 |
| মনসুর আলী গাজী |
সাদা পেত্নী ... মনসুর আলী গাজী
উড়ানখোলা মাঠে সেদিন জমাটি আড্ডা বসেছিল। আড্ডায় ছিল যদু, হরি, করিম, মিহির, জংলা, মিঠা আরও পাঁচ ছ’জন। জংলা হঠাৎ বলে উঠল — বিশ্বাস করবি নে মানে? তোরা যদি নিজে চোখে দেখতি তো বিশ্বাস হত—বুঝলি?
ব্যাপারটা ছিল এই যে, আজ থেকে তিনদিন আগে জংলা ভরদুপুরে এই উড়ানখোলা মাঠে গোবর কুড়োতে এসেছিল। এক আকস্মিক দৃশ্যে জংলা অত্যন্ত ভীত ও বিহ্বল হয়ে পড়ে।
জংলা দেখেছিল — মাঠের উত্তর-পূব দিক থেকে ভরদুপুরে একটা সাদা নারীমূর্তি বেরিয়ে ঐ বড়ো আমবাগানের দিকে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল। ওই আমবাগানে আজ থেকে বছর সাতেক আগে এক মহিলার গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা জংলাকে আরও ভীত ও চিন্তিত করে তুলল।
মহিলাটি ওই বাগানে যেদিন গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিল সেদিনের পর থেকে এই এলাকায় সব লোকে ঐ আমবাগানটিকে ‘গলায় দড়ি বাগান’ বলতে শুরু করেছিল। তা ঐ দুপুরে ওই মহিলা মূর্তির হাঁটতে হাঁটতে গলায় দড়ি বাগানের দিকে যাওয়াকে যদু, করিম, মিহির, মিঠা কেউই বিশ্বাস করতে চাইছে না। আড্ডায় উপস্থিত সকলেই ঘটনাটাকে হাসির কলরোলে একেবারে খড়কুটোর মত উড়িয়ে দিতে প্রাণপণে লেগে পড়েছে। আর এটাই হয়েছে জংলার সমস্যা। জংলা যত ওদের বোঝাতে যায় ওরা ততই ওকে তাচ্ছিল্যের বাণে বিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগে যায়।
জংলা ছেলেটা সেই সাত বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালার সতীর্থ একজনের সাথে মারপিট করে তার মাথা সজোর আঘাতে ফাটিয়ে দিয়ে স্কুলকে বিদায় জানিয়ে বর্তমানে টো টো করে ঘুরে বেড়াবার মুক্ত ও আনন্দময় জীবনটাকে বেছে নিয়েছে। ওর মা ঘুঁটে করে আর ও এ মাঠ ও মাঠ থেকে গোবর কুড়িয়ে আনে।
এখন যে ঝামেলার মধ্যে জংলা পড়েছে তাতে করে দুপুরে একাকী মাঠে গোবর কুড়োতে আসা ওর পক্ষে এক বিভীষিকা হয়ে গেছে। একবার নয় এই নিয়ে তিন তিনবার ও দুপুর বেলায় এই মাঠে একই দৃশ্য দেখেছে, অথচ ওর বন্ধুরা কেউই বিশ্বাস করছে না। হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে।
নাহ্, মাকে বলতে হবে। ভেবেছিলাম এদের বলে কাজ হবে। ব্যাটাগুলো দেখছি সবকটা একেবারে পাজি জিনিস। — ভাবতে থাকে জংলা।
সন্ধ্যাবেলায় দাওয়ায় বসে মুড়ি আর চানাচুরের মিশ্রণ টিফিন খেতে খেতে ও ওর মাকে বলল—মা, আমি আর ওই মাঠে দুপুরবেলা করে গোবর কুড়োতে যাব না।
কেন রে, কি হয়েচে? গোবর কুড়োতে যাবি নে কেন? ঘুঁটে না করলি খাবি কি? তোর বাবার তো দেখচিস বেশি রোজগের নেই, রুগী মানুষ।—বলে জংলার মা লক্ষী।
না মা, এই তিনদিন ধরে যা দেকচি তোমারে আর কি বলব!—বলে জংলা।
কিঞ্চিৎ আশ্চর্য সুরে জংলার মা লক্ষী বলে—কি রে জংলা কি দেকিচিস—সাপ-ভালুক নাকি রে?
শান্তভাবে জুংলা এই তিনদিনের প্রত্যহ দৃষ্ট দৃশ্যটি বিশ্ময়াভিভূত ভঙ্গি চোখে ও মুখে টেনে এনে সবিস্তার বর্ননা দেয় ওর মাকে। ওর মা বলে— দূর, ও তোর চোখের ভুল। তুই কি দেখতে কি দেখে ফেলিচিস।
জংলা রেগে যায়। ওর মাকে বলে —তোমার বিশ্বাস না হয় তো কাল গিয়ে নিজে চোখে দেখবে।
ঠিক আচে, তুই বলচিস যকন আমি গিয়ে দেখব কি দেকিচিস তুই।
জংলা মৃদু বিরক্তির সুরে বলে—হ্যাঁ যাবে। গিয়ে দেকবে একন আমি মিথ্যে বলচি না সত্যি বলচি।
পরের দিন জংলা ওর মাকে নিয়ে দুপুর একটার সময় উড়ানখোলা মাঠের পশ্চিম প্রান্তে এল। গ্রীষ্মকাল। সোঁ সোঁ করে বাতাস বইছে। মাঠের পাশের গাছগুলোর পাতার মৃদু মর্মর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ওদের ঠিক পাশে বাঁধা লালচে রঙের গোরুটা লেজ দিয়ে সপাট করে নিজের পিঠে আঘাত করল, হয়ত ডাঁশজাতীয় পোকা কিছু একটা গায়ে বসেছিল। মাটিতে পা রাখা যাচ্ছে না। পা যেন ঝলসে উঠছে ।
হঠাৎ দেখা গেল মাঠের পুব দিকটা কেমন একটা উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। কিন্তু হায়! সে নারী মূর্তিটা তো দেখা গেল না। জংলার মা বিরক্ত হয়ে বলল— কই কিচু তো দেখলাম না। তোর যতসব আজগুবি গল্প। যা ওই কালো গোরুর গোবরটা তুলে আন্।
না মা, আমি এই কালই দেখেচি। কিন্তু আজগে কেন দেখা গেল না বুজতে পারচি না।—এই কথা বলে মাথা চুলকোতে চুলকোতে জংলা গোবরটা তুলে আনতে গেল।
সেদিন রাতে জংলার চোখে ঘুম এল না। ওর মাথায় খালি এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল কেন এরকমটা হল। আমি তিনদিন দেখলাম। এক্কেবারে নিজের চোখে। আর আজকে যখন মাকে নিয়ে গেলাম তখন দেখতে পেলাম না। ও পেত্নী মনে হয় মাকে ভয় পেয়েছে। দাঁড়াহ্, ব্যবস্থা হচ্ছে। করিমের মোবাইলটা নিতে হবে। পেত্নী, তোকে এবার ক্যামেরাবন্দী করব রে! তারপর ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপ সবজায়গা করে দেব রে। কোথায় যাবি তুই। তোর হচ্ছে! দেখি এবার তুই কি চালাকি করিস আমার সাথে!
পরদিন...
—করিম, তোর ফোনটা দে তো..., করিমকে বলল জংলা।
—এই নে। করিম জংলার হাতে ওর বাবার দেওয়া দামি স্মার্টফোনটা তুলে দিল। আর বলল—কেন, কি করবি? তোর ওই দুপুর পেত্নীর ছবি তুলবি নাকি?
—একদম ঠিক ধরেচিস জংলা। ওই পেত্নীরই ছবি তুলব। তোরা তো কেউ বিশ্বাস করছিস নে। আর তোদের দুপুরে আসতে বলি, তোরা আসবি না। আর কি বলি বল্ তো — সেদিন মাকে নিয়ে এলাম দেখাতে—দেখাই গেল না। ঠায় আধ ঘন্টা দাঁড়িয়ে রোদে আমি আর মা দুজনে ঝলসেছি জানিস! কাল ওর ছবি তুলেই ছাড়ব।
আড্ডার অবশিষ্ট বালকেরা হেসে ওঠে। তাদের অন্যতম মিঠা বলে — তোর মাথাটা একেবারে গেছে জংলা। তুই বরং একটা ডাক্তার দেখা।
জংলা অতিমাত্রায় রাগান্বিত হয়ে যায়। বলে—আমার মাথা গেছে, না তোদের মাথা গেছে। যেদিন এসে সবকটাকে ঘাড় মটকাবে সেদিন বুঝবি।
সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। জংলা বলে—দেখ্, আমি প্রমাণ করেই ছাড়ব। এই তোরা কাল দুপুরে মাঠে আসবি? তাহলে তোদেরও দেখাব। আসবি? বল্।
হরি উৎসাহ নিয়ে বলে — হ্যাঁ হ্যাঁ আসব। বাকিরাও বলে—ঠিক আছে দেখব কেমন তোর সাদা পেত্নী। যদু বলে —যদি দেখতে না পাই তাহলে কী হবে? প্রশ্ন শুনে কি উত্তর দেবে জংলা ভাবতে লাগল। পরক্ষণেই বলে —যাহ্ যদি না দেখিস তো আমি পাগল। তোরা আমাকে পাগল বলে ডাকবি।আমার নাম জংলা থেকে হয়ে যাবে পাগল। এবার খুশি তো?
সবাই বলল—আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে।
রাতে নিশাচর পাখিটা যেন ঘুমতে দিচ্ছে না জংলাকে। কু উ কু উ করে অদ্ভুত সুরে ডেকে চলেছে। জংলা ভেবে চলেছে — কাল তো ওদের আসতে বলে দিলাম। যদি দেখা না যায় কি হবে? —আমাকে তো সবাই পাগল বানিয়ে ছাড়বে। কি যে করি! হায় ঈশ্বর, যেন দেখা যায়। একদিন নয় দুদিন নয়, পরপর তিনদিন আমি নিজে চোখে দেখলাম। আর কালকে যদি দেখা না যায় তাহলে আমার কি হবে! সবাই আমাকে হয় মিথ্যুক আর নাহলে বলবে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। উহ্, কি যে করি!—এইসব ভাবতে ভাবতে জংলা কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল ও জানতে পারল না।
রাত সাড়ে দশটা। এদিকে করিমের বাবা করিমকে বলল— তোর ফোনটা দে তো করিম, একটা ফোন করি। করিম বলল — আব্বা, ফোনটা জংলাকে দিয়েছি। করিমের বাবা মৃদু রেগে গিয়ে বললেন—আমার ফোনে ব্যালেন্স নেই। ভাবলাম তোর ফোন থেকে একটা ফোন করব। তা আ আ—তোর ফোন ওকে দিতে গেলি কেন? করিম বলল—আব্বা, ও নাকি মাঠে দুপুর বেলা সাদা কাপড় পরা একটা পেত্নী দেখেছে। তিনদিন পরপর দেখেছে। ও আমার ফোনটা দিয়ে ওই পেত্নীর ছবি তুলবে। সে নাকি হাঁটতে হাঁটতে উত্তর-পূবের ওই গলায় দড়ি বাগানের দিকে চলে যায়। আব্বা, সত্যি এমন হতে পারে?
ওর বাবা একটু ভেবে নিয়ে বললেন—জায়গাটা ভাল নয়। ওই আমবাগানে বছর সাতেক আগে এক মহিলা আত্মহত্যা করেছিল। করিম এই কথা শুনে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। বলে —আব্বা, সত্যি কি ওই পেত্নী আছে? জংলা সত্যি সত্যি দেখেছে?
দেখতেও পারে। ব্যাপারটা সত্যি হতে পারে। —বলেন করিমের বাবা।
করিম রাতে জেগে ভাবতে থাকে —কি হতে পারে ব্যাপারটা? জংলা অনেক করে জোর দিয়ে বলেছিল। যাক্ গে, কাল দুপুরেই জানা যাবে। এখন ঘুমিয়ে পড়ি। করিম ঘুমিয়ে পড়ে। যদু, হরি, মিহিরও একই চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল বেলা করিম ওর বাবার কাছে জেদ ধরল ওদের সাথে যাবার জন্য। ওর বাবা বললেন —করিম, আমার কাজ আছে রে, কি করে যাই বলতো। করিম ওর বাবার কাছে জেদ ধরে —না আব্বা, তোমাকে যেতেই হবে। আমরা সবাই ছেলেমানুষ, যদি কিছু হয়ে যায়! মানে যদি ওই ডাইনিটা আমাদের কোনো ক্ষতি করে... ।
অগত্যা নিরুপায় করিমের বাবা আর ওরা সবাই দুপুর একটার দিকে মাঠে গেল। ওরা প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে রইল। মিঠা বলল—হ্যাঁ রে এই জংলা, কই রে তোর সাদা পেত্নী? হরি বলল—দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা হয়ে গেল। যদু বলল—মাটিতে আর পা রাখা যাচ্ছে না রে মিহির, পা যেন পুড়ে যাচ্ছে! হঠাৎ ওরা দেখল —মাঠের পুব দিকে একটা কেমন যেন আলো জ্বলে উঠল। করিম বলল—জংলা ক্যামেরা অন্ কর্! মিহির করিমের বাবাকে বলল—আমার ভয় করছে কাকু! আমি বাড়ি যাব। করিমের বাবা অভয় দিলেন —ভয় নেই মিহির, আমি তো আছি। অবাক কান্ড—সেই আলোরই ভিতর হতে একজন সাদা পোশাক পরিহিতা নারীমূর্তি ক্রমশ দৃশ্যমান হতে লাগল। তারপর উত্তর-পূব ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতে লাগল।
জংলা চেঁচিয়ে ওঠে —কাকু ক্যামেরায় ধরা দিচ্ছে না। করিমের বাবা বললেন —ছবি না উঠুক। পুরোটা দেখতে দে। একদম চুপ!
ওরা তিন মিনিট দাঁড়িয়ে মূর্তিটাকে অতি ধীর পদক্ষেপে হেঁটে যেতে দেখল—তারপর উত্তর-পূবের গলায় দড়ি আমবাগানের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল।
—দেখলি তো? আমি সত্যি না মিথ্যে বলেছিলাম। জংলা চেঁচিয়ে ওঠে।
করিমের বাবা বললেন —এখানে আর এক মিনিটও নয়। ফিরে চল। তারপর দেখচি।
সবাই দ্রুত পদক্ষেপে বাড়ির অভিমুখে চলতে লাগল। তারপর গ্রামে প্রবীণ ব্যক্তিদের একটা মিটিং বসল পরদিন সন্ধ্যায় এই বিষয়টি নিয়ে। মিটিংয়ের সভাপতি নরেশ মাহাতো। সব আলোচনা অন্তিমে কি করা হবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তিনিই। এদের দলের সবাইও হাজির —মিহির,জংলা, যদু, হরি, মিঠা সবাই, আর করিমের বাবাও। গ্রামের আরসব বাচ্চারা মহিলারা প্রায় সকলেই উপস্থিত। এক্কেবারে টানটান উত্তেজনা —কি হবে, কি হবে এমন একখানা ব্যাপার! ভয়ে সেদিন থেকে কেউ আর মাঠের ধারেকাছে যাচ্ছে না, বিশেষ করে দুপুর বেলা।
মিটিংয়ের পরিচালক শম্ভুচরণ বললেন —আজ এই মিটিংয়ে একটা বিশেষ আতঙ্কজনক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হবে। আশা করি ব্যাপারটা কারোর অজানা নয়। গত কয়েকদিন ধরে আমাদের গ্রামের ছেলে জংলা ওরফে অসীম সামন্ত গ্রামের পশ্চিমে অবস্থিত উড়ানখোলা মাঠে মধ্যাহ্নকালীন সময়ে এক অশরীরী আত্মার সাদা রূপ দেখতে পায়, এমনকি আমাদের গ্রামের ছেলে করিম সেখের বাবা মুজিবর সেখও গতকাল তা নিজ চোখে দেখেন।
মিটিংয়ে হাজির প্রতিটি মানুষ চুপচাপ। সাঁ সাঁ বাতাসটা দক্ষিণ-পশ্চিম হতে বয়ে আসছে। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবার চোখে এক অভূতপূর্ব বিস্ময়ের ছায়া নেমে এসেছে। এ কখনো হতে পারে! হয় কখনো! বাচ্চারা বললে না হয় হত, একেবারে মুজিবর সেখের মত পরিণত বয়স্ক শিক্ষিত লোকও এ দৃশ্যের জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী! ওফ! কি ভয়ংকর রে বাবা! উড়ানখোলা মাঠে তো আর যাওয়াই যাবে না!—এমন সব কথাই এখন গ্রামের সবার মুখে মুখে।
মিটিং শুরু হল। পরিচালক এক এক করে সবার থেকে এই ভৌতিক ব্যাপারটির কি বিহিত করা যায় সেবিষয়ে পরামর্শ দানের সুযোগ দিচ্ছেন। কেউ বলছে ওঝা ডাকতে হবে, কেউ কেউ বলছে পূজো দিতে হবে, কেউ আবার বলছে মাজারে সিন্নি দিতে হবে, আবার একজন বলল প্লানচেট করা যাক। কিছু তরুণ মাথা গরম করে বলে ফেলল — আমরা ওখানে আগুন দেব। বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করব, দেখি ও পেত্নী কি করে থাকে!
শিশুরা তো ভয়ে জড়োসড়ো। মায়েদের কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে মিটিংয়ের লোকেদের কথা শুনছে। এই ক’দিন গ্রামের কেউই ওই মাঠের ত্রিসীমানায় পা ফেলেনি। দুপুর হবার আগেই সব বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়ে ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ হয়ে যেত। থমথম করত গ্রামখানি!
যাইহোক, মিটিং শেষ হল, যে যার বাড়ি চলে গেল। এদিকে তারপর ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা। নরেশ মাহাতো রাত বারোটা সাড়ে বারোটা হবে এমন সময় আধখোলা উত্তুরে জানালার দিকে ঘুম ভেঙে তাকিয়েছেন; দেখলেন—একটা নারীমুখ জানালা দিয়ে ঘরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে সাদা দন্তবিকশিত নিঃশব্দ করাল হাসি! ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ শুধু শোনা যাচ্ছে। বাড়ির পাশের আমগাছটা থেকে একটা শুকনো পাতা মৃদু কর্কশ শব্দে খসে পড়ল। নরেশবাবুর কপালে ঘাম দেখা দিয়েছে। নরেশবাবু ভালো করে তাকালেন—দেখলেন—একি! মুর্তিটার চোখ নেই, দুটো বড়ো বড়ো গর্ত, আর পরনে সাদা কাপড়। শাড়ি নয়, কফিন —এক্কেবারে সাদা ধবধবে কফিন! নরেশ মাহাতো অসম সাহসী ব্যক্তি। ওনার আর ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইল না। বললেন —কে তুই? কি চাস?
—আমি কে? হিঁ হিঁ! খুব শীগগির টের পাইয়ে দেব আমি কে। হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ। আমাকে তাড়াবি, তাই না? তোদের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি দাঁড়া!
—ও-ও তুই তাহলে সেই সাদা পেত্নী, মাঠে ছেলেদের ভয় দেখাস। তোর ব্যবস্থাও আমরা করব। এই কথা বলেই নরেশবাবু সিগারেট ধরাবার লাইটারটা জ্বালিয়ে একপা একপা করে জানালার দিকে এগতে থাকেন।
—খবরদার! আগুন আনবি না বলছি, আগুন আনবি না। খ্যাঁদা গলায় নারীমূর্তিটি চেঁচিয়ে ওঠে।
—আগুন আনব না মানে, দাঁড়া যদি হিম্মত থাকে। এই বলে নরেশবাবু জানালার দিকে এগতে থাকেন। হঠাৎ জানালার খোলা পাল্লাটি বন্ধ হয়ে যায়। মূর্তিটি অন্ধকারে মিলিয়ে যায়!
