকে, যার দৃশ্যায়ন তিনি করেছেন। অবশ্য তিনি তখনও ঠিক উপলব্ধি করতেন যে, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরের সময় সর্ম্পকে আসলে আমাদের কোন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। যেমন অভিজ্ঞতা নেই জন্মের আগের অবস্থান কিংবা অবস্থা সর্ম্পকে। আর যদি মরে যাবার পরে আদৌ কোন জগৎ থেকেও থাকে সে-জগৎ বর্তমান অনুভূতি সাপেক্ষ নয়। মরে যাবার দু’বছর আগে থেকেই তিনি একধরনের মানসিক অস্থিরতায় ভূগছিলেন। হয়ত প্রত্যেক কবির চিন্তার গঠনই জটিল। তিনি নিজেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঘটমান বর্তমান ছিল তার কাছে একেবারে ¯্রফে একটা শূন্য অনুভূতিসম্পন্ন বিষয়। সেটা তার জন্য দারুণ বিব্রতকর ছিল। কোন আড্ডায়- যদিও সত্যিকার অর্থে তার তেমন কোন বন্ধু-বান্ধব ছিল না যাদের সাথে আড্ডা দেয়া চলে- অন্ততপক্ষে আড্ডা বলতে তিনি যা বোঝেন সেরকম কিছু- যখন শামিল থাকতেন- সেখানে ঠিক কী ভূমিকা তাকে পালন করতে হবে সেটা ঠাহর করতে না পেরে নিজেকে দারুণ অসহায় মনে হতো। অবশ্য কখনও কখনও তিনি প্রচুর কথা বলে সকলকে তার কেন্দ্রমুখি করে রাখতেন। কিন্তু তিনি মূলত বাস্তবে থাকতেন না। অন্যান্য দৃশ্য তার ভিতরে এমন প্রকটভাবে ঢুকে পড়ত যে তিনি ইচ্ছেমাফিক সেখান থেকে বের হতে পারতেন না। চায়ের দোকানের সামেন ঈষৎ বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পোস্টের গায়ে ঝুলে যে তারগুলি লম্বালম্বি শুয়ে আছে তাদের দিকে তার দৃষ্টি আটকে পড়ত- কালো প্লাস্টিক কভারে মোড়ানো তারেদের দীর্ঘকালিন শূন্যে শুয়ে থাকার ফিসফিস গল্পের ভিতরে ঢুকে পড়তেন আর মনে হত তিনি তাদের পাশাপাশি দীর্ঘকাল শুয়ে থাকা একটি বৈদ্যুতিক তার। যার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বিদ্যুত তরঙ্গ- যা অতিশয় প্রকা- কিছুকে চূড়ান্ত গতিশীল রাখছে। কিংবা তার চোখ আটকে যেত ল্যাম্পোস্টের আলোয় ঢিপঢিপ তাকিয়ে থাকা ক্ষয়ে যাওয়া সুরকির উপর- যারা অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোলগোল ছোট-মাঝারি কালো আকৃতি নিয়ে শুয়ে আছে। আর তিনি অতিদ্রুতই পরিণত হতেন ঐরকম একটি মাঝারি আকৃতির খোয়াতে। এবং অনুভব করতেন কত ভারী ভারী যান তার ছোট্ট শরীরের উপর দিয়ে তাকে পিষেপিষে চলে গেছে এবং যেতেযেতে পিচঢালা রাস্তার শৃংখল থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধে সত্যি সত্যি তিনি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তেন। ফলে চা খেতে খেতে শীতকালিন সন্ধ্যার যে আড্ডা চলত মূলত তিনি সেখানে অবস্থানই করতে পারতেন না। ফলে ভীষণ বিব্রত হতে হতো তাকে।
তবে এর চেয়েও করুণ আর ক্লান্তিকর ঘটনা ঘটতে থাকল, যখন তিনি অনুভূতিসম্পন্ন কোন কিছুর ভিতরে নিজেকে আবিস্কার করতে থাকলেন। বিয়ে বাড়িতে এক বৃদ্ধ ভিখারীনিকে দেখে তিনি একবার হাপিয়ে উঠলেন। সেটা ছিল তার এক বন্ধুর বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান। তার বন্ধুর কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিল দেরি করে। আর তাদের খাবার তদারকির ভার ন্যস্ত হলো তার উপরে। যেহেতু তখন সকলের খাওয়া হয়ে গেছে এবং খাবার পরিবেশনে যারা রত ছিল তারা মূলত এদিক-সেদিক চলে গেছে। টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আধখাওয়া মাংসের