নির্মম : উত্তম চৌধুরী

উত্তম চৌধুরী

নির্মম
 
উত্তম চৌধুরী

' মোক ছোঁবেন না '--এমন কথা বলতে বলতে খাবারের প্যাকেট মাটিতে রেখে উঠে দাঁড়াতেই টস টস করে সবির চোখের জল নীচে গড়িয়ে পড়ল। অসীম প্রথমে অবাক হলেও পরে সামলে নেয়। নিজের ছোট্ট ছেলের দিকে আদর ছুঁড়ে দিয়ে বলল,' দোতরাখান পাঠেয়া দিস।'

দিল্লি থেকে অসীমরা গ্রামে ফিরে এসেছে। ওরা দলে বারো জন। গ্রামে কোয়ারান্টিন কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্ক্রিনিং টেস্টে করোনা না পেলেও এখানেই তাদের চোদ্দ দিন থাকতে হবে। চা-বাগান এবং জঙ্গলের পাশে কেন্দ্রটি। একটু দূরেই নদী। সেল্ফহেল্প গ্রুপের তিনজন মহিলা এসে দুপুরে রান্না করে দেয়। দিনে এবং রাতে সেই খাবার সবাই ভাগ করে খায়। হাতির ভয়ে রাতে পালা করে দু'জন ক্যাম্পের বাইরে পাহারায় থাকে।

হোটেলে কাজ করত অসীম। লকডাউনের পর দশ দিন তারা অপেক্ষা করেছিল বাড়ি ফেরার জন্য। কোনও উপায় না দেখে হাঁটতে শুরু করে। কখনও মাল বোঝাই লরিতে, কখনও পিক আপ ভ্যানে এগিয়েছে। কখনও খেয়ে, কখনও না খেয়ে হেঁটেছে তারা। পথে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। পুলিশের ডান্ডাও কম খায়নি। সোজা পথ, বাঁকা পথে হেঁটেছে প্রচুর। কত বাধা, কত প্রশ্নের মুখোমুখি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে কেউ কেউ, কোথাও চূড়ান্ত অপমান আর অবহেলা। অভিসম্পাত করেছে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাকে। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরেছে আঠারো দিন পর বেশি টাকায় ট্রাক ভাড়া করে।

দু'চোখে ঘুম আসে না অসীমের। কত নির্মম এই দেশ।! পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা ভাবলই না! হোটেলের কাজটি পরে থাকবে তো! বাড়ি থেকে যদি যেতে না দেয়! রবিনার কথা খুব মনে পড়ে। ওরা বিহারী -বাঙালি। মেয়েটি ওর সঙ্গেই রিসেপশনে থাকত। খুব হাসিঠাট্টা চলত দু'জনের মধ্যে। বিষণ্ণতা কাটাতে অসীম গভীর রাত পর্যন্ত দোতারায় সুর তোলে। সে সুর ছড়িয়ে যায় ঢেউয়ের মতো।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.