| রুদ্রসাগর কুন্ডু |
মেঘ বৃষ্টি
প্রবল খরার মধ্য দিয়েই আষাঢ় মাস পেরিয়ে গেল। শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়েও বৃষ্টির দেখা নেই। এক-আধটু ছিটে ফোঁটা বৃষ্টিও নেই। প্রায় প্রতিদিন বিকেলের দিকে আকাশে মেঘ করে আসে, কিন্তু বৃষ্টি হয় না।
মাটির বুক শুকনো ও শক্ত, মাটি ফেটে চৌচির হয়ে আছে। হালের বলদ গুলো, বাড়ির একপাশে বাঁশ বাগানের ছায়ায় অলস শুয়ে জাবর কাটছে। জল না হলে মাটিতে লাঙল পড়বে না। ধান চাষ হবে না। ধান না ফলাতে পারলে, সারা বছরের খাদ্য ভাণ্ডারে টান পড়বে। এতগুলো পেট। অভাব অনটন লেগে থাকবে সংসারে।
শুয়ে শুয়ে জাবর কাটা গোরুগুলোর অদূরে দাওয়ায় বসে চিন্তামগ্ন শীর্ণকায় বয়স্ক কৃষক সুনীল রায়। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছে করুণ, নির্বাক দৃষ্টিতে আর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আক্ষেপ করছে।
এক ফোটা বৃষ্টি নেই, এভাবে দিনের পর দিন বৃষ্টি না হলে, শক্ত মাটিতে হাল চালানো যাবে না। সময় বয়ে যাচ্ছে। কবে নামবে বৃষ্টি, কেউ জানে না। বৃষ্টি না হলে শক্ত মাটির বুকে কীভাবে চাষ হবে ? যতই দিন যাচ্ছে, কৃষকের মন ততই উদ্বিগ্ন হচ্ছে। মাঝে মাঝে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠা মন, আকাশের দিকে তাকিয়ে নিরুত্তাপ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় রুগ্ন কৃষক সুনীল রায়।
বৃষ্টি দেরিতে এলে ব্যাহত হবে ধান চাষ। ফলন ভালো হবে না। সারা বছরের খাদ্য ভাণ্ডারেও পড়বে টান। তখন সংসারের প্রায় প্রতিটি মানুষকেই অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাতে হবে। তাই মনে মনে ভাবে, ঠিক সময় মত যদি বৃষ্টি হতো, আর ভালো করে যদি চাষ করা যেত ধান, তাহলে দুবেলা-দুমুঠো খাবার-এর নিশ্চিন্ত সংস্থান হয়। যা দিনকাল পড়েছে!
সবকিছুর অগ্নি মূল্য বাজার দর। বাজার থেকে কোন পণ্য কিনে খাওয়ার ক্ষমতা এদেশের প্রায় কৃষকের থাকে না। সুনীলের নেই। ধানের ভালো ফলন হলে, খরের যোগানও বেশ হয়। সেই খর খেয়ে হালের বলদ গুলো সারা বছর বেঁচে থাকে। হালের বলদের সঙ্গে আর কৃষকের জীবনের সঙ্গে সামান্য কিছু রদবদল ছাড়া বাকি সবই তো মিল। হয়তোবা তার জন্যই হালের বলদ গুলো শুয়ে শুয়ে চিন্তা মগ্ন কৃষকের মুখ পানে চেয়ে, ওরাও আশঙ্কা অনুভব করছে।
এ গায়ে নব্বইটি ঘর। আদিবাসি ও রায়দের সঙ্গে ঘটি বাটি মিলিয়ে সহাবস্থান। হিন্দুস্তান কেবলস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বড়ই কাজের অভাব এখন এদিকে। তারপর বেড়ে গেছে চোরের উৎপাত হিন্দুস্তান কেবলসের পরিত্যক্ত বিল্ডিংগুলো ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে চোরেরা।
বিল্ডিং ভেঙ্গে দরজা জানালা, ইট এবং লোহার রড সংগ্রহ করে, একদল চোরা-কারবারী। অবৈধভাবে কাজগুলো হলেও পুলিশের সহযোগিতায় অনায়াসে এই সব কাজ এখন বৈধতা পেয়ে গেছে।