হলদেটে স্তুপ, মিষ্টান্ন আর গুড়িগুড়ি সাদা পোলাও ন্যাকড়া দিয়ে মুছে তিনি যখন অতিথিদের পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন তখন পর্যন্ত তার মুখে ঝুলে ছিল সামাজিক হাসি। পেছন থেকে বৃদ্ধাটি বলে উঠল, বাবা আমি ঐ প্লেটের পোলাউগুলা কি নিতে পারি? তখন মূলত অতিথিদের খাওয়া শেষ হয়ে এসেছে। এবং পাশের ডিশে বেঁচে যাওয়া কিছু পোলাও অবশিষ্ট পড়ে রয়েছে। তিনি সম্মতি জানাতে বৃদ্ধা তার পলিথিনে পোলাও ভরতে থাকলেন। এ-সবকিছুই বেশ স্বাভাবিকভাবে ঘটে চলছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না বৃদ্ধা মহিলাটি ডিশ থেকে চামচটা তুলে রেখে যে-পোলাওগুলো আর চামচ দিয়ে উঠানো যাচ্ছিল না সেই ছড়িয়ে থাকা পোলাও বয়সের ভারে চামড়া কুচকে যাওয়া হাত দিয়ে একটা একটা তুলে নিচ্ছিলেন। তার এই অতিরিক্ত যতেœর সাথে কাঁপাকাঁপা আঙুলে পোলাও তুলে নেবার দৃশ্য দেখতে দেখতে তিনি বৃদ্ধার জীবনের ভিতরে ঢুকে গেলেন এবং বৃদ্ধার যাপিত জীবন তাকে ভীষণভাবে তাড়াতে থাকল। বৃদ্ধার একাকী নিঃসঙ্গ জীবন আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ঠুকঠুক লাঠিটি নিয়ে সারাদিন ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করা সত্যি সত্যি তার জন্য দারুণ কষ্টকর হয়ে উঠল। এবং খড়ির ব্যাড়ার ছোট্ট খুপরিতে শৈত্য প্রবাহের রাত নামতে নামতে এবং সেই শীতকে মোকাবিলার জন্য কাঁথা দিয়ে পেচানো শরীরের দুই ঠ্যাঙ্গের ভেতরে মালসার আগুন ঢুকিয়েও তিনি ঠকঠক করে কাঁপতে থাকলেন। এরথেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি আশ্রয় নিতে থাকলেন অতীতে। তার জীবনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যের ভিতরে তিনি বসবাস করতে থাকলেন। এবং সেটা ছিল তার জন্য আরামদায়ক। কেননা অতীতে ঢোকার ব্যাপারটায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল তার। তিনি মূলত সেই-সমস্ত ঘটনার ভিতরেই বেছে বেছে ঢুকতেন যা ছিল সরল এবং আনন্দদায়ক। তার নানাবাড়ি ছিল তাদের বাড়ির পাশেই। নানাবাড়ির পেছনে ঝোপ-ঝাড়ে ভরা একটা জায়গা ছিল যেটাকে তারা কানছিখোলা বলতেন। কানছিখোলায় ছিল দুটি গাব গাছ। শিশুবেলায় নানাবাড়ি বেড়াতে গেলে প্রত্যুষে উঠে তিনি সেখানে যেতেন। তলায় গুড়িগুড়ি গাব ফুল ছড়িয়ে থাকত। গাব গাছের চিকন লম্বা লম্বা ঘনসবুজ পাতার ফাঁক গলে সকালের নরোম আলো পড়ত সেই ফুলের উপরে। তিনি ইলাস্টিকের হাফ প্যান্ট পড়ে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতেন। গাব গাছের চিকন শক্ত ডাল বেয়ে উপরে উঠে হলুদ হলুদ গাব দুই হাতের তালুর চাপে টুস করে ফাটিয়ে খয়েরি পিছল আঁটি চুষে চুষে ফুৎ করে ছুড়ে ফেলতেন। তাতে তিনি বিমল আনন্দ লাভ করতেন। সময় পেলেই তিনি ঢুকে পড়েন কানছিখোলা। আর যখন তার চোখে কেবল রং লেগেছে, সবকিছুকেই বড় সবুজ দেখাচ্ছে, বাতাসেও একধরনের গন্ধ পাচ্ছেন- তিনি তখন মেট্রিক পড়–য়া- প্রাইভেট পড়তে গিয়ে সেই স্কুল পড়–য়া মেয়েটিকে প্রথম দিন দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন, এখন থেকে এই মেয়েটিকে নিয়েই সমুদ্র পাড়ের দারুচিনি দ্বীপের ছায়াঘন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবেন। আর শেষ বিকেলের আকাশে ধবল মেঘের ভিতর এই মেয়েটিরই ছবি আঁকবেন। সেইসব তরুণী বিকেল এখনও যেন পশ্চিম পাড়ের ধানি জমির মাথার উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। তিনি গিয়েই হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারবেন। আর সেই সন্ধ্যাটি- বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে যে সন্ধ্যায় হঠাৎই গাঁদা ফুলের গন্ধ জড়ানো স্কুল পড়ুয়ার একটুকরো হাসি উড়ে এলো। তার ঘি রঙ্গা বাহু আর হলুদাভ কচি মুখ সেই সন্ধ্যাকে আরো উজ্জ্বলতর করেছিল। সময় পেলেই তিনি এই সন্ধ্যাটির ভিতরে ঢুকে পড়েন। আর কোমল- নরোম তুলোর ভিতরে ডুবতে থাকা এক অনুভব উপলব্ধি করেন। কিন্তু সেটাও বেশ অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে উঠত। কেননা তিনি মূলত অতীতে বসবাস করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও তাকে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হত প্রায়ই। আর সেইসময় সত্যি কথা বলতে কী এমন হত যে তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারতেন না, তিনি আসলে বর্তমানে না অতীতে বসবাস করছেন। আর যখন তিনি ধাতস্থ হতেন তখন বিপন্নবোধ করতেন। কেননা যে-অতীতে তিনি ছিলেন, বর্তমানে তার ছিটেফোটাও অবশিষ্ট নেই। স্কুল পড়–য়া বালিকাটিও এখন আর স্কুল পড়–য়া নেই। ফুটফুটে বাচ্চাটি নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে থাকা অবস্থায় দেখা হয়ে গেলে বিব্রত হওয়া ছাড়া তার আর বিকল্প থাকে না। মোটকথা মা-মেয়ের মুখোমুখি হলে তিনি কিছুতেই সাবলিল হতে পারেন না। আর তাদের গ্রামটি উপ-শহরের পাশে হওয়ায় দূরের গ্রামের অপেক্ষাকৃত নি¤œ-বিত্তের লোকেরা যাদের উপ-শহরে জায়গা কিনে থাকার মত সামর্থ্য ছিল না অথচ নিজেদের গ্রামেও থাকা সম্ভব ছিল না- কোন একটি ছোট-খাটো ব্যবসায় করে জীবন নির্বাহের জন্য মূলত তারা উপ-শহরের কাছাকাছি কোথাও থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। এদিকে তাদের গ্রামের লোকেরাও মনে করলো যে, যে-সমস্ত জায়গা পতিত পড়ে রয়েছে সেগুলো বিক্রি করলে যদি হাতে দুচার পয়সা নগদ আসে তাতে ক্ষতি কী? দিনেদিনে এরকম অসংখ্য পরিবার এসে তাদের ঢিলেঢালা গ্রামটিকে একেবারে ঘনবসতিতে পরিণত করল। ফলে তার শৈশবের সমস্ত বিচরণক্ষেত্র রূপান্তরিত হল বসতিতে। কোথাও কোন কানছিখোলা কিংবা বিস্তীর্ণ মাঠ যেখানে তারা ছোটাছুটি করতেন একেকজন দস্যু বনহুরের মতোন অবশিষ্ট থাকল না। ঘাটে গোসল করতে গেলেও তিনি দেখতে পেতেন অসংখ্য অচেনা মুখ। যাদের সাথে তার কোন রকম যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব ছিল না। ওদিকে যে-নদীকে তিনি দেখেছেন ফুলে ওঠা যৌবনবতী কামার্ত রমণী রূপে তাকে দেখলে এখন যে-কেউ সেটাকে নদী না বলে ছোট-খাটো খাল বলে সম্বোধন করবে। ফলে তিনি নিজ দেশে পরবাসী হয়ে উঠলেন যা তাকে ভীষণ পীড়া দিতে থাকল। আর তিনি দিনে দিনে আরও বেশি একা হয়ে পড়লেন।
তিনি মরে যাবার পরের দিন স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকায় ভিতরের পাতায় ‘বাস চাপায় তরুণ কবির অকাল প্রয়াণ’ শিরোনামে সংবাদ ছাপা হলো। অবশ্য আমরা এব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত না, তিনি সত্যি সত্যি বাস দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন না-কি এটা ছিল আত্মহনন?

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন