কাজী সাইফুল ইসলাম ও তার জলবাতাসী উপন্যাস : রুদ্রসাগর কুন্ডু

বইয়ের নাম: জলবাতাসী
লেখক: কাজী সাইফুল ইসলামের
মুদ্রিত মূল্য: ২০০
পৃষ্ঠ : ১২০
প্রকাশনায়: গদ্যপদ্য
কাজী সাইফুল ইসলাম ও তার জলবাতাসী উপন্যাস

এক এক জন লেখকের গল্প বলার ধরণ এক এক রকম। আর বলার এই ভিন্নতা আছে বলেই- উত্তর আধুনিক যুগেও গল্প, উপন্যাসের কদর একটু কমে নি। বরং বেড়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনার উপর গল্প, উপন্যাস লেখার প্রচলন শুরু থেকেই। কিন্তু বর্তমান সময় নিয়ে গল্প বলতেই লেখকরা বেশি ভালবাসেন। এর দুটি কারণ আছে। একটি হচ্ছে- সামাজিক দায়বদ্ধতা, অন্যটি- রাষ্ট্রিয় অসংগতি।

কাজী সাইফুল ইসলাম তার জলবাতাসী উপন্যাসে রাস্ট্রিয় অসংগতি আর বৈষম্যের গল্প বলেছেন। তিনি কারো উপর দায় চাঁপিয়ে দেনি নি। বরং গোটা জাতির কাছে একটি মেসেজ পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। 

জলবাতাসী উপন্যাসে তিনি বলেছেন- মানতা সম্প্রদায়ের কথা। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে তাদের বেশি দেখা দেখা যায়। জিপসি এই সম্প্রদায়ের ধর্ম মুসলিম। শুধুমাত্র মাছ ধরেই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তাই তারা ভাগ্যে বিশ্বাসী। মানতা জিপসিরা নৌকার বহর নিয়ে ভেসে বেড়ায়। এক একটি বহরে ২০ থেকে ৫০টি নৌকা থাকে। প্রত্যেকটি বহরে একজন করে সর্দার থাকে। ওটাই তাদের পৃথিবী।

লেখক জলবাতাসী উপন্যাসে যে বহরটির গল্প বলেছেন- সে বহরের সর্দার কুদ্দুস মিয়া। তার স্ত্রী আমিনা বিবি। তার একটিই মাত্রই মেয়ে যার নাম বন্যা। এই বন্যাকে ঘিরেই গোটা গল্পটি এগিয়ে যেতে থাকে। বন্যার সাথে মিরাজ নামের একটি ছেলের প্রেম হয়। মিরাজ ঢাকায় পড়ে। তার বাড়ি মাদারীপুর। সামার ভ্যাকেশনে বাড়িতে আসে মিরাজ। এক বিকেলে নদীর পারে গিয়ে বসে মিরাজ- সেখানেই দেখা হয় বন্যার সাথে। মিরাজ বলে- এত সুন্দর কালো আর গভীর চোখ সে আর কোনদিন দেখে নি।

বহরে একজন জ্ঞানী মানুষ আছেন। তার নাম আবদুল মালেক। সবাই তাকে মালেক মাস্টার বলে ডাকে। তার স্বপ্ন জিপসি শিশুদের জন্য একটি স্কুল গড়া। কিন্তু তা পুরণ হয় না। তবুও তিনি থেমে থাকেন না। কখনো নদীর পাড়ের বড় গাছের নীচে, আবার কখনো বাঁশ ঝরের নিচে বসে শিশুদের পাঠ দান করেন। খোলা আকাশটাই তার স্কুলের ছাদ।
কাজী সাইফুল ইসলাম

মালেক মাস্টারের সাথে মিরাজ দেখা করতে আসে অনেকগুলি বই নিয়ে। আর শিশুদের জন্য নিয়ে আসে চকলেট। মিরাজ বলে- ‘আপনি তো জিপসিদের কনফুসিয়াস।’ হেসে মালেক মাস্টার বলেন- ’তিনি বিখ্যাত দার্শনিক। আমার সাথে তার তুলনা কেন করছ?’ মিরাজ বলে- ‘আপনিও কনফুসিয়াসের মতো শিক্ষা দান করছেন, তাই।’

আমিনা বিবি যখন জানতে পারে বন্যার সাথে মিরাজের প্রেম। তখন বন্যাকে অনেক বার বোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু বন্যা কিছুতেই বুঝতে চায় না। শেষ মনে কষ্ট নিয়ে আমিনা বিবি বলে- ‘নাঙ্গের আর গাঙ্গের কোন ভরসা নাই।’

শেষ পর্যন্ত মায়ের কথাই সত্য হয়েছিল বন্যার জীবনে। মিরাজের দুই বন্ধু মিলে বন্যাকে যখন বলৎকার করেছিল- তখন বন্যার বারবার মনে হয়েছিল মায়ের কথা। সেদিনের পর থেকেই বন্যার জীবন বদলে গিয়ে শুরু হয় জলবাতাসীর জীবন।

প্রেমের সাথে যৌবনের তীব্য হাহাকারও তুলে ধরা হয়েছে জলবাতাসী উপন্যাসে। স্বামীহারা মর্জিনা অবৈধ জৈবিক সম্পর্ক করে বাদলের সাথে। বাদলের স্ত্রী আলেয়া বিচার দেয় বহরের সরদারের কাছে। সেই বিচারের মধ্যে আলেয়ার ভাই নুরু চিৎকার করে গালি দেয় বাদলকে- ‘খায় খয়রাত কইরা আর চোদে ল্যাম জ্বালাইয়া।’

মালেক মস্টার মুক্তি চায় এই বৈষম্য থেকে। তারা এদেশেরই মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রো তাদের কোন রকম অধিকার দেয় নি। তারা ভূমিহীন- সবচেয়ে বড় কথা তাদের কোন ঠিকানা নেই। তাদের জন্ম নৌকাতেই। মুসলিম রিতি মতো তাদের বিয়ে হয়, তাও নৌকাতেই। মৃত্যু সময় একটু মাটি দেবার জায়গা পায় না। তাই মালেক মাস্টার মনে করে-‘ এখানে ক্ষুধা-ভয়ংকর, কাজ প্রতিদিনের, জন্ম হতাশার, জীবন আনন্দহীন আর মুত্যু অভিশাপের।’

ভাতের অভাবে বহরের মানুষের কাছে মনে হয়-‘ক্ষুধার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কিছুই নাই। ক্ষুধা মৃত্যুর চেয়ে কোটিগুন ভয়ানক।’

জলবাতাসী উপন্যসের কঠিন বাস্তব একটি ঘটনা বলি- সন্ধ্যার অনেক পরে বন্যার সাথে আঁড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে দেখা করতে এসেছিল মিরাজ। জোঁছনা রাত। চাঁদের সাথে অসংখ্য তারা গোটা আকাশ জুড়ে। ওরা গিয়ে বসেছে নদীর কিনারে- যেখান থেকে পানি ছোঁয়া যায়। শরতের রাত। বাতাস ছিল অসামান্য উদাস। শরতের বাতাস গায়ে লাগলে মানুষের সময় জ্ঞান থাকে না। ওরা দুজনও সময় ভুলে গেছে। আকাশ থেকে রুপালি জোছনা ঝরে পড়তে থাকে নদীতে। বন্যার মনে হলো- নদীর পানি আর দূরে গ্রাম রুপোর দিয়ে গড়ে দিয়েছে কেউ।

ওদের তেমন কথা হয় না। শুধু পাশাপাশি বসে থাকতেই ভাল লাগে। এত ভাল আগে আর কোনদিন লাগে নি। হঠাৎ ফজরের আজান শুনতে পায় ওরা। অবাক হয়ে যায় দুজনই। সর্বনাস! রাত শেষ হয়ে গেছে! প্রায় দৌঁড়ে নৌকার বহরে ফিরে আসে বন্যা। দেখে- মা দাঁড়িয়ে আছে নৌকার মাথায়। বড়-বড় চোখ করে তাকিয়ে থেকে বন্যার গালে এক থাপ্পর কষে বলে- ‘পানিতে ডুব দিয়া নৌকায় আয়।’

বন্যা যখন বোঝাতে চেষ্ট করে, সে এরকম কিছু করেনি। তখন কণ্ঠে ঘৃণা জড়ো করে আমেনা বিবি বলে- ‘ডাঙ্গার পোলায় তোর কাছে শরীরের লোভে আহে নাই, হেই কতা আমি ক্যান পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করবে না।’

বন্যা যখন প্রতারিত হয় তখন সে বলে-‘দুর্ণীতিবাজ রাষ্ট্র প্রধান আর প্রতারক প্রেমিক দু’ই সমান। তারা শুধু লুটে নিতে জানে, কিছুই দিতে পারে না।’

জলবাতাসী উপন্যাসে একটি পতিতা পল্লিতে নিয়ে দাঁড় করানো হয় বন্যাকে। এটা আমার কাছে ভাল মনে হয় নি। বন্যাকে অন্য কোন ভাবে একটি সংগ্রামি জীবনও দেখানো যেত।

লেখকের লেখার মধ্যে একটি টান আছে। বইটি পাঠক ধরে রাখতে পারবে। কতগুলো উক্তির মধ্যে দিয়ে উপন্যাসটির গঠন অত্যন্ত শক্তিশালি করে তুলেছে।

জলবাতাসী উপন্যাস লেখক যেমনি বলেছেন- সমাজ আর রাষ্ট্রের অসম দিক, তেমনি তুলে ধরেছেন জিপসিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-না পাওয়া, প্রেম-বিরহ। বলতে চেয়েছেন- মানুষ সৃষ্টির শেরা। তাই মানুষ হিসেবে প্রত্যেকটি মানুষের একটি সম্মান থাকা দরকার।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.