সেই রাতে নরেশবাবুর আর ঘুম হল না। অশরীরী আত্মা! এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানে আত্মার সদগতি হয়নি। ভাবতে থাকেন নরেশবাবু। কি করা যায়? প্ল্যানচেট? নাহ্। তাহলে? ওঝা ডাকতে হবে।
পরদিন আবার সবাইকে খবর করে ডাকা হল মিটিংয়ের জন্য। সবাই নরেশবাবুর সাথে কাল রাত্রে ঘটে যাওয়া কান্ড শুনে কাঁপতে লাগল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা মায়েদেরকে ভয়ে জড়িয়ে ধরল। তরুণদের মুখে কথা নেই। প্রবীণ ব্যক্তিগণ চুপ করে ভাবতে লাগলেন — কি করা যেতে পারে?
মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হল প্ল্যানচেট করা হবে, তার সাথে ওঝা দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। ঠিক হল আগামী শনিবার দুপুর একটায় এগুলোর আয়োজন করা হবে।
শনিবার এল। দুপুর বারোটা থেকে গ্রামের ক্লাবঘরের প্রাঙ্গণ লোকে ঠেসে গেল। সবাই এসব দেখবে বলে তাড়াতাড়ি স্নান রান্নাখাওয়া সেরে ক্লাবঘরের সামনে হাজির। প্ল্যানচেট এক্সপার্ট একটা বড়ো কালো শ্লেট আর একটা খড়ি সামনে রেখে মন্ত্র বলে যেতে লাগলেন। পাশের গাছগুলোর পাতার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দটা বেড়ে যেতে লাগল। একটা বিড়ালছানা হুশ্ করে ক্লাবঘরের পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল। ক্লাবের সামনে দু-একটা পায়রার গুরগুর গুরগুর ডাক শোনা যেতে লাগল। প্ল্যানচেট এক্সপার্ট মন্ত্র বলে যেতে লাগলেন। খড়িটি চলতে লাগল শ্লেটের ওপর। কালো শ্লেটে লেখা ফুটে উঠতে লাগল—মন্দিরে পাঁঠাবলি দিয়ে পূজো দিতে হবে। তাহলেই আমার আত্মা পরিতৃপ্ত হবে, নাহলে আমি মাঠে বাচ্চা ধরে খাব।
অবিশ্বাস্য! একেবারে অবিশ্বাস্য! কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওঝা বললেন — গ্রামের সকলকে বলছি একটা পাঁঠা জোগাড় করে অমাবস্যার রাতে গ্রামের ঈশান কোণের ওই কালী মায়ের মন্দিরে শীঘ্রই পূজোর ব্যবস্থা করুন। নইলে ঘোর বিপদ আছে!
পরের শনিবার অমাবস্যার রাতে গ্রামের কিছু মুরুব্বি মানুষ পাঁঠা বলি দিয়ে কালীমূর্তির পূজো দিলেন। তারপর সকালবেলা উঠে গাঁয়ের লোকজন যা দেখল তাতে সকলে হতবাক হয়ে গেল। সবাই দেখল—মাঠের সেই উত্তর-পূব কোণে পড়ে রয়েছে একটা ধবধবে সাদা নতুন শাড়ি—এক্কেবারে পুরো সাদা, আর কোনও রঙের ছিটেফোঁটাও নেই তাতে। কারোর বুঝতে বাকি রইল না যে, সেই পেত্নী চলে গেছে, আর রেখে গেছে এই জিনিসটি।
তারপর থেকে আবার জমে উঠল যদু, হরি,করিম, মিহির, জংলা, মিঠা আর আরো সব ছেলেদের মাঠের আড্ডা। সাদা পেত্নী আর কখনও আসেনি।
গল্প — সাদা পেত্নী
লেখক — মনসুর আলী গাজী
মোবা — ৯০৫১৭২৫৬৮৮
মেইল — mansuraligazi61@gmail.com
ঠিকানা — গ্রাম — পিয়াদাপাড়া
পোস্ট — বারুইপুর
জেলা — দঃ ২৪ পরগণা
কলকাতা — ৭০০১৪৪
পেশা — শিক্ষক, এম এ (ইংরাজী), ডি এল এড
কর্মস্থল — ধোষা চন্দনেশ্বর এন সি হাই স্কুল (এইচ এস)
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন