পুণ্যভূমি জয়রামবাটী
পিনাকী চৌধুরী
বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রাম বর্তমান আক্ষরিক অর্থেই যেন এক পরম পবিত্র তীর্থস্থান। ১৮৫৩ সালে এই জয়রামবাটী গ্রামেই জন্ম হয়েছিল মা সারদার। হ্যাঁ , বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন ঈশ্বরের প্রেরিত অবতার। মা সারদা ছিলেন সৎ এর মা এবং একইসঙ্গে অসৎ এর মা ! মা সারদা বলতেন " ওদের এখানে তিন রাত্রি বাস কত্তে বলো, এখানে তিন রাত্রি বাস কল্লে দেহ শুদ্ধ হয়ে যাবে, এটা শিবের পুরী কিনা !"। আর সেই বিশ্বাস থেকেই এবং অবশ্যই লেখার রসদ সংগ্রহ করতেই এই প্রতিবেদক শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে হাজির হয়েছিল পুণ্যভূমি জয়রামবাটী। সেখান দেখলাম বেশ একটা উৎসবমুখর পরিবেশ।
মা সারদার বাসভবনটি বর্তমানে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীনস্থ। মা সারদার আদি বাড়িটি এই জমির ওপরেই ছিল। আর এই বাড়িতেই তিনি, নয় বৎসর বয়স পর্যন্ত বসবাস করেছিলেন। এখানেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। ১৯২৩ সালের অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ এই মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের সম্মুখভাগে বিশালাকার স্থানে প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে পূজিতা মা সারদার শ্বেত পাথরের মূর্তির তলায় দেবী সারদার দেহাবশেষ রক্ষিত রয়েছে। প্রতিদিনই কাকভোরে মা সারদার মঙ্গলারতি অনুষ্ঠিত হয়। যথেষ্ট দৃষ্টিনন্দন সেই দৃশ্য ! মনে এক শুদ্ধ ভক্তিভাবের উদয় হয়।
এছাড়াও সান্ধ্যকালীন সন্ধারতি দেখতে প্রচুর ভক্ত সমবেত হন। আর এই মাতৃমন্দির মঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের ঠিক বাম দিকে অবস্থিত মায়ের পুরাতন বাটী। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫২ বছর সারদা দেবী এখানে বসবাস করেছিলেন। আর মঠের মঠের প্রবেশদ্বারের ঠিক পাশেই একটি ছোট দরজা দিয়ে মায়ের নূতন বাটীতে প্রবেশ করতে হয়। মাতৃ মন্দিরের উল্টোদিকে পুণ্যপুকুর। প্রতিদিন-ই প্রত্যেক ভক্তকে মায়ের প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
অগুন্তি মানুষের সমবেত হন এই প্রসাদ গ্রহণ করতে, মুহূর্তের মধ্যেই যেন আমার মনের যাবতীয় সংকীর্ণতা দূর হয়ে গেল। তবে তার আগেই একবার ঢু মারলাম সিংহবাহিনী দেবীর মন্দিরে। মাতৃ মন্দিরের অদূরেই অবস্থিত দেবী সিংহবাহিনী গ্রাম্য দেবী হিসেবে বেশ জাগ্রত।
এই সিংহবাহিনী আসলে দেবী দুর্গার অপর এক রূপ। এছাড়াও মন্দিরে মা চন্ডী, মা মহামায়া এবং মা মনসা অধিষ্ঠান করেন। অতীতে মা সারদা এখানে বহুবার পুজো দিয়েছিলেন। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দিরের মাটি অত্যন্ত পবিত্র এবং ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ত্রিতাপজ্বালাদগ্ধ মানুষ আমি, আর পরম বিশ্বাসে এই সিংহবাহিনী মন্দিরের মাটি নিষ্ঠার সঙ্গে মাথায় ঠেকিয়ে সংগ্রহ করলাম। তবে মা সারদার মাতৃমন্দিরে ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত শ্রী শ্রী মায়ের জন্মতিথিতে প্রচুর ভক্ত সমাগম ঘটে, মাতৃমন্দিরে তখন যেন তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এছাড়াও প্রতি বছরই মন্দিরে ধুমধাম সহকারে জগদ্ধাত্রী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। পরিশেষে বলি, মহারাজদের তত্ত্বাবধানে এই মাতৃমন্দিরে যেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হয়।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন
(
Atom
)


0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন