আত্মসমীক্ষা ও একটি পরিবর্তনের আলোচনা : রুদ্রসাগর কুন্ডু

রুদ্রসাগর কুন্ডু
আত্মসমীক্ষা ও একটি পরিবর্তনের আলোচনা 


 মানুষ বেদনা বিলাসী।  সব সময় দুঃখ-যন্ত্রণার কথা বলতে ভালোবাসে।  মানুষ যেহেতু শান্তিপ্রিয়, সেহেতু সে সহানুভূতি চায়।  দুঃখের কথা অন্যের কাছে বললে, নিজের প্রতি সহানুভূতির যে সম্ভাবনা, মানুষ সেই সম্ভাবনাকে নিজের করে পেতে চায়।  

অর্থাৎ, সোজা কথায় বলতে গেলে, মানুষ মানুষের কাছে ভালোবাসা চায়।  এই ভালবাসা প্রাপ্তির জন্য মানুষ তার নিজের বেদনার কথা, অন্যের কাছে ব্যক্ত করে।  অন্যের সঙ্গে তার এক নিবিড় বন্ধুত্ব করার সম্ভাবনার জন্যই, বাস্তবিক অর্থে মানুষ তার মনের কথা খুলে বলে।  সমস্যা হচ্ছে, এই ধরনের আন্তরিকতার পরিপ্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে, মানুষের জীবনের সবথেকে চরমতম বিপদ সমূহের উত্থান ঘটে। 

কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের দুঃখ যন্ত্রণার কথা শুনে, আনন্দ পায়।  অন্যের কষ্ট যন্ত্রণার কথায় নিজেকে পাশবিক শান্তি দান করে।  এবং অন্যের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে, সে তাকে বিভিন্ন ভাবে আঘাত করে এবং নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে।  নানা ঘাত-প্রতিঘাত এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু সরল স্বাভাবিক মানুষ, একসময় নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।  এবং তখনই তার জীবনে শুরু হয় একলা চলার একটি নির্মম প্রচেষ্টা।  সে তখন আর সমস্যা সকলের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে চায় না কেননা মন খুলে মনের কথা বলার জন্য বিগত সময়ে তাকে যে যন্ত্রণার শিকার হতে হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাই তাকে সরল স্বাভাবিক জীবনে প্রতিবন্ধকতার  হাতছানি দেয়।  

আমার সঙ্গে এমন অনেক মানুষের পরিচয় আছে, যারা একসময় অতি সরল স্বাভাবিক বন্ধুসুলভ আচার-আচরণ এবং আন্তরিক জীবন যাপন করত।  আজকাল তাদের সঙ্গে দেখা হলে, কথা বললে বুঝতে পারি, কোনও  না কোনওভাবে কোথাও না কোথাও তারা হয়তো চরমভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।  সেই সাবলীল ব্যক্তিত্ব বা আন্তরিক বাক্য বিন্যাস ও প্রকাশভঙ্গি পরিলক্ষিত হয় না।  আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছি এত সংকীর্ণতা কিসের জন্য ?  তারা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে।  আমার প্রশ্ন শুনে মৃদু হেসে উড়িয়ে দিয়েছে এবং অতি দ্রুত অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা করতে শুরু করে দিয়েছে।  

ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়।  আমরাও আমাদের জীবনে কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত ভুল করেই চলি।  আত্মসমীক্ষার জন্য আমাদের কাছে সময় থাকে না।  কিংবা আমাদের আত্ম অহংকার এর পাশবিক শক্তি, আমাদেরকে আন্তরিক আত্মসমীক্ষার  পথে নিয়ে যেতে বাধার সৃষ্টি করে। মানুষের একটি সুন্দর জীবন গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের অনুশীলন অধ্যাবসায় শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তা কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়ত অর্জন করতে চায় না।  

জীবন-জীবিকার আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, খাবারে রাসায়নিক প্রক্রিয়া, ব্যবহারিক জীবনে অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, সর্বোপরি সামাজিক দূষণে ধীরে ধীরে মানুষের মানবিক জীবন; দুঃখ দুর্দশায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে।  বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা, বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা, মানুষের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ীক। এখন আর কেউ কারো কাছে বন্ধুসুলভ সম্পর্কের জন্য যায় না।  প্রত্যেকে এখন প্রত্যেকের কাছে নিজের কিছু সুবিধা উপার্জনের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হয়।  কাউকে আজ আর মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না। 

ডাক্তার তার চরিত্র হারিয়েছে, মাস্টার তার আদর্শ, রাজনীতিবিদ মিথ্যে কথার বুলি আউড়িয়ে দিনের পর দিন একটি প্রগতিশীল সমাজ কে নিজের অশিক্ষিত মূর্খ তন্ত্রের তত্ত্বে দাবিয়ে রাখে। প্রশ্ন হলো, মানুষ তাহলে কোথায় যাবে ? 

এই বিশ্বায়নের যুগে, শিক্ষা জীবনের বন্ধুরা বিভিন্ন দেশে বা দূরবর্তী কোনও  শহরে চাকরির সুবাদে বসবাস করছে।  কাজেই পুরনো সময়-এর বন্ধুদের সঙ্গ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় প্রতিটি মানুষ।  এভাবে প্রতিনিয়ত মানুষ একা হয়ে পড়ছে।  মানুষ আর আন্তরিকতার পরিচয় বহন করতে পারছে না।  প্রতিবেশীদের সঙ্গে আগের দিনগুলোর মতো এখন আর সম্প্রীতি থাকে না।  হয় রাজনৈতিক মতাদর্শ, না হলে সামাজিক শ্রেণী বিভাজনের ফলে একটি পরিবার অন্য একটি পরিবারের সঙ্গে বিরোধ বা সংঘাতে জড়িয়ে আছে।  

মানুষ বড় ক্লান্ত।  মানসিক যন্ত্রণা আঘাতে জর্জরিত  প্রতিবেশী বন্ধুত্বের।  সংঘাতের রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্বস্তরে মানুষ আজ বিপন্ন জীবনের কষাঘাতে জর্জরিত। মানুষ কেমন যেন দিন দিন অসহায় হয়ে পড়েছে।  মনের কথা বলার জন্য মানুষের আজ কোন বিশ্বস্ত বন্ধু নেই।  বিবাহিত জীবনের সুখ নেই।  সংসার জীবনে সুখ নেই মানুষের।  মানুষ তাহলে যাবে কোথায় ? পরিবারে শান্তি, নেই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্প্রীতি, এই সমাজে সুশৃংখল শান্তিপ্রিয় বাতাবরণ নেই।  পরিবেশে বিশুদ্ধ বাতাস নেই, পানীয় জলের  শুদ্ধতা  নেই।  

অতিরিক্ত বর্ষণ, না হলে প্রবল খরা।   অর্গানিক উৎপাদন নেই।  কৃষক আত্মহত্যা করছে, শ্রমিক ক্রমাগত ঢলে পড়ছে মৃত্যুর কোলে।   মানুষ প্রতিনিয়ত দুঃখী আর দুঃখী আর  দুঃখী।  রাস্তায় কারো সঙ্গে দেখা হলেই কুশল জানতে চাই, তার মৃদু হাসির আড়ালে যে দুঃখ যন্ত্রণা উঁকি মারে, তা দেখে কষ্ট লাগে।  মানুষ নিজেকে বদলে নিয়েছে।   অনেক কষ্ট যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখে মুখে উজ্জ্বল হাসির রেখা টেনে অবলীলায় বলছে, ভালো আছি।  আমিও মনে মনে বলি, ভালো থাকো, ভালো থাকো বন্ধু, ভালো থাকো সবাই।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.