অভিমান : সমাপ্তি চৌধুরী

 সমাপ্তি চৌধুরী

অভিমান 
 
সমাপ্তি চৌধুরী


পড়ন্ত বিকেলে ম্লান সূর্যের আলোয় বসে বসে চৈতি ভাবে পুরনো দিনের কথা। কলেজের সেইসব দিনগুলো কত ভালোই  না ছিলো। রুদ্রর সেই উচ্ছ্বাস, ভরাট গলায় নাটকের সংলাপ বলা, হঠাৎ করে মাঝে মাঝেই সাইকেল নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া - এইসব দেখেই তো চৈতি তার প্রেমে পড়েছিল। একসাথে কত আনন্দের মুহূর্ত কাটিয়েছে তারা।
#### হঠাৎ চিন্তার সুতো ছেঁড়ে বারান্দার দেওয়াল ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজে। স্বামীর বাড়ি ফেরার সময় হলো।,,,,,বাগানে পাখিদের কলকাকলীতে চারিদিক মুখরিত, তাদেরও ঘরে ফেরার পালা।
চৈতির মনে নানা প্রশ্নের আনাগোনা। গত কয়েকদিনে সে দেখেছে, শুনেছে ঘরে ফিরতে চেয়ে কত মানুষের কত করুণ পরিণতি।,,,,,,তার ঘর কোথায়? সত্যিই কী মেয়েদের ঘর বলে কিছু হয়। যেখানে সে জন্মেছে,বড়ো হয়েছে সেটা নাকি তার বাপের বাড়ি। বিয়ের পর প্রথম বউ হয়ে যে বাড়িতে প্রবেশ করল,সেটা তার শ্বশুর বাড়ি। এখন স্বামীর সাথে যেখানে থাকে, সেখানে মাঝে মাঝেই শুনতে হয়- " না পোষালে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও"।

,,,,,,,পড়াশোনায় চৈতি বরাবরই ভালো ছিল। ভালো আবৃত্তি করতো,নাটক করতো।কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা চৈতির কোনো কিছু নিয়েই কেরিয়ার করার কথা ভাবা হয় নি।

প্রায় সমবয়সী হওয়ায় রুদ্রর সঙ্গে চৈতির সম্পর্কটা বিবাহের পরিণতি পায় নি। চৈতির বাড়ি থেকে যখন বিয়ের কথা ভেবেছে, রুদ্র তখনও ঠিকমতো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি,বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে পারে নি। তাই চৈতির বাড়ির লোকেরাও তাকে মেনে  নিতে পারে নি। চৈতি তার বাবাকে অনেক বুঝিয়েছিল,কিছুটা সময় চেয়েছিল,নিজের পরিচিতি তৈরি করার অনুমতি চেয়েছিল------ কিন্তু যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা একরোখা, জেদী বাবা সেদিন চৈতির কোনো কথাই শোনেন নি। বাবার উপর অভিমানে তার বুক ফেটেছিল, কিন্তু মুখ ফোটে নি।

মনের সাহসে ভর করে, নিজেদের ভালোবাসার উপর অগাধ আস্থা নিয়ে চৈতি যখন রুদ্রর দ্বারস্থ হয়েছিল, তখন রুদ্রও তার দিকে ভরসার হাতটা বাড়িয়ে দিতে পারে নি। সেদিন নিজের কেরিয়ার, নিজের নাটকের দল- এগুলোই রুদ্রর কাছে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে সেদিন চৈতি ফিরে এসেছিল।

বসন্তের এক শুভদিনে চৈতির বাবার পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে তার শুভপরিণয় সুসম্পন্ন হয়ে গেল। নিজের মনের সমস্ত ইচ্ছাকে দমিয়ে রেখে অন্যদের ইচ্ছের মূল্য দিতে দিতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এসেছে। কবিতার বই আর নাটকের খাতাগুলোয় ধুলোর আস্তরণ পড়েছে। নীলাভ,চৈতির স্বামী কখনো জানতেই চায় নি তার স্ত্রী কী পছন্দ করে, কী ভালোবাসে---- অভিমান করে চৈতিও কখনো কিছু জানায় নি তাকে। তবে স্বামীর ভালোলাগার রসদ জোগাতে ব্যস্ত থেকেছে সারাক্ষণ। বিয়ের আগে বাড়ীতে কখনো সেভাবে রান্নাঘরে ঢুকতেই হয় নি,,,কিন্তু বর্তমানে ইউ- টিউব দেখে দেখে স্বামীর পছন্দের জোগান দিতে দিতে সে রান্নায় বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সবকিছুর মাঝেও  একাকীত্ব যেন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে গ্রাস করে,,,,,পরিপূর্ণ হৃদয়ে ভালোবাসা উজাড় করে দিতে চায়, কিন্তু তা গ্রহণ করার কেউ নেই।,,,,,,,বিয়ের পাঁচ বছর পরেও মা না হতে  পারার জন্য শ্বশুর বাড়ি থেকে অনেক অভিযোগ এসেছে। যদিও সমস্যা ছিল নীলাভর, তথাপি দুই বাড়ি থেকেই কথা শুনতে হয়েছে চৈতিকে। নীলাভ কখনো কোনো প্রতিবাদ করে নি।অভিমানে, যন্ত্রণায়, কষ্টে মরমে মরেছে চৈতি। কখনো কারোর কাছে কোনো অনুযোগ করে নি।

###### চৈতির মেয়ের বয়স এখন দুই। অনেক ঝড় ঝাপটা সামলে, নীলাভর বিভিন্ন ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চৈতি মা হতে পেরেছে। তবে তখনও তাকে শুনতে হয়েছে-- " এতদিন পর সন্তান এল বাড়ীতে, তা-ও আবার মেয়ে।" অভিমান করেছে চৈতি এই সমাজের উপর, সমাজ ব্যবস্থার উপর-- যেখানে এখনও মেয়ে জন্ম দেওয়াটা অপরাধ বলে গণ্য করা হয়---- তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করেছে , সন্তান মেয়ে না ছেলে হবে তার দায় মায়ের নয়।,,,,,,কিন্তু স্বভাবদোষে সে কিছুই বলতে পারে নি। নীরবে সহ্য করেছে সব অপমান।

একরাশ অভিমান জমাট বেঁধে আজ তার বুক পাথরসম হয়ে গেছে। মনে মনে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে যে,মেয়েকে সে মনের মতো করে মানুষ করে তুলবে, সমাজের উপযুক্ত করে গড়ে তুলবে।

###### ######
কিন্তু হায় রে বিধি,,,,,,ধীরে ধীরে চৈতি বুঝতে পেরেছে তার মেয়ে মূক ও বধির। এখন সে অভিমানে ঠাকুর ঘরে ঢোকা বন্ধ করে দিয়েছে। পুরো জগৎ সংসারের উপর একরাশ অভিমান নিয়ে সে তার নতুন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.