মার্ডার রহস্য: "ধোঁয়াশার অন্তরালে ! : ঈদারুল ইসলাম

মার্ডার রহস্য: "ধোঁয়াশার অন্তরালে ! : ঈদারুল ইসলাম
মার্ডার রহস্য: "ধোঁয়াশার অন্তরালে : ঈদারুল ইসলাম

ঘড়িতে প্রায় রাত পৌনে ন'টা হবে, অকস্মাৎ ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো । লুছিন্ডা রান্নাঘরের থেকে ছুটে এসে ফোনটা রিসিভ করেই কান্নায় ভেঙে পড়ে! ফোনটা পাশে ফেলে দিয়েই মেঝেতে বসে পড়ে সে ! এইতো ঘণ্টা দুয়েক আগেই পুনিত বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ! আজ সকালেই ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছে সে, হঠাৎ কী এমন হল ! লুছিন্ডার কান্নায় গোটা বাড়ি একত্রিত হয় ; কিন্তু ঠিক কী হয়েছে, কারও বোধগম্য হচ্ছে না ! পুনিতের মা লুছিন্ডা কে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইছেন -- কী হয়েছে মা, তুমি কাঁদছো কেন ? তোমার বাবার কিছু হয়েছে ? মা অসুস্থ ?
-- না মা, ওঁদের কিছুই হয়নি ।
-- তবে তোমার ভাইয়ের.. !
-- না না মা, ওঁদের কারও কিছুই হয়নি ।
-- তাহলে !
-- তোমার ছেলের...!
-- প্রিয়াং এর কিছু ? উফফ এই ছেলেটা আমায় শান্তিতে মরতেও দেবে না ! সারাদিন খালি বাইকে চেপে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ান আর আড্ডা ! আজ এর সাথে মারপিট তো কাল অন্য জনের সাথে ! বিয়ের বয়স হয়েছে সে খেয়াল রাখবেন মহারাজ ! আজ বাড়ি আসুক আগে, মহারাজের একদিন কী আমার।
-- প্রিয়াং নয় মা 'পুনিত' ।
-- কী হয়েছে বৌমা পুনিতের ? -- এক্সিডেন্ট !
-- এক্সিডেন্ট! এই তো কিছুক্ষণ হল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে ! আজ কতদিন পরে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি এসেছে, বন্ধুদের সঙ্গে একটু প্রাণখুলে কথা বলবে বলেই তো বেরিয়েছে , আর....
-- মা, পুনিত আর নেই ! কে যেন গলা টিপে ..!
সুষমা দেবী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। এ কী হল! কে আমার সোনা ছেলেটাকে ..!
-- খগেন কাকা ল্যান্ডলাইন থেকেই প্রিয়াং কে ফোন করে বলেন -- "দাদা বাবু অতি সত্বর বাড়ি চলে এসো, বড় দাদা বাবু আর নেই !"
প্রিয়াং কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না, দাদা কে তো বিকেলেই বাড়িতে দেখে এসেছে সে !
কান্নাকাটির শব্দে পাড়ার অনেকেই জড়ো হয়েছে, ততক্ষণে পুলিশ ও খবর পেয়ে প্রাথমিক তদন্তে এসেছে।
জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এমন সময় প্রিয়াং মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরল।
পুলিশের তদন্তের মুখে প্রিয়াং কেও পড়তে হল। পুলিশ কাউকেই সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখতে চাইছে না। একে মার্ডার তার উপরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর বলে কথা। কোনও ক্লুই পুলিশ হাতছাড়া করতে চায়না।
পরের দিন ময়না তদন্তের রিপোর্টে জানা গেল, পুনিতকে প্রথমে কাঁধে নেশার ইঞ্জেকশন দিয়ে বেহুঁশ করা হয়, তার পরে গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে মারা হয়। ক্রাইম স্পটে বাইক আর পুনিতের সেলফোন ছাড়া অন্য কিছুই পাওয়া যায় নি। সন্দেহের তির ঘুরেফিরে প্রিয়াং এর দিকেই আসছিল। প্রিয়াং এর সব বন্ধুদেরই থানায় ডেকে পাঠানো হয় ; কিন্তু তাতেও পুলিশের হাতে কোনও লিড আসেনি !
সেনাবাহিনীর তরফে পুনিত কে "গার্ড অফ অনার" দিয়ে শেষ বারের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান হয়।
~~~~~~~~~
দেরাদুনে পোষ্টিং এ থাকার সময়ই লুছিন্ডার সাথে পুনিতের আলাপ হয়। ধীরে ধীরে তা ভালবাসায় রূপ নেয়। অবশেষে বছর চারেক আগে দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। পুনিতের পোষ্টিং বর্তমানে লাদাখে, সকালেই সে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, আর সন্ধেবেলাই....
কাল তাঁদের চতুর্থ বিবাহ বার্ষিকী, লুছিন্ডার জন্য প্রচুর উপহার এনেছিল সে। লুছিন্ডা একটা এম এন সি তে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার । অফিসে ছুটি নিয়েছিল লুছিন্ডা। সারাদিন সে পুনিত কে দেবে বলে। কত প্ল্যানিং করেছিল পুনিত, আর মাত্র ১৮ মাস সার্ভিস রয়েছে তাঁর। রিটায়ারমেন্টের পরে দুজনে মিলে একটা এক্সপোর্ট ফার্ম খুলবে, নিজেদের সন্তান নেই তাই অনাথ শিশুদের জন্য অনেক কিছুই করার কথা ভেবেছিল পুনিত । পাড়ার সকলের সাথেই পুনিতের মধুর সম্পর্ক, আর হবেই না বা কেন ? সেই ছোট্ট বেলায় বাপ মরা প্রিয়াং কে কোলেপিঠে মানুষ করেছে সে। দাদা হিসেবে নয়, বাবার স্নেহে বড় করেছে প্রিয়াং কে। কোনওদিনই বিরক্তির অবকাশ দেয় নি সে, প্রিয়াং-এর সব অহেতুক আবদারই পূরণ করত পুনিত । আদর দিয়ে দিয়ে একদম মাথায় তুলেছিল প্রিয়াং কে। পুনিত আগাগোড়াই একটু দয়ালু টাইপের ,তাই পাড়ার যে কেউ বিপদে পড়লেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত সে। পাড়ার সবাই পুনিত কে দেবতার মতোই ভক্তিশ্রদ্ধা করত। বিয়ের পরে অবশ্য লুছিন্ডার সাথে এই বিষয়ে একটু অশান্তিও হয়েছিল ।
~~~~~~~~~
এদিকে বৌদির সাথে প্রিয়াং এর সম্পর্ক বেশ মধুর। বাড়িতে প্রিয়াং ই লুছিন্ডার বেস্ট ফ্রেন্ড , যতক্ষণ বাড়িতে থাকে দু'জনাতে হাসি ঠাট্টা লেগেই থাকে। এটা আবার বাড়ির অনেকেরই পছন্দ নয় ! পাড়াতেও ফিসফিসানি লেগেই থাকতো । স্বাভাবিক ভাবেই সন্দেহের তীর প্রিয়াং-এর দিকেই ঘুরেফিরে আসছিল। লুছিন্ডা কে আবার মাঝেমধ্যেই অফিসের বস মি. রয়ের সাথেও দেখা যায়, রাতবিরাতে গাড়িতে করে পৌঁছে দেন। কখনও কখনও রাত্রে এক সাথে ডিনার সেরে ফিরতে দেরিই হয়। আবার অফিসের আর এক সহকর্মী নচিকেতের সাথেও লুছিন্ডার ঘনিষ্ঠতা ছিল । তাঁদেরকে কখনও পার্কে তো কখনও কফিশপে বসে আড্ডা মারতে দেখেছে অনেকেই। এ নিয়ে বাড়িতে অশান্তিও হয়েছে কয়েকবার । পুলিশ সব সূত্রই মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে ; কিন্তু ওঁদের থানায় ডেকে ইন্ট্রোগেট করেও কোনও ক্লুই পুলিশ খুঁজেই পায়নি। এ দিকে ল্যান্ডলাইনে আসা শেষ কল টি কোনও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির করা , তাও আবার পাব্লিক বুথ থেকে ! অবশেষে কেসটা ফাইল বন্দি হয়ে রয়ে যায়।
~~~~~~~~~~
এভাবেই মাস খানেক কেটে যায়। হঠাৎই পুলিশের হাতে একটা ক্লু আসে,  প্লাস্টিক কুড়ানো একটি ছেলের হাতে একটি আইফোন আসে। সেটা পুলিশে দিতেই সব সূত্রই মিলিয়ে দেখে পুলিশের হুঁশ ফেরে! আইফোন টি ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানো হয়, ফরেন্সিক ল্যাবের রিপোর্ট অনুযায়ী ওই ফোন থেকে যে নাম্বারে লাস্ট এস এম এস টি করা হয় সেটা পুনিতের বাড়ির নাম্বার। ওই নাম্বারে এক মাসে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক কল করা হয়, তাও ঘণ্টায় ঘন্টায় ! মার্ডারের দিনই তিন তিনটে কল করা হয় ওই  নাম্বারে। পুনিত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ার পরেই বাড়ির ওই নাম্বার থেকেই কল করা হয়েছিল মাত্র এক মিনিটের জন্য। আর ওই নাম্বারে পাঠানো এস এম এস-এ লেখা রয়েছে - "আসমান সাফ, চির প্রশান্তি "।
~~~~~~~~~~
পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে যে ওই নম্বরটি দেরাদুনের একটি ছেলের, যে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন । আর পুনিতের বাড়ির নাম্বার টি আর কারও নয়,পুনিত আর প্রিয়াং-এর মায়েরই ! পুনিত তাঁর নিজের সন্তান নয়, আগের পক্ষের । পুনিত যখন বছর পাঁচেকের তখনই তাঁর মা কে হারাতে হয়, নতুন মা কে পেয়ে পুনিত কিন্তু খুশিতে ডগমগ হয় । আর ভাই প্রিয়াং কে পেয়ে সে সবই ভুলে যায়। বাবাকে হারিয়ে সংসারের গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে পুনিতের উপরেই, ভাই প্রিয়াং তখন সবে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তখন সে সদ্য গ্রাজুয়েট হয়েছে, কিছু দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে চাকরিটা  পেয়ে যায় সে। ভাই প্রিয়াং কে বাবার অভাব কখনও বুঝতে দেয়নি সে।
~~~~~~~~~
কিন্তু প্রশ্ন হল হঠাৎই এভাবে পুনিতকে মারতে গেলেন কেন সুষমা দেবী ? আর ওই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিই বা কেন পুনিত কে মার্ডার করতে গেল ?
ওই মার্ডারার আর কেউই নয়, লুছিন্ডার ছোট্ট বেলার বন্ধু যে পাগলের মতো ভালোবাসতো লুছিন্ডা কে । কিন্তু লুছিন্ডা সকলের সাথেই বন্ধুর মতো মেলামেশা করত আর পুনিত কে সে ভীষণই ভালোবাসতো। পুনিত ছাড়া সে অন্য কিছুই কল্পনাই করেনি কখনও ।
আর পুনিতের মায়ের ইচ্ছে ছিল প্রিয়াং কে সমস্ত সম্পত্তির মালিক করার । পুনিতকে সরিয়ে দিলেই লুছিন্ডা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। তারপর তাকে মেরে দিয়ে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যার রূপ দিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে! 
তারপর দুজনে মিলে চুক্তি করে যে, পুরো প্রপার্টি সুষমা দেবীর এবং প্রিয়াং এর আর লুছিন্ডা তার ।
এক নিমেষেই লুছিন্ডার পায়ের তলার মাটি সরে যায় ! এ কী ! যে মাকে পুনিত দেবীর মতোই পুজো করত, নিজের মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো সেই মা-ই কিনা..! লুছিন্ডা কান্নায় ভেঙে পড়ে আর চিৎকার করে বলতে থাকে-
-- মা, আপনি এ কী করেছেন ! আমাদের সন্তান নেই, তাই আমরা প্রিয়াং কেই নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসি । এই কথা বলতে বলতেই হঠাৎই ছুটে গিয়ে লকার থেকে উইল পেপার নিয়ে আসে।
-- এই দেখুন, আপনি জানেন না পুনিত তাঁর সমস্ত সম্পত্তিই আপনার আর প্রিয়াং-এর নামে লিখে দিয়েছে। আমাদের কিছুই চাইনা। পুনিত আর আমি দুজনেই ঠিক করেছিলাম যে ,ওর রিটায়ারমেন্টের পরে এক্সপোর্ট ফার্ম টা খুলে একটু এস্টাব্লিশড হতেই সব কিছুই প্রিয়াং কে বুঝিয়ে দিয়ে পথশিশুদের নিয়ে একটা এন জি ও চালাব।
আজ বন্ধুদের সাথে দেখা করেই উকিলের সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট  ছিল, ফার্ম আর এন জি ও-এর রেজিস্ট্রেশন নিয়ে। সেখানেও প্রিয়াং কে ম্যানেজিং ডিরেক্টর করেছে পুনিত।
প্রিয়াং বৌদি কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সুষমা দেবীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে-
-- তুমি মা নও, ডাইনি ! তুমি আমার পিতৃতুল্য দাদার খুনি ! আমি তোমায় কখনও ক্ষমা করতে পারব না।
আমার সম্পত্তি চাই না। স্যার আপনারা ওকে নিয়ে যান । আমি ওই খুনি মায়ের মুখ দেখতে চাই না।
বৌদি আমি দাদার স্বপ্নকে ভেঙে যেতে দেবো না। চলো আমরা দুজনে মিলেই পথশিশুদের নিয়ে দাদার স্বপ্নকে সার্থক করে তুলি।
~~~~~~~~~
পুলিশ সুষমা দেবীকে এরেস্ট করে নিয়ে যায়, ক'দিন পরেই শিলং-এর এক হোটেল থেকে মেইন অভিযুক্ত ব্যক্তি ' ক্রিস্টোফার ' কেও পুলিশ এরেস্ট করে।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.

1 Comments:

IDARUL ISLAM বলেছেন...

লেখাটা একবার পড়ার অনুরোধ করছি!��