গ্রামের লোকেরা, বিশেষত কৃষকেরা, পরিশ্রমি হয়। গায়ের মানুষের মধ্যে সততাবোধ, সৎ উপার্জনের মানসিকতা থাকে। পরিশ্রম করে, বৈধ উপার্জন করাই এদের স্বভাব। এই গায়ের একটি দুটি ছেলে বাদ দিলে, বাকি সব মানুষই সৎ উপার্জনের উপরে নির্ভরশীল। পাথর খাদানে জন খাটে, ট্রাক্টার চালায়।
অদূরেই রেল ইঞ্জিনের কারখানা শহর, চিত্তরঞ্জন। কোয়ার্টারে কোয়ার্টারে ফুলের বাগানে কাজ করে কেউ কেউ জীবিকা নির্বাহ করে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পণ্য বিক্রি করে কেউ কেউ। গ্রাম থেকে মহিলারা খুব ভোরে উঠে পায়ে হেঁটে চলে যায় রেল ইঞ্জিন কারখানায়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসন মাজে, রান্না করে দেয়।
কেউ কেউ আয়ার কাজ করে, রোগীর সেবা শুশ্রূষার কাজ করে। বেশির মানুষের ঘরবাড়ি মাটি দিয়ে নির্মিত। কেউ কেউ নতুন সরকারের ইন্দিরা বাস, গীতাঞ্জলি আবাস যোজনার ঘর বাড়ি পেয়েছে। কারও কারও বাড়িতে এখন গড়ে উঠেছে শৌচালয়। এইসব নির্মাণে সরকারি দুর্নীতির স্পষ্ট ছাপ থেকে যায়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দ্বারা পঞ্চায়েত সদস্যদের কতৃত্বে তৈরি হয় এসব নির্মাণ। গৃহস্থের ব্যাংকে সরাসরি টাকা ঢুকলেও তার মধ্য থেকেই একটা কাটমানি কমিশনের প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা বলতে অঙ্গনওয়াড়ি খিচুড়ি আর খিচুড়ির দিদিমণি। বাচ্চাগুলো এক সকাল কাটিয়ে খানিকটা স্কুলের রান্না করা খিচুড়ি হাতে নিয়ে ঘরে ফেরে। সরকারি যোজনা অনুযায়ী, অপুষ্টি দূরীকরণে একটি অক্ষম প্রচেষ্টা। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে যাদের জন্য পুষ্টি বিনিময়ের এই পদ্ধতি, তাদের কাছে মোট খরচের ৫% পৌঁছয় না। মাঝ পথেই মন্ত্রী, নেতা, আমলা, সুপারভাইজার সিডিপিও, দিদিমণি, সহকারি সকলে মিলে লুটপাট করে খায়।
গ্রামের কৃষকেরা, সাধারণ মানুষেরা এত কিছুর খোঁজ খবর রাখে না। বর্ষায় একটু বৃষ্টির অপেক্ষা করে থাকে তারা। ভালো বৃষ্টি হলে ভালো ধান চাষ হবে। ভালো ধান চাষ হলে, নিজেদের খাবার জুটবে, গাই গরুর খাবার জুটবে। এত সাধারন চাহিদার মধ্যেই এ গায়ের মানুষের জীবন-যাপন।
বর্ষায় গোরুর গোবর জমিয়ে রাখে, তা থেকে জৈব সার হয়। শীতের সময়ে নানা রকমের সবজির চাষ করা হয়, তখন এই জৈব সার ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক সার কেনার পয়সা থেকে বেঁচে যায় কৃষক। গোবর সারে সবজির উৎপাদন ভাল হয় আর তা স্বাস্থ্যসম্মতও। সেই সবজি বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। বিক্রির টাকায় নুন, তেল, মসলাপাতি কিনতে হয়।
বর্ষায় ধানের চাষ শীতকালে সবজি ও আনাজ তরকারি। বড় বিচিত্র জীবনযাপন এদের। অসুখ বিসুখ হলে মন্দিরের থানে মাথা ঠুকে ঈশ্বরের কাছে করুণা প্রার্থনা করে এরা। তাবিজ কবজ, জল পড়া, ঝাড়ফুঁক, ওঝাঁ এদের অসুখে-বিসুখে প্রধান ভূমিকা পালন করে। যারা তুলনায় একটু সচেতন, তারা দুই একটা প্যারাসিটামল খায়। স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়।
গ্রামের জন্য সরকারি তরফে এক জন স্বাস্থ্য কর্মী দিদিমনির বরাদ্দ রয়েছে। তিনি আসেন কালে ভদ্রে। স্বাস্থ্য কর্মী দিদিমণি জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য বড়ি দিয়ে যান। কেউ কেউ গোপনে কনডম চেয়ে রাখেন। সারা বর্ষায় জরুরী প্রয়োজন হিসেবে পরিবার প্রতি একটি করে খাবার স্যালাইন নাকি বরাদ্দ থাকে সরকারি তরফে।
এত অভাব অনটনের মধ্যেও বড় এক বিচিত্র স্বভাব রয়েছে গায়ের মানুষের। তারা সাঁওতাল পাড়ায় ঢুকে সন্ধ্যেবেলায় মহুয়া মদ খায়। শুয়োরের মাংস খায়। বাদাম ছোলা ভাজাভুজি সহযোগে আনন্দ উল্লাস করে। চটুল সাঁওতালি উচ্চহাস্য মনোরঞ্জন করে । না, ঠিক বেশ্যাবৃত্তি নয়। এটা গ্রামীন মদিরার এক গরিবী আনন্দ যাপন। কখনও সখনও শরীর বৃত্তীয় সম্পর্কের নির্মাণ হয় হয়তোবা, কিন্তু তা অর্থের বিনিময়ে নয়, ভালবাসার, আবেগের।
আজও আকাশে মেঘ। কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। গোরু গুলো সেই একই ভাবে, একই অভ্যাসে বাঁশ বাগানের পাশে অলস শুয়ে যাবার কাটছে। আর জীর্ণকায় কৃষকের চিন্তিত মুখপানে চেয়ে কি যেন ভাবছে। কৃষক বারবার তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। মেঘের আকাঙ্ক্ষা করে চোখ দুটো ব্যথিত হয়ে আসে। অজান্তেই কখন যেন ভিজে যায় চোখের পাতা।
চারিদিকে আজকাল বড় অ-সহিষ্ণুতা, বড় সংঘাত, বড় বিপর্যয়। বড় প্রতিঘাতের জীবন। ঈশ্বর বিমুখ। গরিব পাড়ায় যেমন ব্রাহ্মণরা আসেনা, তেমনি তার পিছু পিছু আসেননা স্বয়ং ঈশ্বরও। তবু এরা নিয়মিত ঠাকুরের থানে প্রাণ খুলে দান করে, পূজা-অর্চনা করে, ভক্তি প্রদান করে। হয়তোবা এই চিন্তিত কৃষকেরা মনে মনে, বৃষ্টির মানত করে, কালি বা মা মনসার কাছে পাঠা বলির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশায় বুক বেঁধে আছে।
এরা বিজ্ঞানের অংক জানে না। এরা জলীয় বাষ্প, জলকণা, মেঘ ভারি হয়ে আসলে বৃষ্টি হওয়ার তত্ত্ব বিষয়ের খবর রাখে না। জানে না আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি। এরা শুধু জানে, ভগবান বৃষ্টি দেন। যদি তিনি তুষ্ট থাকেন তাহলে সবকিছু ঠিকঠাক থাকে। আর যদি তিনি রুষ্ট হন, তাহলে খরা, বন্যা, ঝড়, অসুখ-বিসুখ মহামারীতে গ্রামকে গ্রাম মানুষ মরে সয়লাব হয়ে যায়। এরা তাই ঈশ্বরকে ভয় পায়, ভয়ে ভক্তি করে। বিজ্ঞানের জ্ঞান ও শিক্ষার আলো থেকে এরা বহু যোজন দূরে থেকে কেমন আছে, কেমন থাকে; তা জানার অবকাশ নেই কারোরই।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন
(
Atom
)
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন